নাটুয়ার প্রতি জেরা

কামালউদ্দিন নীলুকামালউদ্দিন নীলু
Published : 13 Sept 2022, 07:45 AM
Updated : 13 Sept 2022, 07:45 AM

ইচ্ছে করেই "নাটুয়ার প্রতি জেরা", কবিতার নামটাই এই লেখার শিরোনাম করলাম। আজ সকাল থেকে মনটা খারাপ। অনেক সব কথা মনে হচ্ছিল, থিয়েটার নিয়ে। এর বাইরে আজ আমার আর এমন কিছু ভাবার নেই। এই ভাবনার ডানা মেলে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে মহিলা সমিতির মঞ্চে ঢুকে বিমলা, সন্দীপ, নিখিলেশের মুখোমুখি হয়েছি বলতে পারছিনা। ত্রিভুজ প্রেমের জমজমাট গল্প। পঁচিশটি আত্মকথন। ঘটনা ঘটে চলেছে ভিক্টোরিয়ান আদলের বানানো মহিলা সমিতির পারফরমেন্স স্পেসের মধ‍্যে আরেকটি স্পেসে। থিয়েটারের ভেতরের থিয়েটার। কিছুটা আবার 'পারসী থিয়েটার'র কান্তিবিদ‍্যার মধ‍্যে ঢেলে দিয়ে 'সম্পূর্ণ' থিয়েটারের মধ‍্যে ঝুঁকে পড়ার টানটান বাঁধন। আঙ্গিক, বাচিক, সাত্ত্বিক ও আহারিয়া অভিনয়; 'যাদুর' বিস্ময়কর সমন্বয়। একটা পর্যায় মনে হতো সত‍্যি কি আমি রবীবাবুর বিমলা, সন্দীপ, নিখিলেশকে দেখছি; যদি তাই হবে তবে ফেরদৌসী ভাবী? মামুন ভাই? তারিক ভাই? অভিনয়ের কি অসাধারণ সত‍্য হয়ে ওঠা। অভিনেতা হিসেবে কতটা সৎ হলে এতোটা আত্মীকরণ করে চরিত্রের গভীরে পৌঁছনো সম্ভব। ফেরদৌসী ভাবীর বিমলা চরিত্রের প্রেমে যে কতবার পড়েছি, সে বলে শেষ করা যাবে না। আমি একা নই, অনেকেই, আমাদের বয়সের প্রায় সকলেই। যে কারণে দর্শক ও অভিনেতাদের মধ‍্যে প্রেমটা ঘটতো, সেটা হলো অভিনেতাদের দিয়ে মামুন ভাইয়ের অসাধারণ গল্প বলানোর ধরণ, দৃশ‍্যপটের চমৎকার রূপান্তর প্রক্রিয়ার, মুহুর্তের বিনাশ ও নির্মাণ, সাথে তুখোড় অভিনয়। ওদের অসাধারণ সংলাপ প্রক্ষেপণ, আমাদের প্রত‍্যেকের অমেয়তার মধ‍্যে দিয়ে কোথায় যেন নিয়ে যেত কোনো এক আনন্ত‍্যে। এর বাইরে আর বলতে পারবোনা। শুধুই অনবরত ভালো লাগা। বারবার ভালো লাগা। একটা ঘোরের মধ‍্যে ঢুকে পড়া।

হ‍্যাঁ, এখনও মনে আছে, বিমলা, নিখিলেশ আর সন্দীপ বসে কথা বলছে, 'নারী ভাবনা এবং তার চটুল দর্শন' নিয়ে, সম্ভবত বিমলার প্রথম আত্মকথার শেষ দিকটা। ভয়ঙ্কর রোমান্টিক মেলানকলিক দৃশ‍্য। পুরো অংশটা জুড়ে ছোট ছোট কাজের এক নিঃশব্দের খেলা। পুরো দৃশ‍্যে বন্ধু সিরাজুস সালেকীনের খালি গলায় ভেসে আসা গান:

"এসো পাপ, এসো সুন্দরী!

তব চুম্বন -অগ্নি-মদিরা রক্তে

ফিরুক সঞ্চরি।"

গানের ভেতরে কোনো এক মুহুর্তে আমাদের বিমলা কোনরকমের বিরতি ছাড়াই বলে উঠতো:

"আমার স্বামীর অন্তরের একটি গভীর তাঁর মুখের উপর ছায়া ফেলে চলে গেল।"

ফেরদৌসী ভাবী সংলাপের শেষের অংশটা 'মেঘ মালহার' রাগ দিয়ে শেষ করেই একটা লম্বা বিরতি নিতেন। মাঝেমধ‍্যে টুংটাং চায়ের পেয়ালার শব্দ। আমাদের বিমলা কিছুক্ষণ বাদে উঠে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে জানালা আড়াল করে দাঁড়িয়ে। আস্তে আস্তে সিরাজ-ভাইয়ের 'চোঙার' আলো-আধারের ভেতর দিয়ে ফেরদৌসী ভাবী ছায়ামূর্তি রূপে বেরিয়ে যেতেন। আমাদের সন্দীপ আর নিখিলেশ তাঁর চলে যাওয়াটা এমন ভাবে উপভোগ করতো, মনে হতো মূহুর্তটা যেন 'সত‍্যি'। কিছুক্ষণ বাদেই সন্দীপবাবু বলতেন, "দেখো নিখিল, সত‍্য-জিনিসটা মেয়েদের মধ‍্যে প্রাণের সঙ্গে মিশিয়ে একেবারে এক হয়ে আছে"। মজার একটা জায়গা নির্দেশক মামুন ভাই তৈরী করেছিলেন, আর সেটি হচ্ছে আমাদের বিমলার লুকিয়ে লুকিয়ে কথা চুরি এবং না চুরির ভান করে চলার মুহূর্তগুলো। ফেরদৌসী ভাবী পুরো দৃশ‍্যটি লজ্জা, ভয়, ভালো লাগা, বলতে না পারার চঞ্চলতার ভেতর দিয়ে পাওয়া না পাওয়ার আনন্দের প্রকাশটা এমনভাবে ঘটাতেন, তাতে 'না' হয়ে ওঠাটা সহজ ছিলনা। এটা আমার থিয়েটার জীবনের স্মৃতিতে অপূর্ব এক দৃশ‍্যকাব‍্য তৈরী হয়ে ওঠার স্মৃতি। এখনও মনে আছে:

" আমাদের সত‍্যে রঙ নেই, রস নেই, প্রাণ নেই, শুধু কেবলই যুক্তি"।

আমাদের বিমলা যখন চুপ চুপ করে হেসে উঠতেন, ওদিকে তখন সন্দীপবাবু গলা আরেকটু উপরে ধরে বলতেন:

"মেয়েদের হৃদয় রক্ত শতদল, তার উপরে সত‍্য রূপ ধরে বিরাজ করে, আমাদের তর্কের মতো তা বস্তুহীন নয়।... মেয়েরা সর্বনাশ করতে পারে, কিন্তু তাদের মনে চিন্তার দ্বিধা এসে পড়ে; মেয়েরা ঝড়ের মতো অন‍্যায় করতে পারে- সে অন‍্যায় ভয়ংকর সুন্দর-পুরুষের অন‍্যায় কুশ্রী...তাই আমি তোমাকে বলে রাখছি আজকের দিনে আমাদের মেয়েরাই আমাদের দেশকে বাঁচাবে"। মামুন ভাইয়ের সৃষ্ট দৃশ‍্যটির সাথে সাথে কি ভাবে যেন ধরতে পারছি, আজকের সমাজ ও রাষ্ট্রের সময় ও মুহূর্তটা। নারীদের প্রতি যে ভয়ংকর সব অন‍্যায় হচ্ছে, ভয়াবহ সব বাজে ব‍্যাপার স‍্যাপার ঘটছে; ওটা আর মানতে পারছি না । 'থামলে ভালো লাগে'। সেই সব ভাবতে ভাবতে ভাবছিলাম আরে আমাদের থিয়েটারে অনেক ভালো লাগার গল্পতো আছে, যে গল্পগুলো এখনইতো বলবার সময়; বলাতো যায় না কখন আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যাই !

ত্রপাকে ফোন দিলাম, অনেককাল পর। থিয়েটারের 'ঘরে-বাইরে' প্রযোজনাটি নিয়ে লিখছি, এটা বলবার জন‍্যে। থিয়েটার পত্রিকা আগামী সংখ্যার জন‍্যে লেখা রামেন্দু দাদার ইমেইলে পাঠাবার খবরটাও একইসঙ্গে জানিয়ে রাখলাম। এই লেখার বিষয়টি "আধুনিকতার সাথে সনাতনের মিথস্ক্রিয়া"- ঘটনার অঘটন। এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল গোলাম সারওয়ারের নির্দেশিত হেনরিক ইবসেনের "গোস্টস ( ইয়ানগাংগেরে)"- এর বাংলা ভাষ‍্য 'অদৃশ‍্য পাপ" দেখবার ও তার ভাবনার জায়গাটা শোনার মধ‍্যে দিয়ে। নাটকটির আর্থিক সহযোগিতায় ছিল সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার। প্রযোজনার দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এই কাজটির ভেতর দিয়ে নতুন করে থিয়েটার দেখবার জায়গাটি তৈরী হয়েছিল আর সেটা হচ্ছে, কি করে একটি আধুনিক পাশ্চাত্যের টেক্সট, প্রাচ‍্যের একটি নির্দিষ্ট লোকজ পারফরমেন্সের 'শরীর' পুনঃনির্মান করে। এবং পাশাপাশি নাট‍্য কাঠামো এবং নাট‍্য ফর্মের বাঁধাগুলো অতিক্রমের 'পথ ও পথের মুক্তি' খুঁজে দেখা । আমার কাছে সারওয়ারের চিন্তার জায়গাটা বেশ স্বচ্ছ ও কার্যকর বলেই মনে হয়েছিল, বিশেষ করে আন্তঃসংস্কৃতিক নাট‍্য প্রযোজনার বলয়ের মধ‍্যে থেকে। প্রযোজনাটি ছিল শিল্পকলা একাডেমির, কিন্তু এই কাজটির পেছনের মজবুত কারিগর ছিলেন একাডেমির উপ-পরিচালক, (ড.) আইরিন পারভিন লোপা। পারফরমেন্সের দায়িত্বে ছিল রংপুরের একটি প্রত‍্যন্ত এলাকার ভ্রাম‍্যমাণ পেশাদার দল "কুশান গান" । এই দলের অধিকারী ছিলেন, কৃপা সিন্ধু রাও সরকার মহাশয়।

হ‍্যাঁ, অনেক কাল পর ত্রপার সাথে কথা হলো। ত্রপা নিয়মিত যে আমার কবিতা পড়ে সেটিও অনুমান করতে অসুবিধা হলোনা। কথার ফাঁকফোকর দিয়ে বুঝিয়ে দিলো আমার কবিতার প্রতি ওর ভালো লাগার জায়গাটা। থিয়েটারের নতুন প্রযোজনা ভালো হয়েছে, খবরটা ত্রপাই দিলো। দারুণ খুশি হলাম। ত্রপার সাথে কথা শেষ করে সেলফোনের স্ক্রিনে ঘষা দিয়ে অনেকগুলো ভাবনা নিয়ে অসলোর আ‍্যপার্টমেন্টের দক্ষিণ ব‍্যালকনির কোনার 'গার্ডেন-চেয়ারে' গিয়ে বসলাম। এবার গ্রীষ্মে আমার ব‍্যালকনির বাগানটা ফুলে ফুলে ভরা। অদ্ভুত প্রজাতির ফুল। এক রংয়ের ভিতরে বহু, বহু, বহু রং আর রূপ। আমাদের ওদিকটায় অমন ফুল দেখিনি। ভূমধ‍্যসাগর পাড়ের মানুষেরা এই ফুলকে ডাকে Stemor viola বলে; যার বাংলা অর্থ 'সৎ-মা'। আবার উত্তরসাগর পাড়ের মানুষেরা ডাকে Natt og dag বলে, যার অর্থ ' রাত ও দিন', আমি ডাকি 'দিনরাত্রি' বলে।

এরাই আমার দিনরাত্রির তারার আলো। কাঁজের ফাঁকে এরাই আমার সঙ্গী। এদের সাথেই আড্ডা, কথা বলা। সে এক অন‍্যরকম ভালো লাগা। ফুলেদের নিয়ে কথা বলতে বলতে কোথায় যেন মিশে গেলাম। থিয়েটারের সব হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের মুখগুলো ভেসে ভেসে উঠছিল। ভীষণ মনে পড়ছিল ওদের কথা। কতসব স্মৃতির জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারা। কতসব স্বপ্নভঙ্গের গপ্পো। রঙের ভাগাভাগির গপ্পো। ঠিক আমার 'দিনরাত্রি' ফুলেদের মতো। ভারি মজার, সকলেই একই সঙ্গে, একই ডালে, আবার সকলেই আলাদা, আলাদাভাবে ভাগাভাগি বলয়ের মধ‍্যে।

কিছুদিন ধরে থিয়েটারের সব যাচ্ছেতাই খবরে আমার সেলফোনের মেসেজ বক্স টইটম্বুর। যৌবন হারিয়ে যাওয়ায় আর বিপ্লবের গান গাইতে ইচ্ছে হয় না। ভীষণ বিরক্ত থিয়েটারের ধাড়ি ধাড়ি নেতাদের নিয়ে; এদের ভয়ংকর ভয়াবহ সব আজেবাজে ভাষার ব‍্যবহার শুনে ও দেখে। অদ্ভুত ব‍্যাপার, এরা যে খারাপ ভাষায় কথা বলছে সেটা বুঝতে পারছি, কিন্ত এরা কি চাইছে সেটা বুঝতে পারছি না। এরা কি ভালো থিয়েটারের জন‍্যে এইসব করছে, নাকি থিয়েটারের চর্চাকে ধ্বংস করবার জন‍্যে এইসব করছে? প্রশ্নের পর প্রশ্ন এসে মস্তিষ্কের মধ‍্যে জটলা পাকাচ্ছে:

পূর্বাভাষ:

আহারে নাটুয়া তুমিও তবে তাই,

আড়ালে আবডালে এইসব করলে-

সাজঘরের রঙাবতার হইয়া?

মঞ্চে খাড়ায়ে এত্ত ভালো কথা কও-

ভাঙচুর করতে বলো গতানুদর্শন,

বাঁধতে বলো নবজীবনের গান,

বাহ নাটুয়া বাহ কী দারুণ তুমি মাল!

কত কিছু শেখালে, পড়ালে

কত, কত কী-

যোগ-বিয়োগের ফল কষলে,

অবশেষে অমিশ্র, রাশি, সংখ‍্যা, পূর্ণসংখ‍্যা।

অপ্রকৃত ভগ্নাংশের নাটক।

মঙ্গলাচরণ:

'কে গো তুমি নাটুয়া

কে গো তুমি নাটুয়া

আপন ভোলা নৃত্যে

তালে তালে আকাশে

বাজালে মণি-মন্দির

কে গো তুমি নাটুয়া...'

দৃশ‍্যকাব‍্য:

আচ্ছা এতো মাল রাখলে কোথায়,

বের করলে কোন পথে,

ঐ, ঐ, পথে?

সামনে এসো মোশন-মাস্টার

তুমি বলেছিলে তুমি একজন ভালো মানুষ

তোমাকে নাকি কেনা যায় না,

কিন্তু বজ্রপাতে পুড়ে যাওয়া

বাড়িকেও তো কেনা যায় না।

তুমি যা বলো তার প্রতি তুমি নাকি আপসহীন,

কিন্তু তুমি কি বলেছিলে?

তুমি সৎ, তোমার মতামত দিলে,

কোন মতামত?

তুমি সাহসি,

কার বিরুদ্ধে?

তুমি নাকি তোমার নিজস্ব সুবিধাকে গ্রাহ‍্য করো না।

কার সুবিধাকে গ্রাহ‍্য করো তাহলে?

তুমি বলতে তুমি নাকি বার্টোল্ট ব্রেখস্টের বন্ধু,

একজন ভালো বন্ধু!

তোমাদের দুজনের দর্শন নাকি এক-

মানুষের মুক্তি!

তুমি কি সকল সৃজনীর ভালো বন্ধু?

অন্ত‍্যপরিচ্ছেদ:

আমাদের কথা শোনো তাহলে,

আমরা এখন জানি

তুমি আর আমাদের বন্ধু নও

তুমি আমাদের শত্রু।

একারণেই এখন তোমাকে-

একটি দেয়ালের সামনে দাঁড় করাবো,

তারপর ব্রেখস্টের অস্ত্র দিয়েই তোমাকে হত‍্যা করবো-

যেহেতু তুমি ওর ভালো বন্ধু!

তোমার মেধা ও ভালো গুণের কথা বিবেচনা করে

তোমাকে একটা ধবধবে সাদা দেয়ালের সামনে দাঁড় করাবো,

এবং একটি ভালো খাগের কলম বন্দুক দিয়ে

ব্রেখস্টের শব্দ-বুলেট ছুঁড়বো তোমার বুকে।

তোমার দেহটাকে টেনে নিয়ে যাবো মখমলের গালিচার উপর দিয়ে-

তারপর ভালো বেলচা দিয়ে

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের গোরস্থানের উর্বর মাটিতে

তোমাকে কবর দেবো।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক