এদুয়ার্দো গালেয়ানোর চোখে ফুটবলের মজার ঘটনা

আসাদ মিরণআসাদ মিরণ
Published : 8 Dec 2022, 04:27 AM
Updated : 8 Dec 2022, 04:27 AM

এদুয়ার্দো গালেয়ানো শুধুমাত্র একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও ঔপন্যাসিকই ছিলেন না, তিনি ফুটবলের একজন পাঁড় ভক্তও ছিলেন। তার সেই ভক্তি প্রকাশ পায় ফুটবল ইস সান অ্যান্ড শ্যাডো বইটিতে। ১৯৯৭ সালে, ইংরেজিতে অনূদিত ও প্রকাশিত এই বইটির মাধ্যমে গালেয়ানো খেলা-সাহিত্যের একটি নির্দিষ্ট ঘরাণার পাঠকদের মাঝে নিজেকে দারুণ জনপ্রিয় করে তোলেন।

১৯৫০ সালের ঘটনা। তখন গালেয়ানোর বয়স ছিল নয় বছর। বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনালে ব্রাজিল আর তার দেশ উরুগুয়ে খেলছিল। খেলার ধারাভাষ্য শোনার জন্য উরুগুয়ের অন্যান্য সাধারণ নাগরিকদের মতো তিনিও রেডিওর সাথে আঠার মতো লেগেছিলেন। এমন সময় তিনি ধারাভাষ্যকার কার্লোস সোলের কন্ঠে চরম একটি খারাপ সংবাদ শুনতে পান। ব্রাজিল একটি গোল করেছে! গালেয়ানো প্রচণ্ডভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তারপর তিনি তার সবচেয়ে ক্ষমতাবান বন্ধুর কাছে করুণা চাইলেন! গালেয়ানো সেদিন বলেছিলেন, “হে ঈশ্বর! তুমি যদি মারাকানা স্টেডিয়ামে উপস্থিত হও আর খেলার গতিপথ পরিবর্তন কর, তাহলে আমি তোমার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করতে রাজি আছি।”

পরবর্তীকালে গালেয়ানো বলেছিলেন, “আমি কখনই সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারিনি।” তবে, সেদিন ব্রাজিলের বিপক্ষে উরুগুয়ের ২-১ গোলের জয়টাকে আমার কাছে অবশ্যই অলৌকিকই মনে হয়েছিল। উরুগুয়ের সেই সময়ের জয়ের নায়ক ছিলেন ওবদুলিও ভারেলা নামের একজন রক্তমাংশের খেলোয়াড়, যার গল্প গালেয়ানো বহু বছর পর তার মিররস্ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

গালেয়ানো দুর্নীতি ও অপশাসন থেকে বাঁচার ক্ষমতার জন্য ফুটবলকে ভালোবাসতেন। বহু বছর আগে তিনি ফিফা সভাপতি জোসেফ বাটলারের সমালোচনা করে বলেছিলেন, “একজন ফিফা-আমলা, যিনি জীবনেও বলকে একবারের জন্য লাথি মারেননি অথচ একজন কালো শোফার নিয়ে একটি ২৫ ফুট লম্বা লিমুজিনে ঘুরে বেড়ান।”

এভাবে এদুয়ার্দো গালেয়ানো বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে, তার লেখনিতে - কখনো ম্যারাডোনা, কখনো পেলে, হোসে লিয়েন্দ্রো কিংবা হিগুইতা প্রমূখ ফুটবল খেলোয়াড়দের তুলে এনেছেন। আজ তার মিররস গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ফুটবল নিয়ে কিছু লেখা পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হল। ভুক্তিগুলো ইংরেজি থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন আসাদ মিরণ। বি.স.

পেলে

ইংরেজ দুই ফুটবল দল চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য লড়ছিল। শেষ বাঁশি বাজতে খুব বেশি বাকি নেই। ম্যাচের ফলাফল তখনও ড্র। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন খেলোয়াড় বিপক্ষ দলের আরেকজন খেলোয়াড়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়, জ্ঞান হারায়।

স্ট্রেচার এসে খেলোয়াড়টিকে মাঠের বাইরে নিয়ে যায়। পুরো মেডিকেল টিম তাঁর শুশ্রূষা করতে থাকে। কিন্তু সে মাঠে ফিরতে পারে না।

মিনিট কেটে যায়, কোচ অস্থিরভাবে ঘড়ি দেখছেন। ইতিমধ্যে তিনি বিকল্প খেলোয়াড়ের কোটা পূর্ণ করে ফেলেছিলেন। তাঁর ছেলেদের সংখ্যা এখন এগারো জনের বিরুদ্ধে দশজন। তাঁরা যথাসাধ্য প্রতিপক্ষকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, সেটাও যথেষ্ট ছিল না।

কোচ নিশ্চিত পরাজয় দেখতে পাচ্ছিলেন। তখন হঠাৎ করেই দলের ডাক্তার দৌঁড়ে এসে আনন্দে কেঁদে ফেললেন:

“আমরা পেরেছি! তাঁর জ্ঞান ফিরেছে!”

এবং নীচু গলায় তিনি যোগ করলেন:

“কিন্তু সে নিজেকে চিনতে পারছে না।”

কোচ তখন খেলোয়াড়ের কাছে গেলেন। তখনও সে অসংলগ্নভাবে বকবক করছিল, উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছিল। তিনি তাঁর কানে ফিসফিস করে বললেন:

“তুমি পেলে।”

তাঁরা পাঁচ-শূন্য গোলে জিতেছে।

কয়েক বছর আগে লন্ডনে, আমি এই মিথ্যা শুনেছিলাম যা সত্যি বলেছিল। 

ম্যারাডোনা

এর আগে কখনোই কোন তারকা ফুটবলার খোলাখুলিভাবে ফুটবল শিল্পের প্রভুদের সমালোচনা করেননি। তিনি ছিলেন সর্বকালের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় সেই ক্রীড়াবিদ, যিনি বিখ্যাত কিংবা জনপ্রিয় নয়, এমন খেলোয়াড়দের রক্ষায় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

মহৎ এবং অন্যের প্রতি যত্নশীল দেবতুল্য এই মানুষটিই পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে, সমগ্র ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিপরীতমুখী দু’টি গোল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর অনুগত ভক্তরা উভয়ের জন্যেই তাঁকে শ্রদ্ধা করে: সেই গোল দুটির একটি ছিল, তাঁর পায়ের অত্যন্ত সুক্ষ্ণকর্মে রচিত চাতুর্যপূর্ণ এক শৈল্পিক গোল এবং অন্যটি ছিল, সম্ভবত চুরির চেয়েও বেশি কিছু, নিজ হাতেই বিপক্ষের পকেট কেটে দিলেন।

দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা শুধুমাত্র অসাধারণ অ্যাক্রোব্যাটিকের কারণেই ভক্তদের কাছে আরাধ্য ছিলেন না, বরং একজন নোংরা দেবতা, পাপী এবং দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে মানবীয় কোন দেবতা হিসেবেও তাঁদের কাছে পূজনীয় ছিলেন। যে কেউ সেই দেবতার মধ্যে মানুষের মতো অসংলগ্ন চলাফেরা বা নিদেনপক্ষে কিছু পুরুষালি বৈশিষ্ট্য, দুর্বলতা খুঁজে পাবেন: তিনি ছিলেন একজন অসচ্চরিত্র ব্যক্তি, পেটুক, মাতাল, প্রতারক, মিথ্যাবাদি, দাম্ভিক এবং কান্ডজ্ঞানহীন।

কিন্তু দেবতারা, তা সে যতই মানবীয় হোক না কেন, তাঁর অবসর নেই।

যেখান থেকে তিনি এসেছিলেন, সেই অজ্ঞাতনামা জনতার কাতারে আর কখনো ফিরে যেতে পারেন নি।

যে খ্যাতি তাঁকে দারিদ্র থেমে মুক্ত করেছিলো, সেটিই তাঁকে বন্দীর মতো আটকে রেখেছিল।

তিনি হলেন ম্যারাডোনা, এই বিশ্বাসের কারণেই তাঁকে দোষী হতে হয়েছিল; প্রতিটি শিশুর নামকরণে, প্রতিটি মৃতের জাগরণ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পর্বে, প্রতিটি দলে, তাঁকেই মধ্যমণি হতে বাধ্য করা হয়েছিল।

কোকেনের চেয়েও সাফল্যের নেশা বড্ড বেশি বিধ্বংসী। মূত্র কিংবা রক্ত পরীক্ষায় যা সনাক্ত করা যায় না।

আলোকচিত্র: দ্য স্করপিয়ন

১৯৯৫ সালের শরৎকাল, লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম।

কলম্বিয়ান ফুটবল দল, বয়োজ্যেষ্ঠ শ্রদ্ধেয় ইংল্যান্ড দলকে তাদের সর্বোচ্চ পবিত্রতম মন্দিরে চ্যালেঞ্জ জানায়, এবং গোলরক্ষক রেনে হিগুইতা একটি অতুলনীয় এক সেভ করে তাঁর দলকে রক্ষা করে।

একজন ইংরেজ স্ট্রাইকারের কাছ থেকে গোলার মতো এক বিস্ফোরণ কলম্বিয়ান গোলরক্ষকের দিকে ছুটে এসেছিল। তখন সে বাতাসে তাঁর শরীরকে আনুভূমিক করে গোড়ালি দিয়ে বলটা ফেরত পাঠান। একটি স্করপিয়ন যেমন করে তাঁর লেজ উপরে বাঁকিয়ে রাখে, বলটি ঠেকানোর সময় তাঁর পা দুটিও ওভাবে বাঁকিয়ে ছিলেন।  

কলম্বিয়ান পরিচিতির এই চিত্রটি ভালোভাবে দেখলে, থমকে যেতে হয়। এটির অভিব্যক্তি যেন কোন ক্রীড়াশৈলীর মাঝে সীমিত থাকেনি, হিগুইয়ের চওড়া হাসি তাঁর মুখ থেকে কান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যেন তিনি রাজশক্তির গোলা ঠেকিয়ে ক্ষমার অযোগ্য কোন অপবিত্র কাজ করে ফেলেছেন।

সাম্বার উৎপত্তি

ট্যাঙ্গোর মতো সাম্বাকেও শালীন বলে মনে করা হত না: “সস্তা দরের, কালা-আদমিদের মিউজিক।”

১৯১৭ সালে, যে বছর গার্ডেল ট্যাঙ্গোকে সামনের দরজায় নিয়ে এসেছিলেন, সেই বছরই রিও ডি জেনিরোর কার্নিভালে সাম্বার বিস্ফোরণ ঘটে। বছরের পর বছর ধরে চলা সেই কার্নিভালের রাতে, বোবা মানুষটিও গান গেয়ে উঠেছিল আর রাস্তার নিওন বাতি নেচেছিল। 

এর কিছুদিন পর, সাম্বা প্যারিস ভ্রমণ করে এবং প্যারিস বন্য হয়ে ওঠে। একটি অসাধারণ সঙ্গীতপ্রিয় দেশে, সকল সঙ্গীতের মিলনস্থলে, সাম্বা যেন অপ্রতিরোধ্য রূপ ধারণ করে।

কিন্তু ব্রাজিল সরকার, যারা সে সময়ে জাতীয় ফুটবল দলে কালোদের অন্তর্ভুক্তির অনুমতি দিতে অস্বীকার করতো, তাঁদের কাছে ইউরোপের এই আশীর্বাদ অস্বস্তিকর ছিল। তাঁদের দেশের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীরা সবাই কালো ছিল। সরকারের ধারণা ছিল, কালোদের এমন পরিচিতির কারণে ইউরোপ মনে করতে পারে, ব্রাজিল আফ্রিকার অন্তর্ভুক্ত কোন দেশ ছিল।

এই সকল সঙ্গীতজ্ঞদের গুরু, বাঁশি ও স্যাক্সের ওস্তাদ, জাদুকর পিক্সিংগুইনহা সাম্বার এক অনবদ্য শৈলী তৈরি করেছিলেন। ফরাসিরা আগে কখনও এমন সঙ্গীত শোনেনি। তিনি সঙ্গীতের চেয়েও বেশি কিছু করেছিলেন, সবাইকে খেলায় যোগ দেবার নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

প্যারিসের আত্মসমর্পণ

তিনি যখন খালি পায়ের এক বালক ছিলেন, তখন নামহীন রাস্তায় ন্যাকড়া দিয়ে বানানো ফুটবল নিয়ে খেলতেন। ফড়িংয়ের তেল দিয়ে হাঁটু ও গোড়ালি মালিশ করতেন। তিনি বলেছিলেন, এভাবেই নাকি তাঁর পায়ের জাদু এসেছে।

হোসে লিয়েন্দ্রো আন্দ্রে খুব কম কথা বলতেন। তিনি তাঁর গোল অথবা ভালোবাসা কোনটাই উদযাপন করতেন না। ছবিতে যেমন দেয়া যায়, নিরাসক্ত উদ্ধত ভঙ্গিতে তিনি তাঁর শরীরের সাথে লেগে থাকা কোন নারীর সাথে ট্যাঙ্গো ড্যান্স করছেন, ঠিক তেমনি নিরাসক্ত উদ্ধত ভাব-ভঙ্গি দেখা যায়, যখন তিনি নাচের তালে আঠার মতো পায়ে লেগে থাকা বল নিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে যেতেন।

১৯২৪ সালে অলিম্পিকে তিনি প্যারিসকে চমকে দিয়েছিলেন। দর্শকরা বিমোহিত হয়ে গিয়েছিল, সংবাদপত্র তাঁকে “ব্লাক মার্বেল” বলে অভিহিত করেছিল। খ্যাতি, মা লক্ষীদের ডেকে নিয়ে এসেছিল। তাঁর ওপর চিঠির বর্ষা বইছিল, তার কোনটাই তিনি পড়তেন না। সুগন্ধিযুক্ত কাগজে চিঠি লেখা নারীরা, তাঁর জন্য হাঁটু উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, সোনার কেসে রাখা সিগারেট ঠোঁটে তুলে ধোঁয়ার রিং বাতাসে উড়িয়েছিলেন।

যখন তিনি উরুগুয়েতে ফিরে এসেছিলেন, তখন তাঁর পড়নে ছিল জাপানি সিল্কের পোশাক, হাতে শোভা পাচ্ছিল ধূসর গ্লাভস আর দামী ঘড়ি।

সব কিছু দ্রুতই শেষ হয়ে যায়।

তখনকার দিনে, মদ, খাবার আর আনন্দের বিনিময়ে ফুটবল খেলা হতো।

তিনি রাস্তায় খবরের কাগজ বিক্রি করা শুরু করলেন।

তিনি তাঁর পদক বিক্রি করে ফেললেন।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনিই ছিলেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ তারকা খেলোয়াড়।

শেষ ইচ্ছা

১৯৩৬ সালের গ্রীষ্মকাল, লা কোরুনা: বেবেল গার্সিয়াকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মারা হয়।

বেবেল বামদিকে খেলতেন, বাম চিন্তা করতেন।

ফুটবল স্টেডিয়ামে তিনি দোপোর ক্লাবের জার্সি আর স্টেডিয়ামের বাইরে সমাজতান্ত্রিক যুবদলের জার্সি পরতেন।

ফ্রাঙ্কোর অভ্যুত্থানের এগারো দিন পর, মাত্র একুশ বছর বয়সী বেবেলকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়া করানো হয়:

তিনি আদেশের সুরে বললেন, “এক মিনিট অপেক্ষা করেন।”

তখন সৈন্যরা, যারা তাঁর মতোই স্থানীয় গ্যালিসিয়ান আর তাঁর মতোই ফুটবল পাগল, সেই আদেশ মেনে নেয়।

তারপর বেবেল প্রকাশ্যে, ধীরে ধীরে একটা একটা করে তাঁর প্যান্টের বোতাম খোলেন এবং ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্রাব করেন।

তারপর বোতাম আটকান।

“হ্যাঁ, এখন কাজটি শেষ করেন।”

ঔদ্ধত্য         

১৯৩৬ সালের অলিম্পিকে, পেরুর ফুটবল দলের কাছে হিটলারের জন্মভূমি পরাজিত হয়।

রেফারি, তাঁর পক্ষে যতটা করা সম্ভব ছিল, তা তিনি করেছিলেন। ফুহ্রার বা নেতাকে আরো বেশি অসন্তুষ্ট না করার জন্য, তিনি পেরুর তিন-তিনটি গোল বাতিল করে দিয়েছিলেন, তবুও অস্ট্রিয়া ৪-২ গোলে হেরে যায়।

পরের দিন, সকার ও অলিম্পিক কর্মকর্তারা ব্যাপারটি ঠিকঠাক করে ফেলেন।

ম্যাচটি বাতিল করা হয়। তবে সেটি এই কারণে নয় যে, পেরুর কালো স্টিমরোলার বলে খ্যাত আক্রমণ ভাগের কাছে আর্য-জাতির পরাজয় অগ্রহণযোগ্য ছিল, বরং কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ম্যাচ শেষ হবার আগেই ভক্তরা মাঠে নেমে পড়েছিল বলেই তা বাতিল করা হয়েছে।

পেরু অলিম্পিক থেকে বিদায় নেয় এবং হিটলারের দেশ টুর্নামেন্টে রৌপ্য পদক জেতে।

ইতালি, মুসোলিনির ইতালি, স্বর্ণ জেতে। 

ফুটবলে নাগরিক অধিকার

ফাঁকা স্টেডিয়ামের ঘাসগুলি বড় হয়ে যাচ্ছিল।

স্ট্রাইকাররা ধর্মঘট করছে, ডিফেন্ডাররাও: উরুগুয়ের ফুটবল খেলোয়াড়রা ছিল তাঁদের টিমের ক্রীতদাস। তাঁরা কেবল তাঁদের ইউনিয়নের স্বীকৃতি ও টিকে থাকার অধিকার দাবি করেছিল। কারণটা এতোটাই ন্যায্য ও নিন্দনীয় ছিল যে, মানুষও খেলোয়াড়দের সমর্থন করেছিল। এমনি করে দিন চলে যায় আর ফুটবলবিহীন প্রতি রবিবার মানুষের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে।

কিন্তু মালিকরা ছাড় দিতে নারাজ। তাঁরা হাত গুটিয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো, কখন খেলোয়াড়রা ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু খেলোয়াড়রা তাঁদের দাবীতে অনড় থাকে। স্বল্পভাষী গর্বিত এক কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের সামান্য উদাহরণে তাঁদের মনোবল অভাবনীয়ভাবে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ওবদুলিও ভারেলা নামের সেই মানুষটি ছিলেন নিরক্ষর ও পেশায় রাজমিস্ত্রি। তিনি নিপতিতকে তুলে নিলেন এবং ক্লান্তদের তাড়িত করলেন।

আর এভাবেই, দীর্ঘ সাত মাস পর, উরুগুয়ের খেলোয়াড়রা পা-বন্ধের ধর্মঘট জিতেছিল। এক বছর পর, ১৯৫০ সালে, তাঁরা বিশ্বকাপও জিতে নিলো।

মারাকানা স্টেডিয়াম, ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত খেলায়, ব্রাজিল ষ্পষ্টতঃই ফেবারিট ছিল। তারা মাত্রই স্পেনকে ৬-১ আর সুইডেনকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে। সবার ধারণা ছিল, ভাগ্যের রায়ে ফাইনালে ওঠা উরুগুয়ে, ব্রাজিলের বেদীতে বলি হবার শেষ মেষশাবক হতে চলেছে। এবং বাস্তব অবস্থাও সেই রকমই ছিল। উরুগুয়ে হেরে যাচ্ছিল, গ্যালারিতে দুই লক্ষ ভক্ত গর্জন করছিল। ওবদুলিও তাঁর ফোলা গোড়ালি নিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে খেলছিলেন। এরপর আক্রমণভাগের এই অধিনায়ক অসম্ভব এক জয়ের অধিনায়ক হয়ে ওঠেন।

মারাকানা

মুমূর্ষরা তাঁদের মৃত্যু ঠেকিয়ে রেখেছিল এবং গর্ভের শিশুরা তাঁদের জন্ম ত্বরান্বিত করেছিল।

১৬ জুলাই, ১৯৫০, রিও ডি জেনিরো, মারাকানা স্টেডিয়াম, ব্রাজিল।

আগের রাতে কেউ ঘুমাতে পারেনি।

পরের দিন সকালে, কেউ ঘুম থেকে উঠতে চায়নি। 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক