Published : 26 Sep 2025, 09:14 PM
অস্তিত্ববাদ বা EXISTENTIALISM দর্শনশাস্ত্রের কোনো নির্দিষ্ট শাখা নয়, বরং এটি উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী জুড়ে দর্শনে দেখা দেয়া একটি প্রবণতা। এর আগে দর্শনশাস্ত্র জটিল এবং বিমূর্ত হয়ে উঠছিল। প্রকৃতি ও সত্যের ধারণা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দার্শনিকেরা মানুষের গুরুত্বকে উপেক্ষা করতে শুরু করেছিলেন।
উনবিংশ শতাব্দীতে সোরেন কিয়ের্কেগার্ড এবং ফ্রেডরিখ নীৎশের হাত ধরে এমন কয়েকজন দার্শনিক আবির্ভূত হলেন, যারা নতুনভাবে মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিলেন। যদিও ‘অস্তিত্ববাদ’ শব্দটি বিংশ শতাব্দীর আগে ব্যবহার করা হয়নি এবং এই দার্শনিকদের মধ্যেও চিন্তার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভিন্নতা ছিল, তবুও এদের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয়ে ঐকমত্য ছিল—দর্শন মানুষের অস্তিত্বের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে আলোচনা হওয়া উচিত, আর তখনই অস্তিত্ববাদ মানুষের জীবনের অর্থ ও আত্ম-আবিষ্কারের অনুসন্ধান করা শুরু করে।
অস্তিত্ববাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ
অস্তিত্ববাদী চিন্তা দার্শনিকভেদে ভিন্ন হলেও এর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। জীবনের অর্থ আবিষ্কার মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, ব্যক্তিগত দায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত। বস্তুত, এটাই ছিল অস্তিত্ববাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের মতে, মানুষকে হঠাৎ এই পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়েছে, তাই তাদের অস্তিত্বই হলো চূড়ান্ত বাস্তবতা, চেতনা নয়। মানুষ একজন একক ব্যক্তি, যে-স্বাধীনভাবে চিন্তা ও কাজ করার ক্ষমতা রাখে। তাই মানুষের জীবন দিয়েই তাকে সংজ্ঞায়িত করা উচিত।
অস্তিত্ববাদীরা বিশ্বাস করেন, সামাজিক কাঠামো বা মূল্যবোধ ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে না এবং প্রত্যেক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নির্ভর করে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতার উপর। ব্যক্তিগত দায়িত্ব অস্তিত্ববাদের মূল অংশ। জীবনের সব সিদ্ধান্ত ব্যক্তিকেই নিতে হয়, এবং এর সঙ্গে আসে কাজের পরিণতি ও নানাবিধ চাপ। তবে যখন মানুষ নিজের প্রকৃত স্বভাবকে অতিক্রম করে সংগ্রাম করতে থাকে তখনই সে তার সেরা অবস্থানে পৌঁছায়।
উদ্বেগ (Anxiety)
অস্তিত্ববাদীরা মানুষের জীবনের সেই মুহূর্তকেই বেশি গুরুত্ব দেন যখন সে তার অস্তিত্ব ও প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন কোনো সত্য উপলব্ধি করতে থাকে। তাদের মধ্যে বিরাজ করে একধরনের উদ্বেগ এবং ভয়। অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের মতে, মানুষকে হঠাৎ এই পৃথিবীতে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, তাই তাদের অস্তিত্বের ভেতরে রয়েছে একধরনের অর্থহীনতা, এবং মানুষের জীবন যেহেতু তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত দ্বারা নির্ধারিত হয় তাই হঠাৎ স্বাধীন হয়ে পড়ে, তাদের ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ে অনিশ্চিত।
মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে তারা বিশ্বকে বুঝতে পারছে, তখন মানুষ অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায় এবং তারা জীবনের অনেক দিক নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়। তাই জীবনের অর্থ ও মূল্য পাওয়ার একমাত্র উপায় হিসাবে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে এবং দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়।
প্রামাণ্যতা (Authenticity)
অস্তিত্ববাদের মতে, মানুষের প্রামাণ্যতা অর্জনের জন্য তার স্বাধীনতা থাকতে হবে। প্রামাণ্যতার মানে হল, নিজেকে সত্যিকারভাবে চেনা এবং সে অনুযায়ী বাঁচা। মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে কোনো ধরনের প্রেক্ষাপট বা ইতিহাসের প্রভাব যেন না থাকে। একজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অবশ্যই তার ব্যক্তিগত মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করবে।
যদি কোনো মানুষ তার নিজের স্বাধীনতার ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারে, তবে সে অপ্রামাণ্য (inauthentic). অপ্রামাণ্য মানুষ বিশ্বাস করে, যে-সিদ্ধান্ত পূর্বনির্ধারিত তা অর্থহীন। মানুষের ‘যা করা উচিত’ তাই করা প্রয়োজন।
অযৌক্তিকতা (The Absurd)
অস্তিত্ববাদের অন্যতম বিখ্যাত ধারণা হলো অযৌক্তিকতা। এখানে বলা হয়, জীবনের কোনো অন্তর্নিহিত কারণ নেই, প্রকৃতিরও কোনো পরিকল্পনা নেই। বিজ্ঞান বা অধিবিদ্যা (metaphysics) প্রকৃতির বর্ণনা দিতে পারে, কিন্তু জীবনের অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারে না।
অস্তিত্ববাদের মতে, পৃথিবীর কোনো অর্থ নেই, শুধু আমরা মানুষই অর্থ প্রদান করি। আবার দেখা যায়, জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কারণ খুঁজি, অথচ প্রকৃত অর্থ জানা অসম্ভব। তাই আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াই মূলত অযৌক্তিক।
ধর্ম ও অস্তিত্ববাদ
যদিও কয়েকজন খ্রিস্টান ও ইহুদি দার্শনিক অস্তিত্ববাদী ভাবনা ব্যবহার করেছেন, তবুও অস্তিত্ববাদ সাধারণত নাস্তিকতার সঙ্গে যুক্ত। তবে সব নাস্তিক অস্তিত্ববাদী নয়; কিন্তু অধিকাংশ অস্তিত্ববাদী দার্শনিক নাস্তিক।
এর পেছনে কারণ কী?
অস্তিত্ববাদ ঈশ্বর আছেন বা নেই তা প্রমাণ করতে চায় না। অস্তিত্ববাদ মানুষকে আহ্বান জানায় নিজের ভেতর থেকে অর্থ ও উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে। যদি কেউ বিশ্বাস করে যে কোনো বাহ্যিক শক্তি মানবতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তবে তার পক্ষে সেই আত্ম-আবিষ্কার সম্ভব নয়। নিচে কয়েকজন প্রধান অস্তিত্ববাদী দার্শনিক এবং তাদের চিন্তাভাবনা তুলে ধরা হলো।

সোরেন কিয়ের্কেগার্ড: অস্তিত্ববাদী দর্শনের জনক
দর্শনের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁরা মানুষের চিন্তাজগতে নতুন দ্বার উন্মোচন করেছেন, সোরেন কিয়ের্কেগার্ড (১৮১৩-১৮৫৫) তাঁদের অন্যতম। কিয়ের্কগার্ড ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ, কবি ও সমাজ-সমালোচক। তাঁর চিন্তাধারা আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং অস্তিত্ববাদের ভিত্তি নির্মাণে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন।
শৈশবে কিয়ের্কেগার্ডের পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসন এবং কঠোর নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা ছিল। তাঁর পিতা মাইকেল পেডারসেন কিয়ের্কেগার্ড ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি, যা কিয়ের্কেগার্ডের মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তিনি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করলেও দর্শন, সাহিত্য ও ধর্মের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নিজস্ব এক স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তোলেন।
কিয়ের্কেগার্ডের দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘ব্যক্তি’ এবং তাঁর অস্তিত্ব। তিনি মনে করতেন যে, দর্শন ও ধর্ম কেবল বিমূর্ত চিন্তা নয়, বরং তা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সিদ্ধান্ত ও দায়বদ্ধতার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
কিয়ের্কেগার্ডের মতে, ‘সত্য’কোনো সর্বজনীন বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং ব্যক্তির জীবনের অভিজ্ঞতার ভেতরেই তা নিহিত। তিনি বলেছিলেন, ‘Subjectivity is Truth’ অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত উপলব্ধিই সত্যকে প্রকাশ করে।
কিয়ের্কেগার্ড বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে অনুধাবন করতে পারে না; বরং বিশ্বাস হলো এক ‘লাফ’ (leap of faith), যুক্তি ব্যর্থ হলেও মানুষ হৃদয়ের গভীর থেকে ঈশ্বরকে গ্রহণ করে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Fear and Trembling এই বিশ্বাসের ধারণাকে কেন্দ্র করেই রচিত।
কিয়ের্কেগার্ড প্রথম দার্শনিক যিনি ব্যক্তির স্বাধীনতা, দুঃখ, উদ্বেগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নকে দর্শনের কেন্দ্রে আনেন। তাঁর চিন্তা থেকেই পরে জাঁ-পল সার্ত্র, মার্টিন হাইডেগার প্রমুখ অস্তিত্ববাদী দার্শনিকেরা অনুপ্রেরণা পান।
কিয়ের্কেগার্ডের লেখালেখির সংখ্যা প্রচুর, যেগুলোর ভেতরে দার্শনিক গভীরতা ও সাহিত্যিক রূপক একসাথে মিশে আছে। তাঁর প্রধান গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে, Either/Or (1843), Fear and Trembling (1843), The Concept of Anxiety (1844), Works of Love (1847). এসব গ্রন্থে তিনি মানুষের নৈতিক দ্বন্দ্ব, বিশ্বাসের জটিলতা এবং অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রশ্নগুলো নিয়ে উত্তর খুঁজেছেন।
কিয়ের্কেগার্ড জীবদ্দশায় ততটা স্বীকৃতি পাননি। তবে মৃত্যুর পর তাঁর রচনাগুলি ইউরোপীয় দর্শনে এক বিপ্লব ঘটায়। তাঁর চিন্তাধারা ধর্মতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান, সাহিত্য এবং আধুনিক দর্শনে আজও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
সোরেন কিয়ের্কেগার্ড কেবল একজন দার্শনিক নন, বরং মানবজীবনের গভীর প্রশ্নের একজন অনুসন্ধানী। তিনি দেখিয়েছেন যে, মানুষের অস্তিত্ব কেবল যুক্তি বা বিজ্ঞানের মাধ্যমে বোঝা যায় না; এর ভেতরে আছে ব্যক্তিগত সংগ্রাম, ভয়, বিশ্বাস ও দায়িত্ব। তাই তাঁকে যথার্থভাবেই আধুনিক অস্তিত্ববাদের জনক বলা হয়।
জাঁ-পল সার্ত্র (১৯০৫–১৯৮০), অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের অগ্রদূত
জাঁ-পল সার্ত্র ১৯০৫ সালের ২১ জুন ফ্রান্সের প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ১৯০৬ সালে মারা যান। এরপর তাঁর মা তাঁকে নিয়ে তাঁর নানার বাড়িতে চলে যান। সার্ত্রের নানা ছিলেন একজন দার্শনিক ও ধর্মীয় লেখক। সার্ত্র শৈশবে নানার প্রভাবে বড় হলেও পরবর্তীকালে সেই বিশ্বাস তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯২৪ সালে সার্ত্র প্যারিসের বিখ্যাত École Normale Supérieure বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে ভর্তি হন। ১৯২৮ সালে তিনি সহপাঠী ও পরবর্তী জীবনের আজীবন সঙ্গী সিমোন দ্য বোভোয়ার-এর সঙ্গে পরিচিত হন। স্নাতক শেষে সার্ত্র সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং পরে ফ্রান্সে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে তিনি বার্লিনে যান এবং সেখানে এডমুন্ড হুসার্ল ও মার্টিন হাইডেগারের দর্শন অধ্যয়ন করেন। তাঁদের কাজ সার্ত্রের চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯৩৮ সালে তিনি তাঁর প্রথম দার্শনিক উপন্যাস Nausea প্রকাশ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৩৯ সালে সার্ত্রকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়। ১৯৪০ সালে তিনি জার্মানদের হাতে বন্দি হন এবং প্রায় নয় মাস যুদ্ধবন্দি হিসেবে কাটান। বন্দিদশায় তিনি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত দর্শনগ্রন্থ Being and Nothingness লেখা শুরু করেন। ১৯৪১ সালে তিনি প্যারিসে ফিরে আসেন এবং ১৯৪৩ সালে বইটি প্রকাশিত হলে সার্ত্র দ্রুত খ্যাতি অর্জন করেন ও যুদ্ধোত্তর যুগের একজন প্রধান চিন্তাবিদ হিসেবে স্বীকৃত হন।
সার্ত্র Les Temps Modernes নামক সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন, যেখানে তিনি নিয়মিত রাজনৈতিক ও দার্শনিক লেখা প্রকাশ করতেন। সার্ত্র সারাজীবন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। একজন দৃঢ় সমাজতান্ত্রিক হিসেবে তিনি ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে সমর্থন করেছিলেন। সে-সময় তিনি ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং মার্কসবাদকে সমর্থন করেন। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ফ্রান্সের আলজেরিয়া উপনিবেশিকরণেরও তীব্র সমালোচনা করেন।
সার্ত্র ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বহুমুখী লেখক। ১৯৬৪ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি মনে করতেন, কোনো লেখককে প্রতিষ্ঠানের প্রতীকে রূপান্তর করা উচিত নয় এবং তিনি মনে করতেন, পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতি বিনিময়ের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন নেই।
যদিও তাঁর জীবনের পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাঁর অস্তিত্ববাদ বিষয়ক প্রাথমিক কাজগুলোকে এখনো সর্বাধিক গভীর দার্শনিক অবদান হিসেবে ধরা হয়।
সার্ত্র বিশ্বাস করতেন যে প্রত্যেক ব্যক্তি ‘being-for-itself’ অর্থাৎ একধরনের আত্মসচেতন সত্তা। তাঁর মতে, মানুষের কোনো স্থায়ী বা নির্ধারিত প্রকৃতি নেই। বরং মানুষের রয়েছে আত্ম-সচেতনতা এবং চেতনা, এবং এগুলো সবসময় পরিবর্তনশীল। যদি কেউ মনে করে যে সমাজে তার অবস্থানই তার পরিচয় নির্ধারণ করে, অথবা তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে সে নিজেকেই প্রতারিত করছে। অন্য কাউকে বলা, ‘আমি এমনই, আমার কিছু করার নেই’—এটিও আত্ম-প্রতারণা।
সার্ত্রের মতে, অস্তিত্বের দুই রকম ধরন রয়েছে। এক ধরনের জিনিসের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ধারিত সত্তা বা প্রকৃতি আছে, কিন্তু তারা নিজের সেই সত্তা বা নিজের ব্যাপারে সচেতন নয়, যেমন, পাথর, পাখি, গাছপালা। আবার যেসব সত্তা তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন, নিজেদের অস্তিত্বের উপলব্ধি রাখে, যেমন মানুষ।
ফ্রেডরিখ নীৎশে (১৮৪৪–১৯০০)
জার্মানির রেকেন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। নীৎশের বাবা একজন লুথেরান পাদ্রী ছিলেন। তিনি নীৎশের চার বছর বয়সে মারা যান। বাবার মৃত্যুর ছয় মাস পরই নীৎশের দুই বছরের ছোট ভাইও মারা যায়। ফলে নীৎশে তাঁর মা ও দুই বোনের সাথে বেড়ে ওঠেন। নীৎশে পরে বলেন, তাঁর বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
চৌদ্দ থেকে উনিশ বছর বয়স পর্যন্ত নীৎশে জার্মানির অন্যতম সেরা বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি বন বিশ্ববিদ্যালয় এবং লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং সেখানে তিনি ধীরে ধীরে ফিলোলজি বা পাঠ-ব্যাখ্যা বিষয়ক শাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন। এ সময় থেকেই নীৎশে বিখ্যাত সুরকার রিচার্ড ওয়াগনারের সাথে পরিচিত হন। ওয়াগনার ছিলেন নীৎশের আদর্শ, আর তাঁদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব নীৎশের জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলেছিল। বিশ বছর পর নীৎশে সেই বন্ধুত্বকে জীবনের ‘সবচেয়ে বড় অর্জন’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে, এখনো ডক্টরেট সম্পন্ন না করেই, নীৎশেকে ফিলোলজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়।
১৮৭০ সালে ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে অল্প সময়ের জন্য তিনি মেডিক্যাল সহকারী হিসেবে কাজ করেন, যেখানে নীৎশে আমাশয়, সিফিলিস ও ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হন। যুদ্ধ শেষে তিনি বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন এবং ১৮৭২ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ The Birth of Tragedy প্রকাশ করেন। বইটি ওয়াগনার প্রশংসা করলেও সমালোচক উলরিখ ফন উইলামোভিৎজ-মোলেনডর্ফ প্রবলভাবে নিন্দা করেন।
নীৎশে ১৮৭৯ সাল পর্যন্ত বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন। তবে ১৮৭৮সালের দিকেই বোঝা যায়, তিনি ফিলোলজির চেয়ে দর্শনের প্রতিই বেশি আগ্রহী। তাঁর Human, All-Too-Human বইটি তাঁর দার্শনিক শৈলীর পরিবর্তনের নিদর্শন বহন করে। এই সময়েই ওয়াগনারের সাথে তাঁর সম্পর্কের অবসান ঘটে, কারণ ওয়াগনারের ইহুদিবিদ্বেষী মনোভাব ও জার্মান জাতীয়তাবাদ নীৎশের কাছে ভাল মনে হয়নি। চৌত্রিশ বছর বয়সে তাঁর স্বাস্থ্যের এতটাই অবনতি ঘটে যে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়তে হয়।
১৮৭৮ থেকে ১৮৮৯ সালের মধ্যে তার অসুস্থতা ক্রমশ বাড়তে থাকলেও, নীৎশে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও ইতালির বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়ান এবং এই সময়েই তিনি এগারোটি বই লেখেন। ১৮৮৯ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি মারাত্মক মানসিক ভাঙনের শিকার হন (সম্ভবত সিফিলিসের কারণে), যখন তিনি দেখেন এক ব্যক্তি রাস্তায় একটি ঘোড়াকে চাবুক মারছে। সেই দৃশ্য দেখে নীৎশে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন এবং আর কখনো মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। পরবর্তী এগারো বছর তিনি প্রায় অর্ধচেতন অবস্থায় কাটান এবং অবশেষে ১৯০০ সালের ২৫ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
নীৎশে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত তাঁর উক্তি ‘ঈশ্বর মৃত’ এর জন্য। উনিশ শতকের শেষভাগে যখন বিজ্ঞান বিকাশ লাভ করছিল এবং সমাজে নতুন নতুন অগ্রগতি হচ্ছিল, তখন অনেক জার্মান দার্শনিক তাঁদের সমকালীন জীবনকে আশাবাদী চোখে দেখেছিলেন। কিন্তু নীৎশে এসবকে সমস্যাক্রান্ত সময় বলে মনে করেছিলেন, যা মূলত এক গভীর মূল্যবোধের সংকট দ্বারা চিহ্নিত।
তাঁর বই Thus Spoke Zarathustra–তে নীৎশে এক ব্যক্তির গল্প বলেন, যার নাম জরাথুস্ত্র। ত্রিশ বছর বয়সে সে বনে যায় এবং সেখানে এত আনন্দ পায় যে সে দশ বছর সেখানে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে সমাজে ফিরে এসে সে ঘোষণা করে যে ‘ঈশ্বর মৃত।’ Thus Spoke Zarathustra গ্রন্থে নীৎশে যুক্তি দেন যে বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে মানুষ আর খ্রিস্টধর্ম প্রদত্ত মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করে না। খ্রিস্টধর্মের সেই শক্তিশালী প্রভাব, যা সভ্যতায় ঠিক করে দিত কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ, আর কার্যকর নেই।
নীৎশে খ্রিস্টধর্মের সমালোচক হলেও, তিনি নাস্তিকতার আরও বড় সমালোচক ছিলেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে নাস্তিকতাই হবে পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ। নীৎশে কখনও বলেননি যে বিজ্ঞান খ্রিস্টধর্মের স্থানে নতুন মূল্যবোধ তৈরি করবে; বরং তিনি দাবি করেন যে বিজ্ঞানের পরিণত ফলাফল হবে নিহিলিজম—যা হল সকল বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সম্পূর্ণ অস্বীকার।
নীৎশে বিশ্বাস করতেন, মানুষের সবসময়ই একটি উৎস দরকার যেখানে তারা মূল্যবোধ ও অর্থ খুঁজে পাবে। যদি বিজ্ঞান সেই উৎস না হয়, তবে তা অন্য রূপে আবির্ভূত হবে, যেমন, আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদে। তবে নীৎশে কখনও বলেননি যে এই নিহিলিজম থেকে বের হওয়ার উপায় হল খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়া। বরং, তাঁর মতে, এর সমাধান হলো জীবনের প্রতি ইতিবাচক স্বীকৃতি।
Paul Kleinman এর Philosophy 101 অবলম্বনে লিখিত।