সুভাষ মুখোপাধ্যায়: যত দূরেই যাই
মনে করিয়ে দিতে চাই জনচিত্তে গাঁথা কিছু কবিতাকণা: 'ফুল ফুটুক না ফুটুক/আজ বসন্ত,' কিংবা 'এদেশ আমার গর্ব,/এ মাটি আমার কাছে সোনা,' কিংবা 'প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা।' একজন কবির এরকম আরো কত পঙক্তি আমাদের সমষ্টিগত স্মৃতিতে উৎকীর্ণ হয়ে আছে! প্রায় দেয়াল-লিখনের মতো। হয়ত কিছুটা জীর্ণতার ছাপ লেগেছে অতিব্যবহারে, কিন্তু যাপিত জীবনের বিশেষ কোনো আবেগঘন মুহূর্তে নতুন অর্থ নিয়ে জেগে ওঠে তারা। এমনকি যাঁরা কবিতার দীক্ষিত পাঠক নন, শুধু হাতের কাছে পেলে পড়েন কবিতা, কিংবা তা-ও নয়, তাঁদের অনেকের কাছেও কোনো না কোনোভাবে পৌঁছে গেছে এইসব পঙক্তির দ্যুতি।
একবার কবিতাকে স্মরণযোগ্য বাণীর অভিধা দিয়েছিলেন ইংরেজ কবি ডব্লিউ এইচ অডেন। যদি আমাদের পাঠ-অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিই অডেনের অন্তর্দৃষ্টি, তাহলে বুঝতে পারি কালের নানা দায় মিটিয়ে কীভাবে স্মৃতিতে সঞ্চিত হয়ে থাকে উত্তীর্ণ কবিতার রত্নচূর্ণ। সুভাষ মুখোপাধ্যায়, যিনি রচনা করেছিলেন এমন অজস্র অবিস্মরণীয় পঙক্তি ও কবিতা, তিনিও বাংলা কবিতার পাঠকের স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়ার মতো নন। কী করে মুছে যাবেন? সুভাষের অনেক কবিতা রীতিমতো সুভাষিতের মর্যাদা পেয়ে গেছে যে!
যদিও উত্তর-জীবনে নানা জিজ্ঞাসা, সংশয় ও আত্মদ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে পথ চলেছেন তিনি, তবু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মূল পরিচিতি একজন কমিউনিস্ট কবি হিসেবে। 'আধুনিক বাংলা কবিতা'র 'সংহিতা' রচনা করে যিনি 'পঞ্চপাণ্ডব'কে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন, সেই দীপ্তি ত্রিপাঠী তাঁর 'আধুনিক বাংলা কাব্যপরিচয়ে' সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে গ্রহণ করেননি। সমর সেনকেও। কেন গ্রহণ করেননি তার কারণ হিসেবে বলেছেন, 'এই দুই কবিই বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে একদেশদর্শী। আধুনিক জীবনের জটিল রূপের বিচিত্র পরিচয় এঁদের কাব্যে নেই।…একটা ধরাবাঁধা ফর্মূলা বা ছক পেয়ে যাবার ফলে এঁদের কাব্য চলেছে একই পথ ধরে।' উনিশ শ আটান্ন সালে দীপ্তি ত্রিপাঠীর বইটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন সুভাষ মুখোপাধ্যায় একজন তরুণ কবি, পঞ্চপাণ্ডবের চেয়ে বয়স ছিল অনেক কম। 'আধুনিক জীবনের জটিলতা'র নামে ইওরোপীয় 'মডার্নিজমে'র যে বঙ্গীয় রসায়ন দীপ্তি ত্রিপাঠী তৈরি করতে চেয়েছিলেন তার শর্ত পূরণ করেননি সুভাষ। তা ছাড়া জীবন ও শিল্পকে অবলোকনের একটি সুনির্দিষ্ট বিশ্ববীক্ষা তো তাঁর ছিলই — সেটি ত্রিপাঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য না হতেই পারে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাংলা সাহিত্যে যিনি ইওরোপীয় আধুনিকবাদ ও কলাকৈবল্যবাদের প্রতিভূ হিসেবে নন্দিত ও নিন্দিত, যিনি আজীবন স্থিত ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বিপরীত কাব্যাদর্শে, সেই বুদ্ধদেব বসু কিন্তু প্রবল উচ্ছ্বাসে সুভাষের কবিতাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। দীপ্তি ত্রিপাঠীর বই বেরোনোর অনেক আগেই।
তখন সুভাষ পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেছেন মাত্র। লিখতেন সুভাষচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নামে। উনিশ বছর বয়সে লেখা তাঁর দুটি কবিতা 'সকালের প্রার্থনা' এবং 'রোম্যান্টিক' বুদ্ধদেব বসু মনোনীত করেছিলেন তাঁর যুগন্ধর পত্রিকা 'কবিতা'র জন্য। দেখা করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন চিঠি লিখে। কবিতা দুটি প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকার আষাঢ় ১৩৪৫ (জুলাই ১৯৩৮) সংখ্যায়। তার পর বুদ্ধদেবের 'কবিতাভবন' থেকেই উনিশ শ চল্লিশ সালে বেরোয় সুভাষের প্রথম কবিতার বই 'পদাতিক।' স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে এক কপি বই পাঠিয়ে বুদ্ধদেব লিখেছিলেন, '…আমি নিজে সুভাষের কবিতার অনুরাগী, এত অল্প বয়সে এতখানি শক্তির প্রকাশ আমার তো বিস্ময়কর মনে হয়।'
'পদাতিকে'ই ছিল সুভাষের এই মোহঘোরভাঙা, নির্মোহ আহবান:
'প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।'
('মে-দিনের কবিতা')
ছিল এই সূক্ষ্ম বিদ্রূপের সুর:
'লাল মেঘ গুহা পাবে না হয়তো খুঁজে
নিজেরে নিখিল মিছিলে মেলাও যদি,
চলো তার চেয়ে মরা খড়ে ঘাড় গুঁজে
হবো অপরূপ অপরাহ্ণের নদী।'
('পদাতিক')
এবং বলিষ্ঠ প্রত্যয়ের দ্বিধাহীন প্রকাশ:
'অগ্নিবর্ণ সংগ্রামের পথে প্রতীক্ষায়
এক দ্বিতীয় বসন্ত। আর
গলিতনখ পৃথিবীতে আমরা রেখে যাবো
সংক্রামক স্বাস্থ্যের উল্লাস।
ততদিন আত্মরক্ষার প্রাচীর হোক
প্রত্যেক শরীরের ভগ্নাংশ।'
('পদাতিক')
'কবিতা' পত্রিকার ডিসেম্বর-জানুয়ারি ১৯৪১-৪২ সংখ্যায় বেরোল বুদ্ধদেবের মুগ্ধ, উচ্ছল সমালোচনা: 'দশ বছর আগে বাংলার তরুণতম কবি ছিলাম আমি। কিন্তু 'উর্বশী ও আর্টেমিস' বেরোবার পর থেকে সে-সম্মান হ'লো বিষ্ণু দে-র ভোগ্য, যতদিন না সমর সেন দেখা দিলেন তাঁর 'কয়েকটি কবিতা' নিয়ে। সম্প্রতি এই ঈর্ষিতব্য আসন সমর সেনেরও বেদখল হয়েছে, বাংলার তরুণতম কবি এখন সুভাষ মুখোপাধ্যায়।…সুভাষ মুখোপাধ্যায় দুটি কারণে উল্লেখযোগ্য; প্রথমত তিনি বোধহয় প্রথম বাঙালি কবি যিনি প্রেমের কবিতা লিখে জীবন আরম্ভ করলেন না। এমনকি, প্রকৃতিবিষয়ক কবিতাও তিনি লিখলেন না।…দ্বিতীয়ত, কলাকৌশলে তাঁর দখল এতই অসামান্য যে কাব্যরচনায় তাঁর চেয়ে ঢের বেশি অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরও এই ক্ষুদ্র বইখানায় শিক্ষণীয় বস্তু আছে ব'লে মনে করি।…ঈশ্বর-অবিশ্বাসী পাঠকের পক্ষে যদি রবীন্দ্রনাথের কবিতা উপভোগের কোনো বাধা না থাকে, তা'হলে সাম্যবাদে সন্দিহান পাঠকের পক্ষেও 'পদাতিক' উপভোগ্য হ'তে পারে না তা নয়। 'পদাতিকে' রয়েছে সরলতার পাশাপাশি জটিলতা, নিঃসংকোচ, উচ্চ ঘোষণার পাশে-পাশে ব্যঙ্গের চাতুরী, ধ্বনির বিচ্ছুরিত আভা।…এত অল্প বয়সে যে নিজের একটি বিশিষ্ট রীতি তিনি নির্মাণ করতে পেরেছেন, এতেই তাঁর প্রতিভার পরিচয়।' উদ্ধৃতি দীর্ঘ হলো, কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে বুঝতে বুদ্ধদেবের ভাষ্য খুব সহায়ক বলে মনে করি। অবশ্য বুদ্ধদেব নিজের কাব্যাদর্শের জায়গা থেকে সতর্কবাণী দিয়েছিলেন সুভাষকে। তাঁর কবিসত্তা ও কমিউনিস্ট কর্মীসত্তার মধ্যে বিরোধ দেখেছিলেন। বলেছিলেন, 'হয় তাঁকে কর্মী হ'তে হবে, নয়তো কবি। তিনি কোন দিক ছাড়বেন?'
পরে অবশ্য রাজনৈতিক কারণে 'কবিতা' পত্রিকা ও বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল সুভাষের। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কে চিড় ধরেনি। উনিশ শ তিপ্পান্ন সালে শান্তিনিকেতনের সাহিত্যমেলায় — বামপন্থী ও অবামপন্থীদের সেই তীব্র বিভাজনের যুগে — বেরিয়ে এসেছিল তাঁদের মনান্তর। নিজের লেখা প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে সুভাষ নস্যাৎ করছিলেন তাঁদের যাঁরা তাঁর বিবেচনায় বাস্তববিমুখ। জীবনানন্দও রেহাই পাননি। প্রশংসা করছিলেন নতুনদের — বিশেষ করে শঙখ ঘোষ ও তাঁর সদ্য-প্রকাশিত কবিতা 'যমুনাবতী'র। সভামঞ্চে উপস্থিত বুদ্ধদেব ত্বরিৎ উঠে দাঁড়িয়ে ঝড়ের বেগে বললেন: 'সুভাষ যা বলে গেলেন, এই যদি হয় সত্যি সত্যি পাঁচ বছরের বাংলা কবিতার ছবি, তবে তার নিতান্তই দুর্দশা ঘটেছে বলতে হবে। কবিতা এক গাঢ়তর বোধের জগৎ, ভাত ভাত বলে সরল চিৎকার করলেই সেটা কবিতা হয় না।' আবার মঞ্চ থেকে একসঙ্গে নেমে যেতে যেতে বুদ্ধদেব স্নিগ্ধ কণ্ঠে প্রতিপক্ষকে বললেন: 'সুভাষ, পরে দেখা কোরো আমার সঙ্গে, কথা আছে আরো।'
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম (১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৯) কৃষ্ণনগরে, বাল্যকাল কেটেছে নওগাঁয়, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে লেখাপড়া করেছেন কলকাতায়। উত্তাল তিরিশের দশকে তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যান। উনিশ শ আটত্রিশ সালে যুক্ত হন লেবার পার্টি নামে একটি বামপন্থী দলের সঙ্গে। উনিশ শ উনচল্লিশে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।
আশ্চর্য যে, তিরিশের দশকে কবিতা লিখতে শুরু করলেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও দেহলিপ্ত তিরিশি আধুনিকতার সঙ্গে নিজেকে জড়াননি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর বেশ আগেই কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতায় এক নতুন বহ্ণিজ্বালা নিয়ে এসেছিলেন বটে, কিন্তু চেতনার দিক থেকে কিছুটা মিল থাকলেও সুভাষের পথ ছিল সম্পূর্ণ নিজস্ব। অব্যবহিত পূর্বসূরি ও সমমনা অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০) এবং সমর সেনের (১৯১৬-১৯৮৭) প্রভাবও সুভাষের কবিতায় দেখা যায় না। কৈশোরে রবীন্দ্রনাথের কবিতা তাঁর মনকে পুষ্ট করেছিল। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার নিহিত সৌন্দর্য আর লোকবাংলার ছড়ার ছন্দিত কলস্বর তাঁকে মুগ্ধ করে রেখেছিল সারাজীবন। এইসব ইন্ধন থেকেই গড়ে উঠেছিল তাঁর কবিতার আটপৌরে কথোপকথনের ভঙ্গি ও বিশিষ্ট প্রকরণ। বলে রাখা ভালো, বাংলা কাব্যে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ধারায় কোনো পূর্বসূরিকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্ণিত করা না গেলেও তাঁর যথার্থ উত্তরসূরিকে আমরা দেখতে পাই সুকান্ত ভট্টাচার্যের মধ্যে।
আরো উল্লেখ্য, চেতনার দিক থেকে তিরিশের দশকের প্রতিরোধমুখর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকেও সুভাষ মুখোপাধ্যায় উত্তাপ সংগ্রহ করেছিলেন। স্পেনে জেনারেল ফ্র্যাংকোর ফ্যাসিবাদী হিংস্রতার বিরুদ্ধে তখন গড়ে উঠেছিল শিল্পী-সাহিত্যিকদের আন্তর্জাতিক ব্রিগেড। তাতে যোগ দিয়েছিলেন রম্যাঁ রলাঁ, অঁদ্রে জিদ, অঁদ্রে মালরো, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, স্টিফেন স্পেন্ডার, ডব্লিউ এইচ অডেন এবং আরো অনেকেই। রণাঙ্গনে প্রাণ দিয়েছিলেন ক্রিস্টোফার কডওয়েল, র্যালফ ফক্স, জন কনফোর্ড। এই সংগ্রাম আশা ও মুক্তির প্রেরণা যুগিয়েছিল পল এল্যুয়ার, লুই আরাগঁ, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ও পাবলো নেরুদাকে। এই কবিকুলের সঙ্গে একাত্মতা ছিল তরুণ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। এবং সবচেয়ে বেশি একাত্মতা ছিল তুরস্কের বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমতের সঙ্গে। নাজিম হিকমতের কাব্যবোধ এবং বাকভঙ্গিরও ছায়া আছে সুভাষের দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতায়।
'পদাতিকে'র পর একে একে বেরিয়েছে 'অগ্নিকোণ' (১৯৪৮), 'চিরকুট' (১৯৫০), 'ফুল ফুটুক' (বই হিসেবে অপ্রকাশিত), 'যতদূরেই যাই' (১৩৬৯), 'কাল মধুমাস' (১৯৬৬), 'এই ভাই' (১৯৭১), 'ছেলে গেছে বনে' (১৯৭২), 'একটু পা চালিয়ে ভাই' (১৯৭৯), 'জল সইতে' (১৯৮১), 'চইচই চইচই' (১৯৮৩), 'বাঘ ডেকেছিল' (১৯৮৫), 'যা রে কাগজের নৌকা' (১৯৮৯), 'ধর্মের কল' (১৯৯১), 'একবার বিদায় দে মা' (১৯৯৫) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ, একাধিক উপন্যাস, আত্মজীবনীমূলক রচনা, রিপোর্টাজ ধরনের বই 'আমার বাংলা' এবং আরো অনেক কিছু। তৈরি করেছেন নীহাররঞ্জন রায়ের 'বাঙালির ইতিহাসে'র আদিপর্বের কিশোর সংস্করণ। সম্পাদনা করেছেন বিখ্যাত 'পরিচয়' পত্রিকা। অনুবাদ করেছেন নাজিম হিকমত, পাবলো নেরুদা ও হাফিজের কবিতা, চর্যাপদ, অমরু-শতক।
বিভিন্ন নীতির প্রশ্নে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিক থেকে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কিছুটা টানাপোড়েন শুরু হয়। উনিশ শ একাশিতে পার্টির সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি নেন। উনিশ শ বাহান্নতে বজবজের ব্যঞ্জনহেড়িয়ায় সরাসরি শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করার সূত্রে জীবনকে দেখার এক নতুন দৃষ্টি তিনি লাভ করেন — যে দৃষ্টি তত্ত্বের ছক ছাড়িয়ে জীবনের অনেক গভীরে পৌঁছে যায়। এ সময়ে তাঁর কবিতায় এক ধরনের মোড়-ফেরা চোখে পড়ে। লেখা হয় 'ফুল ফুটুক' পর্যায়ের কবিতাগুলি। তখন থেকে কবিতায় বেজে উঠতে থাকে এক নতুন সুর। দেখা যায় কিছু প্রশ্ন, আকুলতা ও করুণাঘন মানবিক বিষাদের আভাস:
'কোটালের বানের উত্তুঙ্গ তরঙ্গশিখরে উঠে
আমি দুহাতে ছুঁয়েছিলাম
আকাশ।
কে যেন ডেকেছে আমায়। কে?
— মিছিলের সেই মুখ।
দিগন্ত থেকে দিগন্ত জুড়ে বাড়িয়ে দিয়েছি হাত।
সে কি স্বপ্ন?
সে কি মায়া?
সে কি মতিভ্রম?'
('জয়মণি, স্থির হও')
প্রশ্ন মিশে যায় বেদনায়:
'তারপরই
বিদ্যুতের চকিত কশাঘাতে
দুর্নিবার
বেগান্ধ পতন।
… … …
আমি তারস্বরে চেঁচিয়ে বললাম:
জয়মণি, স্থির হও!
হে কালবৈশাখী, শান্ত হও!
এই পৃথিবীতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে
দেখ,
আমি জটায় বাঁধছি
বেদনার আকাশগঙ্গা।।'
('জয়মণি, স্থির হও')
কী গভীর হাহাকার আর আর্তিতে মথিত এই পর্যায়ের কবিতা:
'মা, তোমার কোলে মরা ছেলে
তুমি কাঁদো!
মর্মন্তুদ চিৎকারে, মাগো, আকাশ মাথায় করো!
বুকচাপা এই দুঃস্বপ্নকে গুঁড়ো গুঁড়ো ক'রে ভাঙো
এ জগদ্দল পাথর সরাও —
স্তব্ধতা ভাঙো!
পাষাণ গলাও,
কাঁদো।'
(মা, তুমি কাঁদো')
একই কাতর ব্যাকুলতা ও মমতা সালেমনের মায়ের জন্য:
'এ কলকাতা শহরে
অলিগলির গোলকধাঁধায়
কোথায় লুকিয়ে তুমি,
সালেমনের মা?
বাবরালির চোখের মত এলোমেলো
এ আকাশের নিচে কোথায়
বেঁধেছ ঘর তুমি, কোথায়
সালেমনের মা?'
('সালেমনের মা')
প্রগতি শিবিরে এক সময়ের ভ্রাতৃঘাতী হন্তারক প্রবণতাও তাঁকে যন্ত্রণায় দীর্ণ করেছিল খুব। তখন লিখেছিলেন:
'খোলা হাওয়া কোথাও
নেই, কোথাও
নেই।
… … …
আমরা এ ওকে
সে তাকে
নখ দিয়ে খুঁড়ছি
দিন রাত খুঁড়ছি
দিন রাত খুঁড়ছি
রাত দিন খুঁড়ছি।।
('এই ভাই')
সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পরে তাঁর অবস্থান দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতার যেকোনো ধরনের বিকৃতি ও দম্ভের বিরুদ্ধে। তখন বেদনার সঙ্গে ব্যঙ্গ মিলেমিশে ধ্বনিত হয়েছে তাঁর কণ্ঠে:
'সময়টা সুবিধের নয়
কিছু না ক'রে
যে পারে সেই হাতিয়ে নিচ্ছে
খোলা মঞ্চে
চোখের পর্দাটুকুও না ফেলে
বহুরূপীরা
ঘড়ি ঘড়ি নিজেদের রং বদলাচ্ছে।'
('ধর্মের কল')
সব মিলিয়ে শঙখ ঘোষ সুভাষের কবিতায় দেখেছেন ভালোবাসার প্রগাঢ় প্রকাশ। তাঁর ভাষায়, 'সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা মূলত দেশকে ভালোবাসার, ভাষাকে ভালোবাসার, জীবনকে ভালোবাসার কবিতা। এর সঙ্গে আরো একটু বলা যায় — ভবিষ্যৎকে ভালোবাসার কবিতা।…এক আশ্চর্য সারল্য নিয়ে যে ভাবে তাঁর কবিতা পাঠকের কাছে এসে পৌঁছয়, তার কোনো পূর্বাপর নেই।' এই ভালোবাসা গভীর বিস্ময়বোধের রূপ নিয়েছিল তাঁর শেষ পর্বের কবিতায়। প্রতিদিনের সহজ বিস্ময় থেকেই বলেছিলেন তাঁর আটপৌরে মুখের ভাষায়: 'বেঁচে থাকার প্রত্যহই পরব/যা দেখে তাই ভানুমতীর খেলা ('ভানুমতীর খেল')। এবং 'আপনি মিলেছে যা/তাতেই খুশি, হোক না খুঁদকুঁড়ো/হোক কিছু তার চোখের জলে ভেজা' ('ভানুমতীর খেল')।
বি টি রনদিভের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির সংকীর্ণ ও ভুল নীতির প্রভাবে এক সময় তিনি তীব্র জীবনানন্দ-বিরোধী ছিলেন। 'শত শত শূকরীর প্রসববেদনায় আক্রান্ত' জীবনের ভাষ্যকার জীবনানন্দের অবস্থান জীবনেরই বিপক্ষে — এই ছিল তাঁর মত। 'পরিচয়' পত্রিকায় তাঁর সমালোচনা পড়ে জীবনানন্দ বলেছিলেন: 'সুভাষের ধারণা বদলাত। ও যদি আমার "সাতটি তারার তিমির" পড়ত।' পরে সুভাষ পালটেছিলেন তাঁর মত।
আবার মতভিন্নতার কারণে পুরোনো সহযোদ্ধাদের আক্রমণের শিকারও হতে হয়েছে তাঁকে। উৎপল দত্ত তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গকবিতা লিখেছিলেন। আর সত্তর দশকেই 'কলকাতার হ্যামলেট' নাটকে এক বিকৃত চরিত্রের মাধ্যমে তাঁকে হেনস্থা করা হয়েছিল।
সুভাষ মুখোপাধ্যায় গত হয়েছেন ৮ জুলাই, দু হাজার তিনে। কিন্তু বাংলা কবিতার ইতিহাস তো অস্বীকার করতে পারবে না তাঁকে। বাংলাদেশকে নিয়ে তিনি লিখেছিলেন: 'আমি যত দূরেই যাই/আমার সঙ্গে যায়/ঢেউয়ের মালা-গাঁথা/এক নদীর নাম –/আমি যত দূরেই যাই' ('যত দূরেই যাই')। কবির কথাই ফিরিয়ে দেওয়া যায় তাঁকে। বাংলা কবিতা যত দূরেই যাক না কেন, তাকে ঢেউয়ের মালার মতো জড়িয়ে থাকবেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
