বেগম রোকেয়া: বাংলা সাহিত্যের প্রথম কল্পবিজ্ঞান লেখক
পূর্ববর্তী এক প্রবন্ধে আমি প্রমাণ দেখিয়েছিলাম যে শতাধিক বছর আগে প্রকাশিত বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ই ছিল একটি আদর্শ বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ১। অথচ বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের গবেষকগণ এই লেখক বা গল্পটির নামও উল্লেখ করেননি। বর্তমান প্রবন্ধে আমি যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে দেখাবো যে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ শুধু আদর্শই নয়, এটি বাংলা ভাষায় রচিত সত্যিকার অর্থেই প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনী। কিন্তু তার আগে এখন পর্যন্ত প্রথম বাংলা কল্পবিজ্ঞান হিসেবে চিহ্নিত গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অপরাপর শাখাগুলোর ন্যায় বিজ্ঞান বিষয়ক এবং কল্পবিজ্ঞান রচনাও আমরা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক এবং শিল্পবিপ্লবের ধারাবাহিকতায়ই শুরু করেছি এবং আজও তা অব্যাহত রেখেছি। বাংলা কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে অনেকেই লিখে থাকলেও সবচেয়ে পুরোনো যে গবেষণাটি আমার নজরে এসেছে সেটি ছিল সিদ্ধার্থ ঘোষ রচিত ‘সায়েন্স ফিকশন’, যা ১৯৯৮ সালে ‘এক্ষণ’ শারদীয় সংখ্যা বাংলা ১৩৯৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ২। আর গবেষণামূলক সর্বশেষ লেখাটি ছিল ২০২১ সালের মে মাসে ‘কল্পবিশ্ব’ নামে আন্তর্জালিক বা অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রদোষ ভট্টাচার্যের প্রবন্ধ ৭। এই দুই সময়সীমার মাঝে আমি আরো চারটি লেখার সাহায্য নিয়েছি। গবেষণামূলক এই রিভিউগুলো থেকে কল্পবিজ্ঞান হিসেবে বাংলায় রচিত প্রথম যে রচনাগুলোর নাম উঠে আসে, প্রকাশকালের ক্রমানুসারে তা নিম্নরূপে সাজানো যায়।
১। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে হেমলাল দত্তের ‘রহস্য’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘সচিত্র বিজ্ঞান দর্পণ’ পত্রিকায়।
২। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে জগদানন্দ রায়ের ‘শুক্রভ্রমণ’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘ভারতী’ পত্রিকায়।
৩। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে জগদীশচন্দ্র বসুর ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ প্রথম ‘কুন্তলীন পুরস্কার’ নামের একটি গল্প-সমগ্রে এবং পরবর্তীতে ১৯২০ সালে লেখকের ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থে ‘পলাতক তুফান’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল।
৪। ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে সুকুমার রায়ের ‘হেশরাম হুঁশিয়ারের ডায়ারী’ প্রকাশিত হয়েছিল বলে সিদ্ধার্থ ঘোষ২ উল্লেখ করেছেন।
৫। ১৯২৫-২৭ সালের মাঝে হেমেন্দ্রকুমার রায় ‘মেঘদূতের মর্তে আগমন’ এবং ‘ময়নামতির মায়াকানন’ নামে দুটি বৈজ্ঞানিক ফ্যান্টাসিয়া লেখেন ৭।
৬। বাংলায় কল্পবিজ্ঞান লেখক হিসেবে পরবর্তী যে নামটি আসে তিনি হচ্ছেন ১৯৩০ সাল থেকে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা শুরু করা প্রেমেন্দ্র মিত্র ৭।
উল্লিখিত ছয়টি গবেষণামূলক অথবা সংকলিত প্রবন্ধে ২-৭ বেগম রোকেয়া বা তাঁর রচিত ‘সুলতানার স্বপ্ন’র কথা উল্লেখ না থাকলেও এটি এখন সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত যে এই গল্পটি একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ১। বাংলায় অথবা বাংলা রোকেয়ার সায়েন্স ফিকশন সম্পর্কে ২ থেকে৭ তথ্যসূত্রগুলোতে উল্লেখ না থাকলেও ইংরেজিতে প্রকাশিত কিছু পুস্তকে ঠিকই আছে। পাশ্চাত্যের কে এবং কখন বইটিকে কল্পবিজ্ঞানের মর্যাদা দিয়েছেন তা নিয়ে আমি পরে আলোচনা করবো।
বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ১। বাংলায় অথবা বাংলা রোকেয়ার সায়েন্স ফিকশন সম্পর্কে ২ থেকে৭ তথ্যসূত্রগুলোতে উল্লেখ না থাকলেও ইংরেজিতে প্রকাশিত কিছু পুস্তকে ঠিকই আছে। পাশ্চাত্যের কে এবং কখন বইটিকে কল্পবিজ্ঞানের মর্যাদা দিয়েছেন তা নিয়ে আমি ভবিষ্যতে আলোচনা করবো। তাহলে দেখা যাচ্ছে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় প্রকাশিত ‘সুলতানার স্বপ্ন’ গল্পটি উপরের ঐতিহাসিক ক্রমানুসারে দেখানো ছকটিতে জগদীশচন্দ্র বসুর ‘পলাতক তুফান’ এর পর এবং সুকুমার রায়ের ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়ারী’র আগে, চতুর্থ স্থানে হওয়া উচিত। অর্থাৎ, ‘সুলতানার স্বপ্ন’ প্রকাশের আগে বাংলায় তিনটি কল্পবিজ্ঞান বা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু আমার নিচের আলোচনা থেকে দেখা যাবে যে সাহিত্যের একটি ধারা বা জনরা হিসেবে বর্তমানে আমাদের গৃহীত কল্পবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রথম তিনটি গল্প আদৌ কল্পবিজ্ঞানের আওতায় পড়ে না। সেই ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ই বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনী। ইতিহাসের যে সময়ে উপরোক্ত গল্পগুলো লেখা হয়েছিল, তখন সাহিত্যের একটি সুস্পষ্ট শাখা হিসেবে কল্পবিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটেনি। গেল শতাব্দীর তিরিশের দশকে আমরা সাহিত্যে ‘কল্পবিজ্ঞান’ নামে নতুন একটি ধারার প্রথম ধারণা পাই ৮। পরবর্তীকালে অনেক লেখকই তাঁদের নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে কল্পবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিয়ে গেছেন। কিন্তু যে সংজ্ঞাটিকে বাংলা কল্পবিজ্ঞান গবেষকগণ গ্রহণ করেছেন, এর প্রধান একটি শর্ত হচ্ছে গল্পে বিজ্ঞানের ভবিষ্যতমুখিতা থাকতে হবে। হেমলাল দত্তের ‘রহস্য’৯ গল্পটিতে বিলাত ভ্রমণকারী আপাতদৃষ্টিতে নির্বোধ এক বাঙালির অভিজ্ঞতা হাস্যরসের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে এই ভদ্রলোক এক ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ারের বাসায় নিমন্ত্রিত হয়ে প্রথমবারের মতো স্বয়ংক্রিয় ফটক বা গেইট, দৃষ্টিকোণ পোষাক বা কোট ঝারার যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় পানির ঝরনা বা শাওয়ার, বৈদ্যুতিক ঘণ্টা বা কলিং বেল, ইত্যাদি দেখে যে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিলেন তা বর্ণনা করেছেন। যে যন্ত্রগুলো তিনি উল্লেখ করেছেন সে সব তার কাছে অপরিচিত হলেও এর সবগুলোই তখন আবিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বিজ্ঞান অথবা এর প্রযুক্তিগত প্রয়োগটি তখনকার ইউরোপে প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ কোনো অর্থেই গল্পটি ভবিষ্যৎমুখী ছিল না। ফলে ‘কল্পবিশ্ব’ নামে আন্তর্জালিক বা অনলাইন পত্রিকার সম্পাদকদ্বয় দীপ ঘোষ ও সন্ত বাগ এবং অন্যান্য কল্পবিজ্ঞান লেখকের মতে শুধুমাত্র ভবিষ্যৎমুখিতার অভাবে গল্পটি কল্পবিজ্ঞান এর আওতায় পড়ে না৩। কল্পবিজ্ঞান লেখক ও সম্পাদক অনীশ দেবের উদ্ধৃতি দিয়ে এবং সেই উদ্ধৃতিকে সমর্থন করে দীপ ঘোষ ও সন্ত বাগ৩ লিখেছেন ‘গল্পটি যে কোনোভাবেই কল্পবিজ্ঞানের শ্রেণিতে পড়তে পারে না, তার আরও একটা কারণ হল, গল্পের যাবতীয় যন্ত্রপাতি কোনোটাই কাল্পনিক বা ফিউচারিস্টিক নয়। ঠিক একই কারণে চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস সিনেমাটি সায়েন্স ফিকশন সিনেমার শ্রেণীতে পড়ে না’। উপরোক্ত গবেষকদের মতো আমি নিজেও তাই মনে করি, হেমলাল দত্তের রহস্য গল্পটি কল্পবিজ্ঞান বা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী শ্রেণিভুক্ত নয়। এর পরের জগদানন্দ রায়ের ‘শুক্রভ্রমণ’১০ গল্পে লেখক তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় নিজেকে শুক্রগ্রহে আবিষ্কার করেন। সেখানকার আবহাওয়া, ভূগোল, উদ্ভিদ এবং মানুষরূপী কাল্পনিক প্রাণীর বর্ণনা শেষে তন্দ্রা বা ঘুম ভেঙে আবার নিজের গৃহে ফিরে আসেন। শুক্রগ্রহের যে সব বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তার সবই ছিল গ্রহটি সম্পর্কে এবং পৃথিবী সম্পর্কে তখনকার সৌরবিজ্ঞানীদের বিশ্বাস অনুযায়ী। তাঁর কল্পনার ক্ষেত্রটি ছিল শুক্রগ্রহে যাওয়া, এবং শুক্রবাসীদের দেখা পাওয়া, যাকে ভবিষ্যৎমুখী বলা যেতে পারে। প্রখ্যাত গবেষক ও কল্পবিজ্ঞান লেখক সিদ্ধার্থ ঘোষ২ এবং দীপ ঘোষ ও সন্ত বাগ৩ গল্পটিকে বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রাচীন কল্পবিজ্ঞান বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বারবার পড়েও ‘শুক্রভ্রমণ’ এবং শুক্রগ্রহ সম্পর্কে আমাদের তৎকালীন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিশেষণ করে গল্পটিতে আমি বিজ্ঞানের কোনো ভবিষ্যতমুখিতার পরিচয় পাইনি১১। জগদানন্দ রায় শান্তিনিকেতনে বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। বিজ্ঞানের দুরূহ বিষয়কে সাধারণ ছাত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে একজন ভালো শিক্ষক যে যে অভিনব পন্থা অবলম্বন করে থাকেন, এই গল্পের মাধ্যমে শ্রীজগদানন্দ রায় ঠিক সেই কাজটিই করেছেন। গল্পটিতে কল্পনা থাকলেও বিজ্ঞান বিষয়ক ভবিষ্যতমুখিতা একেবারেই নেই। বিজ্ঞানের কিছু তথ্যের সাথে শুধুমাত্র অন্য একটি গ্রহে ভ্রমণের কল্পনা থাকলেই তাকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বলা যায় না। যেমন চরকায় সূতা কাটার প্রচলন প্রাচীন হলেও সেটি একটি বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি, এবং এক বুড়ি চাঁদে বসে চরকায় সূতা কাটার কাল্পনিক গল্পটিকেও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বলা যায় না। কাজেই ভবিষ্যতমুখিতার অভাবের যে যুক্তিতে দীপ ঘোষ ও সন্ত বাগ৩ হেমলাল দত্তের ‘রহস্য’কে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বলতে নারাজ, ঠিক একই কারণ ও যুক্তিতে জগদানন্দ রায়ের ‘শুক্রভ্রমণ’কেও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বলা যায় না। উপরে উল্লিখিত সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘শুক্র ভ্রমণ’ যে আদৌ কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনী নয়, তা ভিন্ন একটি প্রবন্ধে উদাহরণ ও তথ্য সহকারে সম্প্রতি লিখেছি ১১।
বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর ‘পলাতক তুফান’কেও১২ কল্পবিজ্ঞান লেখক ও গবেষক সিদ্ধার্থ ঘোষ২ এবং দীপ ঘোষ ও সন্ত বাগ৩ শুক্রভ্রমণের মতোই বাংলা সাহিত্যের একটি সর্বপ্রাচীন কল্পবিজ্ঞান বলে অভিহিত করেছেন, যেমন করেছেন মুহিত হাসান৫। শুধু তাই নয়, গল্পটিকে সিদ্ধার্থ ঘোষ ‘একটি অনবদ্য এসএফ কাহিনী’২ বলে আখ্যায়িত করেছেন, যদিও বিজ্ঞানের কোন কোন বিষয়ের জন্য কাহিনীটি অনবদ্য তার ব্যাখ্যা তিনি দেননি। গল্পটি পড়ে এবং সমসাময়িক বিজ্ঞানের জ্ঞানকে বিশ্লেষণ করে আমার সিদ্ধান্তটি ছিল ‘শুক্রভ্রমণ’র মতোই১৩। জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর গল্পে ব্যারোমিটার, ব্যারোমিটারে পারদের উচ্চতা ওঠানামার সাথে বায়ুর চাপের তারতম্য ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস, এবং তেল ও পানির বিপরীত ধর্মের বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁর পলাতক তুফান রচনা করেছিলেন। তাঁর ব্যবহৃত প্রতিটি তথ্যই তৎকালীন বিজ্ঞানী মহলে খুব ভালোভাবেই জানা ছিল। গল্পে তুফানকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করতে জগদীশচন্দ্র বসু কল্পনায় বিজ্ঞানকে তাঁর সময় থেকে একদিনের ভবিষ্যতেও ঠেলে দেননি। তুফানটিকে তিনি তেল ও পানির বিপরীত ধর্ম, যা হাজার বছর থেকেই নাবিকদের কাছে জানা ছিল, তা কাজে লাগিয়ে সমুদ্রের ঢেউকে শান্ত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ প্রকাশের ১৪ বছর আগে বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক জুল ভার্ন এর ‘ডিক স্যান্ডস : দি বয় ক্যাপ্টেইন’ বইতে তেল প্রয়োগের হুবহু একই কৌশল অবলম্বন করে সাগরের ঢেউকে শান্ত করেছিলেন। কাজেই জগদীশচন্দ্র বসুর কল্পনাতেও নতুনত্ব কিছু ছিল না। ‘পলাতক তুফান’ যে আদৌ বিজ্ঞান কল্পকাহিনী শ্রেণিতে পড়ে না তা আমাদের তৎকালীন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিশ্লেষণ করে অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করেছি১৩। সিদ্ধার্থ ঘোষ কোন বিবেচনা থেকে গল্পটিকে এসএফ বলছেন তা আমার সেই রচনার একটি অনুচ্ছেদ বা প্যারাগ্রাফ থেকে বোঝা যাবে: “তিনি (সিদ্ধার্থ ঘোষ) যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন, তা হচ্ছে ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ গল্পের উপশিরোনাম বা সাবটাইটেল হিসেবে ব্যবহৃত ‘বৈজ্ঞানিক রহস্য’ শব্দগুচ্ছে। সিদ্ধার্থ ঘোষের ভাষায় ‘সায়েন্স-এর সাথে ফিকশন বা ফ্যান্টাসিকে যুক্ত করে জোড়-কলম শব্দ দুটি ইংরেজিতে আবির্ভূত হওয়ার বহু পূর্বেই জগদীশচন্দ্র স্বাধীন ও সচেতনভাবে এই বাংলা পরিভাষা নির্মাণ করেছেন। সায়েন্স ফিকশনের বাংলা পরিভাষা কি হবে, বিজ্ঞান-ভিত্তিক গল্প না কল্পবিজ্ঞানের গল্প অথবা এই দুই প্রতিশব্দের এক্তিয়ার সংক্রান্ত বিতর্কের নিষ্পত্তি ঘটাতে পারে ‘বৈজ্ঞানিক রহস্য’। এই আলোচনা থেকে বোঝা যায় শ্রী সিদ্ধার্থ ঘোষ গল্পের বিষয়বস্তু নয়, তাঁর কথিত, জগদীশচন্দ্র বসু ব্যবহৃত উপশিরোনামের (বৈজ্ঞানিক রহস্য) ওপর ভিত্তি করেই গল্পটিকে কল্পবিজ্ঞান বলে ধরে নিয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত দে’জ পাবলিশার্স এর পুনর্মুদ্রিত ‘অব্যক্ত নামে বইয়ের যে পিডিএফ কপিটি আমার হাতে আছে, তাতে ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ গল্পের কোনো উপশিরোনাম নেই। এভাবে উপরের ছকের প্রথম তিনটি গল্পই সংজ্ঞা অনুযায়ী কল্পবিজ্ঞানের আওতায় না পড়লে প্রকাশকালের বিবেচনায় পরবর্তী বিবেচ্য গল্পটি হচ্ছে বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’। আগে যেমন বলা হয়েছে, ইংরেজিতে লেখা বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানা’স ড্রিম’ ১৯০৫ সালে এবং একই লেখকের অনুবাদে বাংলায় ‘সুলতানার স্বপ্ন’ ১৯২২ সালে প্রকাশিত হলেও পূর্বোক্ত গবেষকদের কেহই২-৭ এই রচনাগুলোকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বলে উল্লেখই করেননি। গল্পটির সাম্প্রতিক এক অনুপুঙখ বিশ্লেষণে আমি দেখিয়েছি যে এটি একটি আদর্শ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী১। সেই গল্পে রোকেয়া আলো, তাপ, বিদ্যুৎ, বায়ু, আবহাওয়া, আকাশ-ভ্রমণ, স্বাস্থ্য ও যুদ্ধ প্রযুক্তিকে কল্পনায় এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে লেখাটি প্রকাশের প্রায় সোয়াশ বছর পর আজও তা উন্নত বিজ্ঞান বা অ্যাডভান্স সায়েন্স-এর পর্যায়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এইসব কাল্পনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেই তাঁর কাল্পনিক গল্পে নারীজাতিকে তিনি অত্যন্ত নিপুণতার সাথে পুরুষের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন। ইংরেজিতে লিখিত বলে এই গবেষকরা২-৭ ‘সুলতানা’স ড্রিম’কে বাংলায় কল্পবিজ্ঞান বিবেচনা না করার একটি যুক্তিসংগত কারণ থাকতে পারে। কিন্তু বাংলায় ‘সুলতানার স্বপ্ন’ তো হেমেন্দ্রকুমার রায় এবং প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচনা প্রকাশের অন্তত তিন বছর আগে, ১৯২২ সালেই প্রকাশিত হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর ইতিহাস লিখতে গিয়ে তাঁরা কেন বেগম রোকেয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করেননি?
জীবিতাবস্থায় এবং মৃত্যুর পরেও বেগম রোকেয়া ভারতবর্ষে, বিশেষ করে বাংলায় মুসলমান নারীদের শিক্ষা এবং নারী অধিকারের অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছেন। নারীশিক্ষা বিবর্জিত সমাজে কঠিন পর্দাপ্রথার শিকার হওয়াতে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা না থাকলেও বাংলা এবং ইংরেজিতে তিনি বেশ কিছু কবিতা, অনুবাদ, প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। হাতে গোনা এক বা দুটি ছাড়া তাঁর সমস্ত রচনার মূল মর্মই হচ্ছে সমাজে নারীর অমর্যাদাকে সামনে তুলে ধরে এর প্রতিকারের পথ খোঁজা। রোকেয়ার কোনো রচনাকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বিবেচনা না করার বিবিধ কারণ থাকতে পারে। প্রথমত তিনি ছিলেন একজন নারী। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে কলকাতাকেন্দ্রিক ভারতবর্ষে পাশ্চাত্যের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হলেও তাতে নারীদের অংশগ্রহণ এক শতাংশও ছিল কিনা সন্দেহজনক। দ্বিতীয়ত তিনি ছিলেন মুসলমান। বৃটিশদের প্রচলিত ইংরেজি শিক্ষার প্রতি মুসলমানদের অনীহার কারণে এই সমাজে তাঁর মতো একজন নারীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও ছিল না। তৃতীয়ত তৎকালীন সমাজে তো বটেই, বর্তমানের শিক্ষিত সমাজেও অঙ্ক ও বিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চাকে অত্যন্ত কঠিন বিবেচনা করে তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। এই তিন প্রেক্ষাপটের সাথে বেগম রোকেয়ার নারী অধিকার-প্রবক্তা পরিচিতির সমন্বয় ঘটালে খুব সহজেই বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর উন্নত জ্ঞান ও রচনা সাধারণ পাঠক ও গবেষকদের দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে। সম্ভবত এই কারণেই বাংলা সাহিত্যের গবেষকগণ ‘সুলতানার স্বপ্ন’কে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী হিসেবে বিবেচনা করেননি। উপরের আলোচনার বিপ্রতীপে ২০২০ সালে সুপার্ণো ব্যানার্জির ইংরেজিতে রচিত ইন্ডিয়ান সায়েন্স ফিকশন: প্যাটার্ন, হিস্টোরি এন্ড হাইব্রিডিটি১৪ বইটির উল্লেখ করা প্রয়োজন। ভারতের চারটি প্রধান ভাষায় কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাস লিখতে গিয়ে লেখক বাংলায় ১৮৮৫ সালের ‘শুক্রভ্রমণ’ এবং ১৮৮৬ সালের ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’র পরে হিন্দিতে কেশব প্রসাদ সিংহের ‘চন্দ্রালোক কি যাত্রা’র পরেই ১৯০৫ সালের ‘সুলতানা’স ড্রিম’কে স্থান দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, গল্পটি নিয়ে বইতে তিনি প্রায় দেড় পৃষ্ঠার একটি আলোচনাও করেছেন। এই প্রবন্ধের আলোচনা ও বিশ্লেষণ থেকে এ কথা এখন সুস্পষ্ট যে বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনী। অর্থাৎ বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন বাংলা সাহিত্যে প্রথম কল্পবিজ্ঞান লেখক।
তথ্যপঞ্জী
১. বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ একটি আদর্শ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, আশরাফ আহমেদ (২০২২), বিডিনিউজ২৪ডটকম এর আর্টস বিভাগ ১১ই জানুয়ারি, ২০২২
২. সায়েন্স ফিকশন, সিদ্ধার্থ ঘোষ, এক্ষণ সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ১৩৯৫ শারদীয় সংখ্যা (নির্মাল্য আচার্য সম্পাদিত) পৃ ১১৯-১৭৬, মহাত্মা গান্ধি রোড, কলিকাতা।
বাংলা সাইন্স ফিকশনের ঐতিহ্যঃ সায়েন্স ফিকশন – সির্দ্ধাথ ঘোষের কলমে | কল্পবিশ্ব পত্রিকা (kalpabiswa.in)
৩. প্রথম বাংলা তথা ভারতীয় কল্পবিজ্ঞানের সন্ধানে, দীপ ঘোষ ও সন্তু বাগ, কল্পবিশ্ব পত্রিকা (kalpabiswa.in), ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বরে সর্বশেষ পঠিত বা নামানো বা ডাউনলোডকৃত।
৪. কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য পরিচয় ৩: ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাস ও অবয়ব, সুমিত বর্মন, কল্পবিশ্ব পত্রিকা (kalpabiswa.in)। ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।
৫. বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির আদিপর্ব (prothomalo.com)। মুহিত হাসান, ৩০শে নভম্বর, ২০১৮। ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বরে সর্বশেষ পঠিত বা নামান (ডাউনলোড)।
৬. Amardeep Singh: Early Bengali Science Fiction (lehigh.edu), ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বরে সর্বশেষ পঠিত বা নামানো বা ডাউনলোডকৃত।
৭. প্রদোষ ভট্টাচার্য, হেমেন্দ্রকুমার রায় ও বাংলা কল্পবিজ্ঞান | কল্পবিশ্ব পত্রিকা (kalpabiswa.in), প্রদোষ ভট্টাচার্য, ২রা মে, ২০২১। ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।
৮. Editor Eric's The Greatest Literature of All Times - Eric McMillan, ২০২১ What Is Science Fiction? - The Greatest Literature of All Time (editoreric.com) ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর নামানো বা ডাউনলোডকৃত।
৯. রহস্য, হেমলাল দত্ত, ১৮৮২, বিজ্ঞান দর্পন, প্রথম খণ্ড, আশ্বিন, ১২৯৮। ২০২১ সালের ১০ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।
১০. শুক্র-ভ্রমণ ও প্রাকৃতিকী, জগদানন্দ রায়, Prakritiki : Ray, Jagadananda : Free Download, Borrow, and Streaming : Internet Archive ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।
১১. জগদানন্দ রায়ের শুক্রভ্রমণ কি আদৌ কোনো কল্পবিজ্ঞান? আশরাফ আহমেদ, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২২; বিডিনিউজ২৪ডটকম আর্টস বিভাগ
১২. অব্যক্ত, জগদীশচন্দ্র বসু
১৩. জগদীশচন্দ্র বসুর ‘পলাতক তুফান’ একটি উৎকৃষ্ট ব্যঙ্গ-রসাত্মক গল্প (bdnews24.com), আশরাফ আহমেদ, বিডিনিউজ২৪ডটকম আর্টস বিভাগ, ২৭শে মে, ২০২২।
১৪. Indian Science Fiction: Patterns, History and Hybridity, Suparno Banerjee, University of Wales Press ২০২২ সালের ১৫ই ডিসেম্বর নামানো বা ডাউনলোডকৃত।
