২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯ কার্তিক ১৪৩৩

আসাদুজ্জামান নূর: অনেক বিষয় আছে যেগুলো সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা উচিত

শিমুল সালাহ্উদ্দিন শিমুল সালাহ্উদ্দিন

Published : 05 Nov 2018, 09:47 PM

Updated : 23 Jun 2022, 04:01 PM


বাকেরভাই খ্যাত বরেণ্য অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের জন্ম ৩১ অক্টোবর, ১৯৪৬ সালে অখণ্ড ভারতের নীলফামারীতে। ৩১ অক্টোবর তিনি পা রাখলেন ৭২ বছরে। আসাদুজ্জামান নূর এর বাবা আবু নাজিম মোহাম্মদ আলী এবং মা আমীনা বেগম। নীলফামারী স্বাধীন বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের ছোট্ট মফস্বল শহর। এ শহরেই শৈশব-কৈশোর আর তারুণ্যের প্রথম ভাগ কেটেছে সরকারের বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী ও অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের।

বাবা-মা দু'জনই ছিলেন স্কুলশিক্ষক। দুই ভাই আর এক বোনের মধ্যে আসাদুজ্জামান নূর সবার বড়। জীবনের প্রথম দিকে বাম রাজনীতির আদর্শ নিয়ে দুর্বার যাত্রা। শ্রেণি-সংগ্রাম, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য তিনি লড়াই করেছেন জীবনের অনেকটা সময়। বহমান স্রোতের আদর্শ পুরুষ হিসেবে আসাদুজ্জামান নুর পেয়েছেন যশ, খ্যাতি, প্রশংসা, পুরস্কার এবং লক্ষ-কোটি দর্শকদের ভালোবাসা। ১৯৬২ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন আসাদুজ্জামন নূর। পরবর্তীতে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আসাদুজ্জামান নূর মুক্তিযুদ্ধে ৬ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

ভূমিকা ও সাক্ষাৎকার: শিমুল সালাহ্উদ্দিন

অভিনয়ে আসাদুজ্জামান নূর মূলত খ্যাতি অর্জন করেন হুমায়ূন আহমেদের নাটক কোথাও কেউ নেই এর বাকের ভাই চরিত্রে। কখনও 'এই সব দিনরাত্রি'র শফিক, কখনও 'অয়োময়'র ছোট মীর্জা, কখনও বা 'সবুজ ছায়ার' ডাক্তার চরিত্রে অভিনয় করে লক্ষ দর্শক-শ্রোতার প্রশংসা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। তবে কিংবদন্তি হয়ে আছেন 'কোথাও কেউ নেই' নাটকে বাকের ভাই চরিত্রের কারণেই, গ্রাম বাংলার লাখো মানুষ আজো তাকে বাকের ভাই নামেই চেনে, ডাকে। অবশ্য 'নক্ষত্রের রাত' নাটকে তার হাসান চরিত্রটিও একজন উঁচু পর্যায়ের দার্শনিকের কথাই মনে করিয়ে হুমায়ূনের রচনা ও পরিচালনায় 'আগুনের পরশমনি' চলচ্চিত্রে কাজ করেও নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। তারপর থেকে কেবল অভিনয়ের ভুবনে নিজেকে সমৃদ্ধ করেই চলেছেন। অভিনয় তার কতটা প্রিয় সেটি টের পাওয়া যায় যখন একজন মন্ত্রী হয়েও তাকে এখনো অভিনয় করতে দেখা যায়। সস্প্রতি নাগরিক-এর নবপ্রযোজনা গ্যালিলিও'তে আলী যাকের-এর বিপরীতে তিনি তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। আসাদুজ্জামান নূর ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১‎৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নীলফামারী জেলা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন।

১৯৮২ সালে ডাক্তার শাহীন আকতারকে বিয়ে করেন। এক ছেলে এক মেয়ে তার। ছেলে সুদীপ্ত লন্ডনে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে দেশে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত। মেয়ে সুপ্রভার বিয়ে হয়েছে সম্প্রতি।

এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে ২ নভেম্বর ২০১৬ সালে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার-অনুষ্ঠানের প্রতিবেদন করতে গিয়ে, দুবাই থেকে আল আইন যাবার পথে, গাড়িতে। এই রাষ্ট্রীয় সফরে শিমুল সালাহ্উদ্দিন আমন্ত্রিত হয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছিলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জন্মদিন গেল আপনার কয়েকদিন আগে। একটা বর্ণাঢ্য, কর্মময় জীবন আপনার। অনেক কাজ, অনেক ধরনের কাজ আপনি করেছেন। আমি যেভাবে আপনাকে চিনি শুরু থেকে, আমি প্রথমে আপনাকে পেয়েছি আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতি হিসেবে, তখন সরাসরি আপনাকে দেখেছি, আপনার আবৃত্তি শুনেছি সেই ২০০১/০২ সালে। তার অনেক আগেই আপনি নাটক করে প্রচণ্ড রকম জনপ্রিয় হয়েছেন সারা বাংলাদেশে; আপনার শৈশবের কথা দিয়ে শুরু করতে চাই। আপনার স্মৃতিতে থাকা শৈশবের কোন বিষয়গুলো আপনার মনে পড়ে?
আসাদুজ্জামান নূর: একবারে প্রথম দিকে তো স্কুলের কথা মনে পড়ে, যে বাড়িতে বড় হয়েছি, সেই বাড়িটার কথা মনে পড়ে, যে পাড়ায় থাকতাম সেই পাড়ার কথা মনে পড়ে। এটাই মোটামুটি। আর সেই সময়কার যারা পুরনো বন্ধুবান্ধব, তাদের কথা মনে পড়ে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেটা কি সবই নীলফামারীতে?
আসাদুজ্জামান নূর: নীলফামারীতে। মাঝে বাইরে বছর দুয়েক ছিলাম রংপুরে, কারমাইকেল কলেজে, ইন্টারমিডিয়েট পড়ি যখন; তারপরে বিএ পাশ করার পরে ছেষট্টি সালে যে ঢাকায় আসি, এর মাঝে নীলফামারীর বাইরে কোথাও যাইনি। ছেষট্টি সালে ঢাকায় আসার পরে, ঢাকায়ই বেশি থাকা হয়েছে রাজনীতিতে যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত। তারপর এখন নীলফামারী রীতিমতো যাওয়া আসা করি। তবে এটা ঠিক, যেখানেই থাকি না কেন, আমার বড় হয়ে ওঠা বা বেড়ে ওঠা সবকিছুর উৎসমুখ বা মূল জায়গাটা নীলফামারী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং সেটা নিশ্চয়ই শৈশব-তাড়িত।
আসাদুজ্জামান নূর: আমার বাবা-মা, আমার শিক্ষক, আমার অভিভাবক, শহরে তো নানান ধরনের মানুষ থাকে, সবার সংস্পর্শে বেড়ে ওঠা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তেন, সেই সময়টায়…
আসাদুজ্জামান নূর: আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়িনি আসলে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাই! কেন?
আসাদুজ্জামান নূর: বাবা-মা শিক্ষক ছিলেন। তবে একটা স্কুলে আমাকে কিছুদিন ভর্তি করে দেয়া হয়েছিল, যতদূর মনে পড়ে, কালিদাস প্রাথমিক বিদ্যালয় বলে একটা স্কুলে; কিন্তু ওই স্কুলে যেতে ইচ্ছে করত না বলে আমার বাবা-মা পরে আর আমাকে জোর করেনি। বাড়িতেই পড়াশোনা করেছি। একবারে ক্লাশ থ্রিতে ভর্তি হয়েছি। আমিও তাই, আমার ভাই-ও তাই। ইন ফ্যাক্ট, আমার ছোটবোন একবারে ক্লাশ ফাইভে ভর্তি হয়েছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হাহাহা। শিক্ষক বাবা-মা পাওয়ার বোধহয় এটা একটা সুবিধা। নূর ভাই, বাড়িতে আপনার পরিবারের অবস্থা কেমন ছিল? আপনি কততম সন্তান? পরিবারটা কি যৌথ পরিবার ছিল?
আসাদুজ্জামান নূর: আমি বড়। আমার নিচে এক ভাই। তারপর এক বোন। আমাদের পরিবার ওইভাবে যৌথ পরিবার নয়। আমি, বাবা-মা, আমরা তিন ভাইবোন। আর দাদি আমাদের সঙ্গে থাকতেন। আমার দাদা আমার জন্মের আগেই মারা গেছেন। আমি তাকে দেখিনি। আমার ফুপু অবশ্য খুব কাছেই থাকতেন। তিনিও পরিবারের একজন বলেই মনে হয়েছে সব সময়। বাবা-মা শিক্ষকতা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ফুপুর সাথে আমাদের সময় কাটত। ফুপুর সাথে আমাদের অন্য রকম একটা সম্পর্ক ছিল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার তো স্কুলে যেতে ভালো লাগত না, কী করতে ভালো লাগত আসলে?
আসাদুজ্জামান নূর: খেলাধুলা, বই পড়া, গল্পের বই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কী খেলতেন?


ছবি: রাফিয়া আহমেদ

আসাদুজ্জামান নূর: সবকিছুই খেলতাম। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, ব্যাডমিন্টন আর কোনকিছু না থাকলে বন্ধুবান্ধব মিলে বেড়িয়ে পড়া।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার কলেজ তো রংপুরে?
আসাদুজ্জামান নূর: না, নীলফামারীতে কিছুদিন পড়েছি। পরে একটা গোলমাল হলো, গোলমালের কারণে ওই কলেজ ছেড়ে দিয়ে রংপুরে ভর্তি হলাম। কারমাইকেলে দুই বছর পড়লাম। পড়ার পরে যে রকম ফলাফল হওয়া উচিত ছিল সে রকম হয়নি, যেটা হয় আর কি, যেহেতু পড়াশোনায় আমার মনোযোগ কম ছিল। এমনিতে অল্প পড়লেই ভালো রেজাল্ট করতাম, কিন্তু পড়ার দিকে খুব একটা ঝোঁক ছিল না। বাইরের বই-টই পড়তাম বেশি। তো বাবা-মা আবার নিয়ে এলেন নীলফামারীতে। নীলফামারীতে আসার পর যেটা হলো, ছাত্র-রাজনীতির সাথে বেশি করে জড়িয়ে পড়লাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার রাজনীতিতে যে বুনিয়াদ, ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন, সেটা কত সালের কথা? এবং কার প্রভাবে জড়িয়ে পড়লেন আদতে?
আসাদুজ্জামান নূর: আমার বাবা খুব রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে। যদিও সরাসরি রাজনীতি করতেন না; কিন্তু যারা ওখানে রাজনীতি করতেন বাবা তাদেরকে পরামর্শ দেয়া, পরিচালনা করা— এই কাজটি বাবা করতেন। ফলে আমাদের বাড়িতে সব সময় রাজনীতির মানুষরা আসা যাওয়া করত। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতারা যারা, তারাও বাবাকে খুব মানতেন। সেই হিসাবে তারাও আসতেন। তখন তো আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগের মধ্যে ওইভাবে ভাগাভাগি মারামারি ছিল না, মতপার্থক্য যদিও ছিল; ফলে দেখা গেল মুসলিম লীগের নেতারা আমাদের বাড়িতে আসছেন, আবার আমাদের রাজনৈতিক নেতারা মুসলিম লীগের বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খাচ্ছেন— এ রকম ছিল। পরে আস্তে আস্তে ব্যবধানগুলো বাড়তে থাকে। এবং যেহেতু তারা বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নেয়…..জামাত সম্পর্কে আমার তখনকার দিনে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। পরবর্তীকালে যত দিন গেছে, জামাতের ভূমিকা সম্পর্কে আমরা তত নিশ্চিত হয়েছি। তো ওইরকম আবহতে বড় হওয়ায় পরবর্তীকালে বাবার প্রভাবেই আমি ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত হই। আমি কলেজ সংসদে নির্বাচনও করি। এবং কলেজের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: প্রকাশ্যে এটাই আপনার প্রথম রাজনৈতিক বুনিয়াদ। আপনি অসাধারণ আবৃত্তি করেন। অনেক আবৃত্তি শিল্পী আপনাকে অনুসরণ করেন অনুকরণ করেন। এবং আপনি বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের নেতৃত্বও দিয়েছেন। আপনাকে আগে আবৃত্তি আকৃষ্ট করলো, না অভিনয়?
আসাদুজ্জামান নূর: আবৃত্তিটা আমি আগেই করতাম। এটা আমার বাবার কাছ থেকে পাওয়া। উনি খুব ভালো আবৃত্তি করতেন। আমার স্কুলে একজন শিক্ষক ছিলেন, সুনীল রতন ব্যানার্জি, সবাই তাকে খোকনদা ডাকত, উনি যদিও আমাদের গেম টিচার ছিলেন; কিন্তু স্কুলের যাবতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব উনি দিতেন। ফলে উনিও এই ব্যাপারে আমাকে নানানভাবে বিভিন্ন সময়ে উৎসাহিত করেছেন। উনারও এই ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান আছে বলে আমি মনে করি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন:আর অভিনয়?


ছবি: কয়েক শতাব্দী-প্রাচীন আল আইন দুর্গে শিমুল সালাউদ্দিন-এর সেলফিতে প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাথে সংস্কৃতিমন্ত্রী ও সাক্ষাৎকারগ্রহিতা

আসাদুজ্জামান নূর: অভিনয় স্কুলে যেমন সবাই টুকটাক করে আমিও সেইভাবে করেছি। কিন্তু অভিনেতা হব, ভবিষ্যতে নিয়মিত নাটক করব,এটা কখনো ভাবিনি। ভাবনার মধ্যে ছিল না। রাজনীতি করব এটা ভাবনার মধ্যে ছিল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে সিরিয়াসলি অভিনয়টা শুরু হলো কীভাবে?
আসাদুজ্জামান নূর: সেটা স্বাধীনতার পরে। স্বাধীনতার পরে সাংসারিক প্রয়োজনে আমাকে চাকরিতে ঢুকতে হলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তখন আপনি বিয়ে করে ফেলেছেন?
আসাদুজ্জমান নূর: না। খুবই ছোটখাটো চাকরি। একটা প্রেসের ম্যানেজার।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শুকতারা প্রেস?
আসাদুজ্জামান নূর: না। ওটার নাম ছিল বারিধি মুদ্রায়ণ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ। খুব সুন্দর নাম। বিটপীর প্রেস।
আসাদুজ্জামান নূর: তো, সেই সময় বাম রাজনীতিতে নানা রকম বিতর্ক দেখা দিচ্ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি একমত হতে পারছিলাম না। না হওয়াতে আমি রাজনীতি থেকে সরে এলাম। এসে চাকরি বাকরি করছিলাম। এমন সময় চিত্রালীর আহমেদ জামান চৌধুরী, আজাচৌ, উনি বিটপীতে আসতেন, এবং বিজ্ঞাপনের কপি লিখতেন; তো আমিও দু-একটা মাঝে মাঝে শখ করে লিখতাম। ওখানে তার সাথে আমার পরিচয় হয়। উনি আমাকে বললেন যে, তুমি চিত্রালীতে লেখো। আমি বললাম, ঠিক আছে। উনি আমাকে নিয়ে গেলেন। তখন পারভেজ ভাই ছিলেন সম্পাদক। উনি বললেন, তুমি এক কাজ করো, এখন তো নাটক নিয়ে নাড়াচাড়া হচ্ছে, তিনি কিছু নাম দিয়ে বললেন, এদের ইন্টারভিউ করো। তো ইন্টারভিউ করতে গিয়ে আলী যাকেরের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। উনি আমাকে বললেন, আমাদের রিহার্সাল হচ্ছে। দেখতে আসেন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়। আমি রিহার্সাল দেখতে গেলাম। ওখানে আরো কিছু পরিচিত মানুষ পেলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি সংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি ছিলাম। সেই সূত্রে আমার কিছু কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিল। যেমন: আবুল হায়াৎ, আতাউর রহমান, তামান্না রহমান, গোলাম রব্বানী, এনামুল হক, লাকী ইনাম। তো ওরাও ছিলেন ওখানে। ওরা আমাকে দেখে বলল, আরে প্রমোটার পাওয়া গেছে। আগে যখন ইউনিভার্সিটি লাইফে নাটকগুলো হতো, আমি অনেক সময় প্রমোটিংএর কাজগুলো করতাম। সে সময় সৈয়দ হাসান ইমাম কয়েকটা নাটকের ডিরেকশন দিয়েছিলেন। তখন আমি ওইগুলোতে নানান ধরনের কাজকর্ম করতাম। তো ওইভাবেই পরিচয়। ওইভাবে নাগরিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। তার আগে অবশ্য রামেন্দুদার সঙ্গে থিয়েটার পত্রিকা বার করেছি। ওই প্রেস থেকে। এখনো বেরোয়। প্রথম দিকের কয়েকটা সংখ্যায় আমি সহ-সম্পাদক ছিলাম। পরে যখন ওখান থেকে চাকরি বাদ দিয়ে আমি চলে গেলাম সোভিয়েত দূতাবাসে, তখন এখানে এসে এসে ওই কাজটা করা কঠিন হয়ে গেল। তখন আমি রামেন্দুদাকে বললাম, আমি আর না থাকি। মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর তখন সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দিল। তো এইভাবে নাগরিকে এলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার প্রথম নাটক করার ঘটনা তো খুব মজার।
আসাদুজ্জামান নূর: হ্যাঁ। রিহার্সাল করতে গিয়ে আবুল হায়াতের নাক ফেটে যায়। রশীদ হায়দারের একটা নাটক: তৈল সঙ্কট। বদলুর রহমান আমাদের বন্ধু, খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, মারা গেছে, ওর ঘুষি লেগে ফেটে গেল। তখন নাটকের বাকি একদিন। সুলতানা কামাল, যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন, উনি নায়িকা ছিলেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে উনি তখন আপনাদের দলে কাজ করছেন?
আসাদুজ্জামান নূর: হুম। আমি তো তখন অভিনয় করি না। উনারা করতেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আর আপনি প্রমোটিং করেন।
আসাদুজ্জামান নূর: হ্যাঁ। প্রমোটিং করি। চেয়ার গোছাই। হল পরিষ্কার করি। এই রকম আর কি। তো হঠাৎ করে বদলু আহত হওয়াতে আমাকে আলী যাকের জোর করেই নামিয়ে দিলেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যেহেতু আপনার ডায়লগগুলো মুখস্ত আছে।
আসাদুজ্জামান নূর: কমবেশি মুখস্ত আছে, সে কারণে। এইভাবেই শুরু হলো আর কি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি মঞ্চে যে পরিমাণ কাজ করেছেন, ইন ফ্যাক্ট মন্ত্রী হওয়ার পর এখনো আপনি মঞ্চে প্রায়ই দাঁড়ান, এখন একটা প্রযোজনা চলছেও আপনাদের দলের; এই দীর্ঘ সময়ে মঞ্চে আপনার সবচে' প্রিয় চরিত্র কোনগুলো?
আসাদুজ্জামান নূর: হক ভাইয়ের নুরুলদিনের সারা জীবন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যেটা আপনি সবচে' বেশি জায়গায় পড়েছেন বোধহয়। বাংলাদেশের খুব কম জায়গা আছে, যেখানে আপনি এটা পড়েননি, মঞ্চে।


ছবি: কয়েক শতাব্দী-প্রাচীন আল আইন দুর্গে শিমুল সালাহ্উদ্দিন-এর তোলা ছবিতে প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাথে সংস্কৃতিমন্ত্রী

আসাদুজ্জামান নূর: ওখানে আব্বাস চরিত্রে অভিনয় করতাম। গডোর প্রতীক্ষায় স্ট্রাগন বলে একটা চরিত্র ছিল, মুখোশ বলে একটা নাটক ছিল ওটাও হক ভাইয়ের অনুবাদ করা, ওটাতে ডাক্তারের চরিত্রটা আমি করতাম। হক ভাইয়ের আরেকটি নাটক, খাট্টা তামাশা, সেখানে মতি বাবু বলে একটা চরিত্র ছিল, ওটা আমি করতাম। এইগুলো আমার প্রিয় চরিত্র। গ্যালিলিওতে আমি তিনটা ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করতাম। সেটা করেও আমার খুব মজা লাগত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কখনো কমেডি চরিত্রে অভিনয় করেছেন?
আসাদুজ্জামান নূর: হ্যাঁ। বিদগ্ধ রমনীকূল-এ কমেডি চরিত্র ছিল। খাট্টা তামাশার চরিত্রটাও কমেডি মেশানো। আর টেলিভিশনে তো করেইছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: টেলিভিশন নাটকে আপনার শুরুটা হলো কীভাবে?
আসাদুজ্জামান নূর: আমি রামেন্দুদাকে বলে রেখেছিলাম আমি টেলিভিশনে অভিনয় করতে চাই। একটু মামুন ভাইয়ের সাথে আমার যোগাযোগটা করিয়ে দিন। তো মামুন ভাই একবার ডেকে পাঠালেন একটা ছোট্ট চরিত্রে, সেভেনটি ফোরে। খুব ছোট চরিত্র। দুই মিনিটের। নায়ক নায়িকা ছিলেন ফেরদৌসী মজুমদার আর এখন আমাদের যে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা আছেন গওহর রিজভী, তার ভাই হায়দার রিজভী। উনি তখন টেলিভিশনে চাকরি করেন। প্রডিউসার। খুবই ট্যালেন্টেড মানুষ। মানুষটা অনেক কিছু করতে পারত, কিন্তু কী কারণে যেন কিছু হয়নি। উনি পোল্যান্ডে ফিল্মের উপর পড়াশোনা করেছেন। যাইহোক, ওইটাই হলো শুরু। আব্দল্লাহ আল মামুনের লেখা। উনার পরিচালনা। রঙীন ফানুস বলে একটা নাটক।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কোথাও কেউ নেই এর বাকের ভাই তো বাংলাদেশের কিংবদন্তি চরিত্র। এবং আমার ধারণা, এরচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়তো কোনো নাটকের চরিত্র হয় নাই বাংলাদেশে। বাকের ভাই চরিত্রে অভিনয় করবেন এটা ঠিক হলো কীভাবে আসলে? বা হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাজ করা কীভাবে শুরু হলো?
আসাদুজ্জামান নূর: তার আগে তো এইসব দিনরাত্রি করেছি। বহুব্রীহি করেছি। অয়োময়ও করে ফেলেছি তখন। জমিদারের চরিত্র। তো একদিন হুমায়ূন ডেকে বললেন যে চিত্রনাট্য লিখছি একটা, সেখানে দুইটি চরিত্র আছে। একটা মাস্তানের। আরেকটি সুবর্ণার যে চরিত্র তার প্রেমিক। আমি বললাম যে,প্রেমিকের চরিত্রে করতে গেলে তো আমি যেভাবে কথা বলি, হাঁটাচলা করি এভাবে করলেই অভিনয় হয়ে যাবে। মাস্তানটা হয়তো একটু অন্য রকম চ্যালেঞ্জিং হবে। হুমায়ূন আমাকে এই সুযোগুলো দিয়েছে। আমি যেটা পছন্দ করেছি সেটাই করতে দিয়েছে। হুমায়ূনের আমার উপর একটা আস্থাও ছিল যে, আমাকে যা-ই দেবে আমি করতে পারব। তো আমি মাস্তানের চরিত্র যখন নিলাম, দু-একজন আমার যারা শুভাকাঙ্ক্ষী, তারা আমাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন যে, তুমি এটা ফেইল করবে। সেটা অবশ্য জমিদার চরিত্রের সময়ও আমাকে বলেছিলেন একজন— তুমি ফেইল করবে। তো করলাম। করার পরে যেটা হলো, সেটা তো ইতিহাস হয়ে গেল। আমি নিজেও কখনো ভাবিনি এটা হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যেদিন মিছিল বের হলো বলে আমরা শুনেছি বা পত্রপত্রিকায় সংবাদ বেরোল, সেদিন কি হুমায়ূনের কাছ থেকে কিছু শুনেছিলেন? প্রতিক্রিয়াটা কেমন ছিল? আপনার ইউনিটের যারা ছিলেন, তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? যেহেতু এটা ধারাবহিক। চলছিল নাটকটা।
আসাদুজ্জামান নূর: হুমায়ূনের উপর তো একটা চাপ ছিল ফাঁসি না দেয়ার। কিন্তু হুমায়ূন মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছিল, সে ওই জায়গা থেকে সরবে না। মত পরবির্তন করবে না। সেভাবেই হয়েছে নাটকটা। এবং হয়ে ভালোই হয়েছে। না হলে যে সিমপ্যাথিটা তৈরি হয়েছিল, এটা তৈরি হতো না। সেদিক থেকে আমার মনে হয় সিদ্ধান্তটা ঠিকই ছিল। ওই সময় আমরা একটা টিমের মতো কাজ করেছি। বিটিভিতে পরিবেশটাও ভালো ছিল। আমরা রিহার্সাল করতাম। নিজেরাই পয়সা দিয়ে চা নাস্তা নিয়ে আসতাম। অনেক সময় প্রডিউসার আমাদেরকে খাওয়াতেন। সব মিলিয়ে বেশ একটা আনন্দময় পরিবেশে আমরা নাটকগুলো করতাম। এখন তো বহু বছর টেলিভিশনে যাওয়া হয় না। গত ঈদে শুধু গেলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ। সেটাও বিশেষ ব্যাপার। প্রায় সতেরো বছর পর আপনি আর সুবর্ণা মোস্তফা একসাথে কাজ করলেন।
আসাদুজ্জামান নূর: খুব যে একটা ভালো নাটক হয়েছে তা আমি বলতে পারি না। কিন্তু মনে হলো যে করি। আমার এখনো মনে হয় বিটিভিতে ভালো নাটক করা সম্ভব। এত ভালো যন্ত্রপাতি আছে! নতুন যারা ট্যাকনিক্যাল পারসন আছেন, তাদের হয়তো আরো প্রশিক্ষণ দরকার। যারা প্রযোজক, তাদের আরেকটু প্রশিক্ষণ দরকার। এগুলো হলে বিটিভিতেও ভালো নাটক হওয়া সম্ভব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নূর ভাই, বাংলাদেশ টেলিভিশনের কথা আসল, আপনার নাটকের কথা আসল, আবৃত্তির কথা আসল, আপনি আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদে আপনার অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল? আবৃত্তি নিয়ে যেটা করতে চেয়েছিলেন সেটা কি করতে পেরেছিলেন?
আসাদুজ্জামান নূর: দায়িত্ব নিতে হয়েছিল যে কারণে, সেটা হলো, আমি তো এমনিতেই ওদের সাথে ছিলাম। নানানভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা। কিন্তু মাঝখানে, আমাদের দেশে যেটা হয় আর কি, কিছু সাংগঠনিক সমস্যা দেখা দিল, কে সভাপতি হবে, কে সাধারণ সম্পাদক হবে— তখন সবাই মিলে আমাকে বলল যে, আপনি সভাপতি হলে এই সমস্যাটা আর থাকে না। ওইভাবেই সভাপতি হওয়া আর কি। এখনো অমাকে ওইভাবেই রেখেছে। যদিও আমি সবাইকে বলি যে এখন অন্তত আমাকে ছেড়ে দাও, তোমরা তোমাদের কাজ করো, আমি থাকবোই তোমাদের সঙ্গে, কিন্তু ওরা আমাকে ছাড়ে না। এমনিতে আবৃত্তির ছেলেমেয়েদের সাথে মেলামেশা করতে আমার ভালোই লাগে। যাই-ও মাঝে মাঝে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি এখন সংস্কৃতি মন্ত্রী। আমাদের যে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আছে, এটার ভূমিকাকে আপনি আসলে কীভাবে দেখেন?
আসাদুজ্জামান নূর: এই জোটের জন্ম হয়েছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়। এবং গোড়া থেকেই একটি কথা ছিল, এটি সংস্কৃতি কর্মীদের একটা প্লাটফরম। যে প্লাটফরম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে থাকবে, অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করবে। বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরবে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে এর সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। সে রকমই চলছিল। ভালোই চলছিল। কিন্তু আমার মনে হয়, ইদানীংকালে এই কাজটি করতে গিয়ে অনেকের মনে হতে পারে যে 'আওয়ামী লীগের পক্ষে এই দলটি কাজ করছে'।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা পরিষ্কারভাবে অনেকের মনে হয়। অনেকে বলেনও বটে।
আসাদুজ্জামান নূর: বিষয় হলো যে, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গেলে, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলতে গেলে, বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলতে গেলে আওয়ামী লীগের কথা বলা হয়েই যায়। সেই অর্থে কেউ যদি মনে করেন যে, আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলছে, তাহলে কিছু করার নেই আসলে। তবে এটাও ঠিক, অনেক বিষয় আছে যেগুলো সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা উচিত, বড় করে প্রতিবাদ করা উচিত, এবং সেইখানে যদি আমাদের দলের কোনো ব্যর্থতা থাকে, সেটিরও সমালোচনা হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি যে পরিস্থিতিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলেন, এবং এখন পর্যন্ত কাজ করছেন পূর্ণ উদ্যমে, আমরা যারা সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক আছি, দেখছিও বিভিন্ন সময়ে, সেই চেষ্টাটা, আপনার নিরন্তর চেষ্টার কিছু কিছু প্রতিফলন; তো আপনি কী কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন?
আসাদুজ্জামান নূর: আমাদের কাজটা দুই ধরনের। একটা হলো ট্যানজিবল, অর্থাৎ যেটা চোখে দেখা যাচ্ছে। আরেকটা হলো ইনট্যানজিবল। যেটা চোখে দেখা যাচ্ছে না। আমার নিজের ধারণা, ট্যানজিবল কাজের থেকে ইনট্যানজিবল কাজটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইনট্যানজিবল কাজটা কোথায়? বর্তমান যে পরিস্থিতি, বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তারা যে একটা নেতিবাচক রাজনীতি করে যাচ্ছে বহুদিন ধরে, জ্বালাও- পোড়াও, মানুষ খুন করা, বোমাবাজি করা এবং সর্বশেষে যে জঙ্গিবাদ— এটার প্রেক্ষিতে আমি যেটা মনে করি সেটা হলো, আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনটাকে ঘরে ঘরে নিয়ে যাওয়া। এটার মানে এই নয় যে সবাই গান শিখবে, সবাই আবৃত্তি শিখবে, সবাই বড় লেখক হবে, অভিনেতা হবে। মূলত চর্চাটার ভেতরে নিয়ে যাওয়া। আমরা যারা গান শুনছি, তারাও কিন্তু একটা চর্চার ভেতর আছি। যারা গান গাইছে, তারা এক ধরনের চর্চা করছে আর যারা শুনছি তারা এক ধরনের চর্চা করছি। যিনি লিখছেন তিনি একটা ভূমিকা পালন করছেন, আমরা যারা পড়ছি, সংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা পালন করছি। এই চর্চাটাকে বাড়ানো। এই কাজটি আসলে অদৃশ্য। এইটি চোখে দেখা যায় না। এইটার গুরুত্বটা অনেকে অনুধাবন করেন না। অনেকে মনে করেন, অডিটোরিয়াম বানাও, জেলায় জেলায় শিল্পকলা একাডেমি বানাও, রিহার্সাল রুম করে দাও, এই করে দেন সেই করে দেন— নানান দাবি দাওয়া থাকে। আমার বক্তব্য হলো এগুলো তো নিশ্চয় হবে। এগুলো আমরা করছিও। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ব্যাপারে বড় বড় পদক্ষেপ নিতে বলেছেন, সেইসব ব্যাপারে আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন আমরা অপেরা হাউজ করছি। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আমরা করতে যাচ্ছি। প্রতিটি উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন, মুক্তমঞ্চ, পাবলিক লাইব্রেরি করতে যাচ্ছি। কাজও শুরু হয়ে গেছে। এখন এগারোটা উপজেলায় কাজ চলছে। তো এইগুলো তো হবেই। কিন্তু যে কাজটা আমি মনে করি এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো আমাদের একদম শৈশব থেকে শিশুদের সংস্কৃতি-মুখী করা। একটা বাচ্চা বড় হয়ে উঠবে, সে তার মতো করে একটা ছড়া পড়বে, কবিতা পড়বে, ছবি আঁকবে, খেলাধূলা করবে, গান গাওয়ার চেষ্টা করবে, না হলে গানের অনুষ্ঠানে যাবে। এই রকম একটা পরিবেশের মধ্যে দিয়ে তাদের বড় করে তোলা। এই কাজটির দিকে আমরা অনেকটাই মনোনিবেশ করার চেষ্টা করছি। এবং এটা নিয়ে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলেছি। প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলেছি। সেই ব্যাপারে কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী গ্রহণ করতে যাচ্ছি। আমি আজকে দেখলাম যে, মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী বলেছেন যে, শিক্ষকদের জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা রাখতে হবে। কিন্তু কীভাবে? আমরা একটা মানববন্ধন করলেই কি সবকিছু হয়ে যাবে? এটা তো একটা কন্টিনিউয়াস প্রসেস। একটা মোটিভেশনের প্রসেস। একজন শিক্ষককে যদি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করতে হয়, প্রথমে তাকে এই ব্যাপারে জানতে হবে। বুঝতে হবে এবং কী ধরনের কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে গেলে একটা শিশু জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, সেই প্রক্রিয়াটাও তাকে জানতে হবে। সেই প্রক্রিয়াটার মধ্যদিয়ে সেই বাচ্চাগুলোকে তাকে নিয়ে যেতে হবে। এটা কিন্তু অনেক বড় কাজ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বিশাল কাজ! সেই কাজটা করার মতো কি যথেষ্ট লোকবল আপনার আছে?
আসাদুজ্জামান নূর: লোকবল নেই। সেই চেতনাও নেই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেই চেতনা কাদের নেই বলছেন?
আসাদুজ্জামান নূর: আমি শিক্ষকদের কথাই বলছি। অধিকাংশ শিক্ষকের মধ্যে ওই চেতনাটা কাজ করে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু ধরেন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আাপনারা যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে কি সেই চেতনাটা যথেষ্ট পরিমাণে আছে?


ছবি: দুবাই অপেরার সামনে এর পরিচালক, সংস্কৃতিমন্ত্রী, আগা খান নেটওয়ার্কের বাংলাদেশের আবাসিক প্রধান মুনীর এম মেরালী ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎকা্রগ্রহিতা

আসাদুজ্জামান নূর: এখানে একটা সমস্যা আছে। সেটা হলো আমরা বলছি ঠিকই, কিন্তু এটার জন্য আমাদের কী করতে হবে সেটা বলছি না। সেই গাইড লাইনটা আমাদের দিতে হবে। সেই গাইড লাইনটা আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে আমরা মোটামুটি তৈরি করেছি। হয়তো আগামী বছর শুরু থেকেই আমরা শুরু করব। এখন বাচ্চারা সবাই পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এরপরেই আমরা ওই কাজগুলো শুরু করব। এবং এটি কিন্তু প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটা কন্টিনিউয়াস প্রোসেস হতে হবে। এটা এমন না যে, বছরে একদিন বা একটা সপ্তাহ পালন করলাম, করে কাজ শেষ হয়ে গেল। তা তো নয়। প্রতিদিন আমাকে পতাকা উত্তোলন করতে হবে। আমাকে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে হবে। আমাকে জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি একটি দেশাত্মবোধক গান জানতে হবে। আমাকে জানতে হবে রবীন্দ্রনাথকে, নজরুলকে, শামসুর রাহমানকে, জীবনানন্দ দাসকে। শুধু সংস্কৃতি কেন, বঙ্গবন্ধুকে আমাকে জানতে হবে না? যারা স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে তাদের কথা জানতে হবে না? আমাদের দেশের বড় বড় যারা পেইন্টার তাদের সম্পর্কে জানতে হবে না? যারা শিক্ষাবিদ, যারা বিজ্ঞানী, যারা খেলোয়াড়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখেছে এদের সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। এই জানার ভেতর দিয়েই কিন্তু সে নিজেকে তৈরি করবে। সে নিজেই এক সময় ঠিক করবে যে, আমি একজন বড় লেখক হতে চাই। আমি একজন বড় শিক্ষাবিদ হতে চাই। আমি একজন বড় অর্থনীতিবিদ হতে চাই। আমি একজন বড় খেলোয়াড় হতে চাই। বড় শিল্পী হতে চাই। এই যে গড়ে তোলার কাজটা,এটা সবচে' বেশি জরুরি। এই কাজটি করার জন্য শুধু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যথেষ্ট নয়। এখানে দুটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তাদের দরকার আছে। পাশাপাশি আমি মনে করি আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয়, তাদেরও এই ক্ষেত্রে বাজেট নিতে হবে। বাজেটটা বাড়িয়ে দিতে হবে। কারণ এই বাড়তি কাজগুলো করার জন্য বাড়তি কিছু লোক লাগবে। বাড়তি কিছু শ্রম দিতে হবে। সেটার জন্য কিছু খরচেরও ব্যাপারও আছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং সর্বশেষ বাজেট প্রকাশের পর আপনি গণমাধ্যমে বেশ উষ্মা প্রকাশ করেই বলেছিলেন যে মোট বাজেটের ০.০২% সংস্কৃতির জন্য দেয়া হয়েছে। আমরা জানি আমাদের অর্থমন্ত্রীও খুবই সংস্কৃতিমনা মানুষ।
আসাদুজ্জামান নূর: সরকার সামগ্রিকভাবেই বাজেটটা চিন্তা করে। তবে আমাদের আরেকটি পথ আছে। সেটি হলো প্রকল্পের মধ্যদিয়ে কিছু কাজ করা। সেটা আমরা শুরু করেছি। তবে প্রকল্পের মাধ্যমে যে কাজগুলো হয়, সেটা হতে একটু সময় লাগে। বাজেট থাকলে কাজগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে করা যায়। তো এটা নিয়ে আমি আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সাথে আমি একাধিকবার বসেছি। আমাদের সিলিং বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই বাজেটে হয়তো হলো না কিন্তু আগামী বাজেটে আমি আশা করছি যে সিলিংটা বাড়িয়ে দেয়া হবে। তাতে আমাদের কাজকর্ম অনেক সুবিধা হবে আগের তুলনায়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাংলাদেশে সংস্কৃতিকর্মী যারা আছেন, বুদ্ধিজীবী যারা আছেন, শিক্ষাবিদ যারা আছেন—আপনার কি মনে হয় তাদের সবাই সঠিক ভূমিকাটি পালন করছে?
আসাদুজ্জামান নূর: আসলে কী ভূমিকা পালন করা উচিত আমাদের এটা নিয়ে আমরা নিজেরাই নিশ্চিত না। একটা সমন্বিত কর্মসূচী দরকার। আমাকে জানতে হবে, ছোটবেলা থেকে একটি বাচ্চা বড় হয়ে উঠছে, প্রতিটি ক্লাশে সে কী ধরনের শিক্ষাগুলো পাবে। আমরা কিন্তু বাচ্চাদের নিয়ে নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্টের মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। এখন একটা পরীক্ষা চালু করছি, একবার এমসিকিউ, একবার ক্রিয়েটিভ, পাঠ্যসূচী পরিবর্তন ইত্যাদি নানা কিছু হচ্ছে। পাঠ্যসূচী বারবার পরিবর্তন হওয়ার তো কিছু নাই। একটা স্বাধীন দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একটি দল ক্ষমতায়, সেই সময়ে যে পাঠসূচী হবে, সেটির জন্য একটি কমিশন করে সুন্দর একটি পাঠ্যসূচী তো একবারেই হয়ে যেতে পারে। আমি যেটা বলতে চাইছি, লেখাপড়ার সঙ্গে সংস্কৃতি ব্যাপারটা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। দুটোকে আলাদা করা সম্ভব না। আমরা কী করতে পারি? আমাদের যে শিল্পকলা একাডেমি আছে, সেখানে যে প্রশিক্ষক আছে, তারা হয়তো স্কুল-কলেজে গিয়ে গান শেখাতে পারে। নাচ শেখাতে পারে। অভিনয় শেখাতে পারে। আবৃত্তি শেখাতে পারে। বই পড়া নিয়ে আমাদের পাবলিক লাইব্রেরিগুলো কাজ করতে পারে। কিন্তু সেই যাওয়ার মতো সুযোগটা আমাদের থাকতে হবে। সেখানে এট লিস্ট একজন শিক্ষক থাকতে হবে, যিনি ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দায়িত্বটি গ্রহণ করবেন যে, আপনারা এসে অমুক দিন গান শেখাবেন। একটা শৃঙ্খলার মধ্যদিয়ে যেতে গেলে কিন্তু আমার একটা ফোকাল পারসন দরকার। সেইসব প্রস্তাবই কিন্তু আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দিয়েছি। শিক্ষামন্ত্রী ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছেন। তারাও মনে করছেন যে আমাদের এইভাবেই একসঙ্গে কাজ করা উচিত। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এত রকম কাজকর্ম রয়েছে, এত রকম সমস্যার ভেতর দিয়ে তাদের কাজ করতে হচ্ছে— এই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়, ছাত্ররা এটা মানছে না বা একটা ধর্মঘট হয়ে যাচ্ছে, শিক্ষকরা সমস্যা করছেন, এমপিও নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে— নানান সমস্যা। তার মধ্যেও এই কাজগুলো আমরা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি কেমন সংস্কৃতি চর্চার বাংলাদেশ দেখতে চান? আপনি বললেন, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা, সংস্কৃতি-কর্মীরা জানেই না ঘটনা কী, তার কী করা উচিত তার ভূমিকা কী হওয়া উচিত।
আসাদুজ্জামান নূর: আমাদের সংস্কৃতিকেন্দ্রীক যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, তারা নিজেরা অনুষ্ঠান করছে ঠিকই এবং মনে করছেন, এই অনুষ্ঠান করার মধ্যদিয়ে আমরা একটি সামাজিক ভূমিকা পালন করছি। এটা ঠিক। তারা সামাজিক ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে তার চেয়েও একটু বাড়তি ভূমিকা পালন করতে হবে। যেমন একটা সময়ে এই দেশের শিল্পীরা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছে রাজনৈতিক দলের মতো রাস্তায় নেমে। এটা তো অন্য সময়ে দরকার পড়ে না। কিন্তু সেই সময়ে দরকার হয়েছিল। এখনো সেই রকম একটি প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। এখন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হবে শুধু নিজেদের মধ্যে চর্চাটা সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাওয়া। পাড়ায় পাড়ায় যাওয়া। গ্রামে গ্রামে যাওয়া। উপজেলায় উপজেলায় যাওয়া। গিয়ে এই চর্চাটা আরো বিস্তৃত করা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নূর ভাই, আমাদের দেশে অনুষ্ঠান অনেক বেড়েছে। যেমন ছায়ানট আগে বছরে দুইটা বড় অনুষ্ঠান করত। এখন দুইটা অনুষ্ঠান বাড়িয়েছে। হেমন্তে এবং ফাল্গুনে অনুষ্ঠান করে আলাদাভাবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেগুলা, বিশেষত সংষ্কৃতি নিয়ে যারা কাজ করে, যেমন বেঙ্গল সম্ভবত পৃথিবীর সবচে' বড় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উৎসবটা ঢাকায় নিয়মিত করছে। শিল্পকলা একাডেমি নিয়মিত কাজ করছে। একটা বড় বন্ধ্যাকাল গত সরকারের আমলে শিল্পকলা একাডেমি কাটিয়েছে। তারপরেও আমি বলব যে তারা অনেক অনেক কাজ করছে। এই যে বিভিন্ন রকম অনুষ্ঠান আয়োজন শিল্পীদের অংশগ্রহণের জায়গা, এগুলোও তো শিল্পীদেরকে মোটিভেট করে। তাদেরকে প্রেরণা দেয়। শিল্পীর কাজ তো শিল্প সৃজন। কিন্তু যেটা বললেন, বাড়ি বাড়ি বা স্কুলে স্কুলে যাবে, এটা তো তার রাজনৈতিক চেতনা না থাকলে তো সম্ভব না।
আসাদুজ্জামান নূর: আমি মনে করি, যারা সংস্কৃতির চর্চা করছেন এই দেশে, তারা সবাই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারন করেন। বাঙালি চেতনাকে প্রোমোট করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে কাজ করেন। তাদের রাজনৈতিক চেতনা নেই এটা আমি মনে করি না। তারা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট সচেতন। এখানে একটু বাড়তি উদ্যোগের প্রয়োজন আছে। এই পরিবর্তিত সময়ে, সময়ের প্রয়োজনে এই বাড়তি উদ্যোগটুকু নিতে হবে। অন্য সময় হয়তো এইভাবে উদ্যোগ না নিলেও হবে, যখন দেখা যাবে সরকারই এ ব্যপারে সমস্ত দায়িত্ব নিতে পেরেছে। এখন তো আমরা, সরকার, চাইলেও রাতারাতি এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারছি না। কারণ, অনেক রকমের প্রতিবন্ধকতা আছে। এটা শুধু যে পয়সা খরচ করলেই হবে, তা কিন্তু না। যেমন আমাদের অভিভাবক, আমাদের শিক্ষক, তাদের তো মোটিভেশনের প্রয়োজন আছে। আমাদের অভিভাবকরা মনে করছে পরীক্ষায় ভালো ফল করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। তারা বরং তাদের সন্তানদের গান গাইতে, কবিতা পড়তে, ছবি আঁকতে নিরুৎসাহিত করছেন অনেকেই। সবাই না। কিন্তু অনেকেই। তো অভিভাবকদের চিন্তাভাবনায়ও পরিবর্তন আসার দরকার। শিক্ষকদেরও চিন্তা ভাবনার জগতে পরিবর্তন আসা এবং সেই সঙ্গে তাদের দায়িত্বটুকু পালন করা, প্রয়োজনে একটু বাড়তি দায়িত্ব পালন করা, মানসিকতা সৃষ্টি করা— এগুলো কিন্তু খুবই ইমপরট্যান্ট। এগুলো চোখে দেখা যায় না। যেমন আমি যদি আমার স্কুল জীবনের কথা বলি, আমাদের স্কুল জীবনে আমরা এত রকম সংস্কৃতিচর্চা করেছি, স্কুলে নাটক করেছি, গান করেছি, আবৃত্তি করেছি, দেয়াল পত্রিকা বার করেছি, ডিবেট করেছি, ফুলের বাগান করেছি, খেলাধূলা করেছি— এর জন্য এত শিক্ষক সারাদিন আমাদের সঙ্গে থেকে অমাদেরকে উৎসাহিত করতেন, বা আমাদেরকে সংগঠিত করতেন, তার জন্য তো সরকারের কি থেকে তেমন কোনো নির্দেশক ছিল না বা তার জন্য তারা বাড়তি পয়সাও তারা পেতেন না। কিন্তু আমাদেরকে তাদের সন্তান হিসেবে গণ্য করতেন। এবং সন্তানের বিকাশের জন্য যা যা করার দরকার তারা তা-ই করতেন। এবং অধিকাংশ শিক্ষকের ক্ষেত্রে ওই ধরনের মানসিকতার অভাব রয়েছে। এটা অবশ্য অন্য ধরনের সমস্যা থেকেও হয়েছে। দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই যে অভিভাবক শিক্ষক এবং সার্বিকভাবে সমাজে সংস্কৃতি চর্চার যে প্রয়োজনীয়তাটা, সেটা যে অনেকেই অনুভব করছেন না, এই অনুভব না করার জায়গা থেকে অনুভব করার জায়গায় তাদেরকে নিয়ে আসা— এটাও কিন্তু একটা বড় কাজ। এগুলো করার জন্য কিন্তু সময় লাগবে। সরকার হয়তো এই জায়গাগুলোতে দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে যদি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এগিয়ে আসে তাহলে কিন্তু এই দায়িত্বগুলো পালন করা সরকারের পক্ষে অনেক সহজ হয়ে যাবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একদম ঠিক আছে। কিন্তু আপনি তো সরকারের মন্ত্রী, আপনি তো আসলে সরাসরি সরকার। এবং আপনি রাজপথে আন্দোলন করা মানুষ। আপনি সাংস্কৃতিক মানুষ গড়ার জন্য কবিতা পড়েছেন, নাটক করেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, স্লোগান দিয়েছেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আপনারা যখন ছিলেন, তখন যেই ভূমিকা পালন করত এখন কিন্তু সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সরকারের হয়ে সেই ভূমিকা পালন করছে।আপনার কি মনে হয় না যে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের চেয়ে সাংস্কৃতিক জোট বা সারা দেশে থাকা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলা যদি এই দায়িত্বটা নেয়, সেটা সরকারের জন্য অনেক সহজ সুবিধাজনক হবে? এবং সেটা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও যদি হয়,তবু?
আসাদুজ্জামান নূর: আমি সেই কথাটাই বলেছি। ইভেন আমি একটা নতুন নিয়ম করতে যাচ্ছি। যেসব প্রতিষ্ঠানকে আমরা প্রতি বছর ভাতা দিই, তাদেরকে কোনো না কোনো স্কুলের দায়িত্ব নিতে হবে। তা না হলে তাদেরকে আর ভাতা দেয়া হবে না। যদিও এটা কাউকে কাউকে বাধ্য করার মতো ব্যাপার, কিন্তু আমার কথা হলো আমাদেরকে বাধ্য করতে হবে কেন। আমরা এই কর্মসূচী ঘোষণা করার পরে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন এগিয়ে আসবে না। এগিয়ে যে আসছে না সেটা বলব না। কিন্তু খুব সীমিত সংখ্যক। অনেকেই স্কুলে স্কুলে গিয়ে কর্মসূচী পালন করছেন নিজেদের উদ্যোগেই বা আমরা বলার আগেই। কিন্তু আমার কথা যে, আরো ব্যাপকভাবে এটি ঘটা প্রয়োজন। তবে হবে। আমি আশা করছি, আমরা যদি আমাদের দিক থেকে কর্মসূচী ঘোষণা করে ঠিকমতো উদ্যোগটা গ্রহণ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকেই আমরা কমবেশি এই কাজের মধ্যে পাব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে তো আশা করাই যায়।
আসাদুজ্জামান নূর: নিশ্চয়। আমি আশা করছি যে জানুয়ারির পর থেকেই শুরু করতে পারব। ইতোমধ্যে শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে একশটা স্কুলে কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি আমরা জানুয়ারি থেকে ব্যাপকভাবে কর্মসূচী গ্রহণ করতে পারব। এবং সেই কর্মসূচীগুলোতে আমরা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করেই আমরা সেই কর্মসূচীকে পরিচালনা করব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নূর ভাই এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। আমরা জানি আপনি পাঠক হিসেবে দারুণ। কবিতা আপনার খুবই পছন্দ। আপনার প্রিয় কবি কারা? মঞ্চে তো আপনি বোধহয় সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা সবচেয়ে বেশি আবৃত্তি করেছেন।
আসাদুজ্জামান নূর: রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ, সমর সেন বিভিন্ন জনের কবিতা পড়েছি। তারমধ্যে হক ভাইয়ের কবিতা বেশি পড়া হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। তবে হক ভাইয়ের অন্যান্য কবিতাও আমি পড়েছি বিভিন্ন সময়ে। হক ভাই যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এইসব নিয়ে তার অসংখ্য কবিতা আছে। প্রসঙ্গত সেইগুলো বেশি পড়া হয়েছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি যাদের নাম বললেন, তারা প্রায় সবাই পঞ্চাশ এবং ষাটের কবি। তারপরে, অর্থাৎ সত্তর, আশি, নব্বই বা এই সময়ের কোনো কবি কি আপনার চোখে পড়েছে?
আসাদুজ্জামান নূর: কবি তো আছেই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কবি তো আছেই। কিন্তু তাদের কোনো কবিতা আপনার চোখে পড়েছে কি না? আপনি হয়তো আরজ ফিল করেছেন যে এইটা পড়া যায়।
আসাদুজ্জামান নূর: আনফরচুন্যাটলি খুব একটা পড়া হয় নাই। তবে সম্প্রতি একটি কবিতা আমি বিভিন্ন জায়গায় খুব পড়েছি, এখনো পড়ছি, সেটি হলো তারিক সুজাতের লেখা, হলি আর্টিজানের পরের ঘটনা নিয়ে। সেটি আমি বিভিন্ন জায়গায় পড়ছি। কবিতাটা লেখাও হয়েছে চমৎকার।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দুর্দান্ত কবিতা। কবিতার কথা গেল। আপনার প্রিয় ঔপন্যাসিক কারা, বাংলার সাহিত্যের বাইরে?
আসাদুজ্জামান নূর: আমি তো অত বেশি লেখাপড়া জানা লোক না। টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি, হেমিংওয়ে এক সময় খুব পড়তাম। ইদানীং যারা নতুন লিখছেন, নাইপল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যদিও নাইপলের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ আছে। অন্তত এশিয়ানদের। হুমায়ূন আহমেদের সব উপন্যাস কি আপনি পড়ছেন?
আসাদুজ্জামান নূর: মোটামুটি। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস তো একবসায়ই শেষ করে ফেলার মতো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বসলাম আর শেষ করে ফেললাম।
আসাদুজ্জামান নূর: তবে অনেকে হুমায়ূনের সাহিত্যের গভীরতা নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলে। কিন্তু আমি মনে করি যে, হুমায়ূনের প্রতিটি লেখার মধ্যেই তার একটি দর্শন কাজ করে। সেটি হিমু নিয়ে লেখা হোক, মিসির আলী হোক আর জোছনার ও জননীর গল্প হোক। হুমায়ূনের অনেক ভালো ভালো উপন্যাস আছে যেগুলো বিশ্বমানের। আমাদের দেশের সেলিনা হোসেন, হরিশংকর জলদাস, এরপর আরো আগের দিকে যদি যাই, যেমন রশীদ করিমের উপন্যাস পড়েছি। শওকত ওসমানের জননী, শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন, এরপর আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নম্বর তৈলচিত্র— এই বইটিও খুব ভালো লেগেছিল। রশীদ করিমের উত্তম পুরুষ চমৎকার একটি বই। হক ভাইয়ের বেশকিছু ভালো উপন্যাস আছে।


ছবি: বুর্জ আল খালিফার সামনে সফরসঙ্গীদের সঙ্গে সংস্কৃতিমন্ত্রী ও সাক্ষাৎকারগ্রহিতা

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বলতে বলতে তো মোটামুটি সবই বলে ফেললেন। অনেক পড়েছেন আপনি। টেলিভিশনে কে হতে চায় কোটিপতি আপনি উপস্থাপনা করেছিলেন। এখন বেলা অবেলা সারাবেলা নামে একটা দারুণ অনুষ্ঠান আপনি করেন। সেটা আসলে সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠান এবং আপনি বরেণ্য ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেন।
আসাদুজ্জামান নূর: এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াইশ জনের ইন্টারভিউ করেছি আমি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাংলাদেশে সম্ভবত কোনো সাংবাদিকও এত বেশি বড় মানুষের ইন্টারভিউ করেননি। হাহাহা।
আসাদুজ্জামান নূর: এর দুটো খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে গিয়ে সবার বক্তব্য শুনে আমি তো একটু হতভম্ব হয়ে গেলাম। তখন আমার মনে হলো, আমি তো একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ফেলেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তার আগে মনে হয় নাই? হাহাহা।
আসাদুজ্জামান নূর: তার আগে মনে হয় নাই। অনুষ্ঠানে সবাই বলছে যে, এটা সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। আমি তখন রসিকতা করে আমার বক্তব্যে বললাম, আমি তো আর লেখক হতে পারিনি, কোনো বইয়ে তো আমার নাম লেখক হিসেবে ছাপা হবে না, কিন্তু এই একটি বইয়ের উপরে আমার নাম ছাপা হয়েছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা অসাধারণ। এবং আমি ইন্টারভিউগুলো দেখেছি। খুবই গবেষণা করে দারুণভাবে সেটা করা। এবং আপনার প্রশ্ন করার ধরন বলেন, সেটাও অসাধারণ। নূর ভাই, আপনি যেসব বরেণ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, সবচেয়ে কমন কোন প্রশ্নটার সামনে আপনি উত্তরদাতাদেরকে বিমূঢ় হতে দেখেছেন? অশ্রুসজল হতে দেখেছেন?
আসাদুজ্জামান নূর: আমি কিন্তু কোনো নির্ধারিত প্রশ্ন করি না। দু-একটা থাকে। যেমন, কোথায় জন্ম, কবে জন্ম, লেখাপড়া কী ইত্যাদি। তারপর থেকে আমি কিন্তু আমন্ত্রিতদেরকে কথা বলতে দিই। কথা বলতে দিয়ে তাদের কথার সূত্র ধরেই কিন্তু আমি প্রশ্ন করি। যে প্রশ্নগুলো হয়তো আমার প্রশ্নের তালিকার ভেতরে নেই। অধিকাংশই থাকে না। কথার সূত্র ধরেই করি। তাতে করেই অনেকে অনেক সময় অনেক আবেগের কথা বলে। সেগুলো অনেককে স্পর্শও করেছে। সুতরাং ধরাবাঁধা প্রশ্ন আমার কয়েকটা মাত্র থাকে। জেনারেল প্রশ্ন। ওই কাঠামোর বাইরেও কিন্তু আমি অনেক প্রশ্ন করি। তাৎক্ষণিকভাবে কথার প্রসঙ্গে চলে আসে। সেই কথার প্রসঙ্গ ধরে আমার নতুন আরেকটি প্রশ্নে যাই। এর মাধ্যমে সম্ভবত আমরা অনেক নতুন নতুন তথ্য পেয়ে যাই ওই মানুষটি সম্পর্কে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই রকম একটা অনুষ্ঠানের আভাববোধ করতাম আমি। আপনাদের এই অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর আমি খুবই সন্তুষ্ট।
আসাদুজ্জামান নূর: অনেকেই অনুষ্ঠানটা দেখেন। অনেক বাড়িতে গেলে তারা বলেন যে, এই অনুষ্ঠানটা আমরা দেখি। এটা তো খুব একটা এন্টারটেইনিং প্রোগ্রাম না ওই অর্থে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান।
আসাদুজ্জামান নূর: বিনোদনমূলক নয়। তারপরেও এত মানুষ দেখেন। সেটা আমার খুব ভালো লেগেছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি দেশ টিভির পরিচালনা পর্ষদের সাথে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্ত। আমাদের দেশে অনেকগুলা টেলিভিশন। ঢাকায়ই ছাব্বিশ সাতাশটা টেলিভিশন।
আসাদুজ্জামান নূর: বিজয় টিভি কি এখনো চট্টগ্রাম থেকে?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না না। বিজয় টিভি ঢাকা থেকে। বাংলামোটরে সময় টেলিভিশনের অপজিটে ওদের অফিস। তো মোট বত্রিশটা চ্যানেল সরকার অনুমোদিত। আপনি যেহেতু একটা টেলিভিশনের সাথে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন, আপনি জানেন টেলিভিশনের অবস্থা। আমাদের দেশের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আপনি কী বলবেন? আপনি এই অঙ্গনের সাথে যুক্ত চল্লিশ বছরেরও বেশি সময়।
আসাদুজ্জামান নূর: আমি হতবাক। হাহাহা। আমি সেদিন এটা বলেছি। আমি হতবাক। কারণ, আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মধ্যে, আমার ধারণা, গোটা তিন চারেক টেলিভিশন মোটামুটি লাভজনক অবস্থায় আছে। তিন-চারটা না হলেও পাঁচ-ছয়টা হবে। এর বেশি কোনো অবস্থাতেই না। বাকি সবগুলো লসের ভেতর আছে। তাহলে যারা মালিক, দীর্ঘদিন ধরে এই টেলিভিশনগুলো চালাচ্ছেন, প্রতি মাসে ভর্তুকি দিয়ে, এটা কেন করছেন আমি জানি না। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে অন্য কোথাও নিশ্চয় লাভ হচ্ছে। যেটা আমরা সাধারণ মানুষ জানি না। হয়তো কারো আত্মশ্লাঘার ব্যাপার আছে— আমি একটা টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক। আমি যেটাকে বলি ইগো মাসাজ। ইগো মাসাজ না হলে অন্য কোথাও কোনো লাভ হচ্ছে। নয়তো আমি বুঝতে পারি না কোনো ব্যবসায়ী কেন একটি ব্যবসা দিনের পর দিন লস দিয়ে চালাবেন। অন্য কোনো ব্যবসার ক্ষেত্রে কি এটা হতো?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হতো না।
আসাদুজ্জামান নূর: তাহলে এই ক্ষেত্রে কেন এটা হচ্ছে? আমার ভেতর এই প্রশ্নটা কাজ করে। এর উত্তর আমার জানা নেই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নিশ্চয় অন্য কোনো সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় টেলিভিশন থাকলে। কর কম দেয়ার সুবিধা পাওয়া যায় হয়তো।
আসাদুজ্জামান নূর: বা মানুষেরা ভয় করে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানুষ ভয় পায়। সেই ব্যাপারগুলো নিশ্চয় আছে। আচ্ছা, আপনি কি গান শোনেন?
আসাদুজ্জামান নূর: গান আমি শুনতে খুব পছন্দ করি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: গাইতেও?
আসাদুজ্জামান নূর: না। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে আমাদের দুইজনের গান গাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। আলী যাকের আমাদের ডিরেকশন দিতেন। উনি আমার এবং আতাউর রহমানের গান নিষেধ করে দিয়েছিলেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হাহাহাহা।
আসাদুজ্জামান নূর: মঞ্চে যেন আমরা কখনো গান গাওয়ার চেষ্টা না করি। সুতরাং গান আমার দ্বারা হয় না। ওয়াহিদুল হকের মতো প্রখ্যাত একজন সঙ্গীতজ্ঞ এবং সঙ্গীত গুরু, তিনিও আমায় গান শেখাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু আমি গান প্রচুর শুনি। আমার দিনটা শুরুই হয় সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে গান শোনা দিয়ে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শোনেন?
আসাদুজ্জামান নূর: উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনি। তবে রবীন্দ্রসঙ্গীত বেশি শুনি। পুরনো দিনের আধুনিক গান শুনি। নজরুলের গান শুনি। যেগুলো সত্যিকার অর্থে লোকগীতি, সেগুলো শুনি। নানান ধরনের গান শুনি। আমার গান শোনার ব্যাপারে কোনো ক্লান্তি নেই। আমি ইংরেজি গানও শুনি। আমি স্প্যানিশ গানও শুনি। আমি স্প্যানিশ ভাষা বুঝি না কিন্তু সুরটা আমার ভালো লাগে। গান শোনার ব্যাপারে আমার প্রচুর আগ্রহ। তবে এটা ঠিক যে, রবীন্দ্রসঙ্গীত বেশি শুনি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার প্রিয় শিল্পীদের তালিকায় কারা আছেন?
আসাদুজ্জামান নূর: অনেক। রবীন্দ্রনাথের গানের যদি একজন শিল্পীর কথা বলতে হয়, তাহলে আমি দেবব্রত বিশ্বাসের কথা বলি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দুইজন বলতে হলে?
আসাদুজ্জামান নূর: দুইজন বলা যাবে না। তাহলে পাঁচজন বলতে হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হাহাহা। পাঁচজনই বলেন।
আসাদুজ্জামান নূর: একজনই থাকুক।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: রবীন্দ্রনাথ গেল। লোকগীতিতে আব্বাস উদ্দীন, আব্দুল আলীমের বাইরে কেউ আছে?
আসাদুজ্জামান নূর: ওনারা তো লিজেন্ডস । উনাদের যেটা হয়েছে, আব্বাস উদ্দীন আব্দুল আলীমের ওই সময়ের গানের যে রেকোর্ডিং কোয়ালিটি, এইটার ফলে কিন্তু ওঁদের গানের আসল জায়গাটা কিন্তু এখন পাওয়া যায় না। যেহেতু আমি আব্দুল আলীম সরাসরি শুনেছি, ফলে আমি জানি উনার গানের গলার কোয়ালিটি কী ছিল। ওই গলার কোয়ালিটি এখন দুর্লভ। এবং আব্দুল আলীমের গান যারা সামনাসামনি শুনেছেন, দেখলে মনে হবে, উনি যে গান গাইছেন, চেহারার মধ্যে কোনো অভিব্যক্তি নেই। নির্বিকার মুখ একটা বানিয়ে গান গেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু গলা কোথায় উঠে যাচ্ছে আর কোথায় নামছে— এটা একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিল। আব্বাস উদ্দীন সাহেবের ক্ষেত্রেও একই জিনিস। উনি তো একেবারে প্রণম্য একজন ব্যক্তি। এখনকার দিনে যারা গান গায়, লালনের গান যারা করেন, মুশকিলটা হলো লালন এখন শহরে এসে স্থান গ্রহণ করেছেন। বসবাস করতে শুরু করেছেন। গ্রাম থেকে উঠে মানুষটি যখন টেলিভিশনে গান গাইতে শুরু করলেন, তারপরে তার নানা রকম বাদ্যযন্ত্র যুক্ত হতে শুরু করল, এবং সেখানে আস্তে আস্তে দেখা গেল ঢোল বাদ, খোল বাদ, একতারা দোতারা বাদ, সেখানে ঢুকে যাচ্ছে কি বোর্ড, সেখানে ঢুকে যাচ্ছে ড্রাম, সেখানে ঢুকে যাচ্ছে বিদেশী বাদ্যযন্ত্র; তখন কিন্তু আর গানটা ওই জায়গায় থাকছে না। এটা একটা সমস্যা হয়ে যাচ্ছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তার মানে এই যে নানা ধরনের ফিউশন হচ্ছে, আপনি এইগুলোর বিরুদ্ধে? নিরীক্ষা করতে দেবেন না আপনি?
আসাদুজ্জামান নূর: নিরীক্ষা নিরীক্ষার জায়গায় থাকুক। অসুবিধা নাই। ইয়ংগার জেনারেশন ফিউশন নিয়ে নানা রকম গবেষণা করছে, মাতামাতি করছে করুক না!আমি তো সেই জায়যগাটা মানা করি না। কিন্তু ক্ল্যাসিক্যাল গানের ক্ষেত্রেও তো সেই জিনিসটা ঘটেছে। তাই বলে কি ক্ল্যাসিক্যালটাকে আমরা বাদ দিয়ে দিয়েছি?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দিইনি।
আসাদুজ্জামান নূর: তাহলে আমার লোকগীতিকে সেই জায়গাটায় ধরে রাখার চেষ্টা করছি না কেন!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি যেহেতু আব্দুল আলীমের গান শুনেছেন বা আব্বাস উদ্দীনের গান হয়তো শুনেছেন, সেই রেকোর্ডিংগুলো সরকারিভাবে পুনরুদ্ধারের কি কোনো উপায় আছে? কোনো উদ্যোগ কি আছে?
আসাদুজ্জামান নূর: এখন যে টেকনোলজি হয়েছে, তাতে কিন্তু সম্ভব গানকে ঘষামাজা করে আরো পরিশীলিত করা, এটা সম্ভব। গানগুলো তো আছে মূলত রেডিও এবং টেলিভিশনের কাছে। রেডিওর কাছেই সম্ভবত বেশি আছে। তবে একাত্তরের পরে অনেক কিছুই খুঁজে পাওয়া য়ায় না। আমাদের অনেক গান কিন্তু পাকিস্তানের কাছে, ওদের টেলিভিশনে আছে। ওদের রেডিওতে আছে। সেগুলো যদি কোনোভাবে সংগ্রহ করা যেত তাহলে একটা বড় কাজ হতো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা সংগ্রহের জন্য উদ্যোগটা কীভাবে নেয়া যেতে পারে? এখন তো আর সম্পর্কটা যুদ্ধাবস্থায় নাই।
আসাদুজ্জামান নূর: তথ্য মন্ত্রণালয় ইচ্ছা করলেই পারে। না পারার কোনো কারণ নেই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নূর ভাই,আমরা টেলিভিশনের আলাপে ছিলাম। টেলিভিশনে মানসম্মত অনুষ্ঠান হচ্ছে না। আপনি বললেন, টেলিভিশনগুলা দিনের পর দি লস করছে। তাও তারা টিকে আছে।
আসাদুজ্জামান নূর: এটাকে টিকে থাকা বলা যায় কি না আমি জানি না। আর অনুষ্ঠানের মান খারাপ হতে বাধ্য এই কারণে, সব টেলিভিশ চ্যানেল চেষ্টা করছে খরচ কমাতে। তো খরচ কমাতে চেষ্টা করলে আপনি অনুষ্ঠানের মান বাড়াবেন কী করে? শিল্পীদের তো পয়সা দিতে হবে। সেই রকম ভালো নাটক বানাতে গেলে সেই রকম পয়সাও দিতে হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নির্মাতাকে পয়সা দিতে হবে।
আসাদুজ্জামান নূর: শিল্পীদের পয়সা দিতে হবে। যিনি লিখবেন তাকে ভালো পয়সা দিতে হবে। এখন কথা হলো, আপনি কম পয়সা দিচ্ছেন, একজন নাট্যকার বেঁচে থাকার জন্য মাসে দশটা নাটক লিখছে, এটা তো সম্ভব না। সৃজনশীল কাজ তো কারখানার কাজ না। শুধু প্রোডাকশন বাড়াতে থাকলাম। ফলে যে দশটি নাটক লিখছে সে ভালো নাটক লিখতে পারছে না। কিন্তু তাকে যদি মাসে দুটো নাটক লিখতে হতো এবং সেই পরিমাণ সে পয়সা পেত, তাহলে অবশ্যই সে ভালো মানের নাটক উপহার দিতে পারত। আর নাটকটি যদি ভালো লেখা না হয়, তাহলে অভিনয় শিল্পী যারা আছেন, তাদের পক্ষে ভালো অভিনয় করা সম্ভব না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি সংস্কৃতি মন্ত্রী। আমাদের দেশে বলা হয় সবচেয়ে অবহেলিত মানুষরা হলো শিল্পী-সাহিত্যিক-কবি এবং সাংস্কৃতিক কর্মী। আমরা এটা দেখি, আমরা নিউজ করি, অমুক অভিনেত্রী বস্তিতে থাকতেছে বা এই রকম কায়ক্লেশে দিনযাপন করছে। যখন এই সংবাদগুলো আসে, তখন কিন্তু আজকের দিনে যে ছেলেটা বা মেয়েটা বড় হচ্ছে, সে কখনো চিন্তা করবে না আমি একজন সংস্কৃতি কর্মী হব। বা আমি একজন অভিনেতা হব। বা আমি একজন শিল্পী হব। শিল্পীদের রিকোগনেশন তো বাড়ানো উচিত।
আসাদুজ্জামান নূর: শিল্পীদের এই ঘটনা এটা নতুন কিছু নয়। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী। অনেক বিখ্যাত শিল্পী, এক সময় হয়তো সে না খেয়ে ছিল। কষ্টেসৃষ্টে দিন কেটেছে। এখন উন্নত দেশগুলোতে হয়তো চিত্রটা পাল্টে গেছে; কিন্তু আমরা যেহেতু এখনো ওই রকম একটি জায়গায় পৌঁছতে পারি নাই, আমরা সামনের দিকেই যাচ্ছি। এখন শিল্প-সংস্কৃতির উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবিকা অর্জন করছে, এ রকম মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে আগের তুলনায়। অনেক শিল্পী আছে যারা ধনী। চলচ্চিত্রে বলি, গানে বলি— তারা এইটে করেই ভালোভাবে জীবিক নির্বাহ করছেন। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে না। সবার ক্ষেত্রে এটি হবেও না। কারণ, যারা প্রতিভাধর শিল্পী বা জনপ্রিয়তা অর্জন করবেন, তারা এক ধরনের অর্থ উপার্জন করবেন আর যারা ওই জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারবেন না, তারা ওইভাবে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হবেন না। এটা বাস্তবতা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সরকার বা আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনে যারা নেতৃত্ব দেবেন তাদের তো কিছু চয়েস থাকবে রুচি থাকবে, যে, আমার জাতীয়তাবোধ, আমার দেশের জিনিস এগুলোর প্রতি আমি বেশি মনোযোগ দিব।
আসাদুজ্জামান নূর: সেটা ঠিক আছে। বিষয় হলো যে আমাদের দেশের যারা গুণী শিল্পী, এখন ধরুন একজন রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী, তিনি হয়তো একজন আধুনিক শিল্পীর মতো অত অর্থ উপার্জন করবেন না। এটা বাস্তবিক। এবং সেই রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী যদি জীবিকা নির্বাহের জন্য সরকারি সাহায্যের প্রত্যাশা করেন, সেটা অন্যায় কিছু নয়। কিন্তু সেই দিক থেকে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা চাইলেও অত অর্থ ব্যয় করতে পারছি না। আমরা কিন্তু প্রতি বছর বেশ কিছু শিল্পীকে ভাতা দিয়ে থাকি। নিয়মিত ভাতা। কিন্তু সেই ভাতার অংকটা খুব কম। যেমন ধরুন মাসে হয়তো সাড়ে তিন হাজার টাকা এখন দিতে পারি। কিন্তু পাশাপাশি আমরা যেটা করি, কেউ যদি খুব বেশি সমস্যায় পড়েন, দুর্ভোগে পড়েন, তাহলে দুটি উপায় হয়। একটি হলো, আমরা আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে এককালীন সাহায্য দিতে পারি, মোটামুটি সম্মানজনক অর্থই দিয়ে থাকি। আরেকটি আমাদের প্রধানমন্ত্রী, উনি নিজেও কিন্তু অনেক শিল্পীকে সাহায্য করেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ। সর্বশেষ কবি হেলাল হাফিজের চোখের দায়িত্ব নিলেন।
আসাদুজ্জামান নূর: অনেক সময় উনি নিজেই সংবাদ পেয়ে উদ্যোগী হয়ে ডেকে এনে সাহায্য করেন। আবার অনেকে আমাদের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন করেন। আমরা সেই আবেদন তার কাছে পৌঁছে দিলে তিনি সেখানেও পর্যাপ্ত সাহায্য করেন। দশ লক্ষ, কুড়ি লক্ষ টাকাও আপা নানা শিল্পীর জন্য আমাকে দিয়েছেন। আবার অনেককে ব্যাংক একাউন্ট করে দিয়েছেন, সেই ব্যাংক একাউন্ট থেকে সে নিয়মিত টাকা পাচ্ছে। নানানভাবে করা হয়েছে। তবে যেটি আমরা চিন্তাভাবনা করছি, নাটকের ক্ষেত্রেই মূলত ভাবনাটি এসেছে, কিছু শিল্পীকে মাসোহারা দেয়া।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মঞ্চের ক্ষেত্রে?
আসাদুজ্জামান নূর: মঞ্চের ক্ষেত্রে। দশটি দল হয়তো বেছে নিলাম, সেই দশটি দলের পাঁচ পাঁচ পঞ্চাশজনকে মাসোহারা দেয়া— যাতে তারা নির্বিঘ্নে নাটকটি করতে পারে। সে রকম একটি চিন্তাভাবনা আমরা করছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই ব্যাপারটা, বাংলাদেশ টেলিভিশনে যেমন শিল্পীদের গ্রেডিং আছে, এ বি গ্রেডিং আছে, এই ব্যাপারটা কি সব সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে করা যায়? যেমন ধরেন, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, তারা এ গ্রেডে থাকল, তারা সরকার থেকে এক ধরনের সহযোগিতা পেলেন,সম্মানের অর্থে,সরকার যাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে,সমাজ যাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে,তারা সেই তালিকাভূক্ত হলেন,সেখানে গ্রেডিং থাকল।
আসাদুজ্জামান নূর: এই জায়গাটা একটু জটিল। রুনা লায়লা সাবিনা ইয়াসমিন হয়তো…
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাদের এই গ্রেডিং হয়তো দরকারই নেই।
আসাদুজ্জামান নূর: তারা সরকারের মুখাপেক্ষী নন। তারা নিজেরাই যথেষ্ট আয় করেন। ফলে সরকারের দিক থেকে তাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয় না। আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে যেটা ভাবা যেতে পারে, বা আমরা যেটা অনেক সময় করছিও, সেটা হলো গুণী শিল্পী যদি জীবনের এক পর্যায়ে গিয়ে চলতে পারছেন না বা একজন ওস্তাদ তিনি গান শিখিয়ে যাচ্ছেন ছাত্রছাত্রীদের, বহু বছর ধরে, কিন্তু তার জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে; এই ধরনের একটি সমন্বিত তালিকা তৈরি করে তাদের নিয়মিত সাহায্য দেয়া যায় কি না। আমরা যেটা দিচ্ছি, সাড়ে তিন হাজার টাকা, সেটা খুবই কম, আমরা অবশ্য এক বছরেরটা একবারে দিয়ে দিই, তাতে করে হয়তো চল্লিশ বিয়াল্লিশ হাজার টাকা পান, সেটি দিয়ে হয়তো কিছু উপকার তার হয়। এর পাশাপাশি আমরা কিন্তু এককালীন সাহায্য দিয়েও কাজ করছি। আসলে গুণী শিল্পীর তালিকাটি সঠিকভাবে, স্বচ্ছভাবে করাটা বেশি জরুরি। কারণ, এই কাজে হাত গিয়ে গিয়ে আমরা দেখেছি, তালিকায় এমন অনেক নাম আছে, যাদের এটা পাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, বা পাওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই। এই সমস্যাটাও সেখানে আছে। আমরা অবশ্য নতুন করে তালিকা তৈরি করছি। শর্তারোপ করছি নানানভাবে, যাতে করে সত্যিকারার্থে একজন গুণী শিল্পী এবং যার প্রয়োজন আছে, তেমন শিল্পীদের আমরা যেন সাহায্যটা দিতে পারি। আর সরকারিভাবে মাসিক ভাতাটা আরেকটু বাড়ানোর চেষ্টা করছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক চুক্তির বিনিময় ক্ষেত্রে আমি বলব যে দারুণ ভূমিকা পালন করছে।
আসাদুজ্জামান নূর: চুক্তিগুলার ক্ষেত্রে আমার নিজের পর্যবেক্ষণ হলো, অধিকাংশ চুক্তির ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে কোনো ফলোআপ করা হয় না। তো আমরা সেই ফলোআপের কাজগুলো শুরু করেছি। যেমন আমরা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করলাম অথচ তার সঙ্গে আমার কোনো বিনিময়ই হয়নি। এমন অনেকগুলো দেশ আছে। সেই দেশ থেকেও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি, এবং আমরাও যেহেতু সব সময় একটু পয়সাকড়ির চাপে থাকি, তো ঠিক আছে বিদেশ যখন চায়নি তো আমরা কেন পাঠাই, যেহেতু পয়সা কম, যেখানে চায় সেখানে পাঠাই— এরকম হচ্ছে জিনিসটা আর কি। তো আগের তুলনায় কিন্তু আমাদের বিনিময় বেড়েছে। আর আমরা কিছু নতুন নতুন দেশের সাথে চুক্তি করার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে যেসব দেশ যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করছে আমাদের সাথে। এ ছাড়া যাদের চুক্তি আছে সেগুলো নবায়ন হচ্ছে নতুন করে। আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিনিময় চলছে। যেমন রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের বিনিময়টা চমৎকার। চীনের সঙ্গে ভালো। ভারতে সঙ্গে ভালো। এবং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, আমাদের যে দূতাবাস আছে তাদের পক্ষ থেকে কিছু কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই উদ্যোগে আমাদের দিক থেকে যতটা সহায়তা করা সম্ভব, আমরা করি। যেমন আমরা সম্প্রতি পরপর দুইবার থাইল্যান্ডে পাঠিয়েছি। নেদারল্যান্ডে পাঠিয়েছি। স্পেনে পাঠিয়েছি। ফ্রান্সে পাঠিয়েছি। ইউকে-তেও পাঠিয়েছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এইগুলো তো যে শিল্পীদের আপনারা সাহায্য করতে চান তাদের জন্য একটা রিকগনিশন।
আসাদুজ্জামান নূর:তা তো বটেই। এখানে একটা ঝামেলা হয়। অনেক শিল্পী আছেন, যারা হয়তো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু যখন বিদেশে পাঠাই তখন তো একটা মানের ব্যাপার ভাবতে হয়। তো সেই মানের বিচারে তারা অনেক সময় একটু পিছিয়ে যান। তখন তাদের আবার একটা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আমরা আন্দোলনে সংগ্রামে থাকি অথচ আমাদের বিদেশে পাঠানো হয় না। এটিও একটি এক ধরনের সমস্যা। এটিও ঠিক, তারা যেমন একদিকে অবদান রাখছেন, তারা একটি স্বীকৃতি চান, চাওয়াটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু আবার আমাদের এটাও ভাবতে হয়, বিদেশে একটা দল পাঠাব, সেখানে যদি দেশের সবচেয়ে ভালো শিল্পীরা না যায়, তাহলে দেশের ভাবমূর্তিটা ঠিক থাকে না। সবদিক বিবেচনা করে কিছু কিছু সমস্যা হয়। তবে আমরা চেষ্টা করি, শুধু ঢাকা না, ঢাকার বাইরে থেকেও শিল্পীদের নিয়ে এসে বাইরে পাঠানো। যেমন আমাদের লোকগীতি শিল্পী অনেকেই তারা ঢাকার বাইরে থাকেন। তাদেরকে আমরা পাঠিয়েছি।

শ্রুতিলিপি: সাব্বির জাদিদ