Published : 12 Jul 2025, 12:10 AM
বিকাল বেলা প্রতিবেশী শিশুদের সঙ্গে খেলতে বেরিয়ে আর বাসায় ফেরেনি সাড়ে চার বছরের রোজা মনি। পরদিন তার বস্তাবন্দি ঝলসানো লাশ পাওয়া যায় রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপে। দুই মাস হতে চলল, রোজা মনি হত্যা রহস্যের কিনারা করতে পারেনি পুলিশ।
ঢাকার তেজগাঁও এলাকার তেজকুনীপাড়ায় রোজা মনিদের বাসা। বাবা নূরে আলম মালয়েশিয়ায় চাকরি করেন। নরসিংদীর রায়পুরার মোহিনীপুর গ্রামে তার বাড়ি।
দুই ভাই আর পাঁচ বোনের মধ্যে রোজা ছিল সবার ছোট। তাই আদরটাও ছিল বেশি। ছোট্ট মেয়েটি প্রতিদিনই বাসার পাশে সঙ্গীদের সাথে খেলতে যেত। আবার ফিরে আসত একা একাই। মায়ের অতটা চিন্তাও ছিল না।
গত ১২ মে দুপুর ২টার দিকে মায়ের কাছ থেকে ১০ টাকা নিয়ে সে চিপস কিনতে যায়। পরে বাসায় বসে চিপস খেয়ে ৩টার দিকে যায় প্রতিবেশী শিশুদের সঙ্গে খেলতে।
সেদিন বাসায় গ্যাস ছিল না। মা শিল্পী আক্তারের রান্না শেষ করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়। খেতে বসে মনে পড়ে রোজা মনির কথা। কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল, রোজা ফিরল না। আশপাশের বাসায় খোঁজ নেওয়া হল, এলাকায় করা হল মাইকিং। কিন্তু কেউ শিশুটির খোঁজ দিতে পারল না।পরদিন বিজয়সরণি ফ্লাইওভার সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় ময়লার মধ্যে রোজা মনির লাশ পাওয়া যায়।
শিল্পী আক্তার এখনো জানতে পারেননি, কেন এমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হল তার আদরের সন্তানকে।
১৩ মে তিনি অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে তেজগাঁও থানায় মামলা করেন। রোজা মনিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লাশ গুম করার অভিযোগ করা হয়ে সেখানে।
থানা পুলিশের হাত ঘুরে সেই মামলার তদন্তভার পেয়েছে ডিবি পুলিশ। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারটিকে তারা এখনো জানাতে পারেনি, কে রোজার খুনি।
শিল্পী আক্তার কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলেন, “ওরে এখনো স্কুলে ভর্তি করিনি। সারাদিন রুমে থাকত। মাঝে মধ্যে বাইরে সমবয়সীদের সাথে খেলতে যেত। ঘটনার দিন রান্না করতে লেট হয়ে যায়। আছরের আজানের সময় আমরা খেতে যাব, তখন বলি, কিরে আমার রোজা কই। কিন্তু খুঁজে পাই না। মসজিদের মাইকে, এমনিতে মাইকিং করে খুঁজেও পাই না।”
তিনি বলেন, “পরদিন আমার মেয়ে আইরিন কাজ শেষে বাসায় ফিরছিল। তখন জানতে পারে বস্তাবন্দি একটা লাশ পাওয়া গেছে। ওইখানে যাই ২/৩ বার। আমার মেয়েকে মেরে তিনটা বস্তার মধ্যে ভরে ফেলে রেখেছে। আমার নাবালক মেয়েটার গলায় রশি বেঁধে, গরম পানি দিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। আমার মেয়েটাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করেছে।”
কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে? শিল্পী আক্তার কিছু অস্পষ্ট সন্দেহের কথা বললেন।

“পরিবার নিয়ে সুন্দরভাবে থাকার জন্য এলাকায় (রায়পুরায়) বাড়ি-ঘর করেছিলাম। প্রতিবেশীদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে বাড়ি-ঘর ছেড়ে ঢাকায় এলাম। ঢাকায় এসে মেয়েটাকে হারালাম। আমার মেয়ের খুনিটাকে বের করে দেন। আমার ধারণা, শত্রুতার কারণে আমার মেয়েটাকে খুন করেছে। আমি এর বিচার চাই।”
রোজা মনির বাবা নূরে আলম ঘটনার সময় মালয়েশিয়ায় ছিলেন। ১৬ মে দেশে ফিরে আসেন। মেয়ের মুখটা শেষবারের মত দেখতে পারেননি। তার হৃদয়েও এখন ক্ষোভ আর প্রশ্ন। বিচারের আশায় ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে।
নূরে আলম বলেন, “প্রায় দুই মাস তো হল। এখনও জানতে পারলাম না কে বা কারা আমার ছোট মেয়েটাকে কি কারণে খুন করল। পাঁচ বছরের একটা শিশু হত্যার বিচার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। থানার (তেজগাঁও থানা) ওসি আশ্বাস দিয়েছিলেন বিচারের। কিন্তু ডিবি পুলিশের কাজে আমরা সন্তুষ্ট না। তারা আসে, ঘুরে ফিরে চলে যায়।”
এ ঘটনার সঙ্গে গ্রামের বাড়ির এলাকার এক প্রতিবেশী জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন নূরে আলম। এছাড়া আরও কয়েকজন তার সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। তাদের নাম তিনি তদন্ত সংস্থাকে বলেছেন।
সন্দেহের কারণ জানতে চাইলে রোজার বাবা বলেন, তার ছোট চাচা ২০২২ সালে এলাকায় শামসু মেম্বারের (সাবেক ইউপি সদস্য শামসু মিয়া) কাছে পারিবারিরক কিছু জমি বিক্রি করেন। তাতে তিনি আপত্তি জানান।

এ নিয়ে বিরোধে শামসু এবং তার ভাতিজারা মারধর করেন নূরে আলমকে। তবে পরে মামলা করে সেই জমি তিনিই পেয়েছেন।
তবে এর ‘খেসারত দিবে হবে’ বলে তাকে হুমকি-ধামকি দেয় অপরপক্ষ। ২০২৪ সালে তিনি যখন মালয়েশিয়ায়, তাকে ফোন করে চাঁদাও দাবি করা হয় বলে নূরে আলমের ভাষ্য।
তিনি বলেন, “তারা প্রভাবশালী। চাঁদা না দেওয়ায় আমার বাড়ি-ঘর ভাংচুর করে সব শেষ করে দেয়। পরিবারকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আমার পরিবার পাশের গ্রামে আশ্রয় নেয়। পরে ঢাকায় চলে আসে।
“ওই মেম্বারের এক ভাতিজিকে এই এলাকায় (তেজগাঁও এলাকায়) বিয়ে দিয়েছে। আমরা জানতাম না, ওদের লোকজন এখানে আছে। আমার ধারণা, ওদের দ্বারা এ ঘটনা ঘটেছে। আরও দুইজনের সাথে আমার পরিবারের কথা কাটাকাটি, তর্কাতর্কি হয়েছিল। তারাও বদলা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। আমরা তাদের কথা পুলিশকে জানিয়েছে। কিন্তু পুলিশ তেমনভাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে না।”
খুনি যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে নূরে আলম বলেন, “শিশু হত্যা করে কেউ যেন পার পেয়ে না যায়। অপরাধী আইনের আওতায় এলে আমার ছোট মেয়েকে খুনের কারণ জানতে পারব। আমরা অসহায়, নিরীহ মানুষ। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়াটা যেন আমাদের পাপ হয়েছে।”
তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই শরীফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলার তদন্ত চলছে। অনেকটা এগিয়ে নিয়ে আসছি। আসামি ধরতে পারলে মামলার রহস্য উদঘাটন করতে পারব। রহস্য উদঘাটনে কাজ করছি।”
নূরে আলমের অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “ওই লোকটা (শামসু মেম্বার) নরসিংদী রায়পুরার। মারামারিসহ হত্যা মামলায় পলাতক রয়েছে। সে নাকি পালিয়ে ঢাকায় আসছে। তাদের সাথে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ছিল। এ কারণে তাকে মামলায় গ্রেপ্তার করার কথা বলছে। যেহেতু ইনফরমেশন দিয়েছে। কাজ করে যাচ্ছি।”