২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

চন্দনার চিত্রকর্মে পরাবাস্তবের পরিক্রমা

অবচেতন মন ও মানস নিয়ে চিত্রপটে একের পর এক অবিশ্বাস্য নানা ফ্যান্টাসি রচনা করেছেন শিল্পী চন্দনা। শ্রমলব্ধ শিল্পচর্চা ও শিল্পভাবনার শক্তিতে দর্শক ও শিল্পবোদ্ধাদের সামনে তাঁর এই প্রকাশ যেমন তাঁর অঙ্কনের সার্থকতাকে চিহ্নিত করে, তেমনই এ দেশে পরাবাস্তবতা চর্চার ধারাকে বেগবান করেছে।

জাহিদ মুস্তাফা জাহিদ মুস্তাফা

Published : 05 Aug 2026, 09:57 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:26 PM

১.

এ দেশে সুররিয়ালিস্টিক বা পরাবাস্তববাদী ধারার শিল্পচর্চায় অনুভূতিপ্রবণ ভাবনাকে প্রকাশের জন্য ধারাবাহিক চর্চায় নিয়োজিত শিল্পীদের একজন জাকিয়া খান চন্দনা। দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকায় তাঁর চিত্রকর্মের দু'টি একক প্রদর্শনী হলো। গত জুনে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রসেঁজে তাঁর তৃতীয় একক চিত্র প্রদর্শনীর পর বেশ দ্রুতই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ২ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে চতুর্থ একক। গত   শতাব্দীতে উদ্ভাবিত নানা শিল্প আন্দোলনের অন্যতম সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, তরুণদের মধ্যে তুমুল অস্থিরতা প্রচলিত শিল্প-সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের যে ঢেউ আনে এরই প্রভাবে ইউরোপে দাদাবাদের হাত ধরে সুররিয়ালিজমের উৎপত্তি ও বিকাশ।   

১৯২৪ সালের অক্টোবরে পরাবাস্তববাদী আন্দোলনটি ফরাসী কবি গিয়ম আপেলিনিয়র কর্তুক ১৯১৭ উচ্চারিত ‘সুররিয়ালিজম’ শব্দটি প্রয়োগ করে। ১৯২৪ সালের অক্টোবরে লেখক-প্রাবন্ধিক আঁদ্রে ব্রেতঁ পরাবাস্তববাদী ইশতেহার' (Surrealist Manifesto) প্রকাশ করলে শব্দটি তাঁদের অধিকারে আসে। ব্রেতঁ-র মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল ‘স্বপ্ন ও বাস্তবতার আপাত-বিরোধী অবস্থাকে এক পরম বাস্তবতায়  (surreality) মিলিয়ে দেওয়া’।  ব্রেতঁ-র সঙ্গে এ দলে ছিলেন-  সালভাদর দালি, ম্যাক্স আর্নেস্ট, হুয়ান মিরো, ফিনি, রেনে মাগ্রিত, লিওনোরা ক্যারিংটন, মেরেট ওপেনহেইম, ডরোথি টানিং প্রমুখ। পরাবাস্তব বৈশিষ্ট্যের অন্য অনেক বিশিষ্ট শিল্পীদের মধ্যে আমরা আরও যাঁদের নাম উল্লেখ করতে পারি, এঁদের মধ্যে আছেন- মার্ক শাগাল, রবীন্দ্রনাথ ও ফ্রিদা কাহলো প্রমুখ।

২. 

বাংলাদেশের সমকালীন চারুশিল্পে পরাবাস্তব ধারার শিল্পচর্চার প্রভাব আমরা লক্ষ করছি অনেক দিন থেকেই। আমি যখন চারুকলায় পাঠ নিচ্ছি, সেই  সত্তর- আশির দশকে- গ্রন্থাগারে বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে জগদ্বিখ্যাত অনেক শিল্পীর আঁকা ছবির দিকে চোখ আটকে যেতো। তবে ভূ-কম্পনের ঝাঁকুনি খেয়েছি সালভাদর দালির আঁকা গলে গলে পড়া সময়ের ছবি, রেনে  মাগরিথের পা-জুতো ও ম্যাক্স আর্নেস্টের আঁকা আদিভৌতিক অনুভূতির ছবিগুলো দেখে!  সুররিয়ালিজমের কাজগুলিতে বিস্ময়, অপ্রত্যাশিত বস্তুর সন্নিবেশ এবং অসংলগ্নতার নানা উপাদান। পরাবাস্তববাদ তথা স্যুরিয়ালিজমকে দেশীয় নানা বিষয়, বিশেষ করে, সামাজিক অসঙ্গতির প্রকাশের ধারা হিসেবে একে ধারণ করে আঁকতে আঁকতে চট্টগ্রামের নাজলী লায়লা মনসুর শিল্পী ও শিল্পবোদ্ধা মহলে সুপরিচিত। শিল্পী ঢালী আল মামুন, আহমেদ সামসুদ্দোহা, দিলারা বেগম জলি, নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্য, শামসেত তাবরেজী কমবেশি এই শিল্পধারায় নিজেরা গড়েছেন, এঁকেছেন,আঁকছেন।   

৩. 

জাকিয়া খান ছিলেন কৃতী শিল্পশিক্ষার্থী। এই শতকের শূন্য দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে তিনি চারুশিল্পে স্নাতকোত্তর করেছেন। ১৯৯৮ সালে তিনি বার্জার তরুণশিল্পী পুরস্কার জয়ী হয়েছেন। ২০০০ সালে এক্সপেরিমেন্টাল কাজের জন্য নিজের বিভাগের পুরস্কার অর্জন করেছেন।  

২০০২ জয়নুল গ্যালারিতে তাঁর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন হয়। সেই নবীন বয়সে শিল্পকৃতির জন্য তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন, ২০০২ সালে জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আহ্বানকৃত দক্ষিণ-পশ্চিম এশীয় যুব আমন্ত্রণ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে জাপানে যাওয়ার সুযোগ পান ও সনদ লাভ করেন। জাকিয়ার দ্বিতীয় একক ওপেন হাউজ শো অনুষ্ঠিত হয় ২০০৪ সালের ১৫ জুলাই, কানাডায় টরেন্টোর ৯৫১ মার্গারেটস ড্রাইভে।  

অংশ নিয়েছেন ঢাকায় আয়োজিত নবীনশিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী, জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী, এশীয় দ্বি-বার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীর বেশ কয়েকটিতে। ২০০০ সালেই চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত সমকালীন চারুকলা প্রদর্শনীতে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। জাপানের কুসাবু আর্ট গ্যালারি আয়োজিত দ্বিতীয় ও চতুর্থ নবীন চারুকলা প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চিত্র কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন, এর অন্যতম ২০০৪ সালে ঢাকায় তুরস্কের দূতাবাসের সহযোগিতায় বেঙ্গল শিল্পালয়ের আয়োজনে তুরস্কের খ্যাতিমান শিল্পী প্রফেসর হিকমেত বারুতকাজিলের পরিচালনায় ছবি আঁকায় ইবরুমারব্লিং পেপারের ব্যবহার নিয়ে অনুষ্ঠিত কর্মশালা। বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের রিকসা পেইন্টিংয়ের কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন ২০০৫ সালে। এরপর একক প্রদর্শনী না করলেও নীরবে নিভৃতে শিল্পচর্চা করে গেছেন, স্বনামধন্য একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের আর্ট ও ডিজাইন শেখাচ্ছেন।  

জাকিয়া খান চন্দনা যেন সুররিয়ালিজমের উদ্ভাবকদের ন্যায় ফ্যান্টাসিকে গ্রহণ করেছেন। তাঁর চিত্রকর্ম প্রকৃতি, প্রকৃতির উপাদান এবং মানবের সরল উপস্থাপনার মাধ্যমে অস্তিত্ব ও রূপান্তরের মতো বিষয়বস্তু অন্বেষণ করে, যা সাময়িক পরিবর্তন এবং পুনর্জন্মের ইঙ্গিত দেয়। অতিপ্রাকৃত উপায়ে সামঞ্জস্য বজায় রেখে ছবিগুলোকে তিনি স্বপ্নময় পরিবেশে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। পর্বতসদৃশ কাঠামোর মাধ্যমে অস্তিত্বের সংকটসহ মানবজাতির ক্ষণস্থায়িত্বকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন তিনি, আবার মানব এবং অন্যান্য উপাদানের মাধ্যমে জীবনের সম্ভাবনাকেও তুলে ধরেছেন। 

শিল্পীর আঁকায় নানা আকৃতি এবং খণ্ডিত ভূদৃশ্যগুলোয় সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্যকার টানাপোড়েন দেখা যায়। ২০২৫ সালে তাঁর আঁকা পাঁচ গুণিতক তিন ফুট আকৃতির চিত্রপটে ‘সময়ের ঊর্ধ্বে শেকড়’(Roots Beyond Time) শিরোনামের চিত্রে দেখা যায়- ঘরের বাইরে জনমানবহীন মাটিফাটা চৌচির মাঠের দুইপ্রান্তে নানা বস্তুর সমাবেশ দেখা যাচ্ছে যাতে ফ্রেমের ভেতরে ছবির আরেক ফ্রেম, জলকণা থেকে জলাশয় সৃষ্টি, পোড়ামাটির ভাঙা পাত্রে শেকড় বিস্তৃত পাতাবিহীন কাণ্ড ও ডাল পেঁচানো গাছ! আকাশের খোলাছাদ দিয়ে নামছে ধবল জ্যোৎস্নার আলো-এইসব ফ্যান্টাসি! এরকম কাছাকাছি তাঁর আরেকটি কাজের শিরোনাম ‘সূর্যালোকের জ্যামিতি’ (Sunlit Geometry)। চন্দনার আঁকা কাজগুলোয় বিশ্বের ক্রম বিবর্তনের দৃশ্যমান রূপক উপলব্ধির ইংগিত পাওয়া যায়। 

২০২৪ সালে আঁকা ‘মহাকর্ষের মরিচীকা’ (The Mirage of Gravity) নামে পাঁচ গুণিতক তিন ফুট আকৃতির চিত্রে যেন তীব্র ঝড়ে উপড়ানো বৃক্ষের ন্যায় এক প্রাচীন লোকালয় সজোরে আছড়ে পড়বে এমন এক মুহূর্তের আলো-ছায়ায় বাস্তবানুগ খুঁটিনাটিসমেত ছবি!   

তিনি পরাবাস্তব শিল্পের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বুনন এবং টেক্সচার প্রয়োগে চিত্রকর্মকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনে দর্শককে রস ও রহস্যে আন্দোলিত করার প্রয়াস পান। আবার প্রকৃতির মহাদুর্যোগ যেমন ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্পের আঘাতের পর নতুন করে জেগে ওঠার সংকল্প দৃশ্যমান হয় মানবাকৃতির পাথুরে অবয়বে। যেমন- ২০২৪ এর কাজ সাড়ে পাঁচ গুণিতক সাড়ে তিন ফুট আকৃতির চিত্রকর্ম ‘নীরব পুনরুত্থান’(Silent Ressurection)। এরূপ আরেকটি চিত্র ‘তরুণ্যের জন্য অনুশোচনা’ (Repentance for the youth) নামে চন্দনার একটি চিত্রকর্মে তিন তরুণের পাথুরে অবয়বের ভঙ্গিমায় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’র দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করি। শোষণ ও বৈষম্য মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় তরুণরা সংগ্রাম করে, জীবন দেয় বারবার, কিন্তু জনগণের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। এমন অনুভূতিকে তিনি পরাবাস্তব অঙ্কনে উপস্থাপন করেছেন। ‘শিরাময় পৃথিবী’ (Veins of Earth) নামে চিত্রে ডিমের খোসার মত ভঙ্গুর গোলাকৃতির এক ফর্মের ভেতরে এবং বাইরে গাছের বেঁচে থাকার আকুতি! এবং জীবনের প্রতীক মানবনির্মিত একটি কাঠের টুল আশাবাদের প্রতীক হয়ে ওঠেছে।  

শিল্পীর আরও কয়েকটি চিত্রকর্মের শিরোনাম- ‘ভবিষ্যতের চমক’(Suprizing future), ‘বীজের পুনরুত্থান’ (Seed of renewal), ‘অবচেতনে স্থাপত্য’ (Architecture of  Subconscious), ‘ধ্বংসের বিরুদ্ধে যাত্রা’(The Journey Against Destruction), ‘শ্যাওলার ফিসফিসানি’(The Whispers of Moss), ‘যেখানে সময় ভেঙে পড়ে’ (Where Time Collapses) প্রভৃতি। ক্যানভাসে আক্রেলিক রঙ, তেলরঙ ও মিশ্রমাধ্যমে  চিত্র রচনা করেছেন চন্দনা। চিত্রপটে বর্ণ প্রয়োগে তিনি বাদামি, খয়েরি, কমলা, সাদাটে, কালচে, নীলের প্রাধান্য দিয়েছেন। বাস্তবানুগ ছবি আঁকার তুমুল দক্ষতা কাজে লাগে পরাবাস্তব ধারার চিত্র রচনার ক্ষেত্রে। ক্রমাগত কাজ করে করে উপকরণের স্বভাবকে পাঠ করা যায়। শিল্পী চিত্রপটে এর সারাৎসার প্রয়োগ করে দর্শকের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিকে তৃপ্ত করতে সমর্থ হয়েছেন বলে মনে করছি। এর প্রমাণ তাঁর পর পর দু'টি একক।  

অবচেতন মন ও মানস নিয়ে চিত্রপটে একের পর এক অবিশ্বাস্য নানা ফ্যান্টাসি রচনা করেছেন শিল্পী চন্দনা। শ্রমলব্ধ শিল্পচর্চা ও শিল্পভাবনার শক্তিতে দর্শক ও শিল্পবোদ্ধাদের সামনে তাঁর এই প্রকাশ যেমন তাঁর অঙ্কনের সার্থকতাকে চিহ্নিত করে, তেমনই এ দেশে পরাবাস্তবতা চর্চার ধারাকে বেগবান করেছে। 

চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারির দু'টি হলে প্রদর্শনীটি আগামী ৮ আগস্ট ২০২৬ শনিবার অব্দি প্রতিদিন বেলা এগারোটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।