Published : 14 Aug 2025, 11:18 AM
দুই রকম সমাজের কথা বার বার বলা হচ্ছে ভারতবর্ষীয় বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে। এক রকম সমাজ হচ্ছে ঋত-যুক্ত। অপর সমাজ ঋত-বিহীন। বলাবাহুল্য ঋত-যুক্ত সমাজ এখন আর নেই। কিন্তু প্রাচীন যুগে বৈদিক কবিদেরই আহাজারি করতে শোনা যাচ্ছে ঋত হারিয়ে যাওয়ায়, কাতর হতে দেখা যাচ্ছে সমাজে ঋত ফিরিয়ে আনার কামনায়। ঋগ্বেদে দেখা যাচ্ছে কুৎস নামের একজন কবি তাঁর কবিতায় হাহাকার করছেন ‘অতীতের সেই ঋত কোথায় গমন করেছে’ বলে। তিনি কামনা করছেন, এবং প্রার্থনা করছেন এই বলে--দুঃখ-নিবারক অন্নদানকারী বরুণকে আমি বলছি; আমি এ কথা দৃঢ় হৃদয়ে বলছি--নতুন করে ঋত-র জন্ম হউক!’
ঋত-কে ফিরিয়ে আনার জন্য কেন এই আকুল উৎকণ্ঠা? ঋত ঠিক কোন ধরনের অমূল্য সম্পদ? ঋত-কে ফিরে পেতে মানুষ ও তৎকালীন গণমানুষের কবিদের এই আকুলতার কারণ কী?
বৈদিক সাহিত্যের কিছু সূক্ত জানাচ্ছে, ঋত ফিরে পাওয়ার জন্য এই আকুলতার কারণ ঋত মানুষকে অন্ন, গোধন ও জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগান নিশ্চিত করে। ঋতই সবকিছুর পরিচালক। ঋত যতদিন বর্তমান ছিল ততদিন সমাজ কেমন ছিল তা ঋতকে হারানোর পরে ঋষিগণ মানুষকে আশীর্বাদ করছেন যে শ্লোকের ভাষায়, তা থেকে বোঝা যায়। একটি নয়, তিন-তিনটি আশীর্বচন পাওয়া যাচ্ছে ঋগ্বেদের সর্বশেষ সুক্তে--
‘তোমরা একত্র মিলিত হও, এককণ্ঠে ঘোষণা করো, একত্র মন বিনিময় করো; যেরূপ অতীতে দেবতাগণ সচেতনভাবে একত্র বসিয়া তাঁহাদের ভাগ গ্রহণ করিতেন।’
‘মন্ত্র সমান হউক, সমিতি সমান হউক, মন সমান হউক, বিচার একরূপ হউক। তোমাদের সহিত একই মন্ত্রে আমি মন্ত্রণা করি, তোমাদের সহিত একই হবি দ্বারা আমি হোম করি।’
‘তোমাদের প্রচেষ্টা সমান হউক, হৃদয়গুলি এক হউক, মন এক হউক-- যাহাতে তোমাদের ঐক্য স্থাপিত হয়।’
এখন প্রশ্ন ওঠে দেবতা কারা? বিশ্বকোষকারের মতে “এখন দেবতা বলিলে আমরা যেমন স্বর্গবাসী অমরবৃন্দকে বুঝিয়া থাকি, ঋগ্বেদের ঋষিগণ ঠিক ঐরূপ ভাবিতেন কিনা তৎপক্ষে ঘোর সন্দেহ।...কাত্যায়ন ঋষি ঋকসংহিতার উপক্রমণিকায় লিখিয়াছেন--যাহার কথা সেই ঋষি। যাহার বিষয় তৎকর্তৃক বলা হইয়া থাকে তাহা দেবতা। সেই (ঋষি)বাক্যের প্রতিপাদ্য যে বস্তু তাহাই দেবতা।”
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে আমাদের এই দেবতারা জলজ্যান্ত মানুষ।
ঋত যতদিন ছিল ততদিন মানুষে-দেবতায়(বিশেষ মানুষে) কোনো ভেদাভেদ ছিল না। তাই তো ঋতকে ফিরে পাওয়ার জন্য মানুষের আকুল আকাঙ্ক্ষা।
তাহলে ঋত ঠিক কী জিনিস?
বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত ভিন্টারনিৎসের মতে ঋত হচেছ ‘অর্ডার অফ দি ইউনিভার্স’। ম্যাকডোনেলের মতে ‘ফিজিক্যাল এন্ড মোরাল অর্ডার’। দার্শনিক রাধাকৃষ্ণণ ঋত-কে বলছেন ‘দি কোর্স অফ থিংস’।
কিন্তু তিনজনের ধারণাকেই অপূর্ণাঙ্গ মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ঋত প্রসঙ্গে যেটি সর্বাগ্রে লক্ষণীয় তা হচ্ছে বৈদিক কবিরা ঋত-এর অবলুপ্তির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, এবং সেই ঋতের শাসন যাতে আবার ফিরে আসে তার জন্য আকুলভাবে প্রার্থনা করছেন। ঋত যদি নিছকই নিয়মশাসিত প্রকৃতির প্রতীক হয়ে থাকে, তাহলে তা অবলুপ্তই বা হবে কেন, তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রার্থনাই বা করতে হবে কেন?
এক্ষত্রে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা বিশেষ মনোযোগ দাবি করতে পারে। তিনি বলছেন, ঋত হচ্ছে আদিম শ্রেণীহীন সমাজের ন্যায়নীতির অনুশীলন। ঋগ্বেদে বার বার এসেছে বরুণ ও ইন্দ্রের কথা। বলা হয়েছে বরুণ নিজে ছিলেন ঋত-এর রক্ষাকর্তা, আর ইন্দ্র ঠিক তার বিপরীত, অর্থাৎ ঋত-ধ্বংসকারী। একমাত্র শ্রেণীহীন অবিভক্ত সমাজের পটভূমিতেই বরুণকে ব্যাখ্যা করা যায় যিনি ছিলেন ঋতের রক্ষক, সামাজিক ন্যায়নীতির অনুশাসনগুলিকে যিনি কার্যকর করেন, যাঁর চরিত্রের কঠোরতা শুধুমাত্র সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠার খাতিরেই। সবচাইতে বড় কথা বরুণ নিজেও ছিলেন ঋত-র অধীন।
এরপরেই এলেন ইন্দ্র। প্রাচীন কালের বরুণ আর পরবর্তীকালের ইন্দ্র দেবতার প্রাধান্যের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে সমাজের সুস্পষ্ট বিবর্তনের চিহ্ন। বরুণকে সরিয়ে ইন্দ্র কখন প্রধান হলেন? দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন--‘কালক্রমে বিশেষত যুদ্ধ ও লুণ্ঠনমূলক কীর্তির প্রাধান্যের ফলে সেই আদিম সাম্য সংগঠন ধূলিস্মাৎ হয় এবং তারই ধ্বংসস্তূপের উপর আবির্ভূত হয় ব্রাহ্মণ-সমর্থিত ক্ষাত্র-শাসিত সুস্পষ্ট শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। বৈদিক কবিদের কল্পনায় দেবতা-জগতের এই বিপর্যয়ের মধ্যে এক গভীর সমাজ-জীবন প্রতিফলিত হয়েছে এবং তার মূল কথা হলো, প্রাচীন যৌথ জীবনের ধ্বংসস্তূপের উপর সুস্পষ্ট শ্রেণীসমাজের আবির্ভাব।’ (ভারতীয় দর্শন ১ম খণ্ড)।
ইন্দ্রের অধীনে এসে সাম্য বিলুপ্ত। কারণ ইন্দ্র নিজেই বৈষম্যের ধারক ও বাহক। এখন আর সাম্যসমাজের অস্তিত্ব নেই, লুণ্ঠন এখন ধন আহরণের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর সর্বাধিক বলশালী ইন্দ্র নিজেই লুণ্ঠনকৃত সম্পদের সবচেয়ে বেশি অংশ গ্রহণকারী এবং আত্মস্মাৎকারী।
আর সমাজে ব্যক্তিপুঁজির আবির্ভাব ঘটে গেছে। সেই পুঁজির রক্ষকও ইন্দ্র। আদিম সাম্যসমাজে বিধি ছিল--‘বসালিপ্ত তৃণ’কে কেউ ‘আমার’ বললে তাকে হত্যা করা হবে। তৃণ শব্দের অর্থ ধান্য বা নীবার। বসা বা চর্বি হচ্ছে সামাজিক ধনের অবশেষ। সেই অবশেষ বা পুঁজিকে যে নিজের কুক্ষিগত করে রাখতে পারবে, সে ইন্দ্রের জামানায় তত পূজিত। সমাজদেহে তখন থেকেই যাবতীয় রোগের সূচনা। তাই কেউ কেউ এমনও বলেন যে সমাজদেহে ব্যক্তিমালিকানা এবং মানবদেহে কুষ্ঠ, একই রোগ।
এই হারানো ঋত ফিরিয়ে আনা নিয়ে গৌতম বুদ্ধ ও তাঁর সমসাময়িক চিন্তাবিদরা যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। কেননা তাঁরা জন্মেছিলেন আদিম সাম্যসমাজের বিলুপ্তি আর শ্রেণীসমাজের আবির্ভাবের ক্রান্তিলগ্নে। তাঁরা দেখেছিলেন শ্রেণীহীন কৌমসমাজকে বিধ্বস্ত করে কীভাবে জন্ম নিচ্ছে শ্রেণীবিভাজক রাষ্ট্রশক্তি। আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে কোশলের রাষ্ট্রশক্তি বুদ্ধের চোখের সামনেই তাঁর জ্ঞাতি-পরিজনদের হত্যা করেছিল, শাক্যদের নির্মূল করেছিল, নারী-শিশু-বৃদ্ধদেরও রেহাই দেয়নি। বুদ্ধের চোখের সামনেই মগধরাজ অজাতশত্রু বৃজি সাধারণতন্ত্রকে ধ্বংস করার ব্যাপক আয়োজন করেছিলেন। বিদেহ, লিচ্ছবি, জ্ঞাতৃক ও বৃজি এই চারটি কৌম বা ট্রাইবের সমন্বয়ে গঠিত ছিল ‘বৃজি সাধারণতন্ত্র’, যার সভাপতি ছিলেন জৈনধর্মের প্রবর্তক মহাবীরের মাতুল চেটক বা চেদগ, যিনি সাধারণতন্ত্র রক্ষার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন। সেই ভয়াবহ হত্যা ও রক্তপাতের দুর্যোগময় দিনগুলিতে বুদ্ধ ও মহাবীরের সমসাময়িক আরও অনেক দার্শনিক হতবুদ্ধি ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
বুদ্ধ শ্রেণীরাষ্ট্রের উদ্ভবের কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন সামাজিক উৎপাদন ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির দ্বন্দ্বের মধ্যে। ব্যক্তিসম্পত্তির ধারণাকে তিনি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন। তিনি ভিক্ষুদের কেবলমাত্র ৮টি জিনিসকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের অধিকার দিয়েছিলেন--মাটির তৈরি একটি ভিক্ষাপাত্র, তিনটি পরিধেয় বস্ত্র, একটি সূঁচ, একটি ক্ষুর, একটি কটিবন্ধ ও একটি জলপাত্র। ধনবৈষম্যের ফলে উদ্ভূত সামাজিক সমস্যাসমূহ, দুর্বলের ওপর প্রবলের অত্যাচার, ধনিক শ্রেণীর সীমাহীন লোভ সম্পর্কে বুদ্ধের সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। অন্যদিকে নিজেদের সাম্যসমাজ ও নির্মল সমাজকে হারিয়ে তাই বৈদিক কবি আকুল হয়ে উচ্চারণ করেন--‘আমি তোমায় জিজ্ঞাসা করি, হে যজ্ঞ, অতীতের সেই ঋত কোথায় গেল? নূতন কে তা ধারণ করছে? তোমাদের ঋত কোথায়? হে দেবতাগণ, ঋতের বন্ধন কোথায়? কোথায় গেল বরুণের সেই অতন্দ্র প্রহরা?’

প্রাবন্ধিক লীনা দিলরুবার তোলা যতীন সরকারের আলোকচিত্র
০২.
যতীন সরকারের প্রধান পরিচয় তিনি লেখক। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় প্রবন্ধ লেখক। প্রাবন্ধিক। আমাদের দেশে ইদানিং এই ধরনের লেখককে মননশীল বলার চল হয়েছে। যেন সৃজনশীল লেখকের মননশীলতা নেই। আবার মননশীলতার জন্যও প্রয়োজন নেই সৃজনক্ষমতা ও সৃজনপ্রবণতার। আমরা এইসব কূটতর্ক এড়িয়ে যতীন সরকারকে প্রবন্ধলেখক হিসাবেই অভিহিত করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। লেখক বটে, কিন্তু কোন ধরনের লেখক? উত্তর হচ্ছে, যতীন সরকার একজন পূর্ণাঙ্গ লেখক। কেন তাঁকে পূর্ণাঙ্গ লেখক বলা হবে? উত্তর খুঁজতে হবে অনেকগুলি প্রশ্নের মধ্য দিয়ে। অনেকগুলি প্রশ্ন। যেমন--লেখকের কাজ কী? লেখকের কাজ কি শুধুই সৌন্দর্যসৃষ্টি? অথবা শুধুই সূক্ষ্ণ আনন্দদান? অথবা শুধুই সৌন্দর্য ও আনন্দের ব্যাখ্যাপ্রদান? অথবা শুধুই সমাজের সংস্কার কামনা? অথবা কোনো নির্দিষ্ট মতবাদের পক্ষে প্রচার-প্রপাগাণ্ডা?
যিনি এগুলির যে কোনো একটিকে বেছে নেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে তিনি খণ্ডিত ও নিতান্তই গৌণ লেখক। যতীন সরকার ওপরের সবগুলি শর্তকে একসঙ্গে নিজের মননে ও রচনায় ধারণ করেন বলেই তাঁকে আমরা অভিনন্দিত করি পূর্ণাঙ্গ লেখক হিসাবে। কেউ কেউ তাঁকে অভিহিত করেন ‘বামপন্থি বা মার্কসবাদী’ লেখক বলে। এই অভিধা মেনে নিয়েও যতীন সরকার সবিনয়ে জানান যে তিনি নিজের ক্ষেত্রে ‘মার্কসবাদী’ শব্দটির প্রয়োগ পছন্দ করেন না। বরং তিনি নিজেকে ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী’ বলতেই বেশি পছন্দ করেন। কারণ মার্কসবাদ ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ শব্দদুটি সমার্থক বলে প্রতীয়মান হলেও প্রকৃতপক্ষে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী শব্দটির দ্বারা আরও অনেক বেশি ব্যাপ্তি ও পরিসর বোঝানো হয়ে থাকে। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী যিনি, তিনি মার্কসবাদকে তো বটেই, একই সঙ্গে প্রাক-মার্কস ও মার্কস-পরবর্তী সকল দার্শনিক প্রত্যয়ের দ্বান্দ্বিক ডিসকোর্স নির্মাণে সতত ক্রিয়াশীল। আর সেই কারণেই যিনি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ আত্মস্থ করতে সক্ষম হন, তিনি মার্কসবাদের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের আশাব্যঞ্জক ফলাফল না দেখতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ বিনা পর্যালোচনায় সেই দর্শন পরিত্যাগে উন্মুখ হয়ে ওঠেন না। অর্থাৎ আমাদের সমাজে ঋত-কে ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে তিনি অদ্যাবধি প্রাচীন বৈদিক গণকবি, বুদ্ধ-মহাবীর, অজস্র কৃষক আন্দোলনের সংগঠক ও জঙ্গি লড়াকুদের উত্তরসূরি হিসাবে নিজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকায় অবিচল।
আদিম সাম্যসমাজের ‘ঋত’ আজকের আধুনিক মানুষের কাছে কমিউনিজম বা সাম্যবাদ নামে পরিচিত হয়েছে। সেই সাম্যবাদে উত্তরণের পথের একটি ধাপ বা পর্যায় হিসাবে আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছিল সমাজতন্ত্রের ধারণা। যতীন সরকার ঋত পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে সেই সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার রণকৌশলকে এখনো সঠিক মেনে কাজ করে চলেছেন। তিনি এপথে নিঃসঙ্গও নন, প্রথমও নন। তবে কিছুটা হলেও অনন্য।
০২.
সমাজতন্ত্র তো শুধুমাত্র সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই নয়, বরং একটি মূল্যবোধও বটে। পুরাতন সমাজের ইতিবাচক মূল্যবোধগুলির সাথে নতুন দিনের নতুন মূল্যবোধের সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটানোর মধ্যেই বিপ্লবের সার্থকতা নির্ভর করে। যতীন সরকারের অভিনিবেশি মনন লক্ষ্য করেছে যে আবহমান বাঙালি জাতি এমন অনেক মূল্যবোধকে ধারণ ও বহন করে আসছে যা সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তো বটেই, উপরন্তু সেগুলিকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে মানুষকে সম্পৃক্ত করার হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার করা সম্ভব। বাঙালির প্রাচীন ও লোকায়ত দর্শনের সাথে বস্তুবাদ ও সমাজতন্ত্রের সাযুজ্য খুঁজে পেয়েছিলেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। যতীন সরকার কাজ করেছেন পরবর্তী ধাপ নিয়ে। বাঙালির যৌথ জীবনে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আচরণের উদাহরণ খুঁজে বের করা, সেগুলিকে আরও উৎসাহিত করা, এবং সেগুলি টিকিয়ে রাখার জন্য সমাজতন্ত্রের আন্দোলন ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, এই বোধ জনগণের মধ্যে চারিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে সমাজতন্ত্রের আন্দোলনে শামিল করানোর সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ করতে চান যতীন সরকার। এই কারণেই তিনি সমাজ খুঁড়ে ও ইতিহাস তন্ন তন্ন করে খুঁড়ে বের করে এনেছেন বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের পরিচয়। প্রগতি আন্দোলনের যে কোনো কর্মী নতুন করে এই তথ্য জেনে অবশ্যই আনন্দিত হবেন যে আদিম সাম্যসমাজের অনেক মূল্যবোধ ও স্মৃতি সাধারণ জনগোষ্ঠী বংশ পরম্পরায় বহন করে চলেছে অদ্যাবধি। এই জায়গা থেকেই বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অনুসন্ধান শুরু করেছেন যতীন সরকার। প্রাচীন রাশিয়াতে ছিল ‘মীর’ ও ‘আর্তেল’। ‘মীর’ ছিল আবহমান রাশিয়ার যৌথ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা, আর ‘আর্তেল’ প্রাচীন রাশিয়ার যৌথ শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা। আমরা জেনে আনন্দিত হই যে মীর ও আর্তেল-এর মতো ঐতিহ্য আমাদেরও রয়েছে। আমাদের দেশেও এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পূর্ব পর্যন্তও বর্তমান ছিল যৌথ কৌম কৃষি ব্যবস্থা। আদিম সাম্যসমাজকে ধ্বংস করা সম্ভব হলেও তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য কবি কুৎস, বুদ্ধ ও অগণ্য জননায়কদের নেতৃত্বে আমাদের পূর্বপুরুষরা যে অসংখ্যবার মরণপণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, প্রাকৃত জীবনের ইতিহাস খুঁড়ে সেই সব তথ্য বের করে এনেছেন যতীন সরকার। সার্বিকভাবে বাঙালিকে ভাববাদী বলে চিহ্নিত করার একটি প্রবণতা আমাদের পণ্ডিতসমাজে বিদ্যমান। কিন্তু বাঙালি কখনোই অবিমিশ্র ভাববাদী ছিল না। ভাববাদ যতটুকু ছিল, তা ছিল সমন্বয়বাদী ভাবধারার অনুসারী। বাঙালির নিজস্ব সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন হচ্ছে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধন সঙ্গীত বা চর্যাপদ। যতীন সরকার বলেন--‘ সহজ যান বা সহজিয়া মতবাদ তাকেই বলা যায়, যে মতবাদ মানুষের সহজ ও স্বভাবসঙ্গত বিকাশকে স্বীকার করে। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের তথা শ্রেণীবিভক্ত সমাজের চাঁইদের ধর্ম শ্রেণীবৈষম্যের (তথা ধনবৈষম্যের) যুপকাষ্ঠে মানুষের স্বভাবধর্মকে (বৈদিক পরিভাষায় ঋত-কে) বলি দেয়,--সহজিয়াদের অবস্থান তারই বিপরীত বিন্দুতে। এই সহজিয়া ধর্মমত কৌমসমাজের অভীপ্সার ধারক, শ্রেণীসমাজের উচ্চতর বর্গে প্রচলিত সব ধর্মের প্রতি--এমনকি শিষ্ট ও সংস্কৃত বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিও--ব্যঙ্গবিদ্রূপ-পরায়ণ। শ্রেণীসমাজের রাজ-রাজড়া ও শোষকগোষ্ঠীতে যে বৌদ্ধধর্ম পরিগৃহীত হয়েছিল, এবং হতে হতে সংস্কৃত হচ্ছিল, সে-ধর্মে গৌতমবুদ্ধের সেই সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানাবিরোধী বিদ্রোহী ভাবাদর্শ আর অবশিষ্ট ছিল না। বাংলার কৌম সমাজের লৌকিক বৌদ্ধ ধর্ম কিন্তু সেই আদিম যাদুবিশ্বাস, সর্বপ্রাণবাদ, শ্রেণীসমাজের ধর্মব্যবসায়ীদের প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতার বিরোধিতা, বর্ণবেষম্য-শ্রেণীবৈষম্যের প্রতি তীব্র ঘৃণা--এই সব নিয়েই সারা বাংলার লোকমানসে শিকড় বিস্তার করে রেখেছিল। এই লৌকিক মতবাদই একদিকে যেমন বজ্রযান সহজযান কালচক্রযান প্রভৃতি নানা সাধনপ্রণালীর উদ্ভব ঘটিয়ে উচ্চবর্গের মানুষদের ধর্মানুষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, অন্যদিকে তেমনি শ্রেণীসমাজের শোষকগোষ্ঠীর সঙ্গে সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে নাথপন্থা, অবধৃতবাদ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বিদ্রোহের ধ্বজা সমুন্নত রেখেছিল। এ-সবেরই এক পর্যায়ে উদ্ভূত বাউল মতবাদও সেই একই বিদ্রোহের ধ্বজাবাহী। শুধু বৌদ্ধ মতবাদ নয়, বাংলার লোকসমাজ পৌরাণিক হিন্দুধর্মেরও ব্রাহ্মণ্য ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করে কৌম সমাজের সাম্যচেতনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ রূপে একে পুনর্গঠিত করে নেয়। সাম্য-চেতনা সম্পন্ন ইসলাম ধর্মকেও এর রক্ষণশীল ব্যাখ্যাতাদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনে এদেশের লৌকিক ধারার সঙ্গে একীভূত করে ফেলে। বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতবর্গ তার নাম দেন ‘লৌকিক ইসলাম’। এই লৌকিক বৌদ্ধ, লৌকিক হিন্দু আর লৌকিক ইসলাম আলাদা আলাদা খোপে আবদ্ধ হয়ে থাকে না প্রায়শই, নানাভাবে জড়িত মিশ্রিত হতে হতে এরা একাকার হয়ে যায়, কৌম ঐতিহ্যসম্পন্ন বাঙালীর লোকচেতনায় বিচিত্র বর্ণবিন্যাসের সংযোজন ঘটায়, বৈচিত্র্যের মধ্যে প্রতিবাদী ঐক্যের বেগবান প্রবাহ সৃষ্টি করে।’ [বাঙালীর সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য]।

প্রাবন্ধিক লীনা দিলরুবার তোলা যতীন সরকারের আলোকচিত্র
০৩.
বিগত শতাব্দীর নব্বই দশক থেকে বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলির যে পতনের সূচনা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশ্নও উঠেছিল যে যতীন সরকারের বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য-অনুসন্ধান বা এই জাতীয় কার্যক্রমের আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা অবশিষ্ট রয়েছে কি না? আমাদের দেশে ‘তথাকথিত বাম বুদ্ধিজীবীরা’ যেভাবে তওবা পড়ে নাকে খত দিয়ে সমাজতন্ত্রকে অস্বীকার করে আওয়ামী লীগ-বিএনপির কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার সুরে সুর মিলিয়ে বলতে শুরু করলেন যে পুঁজিবাদেই ইতিহাসের সমাপ্তি; সেই সাথে আমাদের অনেক ডাকসাইটে বাম নেতা যেভাবে বুর্জোয়া আহ্বানে কোনো দ্বিধা-পর্যালোচনা ছাড়াই ছুটে গেলেন পার্টি ছেড়ে, সঙ্গে নিয়ে গেলেন পার্টির সুনাম-সম্পদ এবং অর্থ, তখন সাধারণ মানুষের মনে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। যতীন সরকার এই পরিস্থিতিতেও স্থিতধী, পর্যালোচনামুখর এবং পর্যালোচনা শেষে সমাজতন্ত্রেই আস্থাশীল। অন্যদের সঙ্গে যতীন সরকারের বা যতীন সরকারদের পার্থক্য তাহলে কোন জায়গায়?
পার্থক্য একাধিক জায়গায়।
বাম-কমিউনিস্টদের উপর একসময় বুর্জোয়া দলগুলি এই বলে কলঙ্ক আরোপের চেষ্টা করত যে মস্কো বা পিকিংয়ে বৃষ্টি হলে এরা বাংলাদেশে ছাতা ধরে। অর্থাৎ এরা চীন-সোভিয়েত ইউনিয়নের ডিকটেশনে রাজনীতি করে। নিজেদের মেধা-মনন বা বোধ-বুদ্ধি কাটিয়ে কিছুই করে না। ফলে কাজে ও চিন্তায় পরনির্ভরশীল থাকতে থাকতে এরা নিজেরা কিছু করার কথা বেমালুম ভুলে গেছে। সর্বোপরি তারা বিদেশী টাকায় রাজনীতি করে। রাজনীতিই তাদের পেশা। নিজেরা কারণে-অকারণে সেমিনারের নামে, চিকিৎসার নামে বিদেশভ্রমণ করে। তাদের সন্তান-সন্ততিদের বৃত্তি দিয়ে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে পাঠায়। কেউ কেউ পার্টির নাম ভাঙিয়ে বিদেশী বৃত্তির নামে আদম ব্যবসাও করে। যে লেখক-বুদ্ধিজীবীরা আগে সমাজতন্ত্রের নামে কাব্য করতেন, তারা আসলে ছিলেন ভাড়াটে। কবি সম্মেলনের নামে বিদেশভ্রমণ, আন্তর্জাতিক বিকল্প ধারার পুরস্কারগুলি লাভ করা, অন্য ভাষায় নিজেদের লেখা অনূদিত হওয়া, বিদেশী দূতাবাসের পার্টিতে-অনুষ্ঠানে গিয়ে বিনে পয়সায় মদ খাওয়া-- এসবই ছিল তাদের সমাজতন্ত্রপ্রীতির কারণ। চীনে বা সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাই তাদের মুক্তকচ্ছ হয়ে সুবিধাবাদী দলের কোলে ছুটে গিয়ে পড়া। এগুলিকে আগে বুর্জোয়া অপপ্রচার মনে হতো। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশের শিক্ষা আমাদের এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য করেছে যে এগুলি সব নিছক অপপ্রচার ছিল না।
যতীন সরকার এবং তাঁর আরো কয়েকজন কমরেড এই সময় হালুয়া-রুটির বা বিদেশের টাকার কথা না ভেবে সমাজতন্ত্রের তথাকথিত বিপর্যয়ের পরে ব্যাপক পর্যালোচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। সে বড় কঠিন সময় ছিল। ১৯৯০-এর দশকে যতীন সরকারকে, মার্কসবাদের যে কোনো ছাত্রের মতোই, গভীর আত্মসমালোচনা ও তীব্র আত্ম-অনুসন্ধানের পথে হাঁটতে হয়েছে। তখন আর ষাট দশকের মতো ‘ইতিহাস সমাজতন্ত্রের পক্ষে’ বলে সগর্ব ঘোষণা দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকার মতো অবস্থা ছিল না। তখন আর পূর্বের মতো বাঁধা-ধরা পথে, আলোচনায় ও চিন্তাপদ্ধতিতে মার্কসবাদ ও সমাজতন্ত্রের প্রাসঙ্গিকতাকে প্রতিষ্ঠা করা আদৌ সম্ভব নয়। কিন্তু জীবনই সব থেকে বড় শিক্ষক। বিশ্বমানবের বিগত দেড় দশকের জীবনই এই সত্যকে আবার প্রতিষ্ঠিত করেছে যে ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদ কখনোই সমাজতন্ত্রের বিকল্প হতে পারে না। কারণ পুঁজিবাদের অস্তিত্বই অমানবিক। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা পূর্ব ইউরোপে যা-ই ঘটে থাকুক, এখন পর্যন্ত যে সমাজতন্ত্রের চাইতে অধিক মানবিক দর্শন পৃথিবীতে প্রস্তাবিত হয়নি, তা দেশে দেশে যারা মানুষের মুক্তি সংগ্রামে যুক্ত রয়েছেন তারা সবাই উপলধ্বি করছেন। তাই এখন আবার নতুন করে যতীন সরকার ও তাঁর কমরেডরা আমাদের দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন। বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অনুসন্ধান এখন তাই আরো প্রয়োজনীয় একটি তৎপরতা। কমিউন বা সোভিয়েতের আদলে আমাদের দেশে গ্রাম-সমবায় গড়ে তোলা পরিকল্পনা করেছিলেন মুকুন্দ দাসের মতো চারণ কবি। তাঁর পরিকল্পনা ছিল--‘ প্রতি পাঁচখানা গ্রাম লইয়া হইবে এক একটি মৌজা; প্রতি মৌজায় থাকিবে আমানতী ব্যাংক--এবং ব্যাংকের সাহায্যে ও মাধ্যমে এই পাঁচখানি গ্রামে চলিবে যৌথভাবে চাষ, কারবার ও কুটিরশিল্প।’
যে দার্শনিক প্রত্যয় প্রত্যন্ত জনপদের মানুষকে পর্যন্ত এমনভাবে স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তার মৃত্যু নেই। তাই ‘যতীন সরকার এবং যতীন সরকাররাই’ অবিরাম বৈদিক কবির সুরে সুর মিলিয়ে এখনো এ-কথা বলার অধিকার সংরক্ষণ করেন--‘আমি তোমায় জিজ্ঞাসা করি, হে যজ্ঞ, অতীতের সেই ঋত কোথায় গেল? নূতন কে তা ধারণ করছে? তোমাদের ঋত কোথায়? হে দেবতাগণ ঋতের বন্ধন কোথায়? কোথায় গেল বরুণের সেই অতন্দ্র প্রহরা?’