Published : 09 Mar 2026, 11:18 PM
দুয়ারে ঈদ উৎসব কড়া নাড়লেও এখনো কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার দেখা মেলেনি রাজধানীর মিরপুরে বেনারসি পল্লিতে।
দোকানের সামনে কর্মীরা হাঁকডাক করলেও খরিদ্দার তেমন নেই; ফলে অলস সময় কাটাতে হচ্ছে দোকানিদের। ইফতারের পরও পল্লির চিত্রের খুব একটা হেরফের নেই।
বিক্রয়কর্মীরা বলছেন, আগের মতো ঈদ ঘিরে আর এই পল্লি জমে না, বিয়েসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানই মূল ভরসা হয়ে উঠছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষ এখন শৌখিন ও উৎসবের পোশাক কম কিনছে।
রোববার বিকালে গিয়ে দেখা যায়, মিরপুরে ১০ নম্বর গোল চত্বর এলাকার পাশে অবস্থিত এ পল্লিতে ঐতিহ্যের বেনারসিসহ নানা ধরনের শাড়ির পসরা সাজিয়েছেন বিক্রেতারা। দোকানের বাইরে কয়েকজন কর্মী হাঁকডাক দিয়ে ‘নতুন কালেকশন’ আর ‘ডিসকাউন্টের’ কথা বলে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টায় আছেন।
সেখানকার ‘আদি বেনারসি কিং’র স্বত্বাধিকারী দীন ইসলাম বলেন, “এবার অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেচাকেনা কম। সময়ের চেয়ে এবার ক্রেতা প্রত্যাশার চেয়েও কম। ঈদের যেহেতু আরও কিছু দিন বাকি আছে; তাই আশা করছি বেচাকেনা বাড়বে।”
ক্রেতা খরা নিয়ে হতাশার সুর ‘পালকি’র স্বত্বাধিকারী মতিউর রহমান লিটনের কণ্ঠে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেভাবে বেচাকেনা হওয়ার, সেভাবে হচ্ছে না। সাধারণত ১০ রোজার পর বিক্রি বাড়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। নরমাল মাসের চেয়েও খারাপ হচ্ছে, কারণ ব্রাইডাল মার্কেট হিসেবে অন্যান্য সময়ে মানুষ অনেক টাকার কেনাকাটা করে; কিন্তু ঈদে সেরকম হচ্ছে না। ঈদের বাকি থাকলেও আশানুরূপ বিক্রি হবে বলে মনে হচ্ছে না।
“ছুটি থাকার কারণে মানুষ বাড়িতে যাবে, বিধায় বিক্রি বাড়বে বলা যাবে না। কারণ সরকারি ছুটি-কম বেশির উপর বিক্রি নির্ভর করে।”
বেনারসি রূপ সিঙ্গার’র বিক্রয়কর্মী সাইফুল ইসলাম বলেন, “এটা একটা বিয়ের জন্য বড় বাজার, ব্রাইডাল বাজার। ঈদে বেচাকেনা কম হলেও এবার একটু বেশিই কম।
“ঢাকার অনেক নারীরা চাঁদরাতে শৌখিন কাপড় কিনতে বের হয়, তাছাড়া বেতন-বোনাস পেয়ে পারিবারিক হিসাব মিলিয়ে অনেকেই চাঁদরাত ও এর দু-একদিন আগে রুচিশীল কাপড় কিনতে বের হয়। আমরাও সেই আশা নিয়েই আছি। তবে আশা অনুযায়ী বিক্রি হবে কি না, সেটা বোঝা মুশকিল।”
তবে দোকানিদের কেউ কেউ বিক্রিবাট্টায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তাদের একজন বেনারসি বিগ বাজারের স্বত্বাধিকারী জিয়াউল হক জিয়া বলেন, “বেচাবিক্রি এখন পর্যন্ত ভালো। আশা করি, সামনে আরও ভালো হবে। অনেক আইটেম যুক্ত হয়েছে। ক্রেতারা আসছে, পছন্দ করছে।
“আশা করি, এবার অন্যান্য বারের চেয়ে আমরা ভালোই বেচাবিক্রি করব।”
অবশ্য পল্লির বেশিরভাগ কর্মী এবারের ক্রেতা সমাগম নিয়ে খুশি নন।
আদি ইন্ডিয়ান সিল্ক হাউজের বিক্রয়কর্মী ইমরান বলেন, “অন্যান্য বারের তুলনায় বিক্রি কম। যা বিক্রি হয় আমাদের তা রোজা শুরুর দিকে, এখন তো মানুষ অন্যান্য কেনাকাটা করে বাড়ির দিকে ছুটবে। সব মিলিয়ে এবার ঈদে আশানুরূপ বিক্রি হচ্ছে না।”
এই দোকান থেকে একটি বেনারসি কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ইব্রাহিম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি সবসময়ই বেনারসি নিতে আসি। এখন দাম কিছুটা বেশি রাখতে চাইছে।
“পিউর বেনারসি যেগুলো ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা দাম, সেগুলো ৬-৭ হাজার টাকা চাইছে। দরদাম করে সাড়ে পাঁচ দিয়ে একটা নিয়েছি।”
নিউ বেনারসি ওড়না হাউজের বিক্রয় কর্মী রাকিব বলেন, “এখন বেচাবিক্রি স্লো, দেখে মনে হচ্ছে ঈদের আগে বিক্রি নাও বাড়তে পারে। আসলে মোটকথা আমাদের ঈদের বাজার মনেই হচ্ছে।”
বেশ কয়েকটি দোকানে ঘুরেও দাম মেলাতে পারেননি মোনামি সরকার নামের একজন। স্বামী ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছোট বোনকে নিয়ে পল্লিতে এসেছেন তিনি।
মোনামি বলেন, “এখনো পছন্দ করতে পারিনি। শাড়ির দাম কিছুটা বেশি।”
আল-হামদ’র স্বত্বাধিকারী মামুনুর রশীদ রোববার সন্ধ্যায় বলেন, “কয়েক বছর থেকেই দেখছি- ঈদে বেনারসি পল্লিতে যে একটা জমজমাট বিক্রি হত, সেটা এবারও নেই।
“আজকে তো আঠারো রমজান, কিন্তু চোখে পড়ার মতো বিক্রি তো দেখতে পাচ্ছি না। সবমিলিয়ে ঈদের বেচাকেনা বলা যাবে না।”
ব্যবসা কেবল বিয়ের মৌসুমে
একসময় সারা বছর বেচাবিক্রির ধুম থাকলেও এখন বেনারসি পল্লির ব্যবসার ধরন হয়ে উঠেছে মৌসুমনির্ভর। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বিয়ে-শাদির মৌসুম হওয়ার কারণে বিক্রিবাট্টা বেড়ে যায়। রোজার ঈদকে ঘিরে দোকানিরা ভালো বিক্রির আশা করলেও বাস্তবতা ভিন্ন।
আদি বেনারসি কিং’র স্বত্বাধীকারী দীন ইসলাম বলেন, “এমনিই ব্রাইডাল মার্কেট হিসেবে এর খ্যাতি থাকলেও ঈদে সাধারণত বিক্রি কম হয়। মূলত বিয়ে এবং সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে বেচাবিক্রি বেশি হয়, সেটারও আলাদা মৌসুম আছে, তখন আবার দেখবেন বাজারে প্রাণ ফিরেছে।”
নাজ বেনারসির বিক্রেতা মতিউর রহমান বলেন, “বন্ধের দিন ক্রেতা আসে। আমাদের কিন্তু ঈদ মূল মৌসুম না। বিয়ে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানই আমাদের টার্গেট থাকে।”
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার ধাক্কা পল্লিতে
দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের বিলাসিতা প্রবণতা কমছে বলে মনে করছেন বেনারসি পল্লির অনেক দোকানি। তাদের ভাষ্য, খরচে লাগাম টানায় পল্লির বেচাকেনাতেও প্রভাব পড়ছে।
বেনারসি বিগ বাজারের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন, “এবারও শুরুটা ধীর গতির কারণ কিছুটা মনে হচ্ছে, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি পাওয়া। তাছাড়া চাকরিজীবীরা বেতন-বোনাস পেলে হয়তো বিক্রি বাড়বে।
“আর এখানকার পোশাক তো মূলত ঐতিহ্য, নিপুণ হাতের কাজ এবং সোনালি-রূপালি জরির সুতোর ব্যবহার, মোঘল ও দেশীয় নকশার সংমিশ্রণ। এগুলো উৎসব-অনুষ্ঠানে আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলার জন্যই নারীদের পছন্দ।”
তার দোকানে ৫ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত দামের শাড়ি রয়েছে জানিয়ে আনিসুর রহমান বলেন, “পার্টি শাড়ি, সুতার কাজ করা নেট ও অর্গানজা শাড়ির চাহিদা তুলনামূলক বেশি।”
বিগ বাজারের এক বিক্রয়কর্মী বলেন, “নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে মানুষের হাতে তো টাকা পয়সা বাড়ার কথা, কই? মানুষের মাঝে তো দেখি হতাশা।”
বেনারসি বা কানি সিল্কের মতো শাড়ি মোটাদাগে শৌখিন ও উৎসবের পোশাক হিসেবে বিবেচিত। নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে মানুষ বিলাসী পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে মনে করছেন কলকাতা বড় বাজারের বিক্রয় কর্মী কাওসার।
“অন্যান্য বারের চেয়ে এবার বেচাবিক্রি খুবই খারাপ। আমাদের ১০ রমজানের পর থেকেই এখানে বেচাবিক্রি শুরু হয়; কিন্তু এখন ১৮ রমজান চললেও তেমন বিক্রি নেই। যদি ভালোই বিক্রি করতাম তবে আগেই টের পেতাম। তাই সোজা কথা বলব- এবার বিক্রি কম।
“তার কারণ মানুষ এখন নিত্যপণ্যের দাম নিয়েই বেশি চিন্তিত, আগে দরকার যেটা, সেটা নিচ্ছে। শৌখিন পণ্যে কেনার সুযোগ কম পাচ্ছে।”
ঢাকায় যেসব নারী ঈদ করেন, তাদের বেশিরভাগই ভিড় এড়াতে চাঁদ রাতে পছন্দের পোশাক কিনতে বের হন। তাছাড়া বেতন-বোনাস পাওয়ায় তখন হাতে টাকা থাকে। সেই অল্প সময়ে ব্যবসার আশা করছেন দোকানিরা।
দিয়া শাড়ি ঘরের বিক্রেতা রাজু আহমেদ বলেন, “যা বিক্রি হচ্ছে তা তো নরমাল সময়ের চেয়ে কম। শেষ সপ্তাহে কিছুটা ভিড় বাড়বে বলে মনে হচ্ছে।”