এম এন রায়: মেক্সিকো-প্রবাসের স্মৃতি-৫

কিছুমাত্র সাহিত্যঘেঁষা এমন কোনো পত্রিকা সম্পাদনার কণামাত্র যোগ্যতা নেই মহিলার, কিন্তু যৌন আবেদনে আকৃষ্ট হয়ে তাকে ঘিরে যশোপ্রার্থী তরুণ-যুবা লেখকদের একটি বলয় গড়ে উঠেছে।

প্রিসিলা রাজপ্রিসিলা রাজ
Published : 29 Nov 2023, 07:44 AM
Updated : 29 Nov 2023, 07:44 AM

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার আরবেলিয়া গ্রামে শাক্ত ব্রাহ্মণ ভট্টাচার্য পরিবারে ১৮৮৭ সালে জন্ম নরেন্দ্রনাথের যিনি পরে এম এন রায় হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামী, কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সমধিক পরিচিতি উদার মানবতাবাদের (radical humanism) তাত্ত্বিক ও প্রবক্তা হিসেবে। বিপ্লবী জীবনে তাঁকে বহু ছদ্মনাম নিতে হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি প্রয়াত হন এই মনিষী।

মেক্সিকো সফর তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। এক অর্থে তার রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও মানবেন্দ্রনাথের মেক্সিকো-সফর বড় ধরনের বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ইংরেজিতে লিখিত তাঁর স্মৃতিকথা Memoirs ১৯৬৪ সালে দিল্লী থেকে প্রকাশিত হয়। ৬২৮ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ স্মৃতিকথার শতাধিক পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে মেক্সিকো বাসের রোমাঞ্চকর ও ঘটনাবহুল স্মৃতি। মূল গ্রন্থের ৫ম অধ্যায় থেকে ২৯ অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সেই স্মৃতিচারণ। স্মৃতিকথার এই নির্বাচিত অংশ কলামিস্ট অনুবাদক প্রিসিলা রাজ-এর অনুবাদে ধারাবাহিকভাবে বাংলা ভাষায় প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। আজ থাকছে মেক্সিকো সফরের পঞ্চম পর্ব। এই অনুবাদে মূল বইয়ের পর্ব-বিন্যাস অনুসরণ ও উল্লেখ করা হয়েছে।

মেক্সিকোর দিনগুলি

সন্ধ্যায় ঘনিয়ে এলে পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎস্থলে হাজির হলাম। শহরের আবাসিক এলাকার একটা সড়ক সেটা। শান্ত, সুন্দর বাঁধানো রাস্তা, পরিষ্কার, দু’পাশে গাছের সারি। মেক্সিকো সিটির সন্ধ্যা সত্যি উপভোগ করার মতো। অলসভাবে হাঁটতে হাঁটতে দূরের বরফঢাকা অগ্নিপাহাড় থেকে মৃদুমন্দ গতিতে ভেসে আসা বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলাম। কিন্তু মাথায় ঝোড়োগতিতে কাজ চলছিল। গত কয়েকদিনে বিশেষ করে শেষের কয়েক ঘণ্টায় যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে আমি কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। এরপরে কী অপেক্ষা করছে সেই ভাবনাই আমাকে অধিকার করে বসেছিল। এই সময় পর্যটক বহন করার বিরাটকায় একটা গাড়ি পাশ দিয়ে বেরিয়ে গা ছমছমে নিঃশব্দে অদূরে গিয়ে দাঁড়াল। গাড়ির দরজা খুলে গেল। এবারও কোনো শব্দ হলো না। আমি গিয়ে সামনে চালকের পাশে বসলাম। গাড়ি চলা শুরু করলে পেছনে তাকালাম আর কেউ আছে কিনা দেখতে। যমজ ডিমপোচকে দেখতে পেলাম। গদিআঁটা বিপুল কেদারার ভেতরে তাদের শরীরের পুরোটাই প্রায় ঢুকে গেছে। কেউই কোনো আওয়াজ করল না। বেশি দূর যেতে হলো না। গাড়ি রেখে চালক বের হয়ে আমাকে অনুসরণ করার জন্য ইশারা করলেন। ডিমপোচরা গাড়িতেই বসে রইল।

রাস্তার ওপর একটা বাসার সদর দরজা খুলে গেল। ভেতরে পা রাখলাম আমরা। ঢোকার প্রায় পরপরই পূর্ণ সজ্জিত একটা অভ্যর্থনা কক্ষে উপস্থিত হলাম। আমার সঙ্গী পরনের ভারী কোটটি খুলে অকারণে উর্দিধারী বেয়ারার দিকে ছুড়ে দিলেন। বেয়রাাটি মুন্সিয়ানার সঙ্গে সেটা লুফে নিল। তারপর মাথার নৌবাহিনী অফিসারের ক্যাপও একটা চেয়ারের ওপর ছুড়ে ফেললেন। মোটাসোটা দেখতে লোকটি মধ্যবয়সী, মাথায় কাঁচাপাকা নরম চুল ও ইস্পাতনীল চোখ। সব মিলিয়ে বেশ একটা ওজনদার চেহারা। ধাক্কা দিয়ে সামনের দরজাটি খুলে সামরিক কায়দায় সরে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে ভেতরে আসতে ইশারা করলেন। ভেতরের কক্ষটি লম্বা, ছাদ কিছুটা নিচু, দেওয়ালে গাঢ় পালিশ দেওয়া কাঠের প্যানেল। মেঝেয় পুরু গালিচা।

আমরা ঢুকতেই ঘরের শেষ প্রান্তের পুরু চামড়ার গদিআঁটা কেদারা থেকে দুজন পুরুষ মানুষ উঠে দাঁড়ালেন। দেখামাত্র চিনতে পারলাম জার্মান লোক দু’টোকে। ভারতে অস্ত্র পাচারের উদ্দেশ্য নিয়ে জাভায় এসেছিলেন। এঁদের একজন সেনা কর্মকর্তা। আমার ধারণা ক্যাপ্টেন। অপরজন ঔপনিবেশিক সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। শোনা যায় সেনা কর্মকর্তাটি রাজকীয় সেনাবাহিনী ইমপেরিয়াল জেনারেল স্টাফের দূত। তবে ধনী ও ক্ষমতাধর হেলফেরিক ভ্রাতৃকূল ভদ্রলোকের সঙ্গে যেভাবে বিনয়ের অবতার হয়ে আচরণ করে থাকেন তাতে তিনি যে একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সেটা বোঝাই যায়। তাঁদের বড় ভাই কাইজারের শেষ অর্থমন্ত্রী ছিলেন। একইসঙ্গে শাখ্ট্ -এর আগে রাইখ্স্ব্যাংকের প্রেসিডেন্টও ছিলেন। দূরপ্রাচ্যে জার্মান ব্যবসার বড় অংশের মালিকানা ছিল এই হেলফেরিক ভ্রাতৃদের। দূরপ্রাচ্যে জার্মান সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তারের ব্যর্থ অভিযানের অগ্রদূতও বলা যায় তাঁদেরকে। তাঁদেরই অর্থ যোগানে ভারতে ব্রিটিশদেরকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা হয়।

মেক্সিকোর পুনর্মিলন আমাদের সবাইকেই বেজায় খুশি করে তুলল। পুরানো বন্ধুদের মধ্যে প্রাথমিক কুশলাদি বিনিময়ের পর গৃহকর্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাঁরা “জার্মানির কমান্ডার ভন কে নিগ” বলে। নরডিক জাতিভুক্ত দৈত্যটি আবারও গোড়ালিতে গোড়ালি ঠেকিয়ে ঠকাশ করে স্যালুট করলেন। অধস্তন জাতির প্রতিনিধিকে স্যালুট ঠোকার সময় স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মুখভাব আড়ষ্ট দেখাল। যাই হোক, যুদ্ধের কাল এটা, আর যুদ্ধ ও প্রেমে অন্যায় বলে কিছু নেই।

বিখ্যাত জার্মান সাবমেরিন ডয়েশলান্ড ব্রিটিশ অবরোধ ভেঙে দ্বিতীয়বারের মতো মূল্যবান রাসায়নিক রঞ্জক নিয়ে আমেরিকার বন্দরে নোঙর করার পরপরই আমেরিকা যুদ্ধে যোগ দেয়। জার্মান সাবমেরিনটি আটক হয়। সব ক্রুকে বন্দী করা হয়। ক্যাপ্টেন সাহেব সেসময় জাহাজে ছিলেন না। আরো অনেক স্বদেশীর মতো তিনিও পালিয়ে মেক্সিকোয় ঢুকে পড়েন।

পুনর্মিলন ও পরিচয়পর্বের আনুষ্ঠানিকতা সারা হলে কাজের আলোচনায় বসলাম। পানীয় পরিবেশিত হলো। আমি যথারীতি মাপ চেয়ে নিলাম। জাভাতেও আমি যে একই কাজ করেছিলাম তা স্মরণ করে পুরানো বন্ধুরা আমোদিত হলেন। না বলার মন্দ স্বভাবটাকে নৈতিক উচ্চমন্যতার স্মারক হিসেবে গর্ববোধ করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম অনেকদিন হয়। বিভিন্ন সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে পিউরিটান ধ্যানধারণার খোলসটা পাতলা হয়ে এসেছিল। কিন্তু তেমন উপলক্ষের অভাবে মদ্যপান শুরু করিনি তখনও।

দু’বছর আগে শেষ দেখা হওয়ার পর থেকে আজ অবধি যেসব অভিযান করা হয়েছে তার পারস্পরিক বিবরণ বিনিময় হলো। ক্যাপ্টেন সাহেব ইতিমধ্যে পিতৃভূমির প্রতি অজানা উল্লেখযোগ্য কোনো সেবার পুরস্কারস্বরূপ মহাআকাঙ্ক্ষিত আয়রন ক্রসে ভূষিত হয়েছিলেন। আমার কাছে তিনি পরিকল্পনার বিস্তারিত বিবরণ জানতে চাইলেন যেটা কিনা আমি জার্মান সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম। নিজের কৌতূহলের কারণও ব্যাখ্যা করলেন এই সামরিক কর্মকর্তা। কাইজারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য গেহেলম্রাট ভন অমুক সম্রাটের পক্ষে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে শিগগিরি মেক্সিকোয় পদার্পণ করবেন। এখানে বসে তিনি আমেরিকা ও দূরপ্রাচ্যে জার্মান কূটনীতিক এবং গুপ্তচরদের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করবেন। এরপর বার্লিনের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তাঁর প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেবেন। গোপন এই সংবাদটি অবহিত হতে পেরে যথাবিহিত অভিভূত হলাম এবং আমার পরিকল্পনার বিস্তারিত তাঁর সামনে তুলে ধরলাম। যদিও বিষয়টা সম্পর্কে আমার আগ্রহ ততদিনে কমে এসেছিল। চীন আমার পরিকল্পনার যথাযথ গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি আর তার ফলে পর্যাপ্ত সাহায্য করেনি (এটা অবশ্য তাঁদের মতামত) জেনে তাঁরা তিনজনই ক্রোধান্বিত হলেন।

তিন জার্মান এবার মাতৃভাষায় বাতচিত করতে শুরু করলেন। ভাষাটা তখনও জানতাম না বলে আলাপের বিষয়বস্তু বুঝতে পারছিলাম না, তবে গরম গরম আলোচনা চলছে সেটা বোঝা যাচ্ছিল। তারপর জাহাজের ক্যাপ্টেন জানতে চাইলেন কেন আমি নিউইয়র্ক থেকে সরাসরি বার্লিন চলে গেলাম না। কেমন করে যেতাম? “কেন? আমিই তো নিয়ে যেতে পারতাম। ডয়েশলান্ডের প্রথম ফিরতি যাত্রাতেই তো আপনি আসতে পারতেন।” দারুণ একটা সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার অনুভূতি হলো আমার। বার্লিনে যেতে পারিনি সেজন্য না। দুঃখটা লাগল অবরোধ ভেঙে তিন তিনবার আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া জগদ্বিখ্যাত সাবমেরিনে চড়ে সমুদ্রাভিযানে যাওয়া হলো না বলে। কিন্তু তাঁর সঙ্গে যোগাযোগই বা করতাম কীভাবে? কেন, দূতাবাসের মাধ্যমে! এই বুদ্ধিটা অবশ্য আমার মাথায় আসেনি। কিন্তু ওঁর মাথায় যে এসেছিল সেটা স্পষ্ট। মহাগুরুত্বপূর্ণ মিশন মাথায় নিয়ে আমি যখন আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায়, উনি তখন নিশ্চয়ই এই উপায়ে যোগাযোগের কথা ভেবেছিলেন।

অতএব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে হাত বাড়ানোর জন্য জার্মানি যে প্রস্তাব দিয়েছিল সেটাকে তারা সত্যি সত্যি কতটা গুরুত্ব দিয়েছিল বা আগ্রহী ছিল তা পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী নিউইয়র্কে অবস্থানরত নেতার তৈলাক্ত স্বভাব। তিক্ত ভাবনাটা নিজের মধ্যেই রাখতে হলো। বিদেশীদের কাছে এসব কথা প্রকাশ করা যায় না। ওদের ওপর আস্থা চলে গিয়েছিল আমার। নিউইয়র্কের রহস্যময় বাড়ির অদ্ভুত বাসিন্দাদের আচরণের মধ্যে একটা আঁশটে গন্ধ ছিল। কিন্তু ঐ ঠগ যে আমার সঙ্গে বা পরিকল্পনাটার সঙ্গে প্রতারণা করবে তা ভাবতে পারিনি। কিন্তু সে ঠিকই জানত, যে স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করার ভান করছে সে, তার সঙ্গে আসলে বেঈমানি করছে। যদিও তাকে আমার পরিকল্পনার কথা কিছু জানাইনি; কিন্তু সে জানত যে আমি ভারত থেকে অতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি বার্লিনে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। জানত যে, বার্লিনে অবস্থানরত ভারতীয় বিপ্লবী কমিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে এনেছি আমি।

জার্মান দূতাবাসকে ব্যাপারটা জানানোর দায়িত্ব ছিল তার যা সে পালন করেনি।

তবে পরবর্তীকালে এই প্রতারণাকে একধরনের কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই স্মরণ করতাম। ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য তো বটেই, অন্যদের জন্যও হয়তো এই ঘটনা শাপে বর হয়ে এসেছিল। আমার জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল এর ফলে। আমাকে অন্ধগলি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছিল এই ঘটনা। জার্মান ষড়যন্ত্রের ভারতীয় ধ্বংসাবশেষ হওয়ার করুণ পরিণতি থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল তা। পরবর্তীকালে এদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। ততদিনে তাঁরা একেকটি যাদুঘরের বস্তু। মহাশক্তিধর জার্মান সেনাবাহিনী বিধ্বস্ত। যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক পরাভূত সাম্রাজ্য ছেড়ে পলায়ন করেছেন। পুরাতন রাজ্যশাসনের ধ্বংসাবশেষ উড়িয়ে নয়া এক বিপ্লব জেগে উঠেছে। যুদ্ধের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত জার্মানি অনাহারে ধুঁকছে। কিন্তু এরই মধ্যে নতুন ভাবনা-চিন্তার ঢেউ খেলে যাচ্ছে, নতুন এক সাংস্কৃতিক ঢেউয়ের আঘাত লেগেছে তার শরীরে। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই সেখানকার ভারতীয় বিপ্লবীদের স্পর্শ করতে পারেনি, যাঁরা যুদ্ধের সময় বার্লিনে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন কাইজারের বাহিনীর সহযোগিতায় দেশকে শত্রুমুক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে। ১৯২০ সালে ইউরোপের পুবসীমানায় যখন রুশ লালফৌজের কামান দাগার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো, এমন কী তখনও মহাদেশটির কেন্দ্রে বসে ভাতাভোগী এসব বিপ্লবী সমাজতন্ত্রকে বিদ্রূপ করে যাচ্ছিলেন। রুশ বিপ্লব যে দীর্ঘদিন টিঁকে যেতে পারে সেটাও তাঁরা বিশ্বাস করতেন না। তৈলাক্ত সেই নেতা ঠগবাজি না করলে আমিও হয়তো তাঁদেরই একজন হতাম। ইতিহাসে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া অদ্ভুত বিপ্লবীদের দলে ঠাঁই হতো আমার।

কিন্তু মেক্সিকোতে থাকার সময় ঐ ঠগের দ্বারা প্রতারিত হওয়ার ঘটনায় প্রচণ্ড ক্ষোভ হয়েছিল আমার। আমি তখন বার্লিনের ভারতীয় বিপ্লবী কমিটি ও তাদের প্রতারক এজেন্টদের ওপর দিয়ে গিয়ে জার্মান হাই কমান্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিলাম। মেক্সিকোতে যে দূতের আসার কথা তিনি যদি বার্লিন থেকে আমার পরিকল্পনার অনুমোদন করাতে পারেন তাহলে আবার চীনে ফিরে গিয়ে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করব বলে ঠিক করলাম। এক বছর হয় ওখান থেকে চলে এসেছিলাম। ইতিমধ্যে অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। ওখানে কাজ করতে হলে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। এর জন্য আমাকে অর্থসহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হলো। আমি সম্মত হলাম। অর্থের যোগান জরুরি হয়ে পড়েছিল। আমার কাছে যে সামান্য অর্থকড়ি ছিল মেক্সিকো সিটিতে পৌঁছানোর পর গত এক সপ্তাহে তার প্রায় সবই খরচ হয়ে গেছিল। বেশিরভাগটা গেছে হোটেলের বিল মেটাতে। অপ্রত্যাশিত এই অর্থাগমকে সুস্বাগতম জানালাম তাই। কয়েকদিন পরে সাক্ষাতের দিন ঠিক করে উঠে পড়লাম। খুব বেশি দেখা করাও উচিত হবে না আমাদের। দূতের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতে হবে। বাসা থেকে একাই বেরিয়ে এলাম। পূর্বনির্দেশ অনুযায়ী বাঁয়ে হেঁটে একটা মোড়ে পৌঁছে অপেক্ষমান গাড়িতে উঠে পড়লাম। গাড়িটা আমাকে ঠিকানা জিজ্ঞেস না করেই বাসায় পৌঁছে দিলো। এর নাম জার্মান কার্যকারিতা। তবে এত ঢাকঢাক গুড়গুড়, এত ষড়যন্ত্রমূলক পদ্ধতি, এসবের দরকার ছিল কি? উত্তরটা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখতে হয়েছিল আমায়।

পরদিন কমবয়সী এক লোক দেখা করতে এল। পোশাকআশাকে ফুলবাবু গোছের। সাধারণ কুশল বিনিময়ের পর এল পুয়েবলো’র সম্পাদকের চিঠি বের করে দিলো। তাতে পত্রবাহকের পরিচয় উল্লেখপূর্বক সন্ধ্যায় সস্ত্রীক সম্পাদকের সঙ্গে তাঁর গৃহে নৈশাহারের নিমন্ত্রণের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। পত্রবাহক আমাকে গন্তব্যে নিয়ে যাবেন। এছাড়া, ইনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান যুবক এবং কিছু শিক্ষাদীক্ষার অধিকারী। আমার যদি একান্ত সচিব দরকার হয় তবে এনাকে সে কাজে অনায়াসে নিযুক্ত করা যায়। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত জানতাম না পরের বেলার খাওয়া খরচ কোত্থেকে যোগাব। একান্ত সচিব রাখার পয়সা কোথায়? এখানকার উঁচু মহল থেকে আমার ওপর যে নেকনজর বর্ষিত হচ্ছে তার কারণ কি এই যে, তারা আমাকে ছদ্মবেশী পকেটভারী ভারতীয় রাজা ঠাউরে নিয়েছে? কল্পনাতেই এমনটা সম্ভব! সন্ধ্যায় আমাকে তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে যুবকটিকে বিদায় করলাম।

সেদিনের নৈশাহারের মধ্য দিয়ে মেক্সিকোর পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে উঁকি দেওয়ার প্রথম সুযোগ এল আমার। আনুষ্ঠানিক ডিনার পার্টি নয়। আমি বাদে আরো দু’জন অতিথি উপস্থিত। একজন অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক তরুণী, আরেকজন বোকা বোকা চেহারার পুরুষ। রীতিমাফিক আমাকে প্রথমে গৃহকর্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হলো: “ইনি দোনঞা অমুক এবং ইনি অমুক।” স্নেহময়ী মাতৃমূর্তিটি আপাদমস্তক কালো রেশমে মোড়া, মাথায় সূ্ক্ষ্ণ লেসের ম্যানতিলা যা কিনা স্প্যানিশ নারীদের ধ্রুপদী মস্তকাবরণী। আড়ষ্ট ভঙ্গীতে যতটা চৌকসভাবে সম্ভব অভিবাদন জানালাম। স্বামীর কথার সূত্র ধরে তিনি মাতৃভাষায় কিছু বললেন। “সের্বিদর দে উস্তেদ, সেনঞর, আকি তিয়েনে উস্তেদ সু কাসা।” (আপনার সেবা করতে প্রস্তুত, মহোদয়। এ তো আপনারই গৃহ।) গৃহ যখন আমার তাহলে পরদিন এসে যদি উঠি, কী বলবেন এনারা? স্পষ্টতই, প্রস্তাবটি আক্ষরিক অর্থে দেওয়া হয়নি। সীমাহীন আতিথ্যের রূপক হিসেবে বলা হয়েছে...

অতিথিদের মধ্যে তরুণীটি মেক্সিকোর প্রথম ও একমাত্র নারী বিষয়ক মাসিক পত্রিকাটির সম্পাদিকা। পত্রিকার নাম “লা মুহের মদের্না”( আধুনিক নারী)। তাকে দেখে আমার মোটেই নীল মোজা আন্দোলন বা সাফরাজেটদের কেউ বলে মনে হলো না। আলগা চৌকস ধরনের সাদামাটা মহিলা বলেই মনে হলো। চুলের কাঁটার আগায় ধরা সিগারেট ফোঁকাই তার একমাত্র দৃশ্যমান আধুনিকতা। কাঁটাটা চুলেই আটকানো থাকে, কেবল দরকারমতো বের করে নেওয়া হয়। জানতে পেলাম কাররান্সা দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিল মেয়েটি। ওর সেবায় খুশি কাররান্সা এই পদ উপহার দিয়েছেন। কিছুমাত্র সাহিত্যঘেঁষা এমন কোনো পত্রিকা সম্পাদনার কণামাত্র যোগ্যতা নেই মহিলার, কিন্তু যৌন আবেদনে আকৃষ্ট হয়ে তাকে ঘিরে যশোপ্রার্থী তরুণ-যুবা লেখকদের একটি বলয় গড়ে উঠেছে। তাদের কেউ কেউ কবিতা লেখে নিশ্চয়ই। তবে সেগুলো তাকেই উদ্দেশ্য করে লেখা এবং অবধারিতভাবে তা সম্পাদকের লেখা হিসেবে প্রকাশিত হয়। মেক্সিকোবাসের প্রথম দিনগুলোতে তার সঙ্গে আমার বেশ অনেকবারই সাক্ষাৎ হয়েছিল।

কমবয়সী পুরুষটি সম্ভবত সম্পাদক মহিলার সঙ্গী হিসেবে এসেছিল। তবে নিজে সে কিছু সামাজিক গুরুত্বের অধিকারী। বিদেশমন্ত্রীর জনৈক ভাই সে। নিজে অবশ্য ব্যাংকের চাকুরেমাত্র। সেইসাথে জাতীয় টেনিস চ্যাম্পিয়ন। আকাট বোকা হলেও লোকটি কয়েকটি ভাষায় কথা বলতে পারত। ওর কাছেই আমি টেনিস খেলতে শিখি। তার আগে খেলাটাকে আমার ঠিক পুরুষালি বলে মনে হতো না। শিষ্যের ব্যাপারে সে খুব গর্বিত ছিল কারণ অচিরেই কোর্টে চ্যাম্পিয়নসাহেবকে ভালই দৌড় করাতে শিখে গিয়েছিলাম। ঐদিনের ডিনারে লা মুহের মদের্নার (মহিলাটিকে আমি এই নামেই ডাকতাম আর সে তাতে খুশিও হতো। অন্যরাও তাকে এই নামে ডাকতে শুরু করেছিল) সঙ্গী হয়ে তার উপস্থিত হওয়াটা কাকতালীয় ছিল না। ওখানে পা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিষয়টা আঁচ করি। পরদিন তার প্রমাণও পাই।

খাবার টেবিলে, বা আগে ও পরে কথাবার্তা খুব একটা জমল না। মহিলা দু’জনের কেউই ইংরেজি পারেন না। গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে ভাঙা ভাঙা ফরাসীতে কিছু কথা তাও বলতে পারছিলাম। লা মুহের মদের্না ফরাসীর ছিটেফোঁটাও জানে না, যদিও সব মেক্সিকান বুদ্ধিজীবীদের জন্য তা প্রায় মাতৃভাষার সমান। খাবার টেবিলে বা বৈঠকখানার সামাজিকতা সম্পর্কে আমার কোনো শিক্ষাদীক্ষা না থাকলেও মনে হচ্ছিল মহিলারা যেহেতু বুঝতে পারছেন না সেহেতু তাঁদের উপস্থিতিতে তিন পুরুষের জমাটি আলাপ শোভন নয়। আমার চোখে অদ্ভুত লাগলেও বাকি দুই পুরুষ কিন্তু খাঁটি মেক্সিকান ভঙ্গীতে ওদের দুজনকে হালকা চালে “মাপ করবেন” শুনিয়ে দিব্যি আলাপ চালিয়ে গেলেন। তবে এটা পরিষ্কার সেই সন্ধ্যা কারোরই একঘেঁয়ে লাগেনি এবং মাঝরাত পর্যন্ত আড্ডা চলেছিল। ডিনারের পর লা মুহের মদের্না বেশ তরতাজা হয়ে উঠে সঙ্গীর সঙ্গে স্প্যানিশে আলাপ জুড়ে দিলো। গৃহকর্ত্রী তাতে সমূহ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। তাঁকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে, ভাষা না বুঝলেও ধ্বনি শুনতে আমার রীতিমতো ভাল লাগছে। যেটা আসলে সত্যি। কথা অবশ্য লা মুহের মদের্নাই বলতে লাগল। ঘরের এমাথা-ওমাথা হাঁটতে হাঁটতে আর চুলের কাঁটায় ধরা সিগারেট দুলিয়ে অনর্গল বকে যাচ্ছিল সে। সঙ্গী মাঝে মাঝে দু’একটা শব্দ যোগ করতে যেতেই এক ঝাপটায় থামিয়ে দিচ্ছিল তাকে।

চলে আসার আগে গৃহকর্তা আমাকে একপাশে নিয়ে জানতে চাইলেন ভারতে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে একটা ধারাবাহিক লেখা এল পুয়েবলোর জন্য আমি লিখতে পারি কিনা। বললেন তিনি, “দেখুন, আমরাও তো একসময় আপনাদের মতো উপনিবেশ ছিলাম। আমাদের পূর্বপুরুষ যুদ্ধ করে স্প্যানিশ শাসকদের উচ্ছেদ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, মেক্সিকো এখনও প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়। আমরা এখনও স্বাধীনতা যুদ্ধ করে চলেছি। ফলে আপনাদের জন্য মেক্সিকোর জনগণের সহানুভূতি রয়েছে। তাছাড়া আপনাদের দেশ এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য দেশের জনগণের সংগ্রামের কথা জানতে পারলে আমাদের জনগণ অনেক উপকৃত হবে। আমরাও তো ইন্ডিয়ান। আমি খাঁটি ইন্ডিয়ান রক্তের অধিকারী।” আমার চোখ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর দিকে চলে গেল। শ্যামবর্ণ, সুপুরুষ বুদ্ধিমান এই চেহারা সর্বোত্তম মানের যে কোনো ভারতীয়র হতে পারে। নিবন্ধগুলো লিখতে সম্মত হলাম। কিন্তু ভাষা তো বাধা। আমি তো স্প্যানিশ জানি না। সান্তনা দিয়ে তিনি বললেন, খুব শিগগিরি আমি শিখে যাব। যতদিন না শিখছি ততদিন সকালের যুবকটি আমার লেখা ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে দেবে। এভাবে আমার একান্ত সচিব পদে তার নিযুক্তি ঘটল। পরদিন সকালে যুবকটি আমার বাসায় এসে হাজির। এল পুয়েবলোর জন্য প্রথম লেখাটা আমি কবে অনুবাদের জন্য দিতে পারব? সঙ্গে এটাও জানিয়ে দিলো এর জন্য তার একটা টাইপরাইটার কেনা প্রয়োজন। অলিভার টাইপরাইটারই কিনতে হবে কারণ ওটাই সারা লাতিন আমেরিকায় চলছে। আমরা মনে হলো কোনো একটা অদৃশ্য হাত ঘটনাবলি যেন দ্রুত ঠেলে দিচ্ছে। আরো একবার, কাণ্ডজ্ঞানে জারিত স্বর্গীয় অস্তিত্বে বিশ্বাস আমাকে সতর্কবার্তা দিলো সামনেই আরো কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

তবে ঈশ্বর যেন আমার বিশ্বাস ফিরে পেতে বদ্ধপরিকর। দুপুরবেলা উদয় হলেন সেনঞর ফের্নান্দেস। বিদেশমন্ত্রীর এই ভাইয়ের সঙ্গেই আগের রাতে দেখা হয়েছিল। তিনি জানালেন, তাঁদের একজন গ্রাহক আমাকে দশ হাজার পেসো প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। মেক্সিকোর মুদ্রা পেসোর বিনিময়মূল্য তখন ডলারের অর্ধেক। সেসময়কার সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা পেসো। কাররান্সা সরকার কাগজি মুদ্রা বাতিল করেছিল। রৌপ্যমুদ্রা ছিল প্রধান, আর ছিল পাঁচ, দশ ও কুড়ি পেসোর স্বর্ণমুদ্রা। এসব তথ্য জেনেছিলাম আমার এই নতুন ব্যাংক কর্মী বন্ধুর মারফত।

পরদিন ব্যাংকের এক পিয়ন এসে আমাকে কুড়ি পেসো স্বর্ণমুদ্রার থলি দিয়ে রসিদে সই করিয়ে নিয়ে গেল। ওপরওয়ালা নিঃসন্দেহে ভাল আর দয়ালু। তবে না চাইতেই দোরগোড়ায় স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকা আমার ঈশ্বর বিশ্বাসের গোড়া যে আবার শক্ত করে তুলল, ব্যাপারটা অবশ্য তেমন নয়।

পাদটীকা

১. হেলফেরিক ভ্রাতৃকুল (Helfferich brothers)। এমিল, থিওডোর এবং কার্ল হেলফেরিক। ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্বার্থের ক্ষতিসাধনে জার্মান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিশ শতকের শুরুর দ্বিতীয় দশকে ভারতের সেকুলার বিপ্লবী ও নিখিল ইসলামী আন্দোলনকারীদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তার পরিকল্পনা করে। তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান, জাপান, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়াসহ মধ্য, দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেকগুলো দেশকে সম্পৃক্ত করে সুদূরপ্রসারী এই পরিকল্পনাটি সাজানো হয়। জাপান ও দূরপ্রাচ্যে জার্মান ব্যবসায়িক স্বার্থের পুরোধা ছিলেন এমিল ও থিওডোর হেলফেরিক ভ্রাতাদ্বয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ইসলামী আন্দোলনকারীদের সহায়তা প্রদানে এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান কুশীলব ছিলেন এমিল ও থিওডোর। এই দু‘জন আবার সেসময়কার জার্মান অর্থমন্ত্রী ও অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব কার্ল হেলফেরিকের ছোট ভাই ছিলেন।

সূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Christmas_Day_Plot , https://en.wikipedia.org/wiki/Karl_Helfferich

২. শাখ্ট (Hjalmar Schacht)। জন্ম ১৮৭৭ মৃত্যু ১৯৭০। দুই দফায় জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাইখ্শব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রথম দফায় ১৯২৩ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত।

৩. রাইখ্শব্যাংক (The Reichsbank)। ১৮৭১ সালে জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হওয়ার কিছু পরে ১৯৭৬ সালে রাইখশব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল প্রুশিয়ার একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জার্মানি রাষ্ট্রের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হতো। ১৮৭১ সালে ঐক্যবদ্ধ জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে জার্মানিতে ৩১টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল যেগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্য নিজস্ব মুদ্রা ছাপাত। ১৮৭৫ সালে জার্মানি ব্যাংকিং আইন বলবৎ করে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত রাইখ্শব্যাংক ক্রিয়াশীল ছিল। মিত্রবাহিনীর কাছে জার্মানির পরাজয়ের পর এবং দেশটি পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি এই দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার পর দেশ দু’টোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা নতুন করে গড়ে তোলা হয়।

সূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Reichsbank

৪.ডয়েশলান্ড (Deutschland)। জার্মান ভাষায় জার্মানির এই নাম।

৫. দ্বিতীয় উইলহেলম (১৮৫৯-১৯১৮)। জার্মানির কাইজার বা সম্রাট। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সময় প্রধান রাষ্ট্রনায়কদের একজন।

৬. ভারতীয় বিপ্লবী কমিটি (Indian Revolutionary Committee)। আসল নাম বার্লিন-ইন্ডিয়ান কমিটি। ১৯১৪ সালে বার্লিনে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন ১৯১৫ সালে এর নাম বদলে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স কমিটি রাখা হয়। জার্মানিতে অবস্থানরত ভারতীয় শিক্ষার্থী ও বিপ্লবীদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে গঠন করা হয়। এর বিখ্যাত সদস্যদের মধ্যে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, চেম্পাকারমণ পিল্লাই, অবিনাশ ভট্টাচার্য প্রমুখের নাম উল্লেখ্য। তৎকালীন জার্মান সরকার এই কমিটিকে কাজে লাগিয়ে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ বিঘ্নিত করার পরিকল্পনা করেছিল। সুদূরপ্রসারী এই পরিকল্পনার অংশ ছিল ভারতে একদিকে বাঙালিদের নেতৃত্বে পরিচালিত স্বাধীনতা সংগ্রাম অন্যদিকে নিখিল ইসলামী আন্দোলনে মদদ যোগানো। এজন্য জার্মান সরকার এবং এই কমিটি বঙ্গসহ অন্যান্য প্রদেশের সেকুলার স্বাধীনতা সংগ্রামী, নিখিল ইসলামী বিপ্লবের দেওবন্দভিত্তিক দল, আফগানিস্তান ও ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন উপজাতিসহ সোভিয়েত বলশেভিক পার্টি, চীন ও আমেরিকায় নানাবিধ তৎপরতা পরিচালনা করে। এরই অংশ ইতিহাসবিখ্যাত হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র। এর মাধ্যমে ১৯১৪ থেকে ১৯১৭ সময়কালে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নানাবিধ বিপ্লবী তৎপরতা পরিচালিত হয়েছিল।

সূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Berlin_Committee

৭. নীল মোজা আন্দোলন (Blue stocking movement)। আঠারো শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডে পরিচালিত নারীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অপ্রাতিষ্ঠানিক একটি আন্দোলন। এলিজাবেথ মন্টাগু, এলিজাবেথ ভেসি প্রমুখ ১৮৫০-এর দশকে এই আন্দোলনের সূচনা করেন। এতে মূলত শিক্ষা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হতো।

সূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Blue_Stockings_Society

৮. সাফরিজেট (Suffragette)। বিংশ শতকের শুরুতে নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের ইংরেজিতে এই শব্দ দ্বারা বোঝানো হতো। এই অভিধাটি অবশ্য শুরুতে ব্রিটেনের ‘উইমেনস সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন’ (ডব্লিউএসপিইউ)-এর সদস্য ও এতে সম্পৃক্তদের সম্পর্কে নেতিবাচক অর্থে বা ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার করা হয়। সংগঠনটি ১৯০৩ সালে এমেলিন প্যাংকহার্স্ট প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি নারীর ভোটাধিকার আদায়ে প্রত্যক্ষ সংঘাতমূলক কার্যক্রম এবং অসহযোগ আন্দোলনের কৌশল অবলম্বন করেছিল। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের সম্পর্কে ব্যঙ্গ করে ‘ডেইলি মেইল’ পত্রিকার এক প্রতিবেদক ‘সাফরিজেট’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। পরবর্তীকালে আন্দোলনকারীরা এই নেতিবাচক শব্দটিকেই নিজেদের জন্য ব্যবহার করতে শুরু করেন। শব্দটির ব্যুৎপত্তি: ল্যাটিন suffragium শব্দটি থেকে suffrage শব্দটি এসেছে। suffragium শব্দটির অর্থ ভোট, সমর্থন ও প্রার্থনা। ইংরেজিতে suffrage শব্দটি ভোটাধিকার অর্থে ব্যবহৃত হয়।