‘মবি ডিক’ ও তার স্রষ্টা

তার সবটুকু ঘৃণা, ক্রোধ, প্রতিশোধস্পৃহা ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার তীব্র বাসনা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এই উপন্যাসে।

সরকার মাসুদসরকার মাসুদ
Published : 30 Nov 2022, 12:48 PM
Updated : 30 Nov 2022, 12:48 PM

উপন্যাসের ক্ষেত্রে মার্কিন কথাশিল্পীরা বিষয়বস্তু ও শৈলী উভয় দিক থেকেই অসাধারণ সৃষ্টি-দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এ কথা যেমন অতীতের ন্যাথানিয়েল হর্থন, হেরমান মেলভিল, জ্যাক লন্ডন, স্কট ফিটজিরাল্ড, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জন স্টেইনবেক প্রমুখের বেলায় সত্য, তেমনি সাম্প্রতিককালের কুর্ট ভনেগাট, এলিস ওয়াকার, থমাস পিনচন প্রমুখের বেলায়ও প্রযোজ্য। ভেবে দেখুন, জ্যাক লন্ডনের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস The sea wolf-এ সমুদয় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে একটা সমুদ্রগামী জাহাজের ভেতর। গ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৯০২ এবং সেই সময়ের বিচারে (এখনও তো) এটা নতুন আইডিয়া যে, একটা উপন্যাসে ধারণকৃত সবকিছু ঘটছে একটা জাহাজে। ন্যাথানিয়েল হথর্ন তাঁর The scarlet letter উপন্যাসে শরীরের পবিত্রতার চেয়ে মনের পবিত্রতার ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন এবং নির্যাতিত নারীর মানসসঙ্কট অত্যন্ত কুশলী হাতে উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর কলমে। ইনিও সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা লেখক। তবে Moby dick উপন্যাসে হেরমান মেলভিল যে কাণ্ড ঘটিয়েছেন তা একেবারে তুলনারহিত। এই বই তো নিছক তিমি শিকারের ভয়ানক গল্প নয়, এটা প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধেরও গল্প। ক্ষোভ বা ক্রোধের মতো রিপুর জয় হয়েছে এখানে। তিমি শিকার যে রীতিমতো এলাহি কারবার এবং তিমি সংশ্লিষ্ট তথ্য ও জ্ঞান একজন লেখককে কতখানি বিশিষ্টতা দিতে পারে তা আদৌ বোঝা যাবে না উপন্যাসটি আদ্যোপান্ত পাঠ না করলে। হেরমান মেলভিলের জন্মসাল ১৮১৯; জন্মস্থান নিউ ইয়র্ক সিটি। তাঁর পিতা ছিলেন মোটামুটি সফল ব্যবসায়ী। মেলভিলের বয়সন্ধিকালে তার আর্থিক অবস্থার পতন ঘটে। এক পর্যায়ে তিনি দেউলিয়া হয়ে যান। ফলে অতিরিক্ত পরিশ্রম ও চাপের কারণে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং দু’বছর পর তার মৃত্যু হয়। অর্থ উপার্জনের জন্য মেলভিল নানারকম কাজ করেছিলেন। সেলসম্যান, খামারের কৃষক, স্কুলের শিক্ষক, ব্যাংকের কেরানি প্রভৃতি বিচিত্র পেশার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। জীবনের অনেক অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক এবং আশা-নিরাশার দোলাচলের সঙ্গে তিনি পরিচিত হন নিতান্ত অল্প বয়সেই। তবে যে-সব কাজ তাকে করতে হয়েছিল তার মধ্যে কেবিন বয়-এর চাকরিটি ছিল সব চাইতে ব্যতিক্রমী ও রোমাঞ্চকর। ওই চাকরি নিয়ে মেলভিল ১৮৩৯ সালে একটি সমুদ্রগামী জাহাজে উঠে পড়েন। জাহাজটি আমেরিকা থেকে ইংল্যান্ডের লিভারপুল পর্যন্ত যেতো, আবার ফিরে আসতো একই পথ ধরে। কেবিন বয় হিসাবে মেলভিল প্রতিকূল ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। The sea wolf, The white fangসহ আরও কিছু লেখায় জ্যাক লন্ডন প্রতিকূল আবহাওয়া ও বিচলিত সতর্ক মনের যে গভীর পরিচয় রেখেছেন তারই অন্য প্রকাশ আমরা লক্ষ করি হেরমান মেলভিলের উপন্যাসে। Redburn, white jacket, Billy Budd এবং বিশেষভাবে Moby dick-এ হিংসা-প্রতিহিংসা, সহনশীলতা ও অভিজ্ঞতা লব্ধজ্ঞানের যে বিপুল সমাহার আমরা প্রত্যক্ষ করি তা মার্কিন কথাসাহিত্যের ইতিহাসে অতুল কারিগরদের নামের তালিকায় একেবারে প্রথম দিকেই তার স্থান বলে আমরা মনে করি।

মেলভিল ‘আকুশনেট’ নামের তিমি শিকারের জাহাজের নাবিক ছিলেন। ১৭ মাস পর জলযানটি ‘মার্কুইসাস’ দ্বীপে পৌঁছালে তিনি নেমে পড়েন ও পালিয়ে যান। এই পলায়ন নির্বিঘ্ন ছিলো না, কেন না নরখাদক আদিবাসী লোকজনের সামনে তিনি পড়ে গিয়েছিলেন। যাহোক, শেষ পর্যন্ত আরেকটি তিমি শিকারের জাহাজে উঠে তিনি রক্ষা পান। ওই অস্ট্রেলিয়ান জাহাজের নাবিকগণ এক পর্যায়ে ক্যাপ্টেনের একনায়কতন্ত্রী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ওই দ্রোহের পক্ষে ছিলেন মেলভিলও। সেই অপরাধে তাঁকে কিছুকাল বন্দি থাকতে হয় তাহিতির কারাগারে। ছাড়া পাওয়ার পর তিনি মার্কিন রণতরী ‘ইউনাইটেড স্টেটস’-এ নাবিকের চাকরি নেন। দেড় বছর জাহাজে কাটানোর পর ১৮৪৪-এর শেষ দিকে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

দেখা যাচ্ছে, মেলভিলের কর্মজীবনের বারো আনা বা তারও বেশি জুড়ে আছে সমুদ্র। জাহাজের চাকরির সুবাদে তিনি অসংখ্য নেতিবাচক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। ক্যাপ্টেন ও তার তৈরি সিন্ডিকেট কর্তৃক যে-সব অন্যায় কাজ ও সাধারণ নাবিকদের ওপর যে-ধরনের নির্যাতন করা হতো তা তাঁকে এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে, সেইসব অভিজ্ঞতা তিনি লেখার কাজে প্রয়োগ না করে পারেন নি। এ প্রসঙ্গে সর্বাগ্রে মনে পড়ে Moby dick উপন্যাসটি। আবার Tepeeতে দেখতে পাচ্ছি, মেলভিল অবিস্মরণীয় দক্ষতায় তুলে ধরেছেন তার মার্কুইসাস দ্বীপপুঞ্জে অর্জিত অভিজ্ঞতা।

Moby dick প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৫০-এ। এই উপন্যাস এক পৌরষদীপ্ত রচনা। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এতে কোনো নারী চরিত্র নেই। সামান্যতম প্রেম-ভালোবাসা নেই। সহানুভূতি বা সহমর্মিতার স্থানও এখানে অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। নারী-পুরুষের সম্পর্কের টানাপড়েন এ গ্রন্থে অনুপস্থিত। সুতরাং তখন পর্যন্ত চালু উপন্যাসের সুপরিচিত প্রতিমার বিপরীতে নতুন ইমেজ নিয়ে হাজির হওয়া উপন্যাস Moby dick পাঠক মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল। আর এটাই ছিল স্বাভাবিক। মার্কিন উপন্যাসের পাঠকদের একটি বড় অংশ মহিলা। কাজেই নারী বা প্রেমবর্জিত কাহিনী তাদের ভালো না লাগারই কথা। তবে মহিলা পাঠকবর্গের অগ্রসর অংশটি এই নতুন উপন্যাসকে স্বাগত জানিয়েছিল। তারা সংখ্যায় অগণন না হলেও অগ্রসর সাহিত্যরুচির বিচারে খুবই উল্লেখ্য। অন্যদিকে, এর লেখকও এই মর্মে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, তিনি এই গ্রন্থের মাধ্যমে বড় ধরনের একটি সৃষ্টিশীল কাজ সম্পন্ন করেছেন।

Moby dick এক বিশালকায় শ্বেত তিমি শিকারের গল্প। এটুকু বললে পুরোটা বলা হয় না। মেলভিল এই বইয়ে কেবল অশুভের অনিবার্য প্রভাব পরিধির কথা বলেননি; প্রায় গবেষকের ঔৎসুক্য নিয়ে তিমি সম্পর্কিত নানা তথ্য-উপাত্তও সন্নিবেশিত করেছেন। একটি চরম হিংসুটে, অকল্যাণী তিমিকে হত্যা করার জন্য মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে ‘পিকো’ নামধারী জাহাজের ক্যাপ্টেন। আহাব নামের এই মানুষটি অসমসাহসী, ভয়ানক জেদি ও একরোখা। ক্যাপ্টেন আহাব এক অবিস্মরণীয় চরিত্র। একই সঙ্গে জটিল ও দৃষ্টিআকর্ষণী। তার দেহ-মনের শক্তি অবিশ্বাস্য। পরাজয় মেনে নেয়া তার স্বভাববিরুদ্ধ। এমন নয় যে তার হৃদয়ে করুণা, স্নেহ-মমতা এসব নেই। কিন্তু বিশেষ বিশেষ অবস্থায় সে চরম নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারে। অবাধ্যতা তার কাছে অমার্জনীয়।

মানসিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ তার সহ্যাতীত। লেখক আহাব চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তোলার জন্য বেশি কথা ব্যয় করেননি। কয়েকটি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ, আবেগঘন দৃশ্যে আহাব যে ধরনের আচরণ করেছে সেসবের মধ্য দিয়েই জীবন্ত হয়ে উঠেছে চরিত্রটি। তার সম্বন্ধে লেখক বলেছেন, ‘তার নিজের জায়গায়, নিজের যথাযথ অবস্থানে কোনো মানুষ, কোনো শ্বেত তিমি বা কোনো দানবের সাধ্য নেই তার গায়ে আলতোভাবে আঁচড় কাটার।’ এহেন আহাবকে তুলনা করা হয়েছে বিশালদেহী লোমশ ভালুক, পাহাড়ি ঈগল এবং একাকী দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ এল্ম গাছের সঙ্গে। খাবার টেবিলে আহাব জার্মান সম্রাটের মতো আচরণ করে। জাহাজের ডেকে পায়চারি করার সময় তাকে যে কোনও ক্ষমতাধর সুপুরুষের মতো মনে হয়।

আহাব অবশ্যই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। মেলভিলের অসাধারণ সৃষ্টি। এ ছাড়াও লেখক তুলির কয়েকটি সুদক্ষ আঁচড়ে এঁকেছেন স্টারবাক, ফেদাল্লা, কুইকোয়েগ ও ইসমাইল নামের আরও কয়েকটি চরিত্রকে। ইসমাইল তো গল্পের কথক। উপন্যাস শুরু হয়েছে তাকে দিয়ে। শেষও হয়েছে তাকে দিয়ে। কাহিনির শেষে বাকি সবাই ধ্বংস হয়ে গেলেও টিকে থাকে একমাত্র ইসমাইল। লেখক তাকে বাঁচিয়ে রাখেন গল্পটা শেষ পর্যন্ত বয়ানের গরজেই। ইসমাইলের বেঁচে যাওয়ার বিষয়টি প্রতীকী বর্ণনায় ঋদ্ধ। জাহাজ ডুবে যাওয়ার পর একটা ওল্টানো কফিনকে আঁকড়ে ধরে সে ভাসতে থাকে। পরে তাকে উদ্ধার করে র‌্যাচেল নামধারী একটি জাহাজ। সমুদ্রে ভেসে থাকার সময় ইসমাইলের যে বিচিত্র অতীন্দ্রিয় অনুভূতি হয় তার অনবদ্য বর্ণনা আছে উপন্যাসে। সে এমনই সময় যখন ইসমাইলের মন সিদ্ধ এক আবেশে জড়ানো। মাংসাশী হাঙ্গরের দল তার পাশ দিয়ে চলে যায়। তার কোনও ক্ষতি করে না। আহাব ও ইসমাইল একসঙ্গে সমুদ্রযাত্রা আরম্ভ করেছিল। নাবিকদল ও শ্বেত তিমির মধ্যকার চূড়ান্ত লড়াইয়ে আহাব মৃত্যুবরণ করে। ইসমাইল বেঁচে থাকে সমৃদ্ধ জীবনবোধে স্নাত হওয়ার জন্য। তবে ক্যাপ্টেন আহাবের চরিত্রটি সবদিক থেকেই অনন্য ও ব্যতিক্রমী। তার মধ্যে মহাকাব্যের নায়কের মতো ব্যাপ্তি দেখি আমরা।

প্রচল সংজ্ঞা অনুসারে আহাব এই কাহিনীর নায়ক। কিন্তু শাদা তিমি Moby dickকে আমার নায়কের প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য এক নায়ক বলে মনে হয়। কেননা তাকে কেন্দ্র করেই শিকারিদের যতো আবেগ-উৎকণ্ঠা, আর তার বিরুদ্ধেই মরিয়া হয়ে ওঠা নাবিকদের সমুদয় ক্ষোভ। যুদ্ধের শেষে কেবল ইসমাইল ছাড়া সবাই, সবকিছু শেষ হয়ে যায়, এমনকি পরাক্রমশালী শ্বেত তিমিটিও। আহাবের দৃষ্টিতে ওই তিমি পৃথিবীর সমস্ত অশুভর প্রতীক। তার সবটুকু ঘৃণা, ক্রোধ, প্রতিশোধস্পৃহা ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার তীব্র বাসনা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এই উপন্যাসে।

প্রথম প্রকাশের সময় Moby dick পাঠক মহলে সাড়া জাগাতে পারেনি, বরং বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছিল। এতে কিছুটা হতাশ ও হতোদ্যম হয়েছিলেন তিনি। এর ফলে অ্যাডভেঞ্চার কাহিনির ঐতিহ্য থেকে সরে এসে মেলভিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক রূপকের আশ্রয় নেন ঠিক যেমনটা দেখতে পাই Mardy উপন্যাসে। অবশ্য এতেও তিনি সফল হননি। তবে আবির্ভাবের অনেক বছর পর পাঠক বুঝতে পেরেছে অ্যাডভেঞ্চার স্টোরিই এই লেখকের আসল জায়গা। তার প্রতিভার সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছে সেখানেই। Moby dick-এর পাতায় পাতায় আছে বাইবেলের নানা অনুষঙ্গ। এছাড়া অ্যাডভেঞ্চার কাহিনিতে সুলভ উদ্ভট বিষয়-আশয়ের সঙ্গে জটিল ও গভীর সব ভাবনা যুক্ত করতে পেরেছেন লেখক। এই জায়গায় ঔপন্যাসিক মেলভিল নতুন ও স্বতন্ত্র।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক