মাহবুব জামিলের স্মরণসভায় ৩টি প্রস্তাব

ব্যবসায়ী মাহবুব জামিল চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয়।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Nov 2022, 06:42 PM
Updated : 22 Nov 2022, 06:42 PM

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মাহবুব জামিলকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ এবং তার নামে পদক প্রবর্তনের প্রস্তাব করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। আর্থিক সহযোগিতা পেলে নিজেই প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি। 

মঙ্গলবার সদ্য প্রয়াত মাহবুব জামিলের স্মরণসভায় এই প্রস্তাব উত্থাপন করে মোরশেদুল ইসলাম বলেন, “স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে শিল্পকলা একাডেমি যেন আর্থিক সহযোগিতা করে, তার জন্য আমরা দাবি জানাব।”

এছাড়া মাহবুব জামিলের নামে প্রতি বছর একটি পূর্ণ্যদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পদক দেওয়ার প্রস্তাবও উত্থাপন করেন মোরশেদুল।

তিনি বলেন, “এই পদকের জন্য যে খরচটি হবে, তার স্পন্সর নেওয়ার ব্যাপারে আমরা চেষ্টা করতে পারি। জামিল ভাই সিঙ্গার, রবিসহ যেসব প্রতিষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন, তাদেরকেও বলতে পারি আর্থিক সহযোগিতার জন্য। আমার বিশ্বাস এই তিনটি কাজ সবাই মিলে করতে পারব। ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ এই তিনটি কাজ বাস্তবায়ন করার কাজটি করতে পারে।”

বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, প্রামাণ্যচিত্র পর্ষদ ও শিল্পকলা একাডেমি যৌথভাবে এই স্মরণসভার আয়োজন করে। 

ফখরুদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহবুব জামিল গত ১৫ নভেম্বর মারা যান। এই ব্যবসায়ী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাস্টিও ছিলেন।

স্মরণ সভার শুরুতে ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে/ তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে’ গানটি গেয়ে শোনান তাহমিদ। পরে মাহবুব জামিলের প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’ গানটিও গেয়ে শোনান এই শিল্পী। 

চলচ্চিত্র শিক্ষক মানজারে হাসীন মুরাদ বলেন, “জামিল ভাই সজ্জন এবং সু-ভাষী মানুষ ছিলেন। ভালো মানুষ হিসেবে তার যে পরিচয়- এটাই আমার কাছে বড় পরিচয়। তিনি এত কর্মব্যস্ত মানুষ, কিন্তু ভীষণ পড়ুয়া মানুষ ছিলেন। অবাক হতাম যে তিনি কখন এই পড়ার সময় পান। চলচ্চিত্র নিয়ে তার পড়ার ব্যাপ্তি দেখে ভীষণ অবাক হতাম।”

চিত্র সমালোচক মঈনুদ্দীন খালেদ বলেন, “মাহবুব জামিল একটা লড়াই। তার অনেক কাজ আমরা দেখতে পেতাম না। দৃশ্যমান ছিল না। তিনি সব সময় পেছনে থেকে আমাদের এগিয়ে দিয়েছেন। ফিল্ম সোসাইটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।”

প্রামাণ্যচিত্র পর্ষদের সাবেক সভাপতি ফরিদুর রহমান বলেন, “ছায়াবৃক্ষ নাটকে মাহবুব জামিল অন্যরূপে নিজেকে হাজির করেছিলেন। তার লেখা নাটকটি সিলেটের চা বাগানে শুটিং হয়েছিল। সেই নাটকটির মধ্য দিয়ে তিনি যে মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন, তিনি যদি লেখালেখি করতেন, তাহলে আমরা ভালো কিছু নাটক এবং চলচ্চিত্র পেতাম।”

শর্ট ফিল্ম ফোরামের সভাপতি জহিরুল ইসলাম কচি বলেন, “জামিল ভাই ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের সভাপতি ছিলেন, আমি সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। তিনি কখনো কাউকে আহত করে কথা বলতেন না। তার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করার লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

মুভ্যিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি বেলায়াত হোসেন মামুন বলেন, “জামিল ভাইয়ের স্নেহ আমি পেয়েছি। ২০১৪/২০১৫ সালে জামিল ভাইয়ের ৭/৮ ঘণ্টার একটা ইন্টারভিউ করেছিলাম। সেটি এখনো কোথাও প্রকাশ করি নি। সেই ইন্টারভিউতে অনেক খোঁচা দিয়ে প্রশ্ন করেছি, কিন্তু তিনি রেগে যাননি। খুবই ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর দিয়েছেন। উনার সাথে যখন কথা বলেছি, উনি যে সম্মানটা দিতেন সেটা বিরল।”

চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে যারা কাজ করে গেছেন, তাদের অনেকেই সঠিক মূল্যায়ন পাননি মন্তব্য করে মামুন বলেন, “জামিল ভাইও সঠিক মূল্যায়ন পান নাই।”

আলোকচিত্রী মুনীরা মোরশেদ মুন্নী বলেন, “স্বল্পভাষী জামিল ভাই এত সময় সচেতন ছিলেন। তাকে কখনোই বিলম্ব হয়ে কোথাও উপস্থিত হতে দেখিনি। ঠিক ৫/১০ মিনিট আগে এসে উপস্থিত হতেন। যদি দেরি হত সেটাও ফোনে জানিয়ে দিতেন।”

মাহবুব জামিলের ছেলে রুবায়েত জামিল বলেন, “আমার বাবা ছিলেন যোদ্ধা। ব্যবসায়ী কমিউনিটি থেকে নানা ক্ষেত্রে তিনি যুদ্ধ করে সফল হয়েছেন। বাবার কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয় শিখেছি, এর মধ্যে এটা শিখেছি। সফল হওয়ার জন্য আমরা কেউ যেন নীতি বিসর্জন না দেই। বাবার জীবন আমরা উদযাপন করতে চাই।”

মাহবুব জামিলের স্ত্রী নাহার জামিল বলেন, “ফিল্ম সোসাইটি ছিল জামিলের তৃতীয় সংসার। আমি বিয়ের পর থেকেই দেখেছি, উনার যত কাজই থাক, ফিল্ম সোসাইটির কোনো কাজ হলে উনাকে কেউ আটকে রাখতে পারত না। সে যে ফিল্ম সোসাইটির কাজগুলো করত, আমার ভালো লাগত।”

সভাপতির বক্তব্যে লাইলুন নাহার স্বেমি বলেন, “জামিল ভাই আমার একজন অভিভাবক ছিলেন। আপন লোক বলতে যা বোঝায়- তিনি তা-ই ছিলেন। এই আপন লোক জীবনে থাকা দরকার হয়। এই আপন লোকেরা গাইড করে উপরে উঠার জন্য।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক