Published : 05 May 2026, 03:26 PM
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সংবাদমাধ্যম ভিন্নভাবে প্রচার করলেও জঙ্গিবাদ নিয়ে তার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ‘খুব বেশি ভিন্নতা’ ছিল না।
দেশে জঙ্গি আছে কি না, সেই প্রশ্নে তার ভাষ্য, রেড অ্যালার্ট যেহেতু এখানো আছে, তার অর্থ ‘বুঝে নিতে হবে’।
মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে জঙ্গিবাদ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও কিন্তু বলেছেন যে, কিছু এক্সট্রিমিজমের অস্তিত্ব আছে। মানে এই যে জঙ্গিবাদ শব্দটা আসলে উনি ব্যবহার করতে চান নাই। ইনফ্যাক্ট আমি যা বলেছি, উনার বক্তব্যের সাথে আসলে খুব বেশি ভিন্নতা নেই। সো এটাকে আপনি জঙ্গিবাদ নামে বলুন অথবা উগ্রবাদ নামে বলুন, একটা লো ইন্টেনসিটি তো আছে।
“না হলে তো আমরা এই রেড অ্যালার্ট আনতাম না। এটা আছে। এটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন। প্রচুর কাটুন-টার্টুন হয়েছে…। রেড অ্যালার্ট যেহেতু এখনো আছে, তার মানে … আপনাকে বুঝতে হবে, এই ধরনের ঘটনায় সবসময় পাবলিকলি সব কথা সরকার বলবে–সেটা সবসময় হবে না।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে দাবি করা হচ্ছিল। দেড় দশকে শত শত গুমের অভিযোগ অনুসন্ধানে গঠিত গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশন তখন বলেছিল, জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের ছায়ায় ইসলামী উগ্রবাদের হুমকিকে ব্যবহার করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গুমকে ‘একটি সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ’ দিয়েছিল।
তবে সন্ত্রাসবাদের হুমকি যে মিথ্যে নয়, সে কথা স্বীকার করে কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম গত ১৯ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “সন্ত্রাসবাদ সারা বিশ্বে একটি বাস্তব হুমকি, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজানে হামলার মত ঘটনা এর প্রমাণ।
“তবে এই হুমকি মোকাবেলায় রাষ্ট্রের সততা, মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতি এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় অটল থাকা জরুরি। সরকার সন্ত্রাসবিরোধী প্রচারণাকে যখন রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তা আইনের শাসন, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের বিশ্বাসকে ধ্বংস করে দেয়।”
বিএনপির নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর এক সতর্কবার্তায় জানায়, ‘নিষিদ্ধঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা’ জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। এরপর দেশের বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
এরপর ২৮ এপ্রিল ঢাকার আগারগাঁওয়ে কোস্ট গার্ডের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
এক সাংবাদিক বলেন, “দেশে জঙ্গি উত্থানের বিষয় জানা যাচ্ছে এবং বিমানবন্দরে নিরাপত্তাও বাড়ানো হচ্ছে। তো এই বিষয়টি আপনারা...।”
তার কথার সূত্র ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি আপনাদের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরেছি, কিন্তু আমি ওই শব্দকে রিকগনাইজ করি না। আমাদের দেশে এরকম কোনো তৎপরতা নেই। কিছু এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ থাকে—পৃথিবীর সব দেশেই এরকম অ্যাক্টিভ থাকে।
“র্যাডিক্যাল কিছু ফোর্স থাকে, ফান্ডামেন্টাল কিছু পলিটিক্যাল পার্টি থাকে—এগুলো আমরা ইউজড টু, এগুলো থাকে। কিন্তু সে বিষয়ে আপনি যে শব্দ উচ্চারণ করলেন, আমাদের দেশের বর্তমান কালচারে সেটা এখন আর নাই-ই।”
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আগে সেই শব্দটা উচ্চারিত হতো ফ্যাসিবাদী আমলের সময়; তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর এক্সিস্টেন্স নেই।”
ওইদিনই সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে ব্রিফিংয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। সেখানে তাকেও জঙ্গি হুমকি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
এক সাংবাদিক জানতে চান, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ‘জঙ্গি হামলার’ আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলেছিলেন, ‘দেশে আসলে জঙ্গি নেই’। জঙ্গি আছে কি না—এ সরকার কি মনে করে এবং নাশকতা যদি হয়, সরকারের গোয়েন্দাদের কাছে কী ধরনের তথ্য আছে? কতখানি শঙ্কা রয়েছে সরকারের কাছে? মানে কতখানি ‘ম্যাসাকার’ হতে পারে?
জবাবে উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সেদিন বলেন, “প্রথম কথা হচ্ছে—সরকারের কাছে কতখানি তথ্য আছে, এটা বলা যাবে না। এটা একটা সেনসিটিভ তথ্য। এ তথ্যটা গোপন থাকবে। কিন্তু যেটুকু তথ্য সরকার জানিয়েছে- এটা ফ্যাক্ট; বাংলাদেশে জঙ্গি আছে। কিন্তু এখানে দুটো এক্সট্রিম আছে। আমি দুটো এক্সট্রিমের কথা বলি।
“আগের সরকারের সময়, মানে আমি ইন্টেরিমের কথা বলছি না, তার আগের সরকারের (আওয়ামী লীগ) সময় জঙ্গি সমস্যাকে যেই স্কেলে দেখানো হয়েছে, এটা তাদের ক্ষমতায় থাকার একটা ন্যারেটিভ হিসেবে তারা ব্যবহার করেছিলেন যে ‘বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, জঙ্গিরা সব দখল করবে; সুতরাং আমি নির্বাচন করলাম কি না দেখার দরকার নেই, আমাকে ক্ষমতায় রাখো’। দ্যাট ওয়াজ আ ন্যারেটিভ।”
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “এটা একজাজারেটেড (অতিরঞ্জিত) হয়েছিল ওই সরকারের সময়। পরবর্তীতে যে সরকারের সময় ইন্টারিমের সময় এই আলাপ কেউ কেউ করার চেষ্টা করেছে যে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই, এটাও আরেকটা এক্সট্রিম। এটাও ভুল কথা।
“বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিটেন্সি- জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট করতে চাই। এই সতর্কতার মানে হচ্ছে এটা খানিকটা ঝুঁকি তৈরি করেছে, কারণ দেড় বছর ইন্টারিম সরকারের সময় আমরা খেয়াল করেছি এই প্রবণতার মানুষদের অনেক বেশি সংগঠিত হওয়া বা পাবলিকলি আসা বা ওপেনলি আসার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে ‘অমিল’ নিয়ে সোমবার সালাউদ্দিন আহমদকে প্রশ্ন করা হলে তিনি ‘আমি কে’ বলে তিনি প্রশ্নদাতার দিকে তাকিয়ে উত্তর জানতে চান।
“আপনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী” বলার পর সালাহউদ্দিন বলেন, “আমি যেটা বক্তব্য দিয়েছি, ওটাই তো আপনারা ছাপিয়েছেন। তথ্য উপদেষ্টা কীভাবে বলেছেন জানি না। হয়ত আপনাদের লেখার মধ্যেও ‘মিসইন্টারপ্রেট’ হয়ে যেতে পারে। এটা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কী বলেছে সেটা শুনতে হবে।”
এরপর মঙ্গলবার তথ্য অধিদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে এসে আবারও জঙ্গিবাদ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “সরকার এইগুলোর যে রিস্ক আছে, এগুলোর ব্যাপারে যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি। যখন গ্রেপ্তার বা এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে, যেটা সরকার মনে করবে, আপনাদের সময়মত জানানো হবে।
“এটুকু বলতে পারি যে, রিস্কের কথা আগে বলা হয়েছিল, সেই রিস্ক নিশ্চয় এখন অনেক কম। সেই রিস্ক কমে যাচ্ছে। কিন্তু এই জায়গাগুলো অনেক বেশি সেনসিটিভ, সে কারণেই এখন পর্যন্ত (রেড অ্যালার্ট) রাখা হয়েছে। তবে এটা খুব বেশিদিন থাকবে বলে আমার মনে হয় না।”
সাংবাদিকদের প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, “জঙ্গি আছে, জঙ্গি নেই–আমি একটা বক্তব্য করেছি। প্রায় একই সময়ে বা একটু পরেই মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন দেশে কোনো জঙ্গি নেই। আপনারা যদি পড়ে দেখেন আমরা বক্তব্য আর উনার বক্তব্যের মধ্যে খুব বেশি ভিন্নতা ছিল না। এটা হল প্রধান কথা।
“আমরা তো আসলে ফটোকার্ড করি এখন। আমি এভাবে বলেছি যে জঙ্গিবাদের একটা অতিরঞ্জন ছিল। আওয়ামী লীগের সময় তারা এটা দিয়ে ক্ষমতায় থাকার ন্যারেটিভ তৈরি করেছে। আবার কেউ কেউ কিছুই নেই আমাদের দেশে–এ ধরনের বলে। দুটোই কিন্তু নেগেটিভ।”
অন্যদের মধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহ আলম এবং প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।