১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক জহুরের একগুচ্ছ কবিতা

সাশেনা, দুপুরে ভাতঘুমে হেমন্তের বর্ণমালা হেঁটে আসে / বন্ধুত্ব মানে ঠান্ডা বরফ কুচির ভেতর একসাথে হাঁটা/ চড়ুই পাখির নীরবতার মতো চুপ থাকা? হারিয়ে যাওয়া জীবনের গানে/ সাগরের দুয়ার খুলে যাওয়া

তৌফিক জহুরের একগুচ্ছ কবিতা
চিত্রকর্ম: গিয়র্গিও দি চিরিকো

তৌফিক জহুর তৌফিক জহুর

Published : 02 Jun 2026, 09:35 AM

Updated : 10 Sep 2026, 05:57 PM

জংধরা চাঁদের নিচে

ধরো, একদিন তোমার সমস্ত কান্না

সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো

তখন তুমি গোপনে বাথরুমের আয়নায়

একটি মৃত মাছের চোখ দেখবে 

মাছটি একা একা কাঁদছে 

শহরের সব সেতু যখন উল্টো দিকে হেঁটে যায় 

বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড থেকে 

নেমে আসে ক্ষুধার্ত মডেল কন্যা

মানুষের ফুসফুসে গুঁজে দেয় প্লাস্টিকের বন

তুমি দেখবে

তোমার পুরোনো প্রেমিকা হঠাৎ নদী হয়ে গেছে 

তার শরীর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে 

নবাবের লুঠ হওয়া হীরে-জহরতের বজরা

রাতে ঘুমালে বিছানার নিচে স্বপ্নে পাবে

ধীরে ধীরে জন্ম নেয়া আরেকটি অচেনা পৃথিবী

যেখানে মৃত শিশুরা চক দিয়ে আঁকছে

সূর্যগ্রহণের কালো মহিষ

তোমার হৃদয় যেন শুকিয়ে না যায়

ভাঙা লিফটের ভিতর আটকে থাকা বাদুড়

শহরে সকল অন্ধ জানালায় একে একে ফাঁস করে দেবে

তোমার দুপুরের রোদ বেচার গল্প

ঘুম ভেঙে দেখবে কবরের মাটি 

কথা বলছে বিশুদ্ধ বাংলায় 

হে মানুষ, তোমরা এখনো কেন জীবিত?

উঁচু শহরের নিচে আমাদের রাত

এই শহরে এখন আর কেউ

সম্পূর্ণ কথা বলে না

সবাই ইনবক্সে রেখে দেয়

অর্ধেক কান্না

অর্ধেক বিপ্লব

কিছু ভালোবাসা

রাত নামলে উড়ালসেতুর নিচে

জমে থাকে নীল আলোর ছায়া

কিছু ক্লান্ত মুখ

কিছু অনিদ্রার বিজ্ঞাপন

আমি সেখানে তোমার হাত খুঁজি

যেন ভাঙা লিফটের ভিতর

হঠাৎ বিদ্যুৎ ফিরে আসা

তুমি কপালে আঙুল রাখলেই

শরীরের ভিতর নদী বদলায় পথ

পুরোনো সব ক্ষত

নোটিফিকেশনের মতো জ্বলে ওঠে

আমরা দুজন ভেসে যাই

এক অদ্ভুত স্রোতে

যেখানে অসমাপ্ত বাক্যগুলোও

ডুবে যেতে যেতে আলো ছড়ায়

তারপর ঘুম

তারপর বৃষ্টি

তারপর দেখি

পুরো আকাশটা উপুড় হয়ে আছে

আমাদের বিছানার ওপর

শহর জুড়ে জমেছে বৃষ্টির পানি

ঠিক মানুষের চোখের মতো 

যে শহরে তুমি থাকো

যে শহরে তুমি থাকো

সেখানে বৃষ্টি নামলে রাস্তাগুলো প্রেমিকা হয়ে যায়

মানুষেরা হেঁটে যায় স্মৃতির ছাতার নিচে 

কোনোদিন যাইনি সেই শহরে, তবুও

রাত নেমে এলে জানালার কাঁচে 

তোমার শহরের অলিগলি ভেসে ওঠে

একটা বাতির মতো তুমি জ্বলে থাকো 

দূর ফ্ল্যাটের বারান্দায় 

আমি অন্ধকারে বসে

নিজের নিঃশ্বাসে বিশ্বাস মিলিয়ে চাঁদ দেখি

যে শহরে তুমি থাকো

সেখানে নদীরা প্রেম শিখে সমুদ্রে যায়

মানুষরা বুকের ভিতর লুকিয়ে রাখে

একটা আকাশ একটা সূর্য একটা চাঁদ 

তোমাকে ভালোবাসার পর

পৃথিবীর মানচিত্রে একটাই শহর আঁকা হয়

যে শহরে একটা খনিজ পুকুর ঘিরে 

অপেক্ষারা অপেক্ষা করে 

বৃক্ষের কাছে আমার অনেক ঋণ 

লোকটা

লোকটা আলোয় দাঁড়ায় না

আলোর ভেতর দিয়ে শুধু হেঁটে যায় 

জন্মের সময় থেকেই

তার শরীরে ছায়ার অনুশীলন

তার চোখে কখনো ঘুম নামে না

কেবলই দেখা যায় অদেখা নদী

ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায় ভিতরে

তবু সে জলের কথা বলে

সে জানে, সবই ধার করা

বাশির সুর থেমে গেলে 

একদিন নিজের নামটাও

ফেলে আসবে কোনো ভাঙা ঘাটে

লোকটা প্রেমিক নয়, তবু ভালোবাসে

ভালোবাসা তার কাছে

প্রতিদিনের নিঃশ্বাস

সে জানে, এই শহর তাকে মনে রাখবে না

তবু প্রতিটি দেয়ালে

নিজের ছায়া এঁকে রেখে যায়

ভুল করে কখনো কেউ একটু থমকে দাঁড়ালে

চেষ্টা কি করবে চিনতে

কেউ তার কথা শোনে না এখন

তবু সে কথা বলে যায়

নীরবতা তার কাছে

উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ

লোকটা একদিন হারিয়ে যাবে

কোনো ঘোষণা ছাড়াই

শুধু বাতাসে ভেসে

 থাকবে

তাঁর অদ্ভুত অসমাপ্ত স্মৃতি 

সাশেনা

তোমার কথা মনে হলে আমার সামনে

নিঃশব্দে একটা বিকেল এসে দাঁড়ায়

তোমার শাড়ির আঁচলে ঝুলে আছে পুণ্ড্রনগর

সভ্যতার আলো-অন্ধকারের বিনয়

তুমি পাহাড়ের মতো নীরব সবুজ কৌতূহল 

যে পাহাড় কথা বললে কুয়াশা কেটে যায় 

শিলা দেবীর ঘাটে হেঁটে আসে এক আশেক

পাথরের শরীরে আঁকা হয় প্রাচীন পুঁথি 

তুমি খরস্রোতা নও এক অচেনা পানির নহর

যে পানিতে ভাসতে থাকে বন্ধুর পায়ের ছাপ

সাশেনা, মাটির দেহ আঁধারে মিশে গেলে

অচেনা নোঙরে আবিষ্কার হয় বিস্মিত আবেগের চিঠি 

ভাষার ঢেউয়ে অস্তমিত সূর্য খুঁজে পায়

শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে জ্যোৎস্নার উঠোন

বন্ধুত্বের প্রাচীন দর্শনে

যে পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকে অচেনা কৃষকের হাত ধরে 

তার পাদদেশে পাওয়া যায় 

গভীর সমুদ্রে লুকিয়ে থাকা মাছেদের ঘ্রাণ 

সাশেনা, দুপুরে ভাতঘুমে হেমন্তের বর্ণমালা হেঁটে আসে 

বন্ধুত্ব মানে ঠান্ডা বরফ কুচির ভেতর একসাথে হাঁটা

চড়ুই পাখির নীরবতার মতো চুপ থাকা

হারিয়ে যাওয়া জীবনের গানে

সাগরের দুয়ার খুলে যাওয়া

মানুষ সময়ের বিন্দু ডিঙিয়ে গেলে

রূপ বদলায়, হৃদয়ের গভীরে রেখে যায় অতীত স্মৃতি 

তোমার নামে বাতাসে নবান্নের প্রসন্ন হাওয়া বয়ে যায় 

ইতিহাসের রজনীগন্ধায় শুয়ে আছে মৌমাছি 

আসন্ন বন্ধু দিবসে কাপাচিনোয় হোক বোঝাপড়া