Published : 02 Jan 2026, 10:45 PM
অবশেষে রুশদেশে আসা গেল। বহুদিন এদেশে আসবার ইচ্ছে ছিল। বাবা এসেছিলেন ১৯৭৫ সালে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে বছর-ব্যাপি প্রশিক্ষণের সুবাদে। সে সম্বন্ধে প্রচুর রুশ নাম বা ছবি দেখা হয়েছে শৈশব থেকেই। কিংবা শৈশবের ঘোড়াশালে বিদ্যুৎকেন্দ্রেও অনেক রুশ প্রকৌশলী ছিলেন। রুশী নামও ছোটোবেলা থেকে মনে নানা অনুরণন সৃষ্টি করেছে। যেমন, ‘মিল্লিকফের বউ’ শব্দবন্ধটি আজও কানে বাজে, হয়ত কোনো রুশী এঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী ছিলেন যিনি ঘোড়াশালের বাঙালি পরিবারে পরিচিত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই রুশী বই, পাঠ্যপুস্তক, ‘অঙ্কের হেঁয়ালি’, ‘পদার্থবিদ্যার মজার কথা’ ইত্যাদি বই পড়ে একটা রুশীমন আগে থেকেই তৈরি ছিল। ‘উভচর মানুষ’, বা ‘রুশদেশের উপকথা’ কে না পড়েছে! সে কি অসাধারণ ভিনদেশী কল্পনার জগৎ! ‘সিভকা বুরকা/ যাদুকা লেড়কা/ চেকনাই ঘোড়া / সামনে এসে দাঁড়া’ জাদুমন্ত্রটি মাথায় গেঁথে ছিল, ডাইনী বুড়ি বাবা ইয়াগা যেমন গা-এ কাঁটা দিত, আর জাদুকরী ভাসিলিসা তেমনি নরম মনে স্বপ্নের জাল বুনে দিত।
২০২৫ এর ২২শে নভেম্বর খুব ভোরবেলা রাশা’র কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী সোচি সমুদ্র-শহরে বিমানবতরণ করা গেল। নিমিত্ত আন্তর্জাতিক জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডের ২২-তম আসর। এই অলিম্পিয়াডটিতে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে ২০১৫ সাল থেকে। এবারের স্বাগত দেশ রাশা। বাংলাদেশ থেকে আমরা দশজনের দল এতে অংশ নিতে এসেছি। দলে আছে ছয়জন জুনিয়র শিক্ষার্থী (বয়স ১৬ বছরের নিচে), দুজন শিক্ষক দলনেতা, একজন বাবা, এবং আমি। যে-ফ্লাইটে আমরা এসেছি, একই ফ্লাইটে এসেছে ভারতীয় দল, কোস্টারিকা এবং ইরাকের দল। রাত তিনটার দিকে নেমেই আমরা সোভিয়েত আমলীয় ভীতিকর ইমিগ্রেশন বুথের মুখে পড়লাম। চারটা রুম, আলাদা করে ঢুকতে হয়, বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হয়, ভাঙা ইংরেজিতে টুকটাক জিজ্ঞেস করে, তারপর ধুমধাম সিল পড়ে। তার আগে অবশ্য দলবল দেখে ইমিগ্রেশনের লোকেরা ঘাবড়ে গেল। রুশ ভাষায় ঘুশমুশ কী সব জিজ্ঞেস করল। নিমন্ত্রণ পত্র দেখে আরও দুয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসল। আমরাও ঘুমঘুম চোখে বিস্ময় নিয়ে দেখতে থাকলাম। ভাগ্যিস শুধু বাংলাদেশ ছিল না, অন্য দলও ছিল। বাংলাদেশী পাসপোর্টের যা-অবস্থা, বাচ্চাকাচ্চা সমেত কেবল আমরা থাকলে কী যে হত!
বেশ সময়ক্ষেপণ করে বেরিয়ে পড়তে হল টাকা ভাঙ্গানোর বিড়ম্বনায়। একটি বুথ, অনেকগুলি লোক আলাদা করে রুবল কিনতে লাগল। কারণ এয়ারপোর্টের বাইরে রুবল ভাঙানোর সুবিধা সীমিত। হোটেলে নেই, দূরে গিয়ে ভাঙতে হবে, আয়োজকরা বলেছিল এয়ারপোর্টে ভাঙানোই উত্তম। চারটি দেশের লোকজন লাইন দিয়ে ডলার বিক্রয় করতে লাগতেই জ্যাম লেগে গেল। সোচি এয়ারপোর্ট ছোট। আন্তর্জাতিক আগমনের স্বল্পপরিসর বদ্ধ কাঠামো অবশ্য এর সৌন্দর্যকে প্রতিনিধিত্ব করে না। সেজন্য আপনাকে দোতলায় উঠতে হবে, সেখানে রুশী কিছু ভাল দোকান পাবেন - বাবুশকা, ইত্যাদি। কিন্তু রাত সাড়ে-তিনটেয় কফিশপ ছাড়া আর কিছু দেখলাম না। আয়োজকদের বাসে করে আমরা নির্ধারিত হোটেলে পৌঁছলাম, নানান ঝক্কির পর।

ক্রেমলিন ও সেন্ট বাসিল ক্যাথিড্রাল
পরবর্তী দশদিন আমাদের সোচি শহরেই থাকতে হয়েছে। সোচি বেশ পুরনো শহর। কৃষ্ণসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় স্বাস্থ্যোদ্ধারকারী আর পর্যটকদের অনেকদিনের আগ্রহের শহর সোচি। এর ইতিহাস বেশ পুরাতন। তবে ১৮৩৮ সাল থেকে এখানে শহরবাস শুরু হয় সোভিয়েত প্রভাবে। ১৯৫০-এর দশকে সোচিকে সোভিয়েত রাশা’র গ্রীষ্মকালীন রাজধানীর সম-উচ্চতায় ভাবা শুরু হয় এবং ১৯৬০-এর দশকে এর বৃহত প্রসারণ শুরু হয়। ২০১৪ সালের শীতকালীন অলিম্পিকস অনুষ্ঠিত হয় এই শহরে এবং ২০১৯ সালে সোচির দক্ষিণ তীরবর্তী নিম্নভূমিকে আরও বড় আকারে উন্নত এবং প্রসারিত করে সিরিয়াস ফেডারেল রিজিয়ন গঠিত হয়। আমাদের অলিম্পিয়াডটি এই ফেডারেল টেরিটোরিতেই অনুষ্ঠিত হয়।
সিরিয়াস অঞ্চল একদমই অত্যাধুনিক। অলিম্পিকের যত উন্নয়ন সব এখানে পরিদৃষ্ট হয়। অত্যাধুনিক স্থাপত্যের নিশানা এখানে দেখা যায়, যার পুরোটাই নানা ধরনের খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে। বিভিন্ন স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে, আবাসিক এবং হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে। এই ভবন এবং কাঠামোগুলিকে এখন শিক্ষার কাজে ব্যবহার করা হয়। সিরিয়াস এডুকেশন সেন্টারের অধীনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সংগীত এবং খেলাধুলা - এই তিন লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই স্থাপনাগুলি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া নানা রকমের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের অলিম্পিয়াডটিও সেই ধারাবাহিকতায় এখানেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আমাদের ‘আলফা সিরিয়াস’ হোটেলের সামনেই কৃষ্ণসাগর। ছোট একটি সমুদ্রতীরবর্তী ‘কি’ দেখলাম, যেখানে বেশ কিছু ছোট ইয়ট আছে, ভাড়ায় কৃষ্ণসাগর ঘোরা যায়, তিনঘন্টা ১৮০০ রুবল। রুশী নাগরিকদের মাছ ধরার বিষয়ে বেশ আগ্রহী দেখা গেল। তীর ধরে হাটবার, জগিং বা সাইকেল চালানোর চমৎকার ব্যবস্থা। কিছুদূরে আছে কফি ও রেস্টুরেন্ট। কৃষ্ণসাগর রুশী মনে আনন্দ, উষ্ণতা এবং অবসর বিনোদনের এক দারুন উদ্দীপনার অপর নাম। পুরনো গল্পে পড়েছিলাম, রুশীদের অবসরযাপনের জন্য এই অঞ্চল প্রসিদ্ধ, প্রায়ই লেখা থাকত, অমুক এখন কৃষ্ণসাগরের তীরে বাড়ি বানিয়ে চলে গেছেন। এই সেই সোচি অঞ্চল এবং এই সেই কৃষ্ণসাগর। কৃষ্ণসাগর শীতের মৌসুমে শান্ত সাগর। প্রচুর মানুষ এখানে রোদ পোহায়, সাগরে ঘোরে, সমুদ্রতীরে পিকনিক করে। সাগরটিকে ভাল লাগলেও আমার সমুদ্রতীরটি পছন্দ হয়নি। অনেক বড় নুড়ি পাথর, বোল্ডার। মানুষ আছে, তবে কম। এর চেয়ে সত্যি বলতে কক্সবাজার উত্তম। তবে কৃষ্ণসাগরের পাড় দিয়ে হাটতে অসাধারণ লাগে, হাল্কা ঠান্ডা হাওয়া আর হাটাহাটি, স্বাস্থ্যের জন্য ভাল তো বটেই, মনের চিন্তাজট ছাড়াতেও কাজে লাগে। শারীরিক শ্রম চিন্তাকে লঘু করে, জটিল চিন্তাকে সহজ করে। এজন্যই হাইডেলবার্গে দার্শনিকদের হাঁটাহাটির জন্য আলাদা পাহাড়ি রাস্তা রয়েছে।
সোচি’র আরেকটি আকর্ষণের জায়গা হল রোজা খুটার, এটি আগে একটি এস্তোনীয় স্থাপনা ছিল। রোজা নামীয় এক এস্তোনীয় এখানে বসত গেড়েছিলেন। এখানে ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত একটি স্কি-রিসর্ট গড়ে তোলা হয়েছে ২০১৪-এর অলিম্পিককে ঘিরে। রোজা খুটার অঞ্চল খুবই আকর্ষণীয় পাহাড়ি পর্যটক এলাকা, অনেক নামী ও বড় হোটেল, শপিং মল ও ক্যাসিনো দেখেছি এখানে। এর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মিঝিমতা নদী, রুশদেশের অন্যতম দীর্ঘতমা নদী। এর চলার পথ প্রায় ৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। নদীটি খুবই ছোট পরিসরের, আমাদের দেশের বড় ছড়ার মত মনে হবে, কিন্তু উজানে এটি খুবই খরস্রোতা, এবং এর চলার পথের শব্দে কান পেতে বসা দায়। খুটার অঞ্চলে অনেক দর্শনীয় ব্যাপার আছে, রোপওয়ে বা কেবল কার দিয়ে পাহাড়ে চড়া আছে, রাশা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্বলিত ওয়াকিং মিউজিয়াম আছে। এই অঞ্চলের পাহাড় আর বনাঞ্চল সোচি ন্যাশনাল পার্কের অন্তর্ভুক্ত।
সোচিতেই একটু অন্যদিকে আছে রাশার সবচেয়ে দীর্ঘতম পায়ে চলা ঝুলন্ত সেতু (সোচি স্কাইব্রিজ) যার উচ্চতা ২০০ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৪৩৯ মিটার। এখানে অভিযাত্রীদের জন্য বাঞ্জি জাম্প এবং যিপলাইনে অভিজ্ঞতা নেবার সুযোগ আছে। এটি একটি শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা। দুপাশে খাড়া দুই পাহাড়, মাঝে ৬০০ ফুটের বেশি নিচে আঁকাবাকা বয়ে চলেছে মিঝিমতা নদী, একদিকে সোচির উত্তর-ককেশীয় পর্বতমালা আর অন্যদিকে কৃষ্ণসাগরের উপকূল। ককেশাস রেঞ্জ বা পর্বতমালা উঠেছেই সোচির উত্তর-পূর্ব প্রান্ত দিয়ে, তারপর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বেঁকে গেছে কাস্পিয়ান সাগরের দিকে। একদিকে সমুদ্র, আর আরেকদিকে পাহাড়! আর এর মুখে আছে সেই বিখ্যাত আখ্শতির গর্জ। এই গর্জের দৈর্ঘ্য প্রায় আড়াই কিলোমিটার, দুপাশের পাহাড়কে কেটে বয়ে চলে মিঝিমতা নদী। পাহাড়ের ঢালে দেখা যায় জুরাসিক যুগের চুনাপাথর। স্কাইব্রিজটির অপর ধারে প্রায় ৩৩০ মিটার উঁচু অবজার্ভেশন ব্রিজ আছে, যেখান থেকে গর্জ এবং সাগর দুটোই দেখা যায়। সে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা! স্মরণাতীত কাল থেকে এই সরু গর্জ বেয়ে নিশ্চয় সুপ্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষী যাযাবর কুরগান-সংস্কৃতির মানুষেরা হেঁটে গেছে বসতী ও খাদ্যের উদ্দেশ্যে। এই গর্জে অনেক গুহা আছে, যার একটির মধ্যে (আখ্শতিরস্কায়া) নিয়ান্ডার্থাল মানুষের বসবাস ছিল, অনুসন্ধান বলছে তা প্রায় ১,৩০,০০০ বছর আগেকার। পাহাড়, নদী, ইতিহাস আর সমুদ্রের এমন অবিস্মরণীয় ও অদৃষ্টপূর্ব সম্মিলন প্রত্যক্ষ করাটা একটা দারুন অভিজ্ঞতার ব্যাপার। রোমহর্ষকও বটে!

আখ্শতিরস্কায়া গর্জ
সোচিতে আমাদের অবস্থান কিছুটা বোরিং ছিল। পরীক্ষার প্রশ্ন মডারেশন, দীর্ঘ রাতজাগানিয়া অনুবাদকর্ম, কিছুটা ঘোরাঘুরি, স্থানীয় অ্যাডলার অঞ্চলের শপিংমল ও সৈকতবর্তী বাজার পরিদর্শন, কৃষ্ণসাগরের তীরে হন্টন ইত্যাদি। মাঝে ছন্দপতন ঘটাতো ড্রোন-আক্রমণ জনিত সংকেতের আগমন। না, সরাসরি ড্রোন আক্রমণের শিকার হইনাই, তবে একরম সংকেত মাঝেমধ্যে পাওয়া যেত, তখন আমাদের বাচ্চাদের নির্দিষ্ট শেল্টারে নেওয়া হত, আদৌ কিছু উড়ত কিনা কে জানে! তবে হ্যাঁ, সোচির কাছেই কিন্তু ক্রাইমিয়া উপকূল, এবং ক্রাস্নোদারক্রাই জেলার পাশেই কিন্তু উক্রাইন ফ্রন্ট! তাছাড়া সোচি শহরের অনতিদূরেও আবখাজিয়া সীমান্ত, একদম পায়ে হেঁটে চলে যাওয়া সম্ভব। এসব কারণে সোচি শহর কিছুটা ভালনারেবল, ফলে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা সরঞ্জামের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। সম্ভাব্য এয়ার-অ্যাটাক সিগনালের সাথে সাথে আমরা আমাদের হোটেলের আশপাশে বড় রকমের সৈন্য সমাবেশ দেখেছি, তাছাড়া সাগরের উপকূলে অত্যাধুনিক ইএমপি রেডার ও সক্রিয় এয়ার-ডিফেন্সের উপস্থিতি দেখেছি। ফলে তেমন কোনো আতঙ্ক ছিল না।
এবারের যাত্রায় একটা উপকার হল যে রুশ দেশের অলিম্পিয়াড প্রস্তুতির ব্যাপার-স্যাপার এবং তাদের স্থাপনা ও আসল মানুষগুলোকে প্রত্যক্ষ করে গিয়েছে। ফলে রুশী অলিম্পিক প্রস্তুতি সম্পর্কে আমাদের কিছুটা স্বচ্ছ ধারণা এসেছে। রুশীরা আসলেই অলিম্পিকসের জাত - কি খেলায়, কি মেধায়! স্কুলপর্যায় থেকে কম বয়স থেকেই বাচ্চারা অলিম্পিকের গুণকীর্তন শুনে-দেখে বড় হয়। আমাদের দেশে যেমন ‘এঞ্জিনিয়র-ডাক্তার হও কিংবা বিসিএস’ এমন একটা ভাইব কাজ করে, রুশদেশে ছোটবেলা থেকে স্পোর্টস, ব্যালে নৃত্য, গণিত অলিম্পিয়াড, মিউজিক অপেরা ইত্যাদির পরিবেশে বড় হয়। স্পোর্টস বা গণিত বা ফিজিকসের অলিম্পিয়ান মেডালিস্টদের হিরো গণ্য করেই রুশী বাচ্চারা বড় হয়। বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত মহান গণিতবিদ গ্রিগোরি পেরেলমানও শৈশবে অঙ্কের প্রতিভা হিসেবে গণিত অলিম্পিয়াড করেছেন, স্পেশাল ট্রেনিং পেয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবেও রুশীরা অলিম্পিয়াডকে গুরুত্ব দেয়। সোভিয়েত আমলে তাদের অলিম্পিক-লেভেলের বাচ্চাদের আলাদা ট্রেনিং দেবার ব্যবস্থা ছিল। সেটাই এখন সিরিয়াস এডুকেশন সেন্টারে হয়, আর ইন্টেলেকচুয়াল নেতৃত্ব দেয় মস্কো ইনস্টিটিউট অফ ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি। এমন একটি সার্বিক ইকোসিস্টেমে থাকার ফলে অলিম্পিয়াডে ভাল করা রুশীদের মজ্জাগত হয়ে আছে।
রুশীরা সায়েন্স ও এঞ্জিনিয়ারিং, মিউজিক এবং স্পোর্টসকে খুবই মান্যতা দেয়। প্রেসিডেন্ট পুতিনের নির্দেশে সিরিয়াস শিক্ষাকেন্দ্রে তিনটি বড় কেন্দ্র আছে - একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির, একটি সংগীতের এবং একটি খেলাধুলার। স্পোর্টসের কথা আমি আলাদা করে বলতে পারব না, তবে সিরিয়াস সেন্টারে আন্তর্জাতিক মানের নানান স্পোর্টস ফ্যাসিলিটি আছে, যাতে অলিম্পিকস প্রস্তুতি নিয়মিত নেওয়া যায়। ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাগুলোতে রুশীরা নিয়মিত রেকর্ড করে থাকে।
সংগীত অনুশীলন ও বিদেশী ভাষা শেখার বিষয়ে রুশী আগ্রহ ও প্রযত্ন প্রবল। তারা বিভিন্ন ভাষা শিখে থাকে, এবং ইন্টারপ্রেটার বা দোভাষি হিসেবে তাদের ভাল চাকরিও হয়। ভাষা জানলে প্রচুর ভলান্টিয়ারিঙের সুযোগ আছে। মিউজিক, অপেরা ও ব্যালে নাচে রুশদেশের সুখ্যাতি ভুবনবিখ্যাত। ঘটনাক্রমে সোচির বিখ্যাত ও নবনির্মিত সিরিয়াস কনসার্ট হলে একটি পূর্ণাঙ্গ অপেরা উপভোগের সুযোগ ঘটেছিল। রুশী শিল্পবোধের পরিচয় মিলল সেখানে। রাতে গিয়ে দেখি হল কানায় কানায় পূর্ণ। সেখানে হাজার বারোশো মানুষের উপস্থিতিতে অভিনীত হল ‘দন জুয়ান’। মূল পারফরমেন্স ইতালীয় ভাষায়, উপরে রুশ ও ইংরেজিতে সাবটাইটেল দেখানো হল, যাতে আমরা বুঝতে পারি। পুরা তিন ঘন্টার অনুষ্ঠান। সদ্য নির্মিত নিউ সিরিয়াস কনসার্ট সেন্টারে সেন্ট পিটার্সবার্গের মারিন্সকি থিয়েটার দল, আর অর্কেস্ট্রায় ছিলেন, আরেক মায়েস্ত্রো, নাম জানা হয়নি। হলের নান্দনিক নির্মিতি, বিশালতা, পারফরমেন্সের কারুকার্য, ভোকাল পারফরম্যান্স, রুশী অভিজাতদের সাজসজ্জা - সবই অভিভূত করে দিল। পুরো তিনঘন্টা আমি মানুষকে তন্ময় হয়ে উপভোগ করতে দেখলাম, ফোনে বুঁদ হতে দেখলাম না, এমনকি শো শেষে আমরা সবাই শিল্পীগোষ্ঠীকে স্ট্যান্ডিং অভেশন দিলাম।
সোচি-পর্ব শেষ করে, রুশী ভয়াবহ কঠিন প্রব্লেম-রাজ্যে দাঁত ফুঁটিয়ে কোনরকমে তা রফা পেল ছয়টি ব্রোঞ্জ পদকে। তার পরে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালালুম রুশ বগাতীরদের(Bogatyr—রুশ শব্দ যার অর্থ বীর) স্নেহধন্য, স্বপ্নের শহর ও ঐতিহাসিক নগরী মস্কোবাতে। আহা মস্কো! জেমস বন্ড আর মাসুদ রানার অনতিঅসীম এস্পিওনাজের রাজধানী মস্কো! সবাই যেখানে গুপ্তচর! অথবা কোমিতেত গসুদারসৎভেন্নোয়ি বেজোপাসনেস্তি’র কুখ্যাত সদস্য। কী যে ঘটে সেই রহস্য নগরীতে, পা না ফেলে যাই কী করে?
মস্কোয় পৌঁছলাম ২রা ডিসেম্বরের সন্ধ্যেরাতে, সাড়ে আটটা নাগাদ। আহা, ছমছমে মস্কো নগরী! এয়ারপোর্টে লাগেজ কুড়িয়ে দশজনের টিম গেলাম বেইজমেন্টে মেট্রো স্টেশনে। থাকবার হোটেল শহরের অন্য প্রান্তে। মেট্রো ছাড়া গত্যন্তর নেই। দশজন বাচ্চা, তাদের ভারী লাগেজ, ভাষা বুঝি না, মেট্রো রুট জানা নেই - এসব নিয়ে কোনো হতাশাই করতে দিলেন না তরুণ বন্ধু হাসিব সিফাত। তিনি লোমোনোসভ ইনস্টিটিউটে স্ট্রিং থিওরি পড়ছেন, আন্ডারগ্র্যাড করেছেন বিখ্যাত এমআইপিটি (মস্কো ইনস্টিটিউট অফ ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি) থেকে। তাঁর নেতৃত্বে বাক্সপেট্রা টেনে চলে গেলাম ইজমাইলোভা ডিস্ট্রিক্টে আমাদের হোটেল বেটা’তে। ‘এয়োরেপোর্ট’ স্টেশন থেকে ‘পার্ক পোবেদি’, সেখানে পাশের আরেক মেট্রো চড়ে ‘পার্তিজান্স্কায়া’তে নামলুম। এবং সে স্টেশনে কোনো লিফট নেই, এসকেলেটর নাই, পুরো সিঁড়ি ভেঙ্গে এই বাক্সপেট্রা নিয়ে উঠতে হল, কোমর ভেঙ্গে। কী একটা অবস্থা! ভাবা যায়, পরাশক্তির দেশে বিশেষ-সুবিধাকাঙ্ক্ষীদের এমৎ দুরবস্থা!
মস্কোর মেট্রো দুনিয়াখ্যাত মেট্রো সিস্টেম, যা মস্কোর ভূগর্ভকে জালের মত আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। শহরের যে-প্রান্তে যান না কেন, মেট্রো আপনাকে সংযুক্ত রেখেছে। মস্কোর গভীরতম স্টেশন পার্ক পোবেদি (গভীরতা ৮৪ মিটার) বিশ্বের ৮ম গভীরতম মেট্রো স্টেশন। মস্কোর অনেকগুলি মেট্রো স্টেশন অনেক পুরাতন এবং ঐতিহ্য সম্পন্ন। বেশিরভাগ স্টেশনই নান্দনিক সজ্জায় সজ্জিত। নানা রকমের ভাস্কর্য, সুসজ্জিত স্তম্ভ, গভীর এস্কেলেটর, ইত্যাদি এই মেট্রোর বৈশিষ্ট্য। আমি বেশ কয়েকটি দেশের ভূগর্ভস্থ মেট্রো চড়েছি - কলকাতা মেট্রো, মন্ট্রিয়েল, সৌল, জাপান, সিঙ্গাপুর, সিডনি। এছাড়া অন্য দেশের মাটির উপরের মেট্রোতেও চড়া হয়েছে - ঢাকা, মেলবোর্ন, সউদি আরব, কুয়ালালামপুর ও ব্যাংকক। এদের মধ্যে সিডনি আর সিঙ্গাপুরের মেট্রোকে সবচেয়ে আধুনিক মনে হয়েছে। জাপানও শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এদের তুলনায় মস্কোর মেট্রো যথেষ্ট পুরাতন। ক্যারেজ বা বগিগুলো পুরাতন, প্রচুর শব্দ হয়, লাইনের ঝাঁকুনিও টের পাওয়া যায়। মস্কোর মেট্রোতে চড়লে আপনি আমাদের আন্তঃনগরগুলির ফ্লেভার পাবেন, ঘটাং ঘটাং শব্দ সমেত। ক্যারেজের ভেতরে মেট্রোর লাইনম্যাপগুলিও বেশ পুরাতন এবং পর্যটকবান্ধব নয়। ছোট ছোট অক্ষরে লেখা, খুঁজে পেতে অসুবিধাই হয়, ইংরেজি লেখাগুলি আরও ছোট, পাবলিক অ্যাড্রেস হয় রুশ ভাষায়, ফলে স্টেশনের নাম বুঝে নিতে অসুবিধা হয়। তবে হ্যাঁ, ব্যাপ্তি ও শৈল্পিক নির্মাণে এরা অদ্বিতীয়। আমাদের ৫২ ঘন্টার পুরো মস্কোযাপনে আমি একবারই একজন তরুণকে বই পড়তে দেখেছি, বাকিরা সবাই মুঠোফোনে গুজরান। রাতের মেট্রো সবসময়েই ক্লান্ত মানুষের মুখচ্ছবি দেখার আদর্শ স্থান। কি মন্ট্রিয়াল, কি মস্কো, কি সিডনি - কাজ সেরে ঘরে ফেরা অফিসফেরতা ক্লান্ত মানুষের ভাষাহীন মুখ, মেয়েদের গড়পরতা ফ্যাশন আর টিনেজদের খুনসুটি - সর্বত্র প্রায় একই। তবে রুশ মেয়েদের ফ্যাশন ভাল, তাদের পোশাকে উলের মাত্রা বেশি, ওয়ার্মথ বেশি, ভারী উলের কোটগুলি দারুন সুন্দর। গ্রীবা উঁচু করে মস্কো সুন্দরীর চলাচল দেখবার মত। রুশী রূপকথার আলিওনুশকারা বা ভাসিলিসারা কেমন ছিল তা টের পাওয়া যায়, কল্পনা বিস্তার করলেই।

মস্কো মেট্রো
প্রথম দিন রাতে হোটেলে ঢুকে আমাদের ক্লান্ত দল আর কোনো অভিযানে যেতে পারেনি। নিকটস্থ বার্গার কিঙে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তাছাড়া রুশীরা খুবই আমলাপ্রবণ। যেকোনো বিষয়ে দীর্ঘ ফরমপূরণ এবং লম্বা ফর্দ মেলানোর ব্যাপার থাকে। বলাবাহুল্য, হোটেল রেজিস্ট্রেশনেও আমাদের সব মিলিয়ে প্রায় ঘন্টা-দেড়েক লেগে গেল। বারবার পাসপোর্ট, ইমিগ্রেশন কার্ড, এই সেই নিয়ে নাড়াচাড়া। আবার ভাষাসমস্যাও একটা ব্যাপার।
তেসরা ডিসেম্বর সক্কাল সক্কাল উঠে ছয় বাচ্চাকে উঠিয়ে রেডি করিয়ে হোটেলের কাছাকাছি উজবেকি রেস্তোরাঁয় নাস্তা খাওয়া গেল। ভ্রমণসঙ্গী প্রকৌশলী জাকারিয়া পাঠানের পুরাতন স্মৃতিভিত্তিক পরামর্শে আমাদের সবাইকে ‘পুলাফ’ খেতে হল। ‘পুলাফ’ আসলে পোলাও বা পল মিশ্রিত অণ্ন। কম নুনের পানসে পোলাও অতএব গলাধঃকরণ করে মেট্রো সহযোগে চলে এলাম পার্ক পোবেদি। এখান থেকে উঁচু লম্বা দীর্ঘ এসকেলেটর বেয়ে উঠে এলাম রেড স্কয়ারের কাছে। একটু হেঁটে চলে এলাম নিকোলস্কায়া রোডে যা লুবিয়াঙ্কা স্কয়ার ও রেড স্কয়ারের সংযোগ সড়ক। সড়কটি বিখ্যাত, এখানেই পেলাম বিখ্যাত এবং অত্যন্ত দামী ‘গুম’ মল যেখানে প্রক্ষালন কক্ষ ব্যবহারেই প্রয়োজন হয় ২০০ রুবলের। গুমের ঐতিহ্যবাহী আইসক্রিম খাওয়া দরকার, খেলামও। শপিং মলটি খুবই সুন্দর ও সাজানো। দামের ব্যাপারে একটু ধারণা দেই। একটা বুকখোলা চমৎকার বয়স্কদের সোয়েটার পছন্দ হল, ধরে দাম জিজ্ঞেস করে জানলাম মাত্র ৮৬ হাজার রুবল, মানে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা! মলের বাইরে নিকোলস্কায়া সড়কে অনেক বসার জায়গা আছে, একটা চওড়া প্রোমেনাদের মত। এপাশে গুম মল, ওপাশে অনেক কিউরিওশপ। সেখানে নানা স্যুভেনির, ম্যাগনেট, মাত্রিউশকা পুতুল পাওয়া যায়। একটি ১৮-সেটের মাত্রিউশকা পুতুল-সেটের দাম শুনলাম এক লক্ষ রুবল। তবে ৩ বা ৫ সেটের পুতুলের দাম বেশ কম।
গুম মলের সামনের চওড়া প্রোমেনাদে অনেকে এসে বসে দৃশ্য উপভোগ করেন, নানান পারফরমার দল নাচাগানা করে, সারাদিন বসে থাকলেও কেউ বোর হবেন না। আমরা যেদিন গেলাম, সেদিন তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি। ফলে পাগলপারা শীত না-হলেও বাঙালের তুলনায় হাড়-কাঁপানি শীত তো বটেই! আমরা পদব্রজে ধীরে ধীরে ঐতিহাসিক রেড স্কয়ার, ক্রেমলিন আর সেন্ট বাসিল গির্জা দর্শন করলাম। প্রচুর ছবি তোলা হল। ক্রেমলিনের সামনে বেশ উৎসবের আমেজ, সামনে ক্রিসমাস, তাই মেলা বসেছে। অন্য সময়ে অবশ্য কুচকাওয়াজ হয়, বা এমনি খালি থাকে। ক্রেমলিন ওয়ালের ওধারে আলেকজান্দার গার্ডেনে দুপুর ১২টার গার্ড চেঞ্জ দেখলাম। অনেক উৎসুক মানুষ সামরিক কুচকাওয়াজ দেখল। সেখানে আছে এক অনামা যোদ্ধার স্মৃতি, চিরন্তন শিখা আর স্তম্ভ। হাঁটতে হাঁটতে মস্কোভা নদীর ধারে জারিয়াদিয়ে পার্কে চলে এলাম। চমৎকার পার্ক। নদীর ওপরে তার বিশাল ভি-আকৃতির ক্যান্টিলিভার, একদম নদীর উপর নিয়ে যায়। নদীর শোভা, বড় বড় ভবন, এবং দূরে মস্কোর বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট দেখা যায়।
নদীর শোভা, পার্কের মনোহর বাতাস সেবন করে মেট্রো ধরে এবার চলে এলাম বইয়ের দোকানে। নাম ‘মস্কোভা’, সেই ১৯৫৮ সাল থেকে দোকানটি চালু আছে, তাভারস্কায়া স্ট্রিটে। বিশাল বইয়ের দোকান। অনেকটাই আমাদের এশীয় বুক জায়ান্ট ‘কিনোকুনিয়ার’ মত। তবে অত বই নেই। এই দোকানের পুরো সংগ্রহটিই রুশ ভাষার। একটি সমৃদ্ধ সেকেন্ড-হ্যান্ড বই ও দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সেকশন আছে। রুশ জানা নেই বলে ওদিকে ঢুঁ মেরে লাভ হবে না বুঝে চলে গেলাম দোকানের একদম শেষ প্রান্তে। শেষের দেওয়ালের বামের চারটি শেলফে ইংরাজি বই আছে কয়েকখান। বেশির ভাগই রুশী লেখকদের ইংরাজি অনুবাদ। কিছু হাল ফ্যাশনের বই আছে- হকিং বা ড্যান ব্রাউন।

বইয়ের দোকান সেরে গেলাম ‘আশান’ মলে। বিশাল দক্ষযজ্ঞ, সুবিশাল সুপারমল। ঢাকার ‘যমুনা ফিউচার’ যেন। শুধু সুপারমলেই সময়টা কেটে গেল কেনাকাটায়। বাচ্চারা প্রচুর চকলেট কিনল। বড়দেরও কিনতে হল। মস্কোর মলে রুশী মডেল পাব ভেবেছিলাম। কিন্তু সেই একই নিভিয়া, ট্রেসেমি, ডাভ। মনটা দমেই গেল। মলেই রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরলাম, সেই মেট্রোতে চড়ে।
আমাদের মেট্রো জার্নি দেখার মত। প্রথমত, ভাষা জানি না। দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেট অকার্যকর। ফলে কোথায় উঠব, কোথায় নামব, কীভাবে টিকিট কিনব কিছুই জানি না। ত্রাতা একমাত্র হাসিব সিফাত। তিনি তার আরও দুজন বঙ্গীয় অনুজ নিয়ে এসেছেন, আমাদের সাহায্যার্থে। তারাই টিকিট কিনে দিয়েছেন, রুট পরিকল্পনা করেছেন, আমাদের ও বাচ্চাদের হাত ধরে মেট্রোতে উঠিয়েছেন আর নামিয়েছেন। প্রতি স্টেশনে নেমে হেড-কাউন্ট করাটা রীতিমত দর্শনীয় – এই ছ’নম্বর কই গেল, এই দেখতো আলিফ কোথায়, হায় হায় রুফফাহ্ কি নামে নাই, ইত্যাদি। মস্কো মেট্রোতে যাত্রাপথের দিকনির্দেশনা খুবই দায়সারা, প্রায় পুরোটাই রুশে লেখা। ছোট্ট করে ইংরেজিতে লেখা থাকে কি থাকে না। তদুপরি বাঙালিরাই বিদেশে বাঙালির ভরসাস্থল, তা প্রমাণ করেছেন সিফাত ও তার দল। তাদের প্রতি অনন্ত কৃতজ্ঞতা।

মস্কোতে শেষ দিন অর্থাৎ ৪ঠা ডিসেম্বর মধ্যরাতের পর রাত দুটোয় আমাদের ফিরতি ফ্লাইট। ফলে সকালেই সমস্ত লাগেজ বাক্সবন্দী করে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। তাই মস্কো অভিযানে বেরুতে একটু দেরিই হয়ে গেল। সেই প্রিয় উজবেকি রেস্তোরাঁয় ব্রাঞ্চ সেরে আমরা ইজমাইলোভা থেকে বোটানিচেস্কি সাদ চলে এলাম। মস্কো সেন্ট্রাল সার্কেল রুটের এই ট্রেনগুলো সারফেস ট্রেন, শব্দহীন বগিগুলা খুবই ভাল, লাইনও ভাল। ঝাঁকুনি পেলাম না, ট্রেনের গতি মুহূর্তে ৯০ কেপিএইচ উঠে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। এখানে এসে আবার ভূগর্ভের মেট্রো ধরে ভেদেনখা পার্কে চলে এলাম।
ভেদেনখা পার্ক রুশ ঐতিহ্যের এক ঐতিহাসিক ময়দান। ভেদেনখা শব্দটি “জাতীয় অর্থনীতিতে অর্জনসমূহের প্রদর্শনী” শব্দবন্ধের রুশী-সংস্করণের শব্দ-সংক্ষেপ। সোভিয়েত আমলে ১৯৩৫ সালে এই ময়দানের পরিকল্পনা করা হয়। তখনকার সোভিয়েত আমলে কৃষিখাতে বিভিন্ন অর্জনের একটা প্রদর্শনী দেখাবার জন্য এর পরিকল্পনা করা হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৯ এর মধ্যে এই ময়দানটির বড় রকমের উন্নয়ন ঘটানো হয়। ১৯৯২ সালে এর নতুন নামকরণ হয় এবং বর্তমানে এর আয়তন ২৩,৭৫,০০০ বর্গমিটার। শীতকালে এই ময়দানটিতে স্কি-রিং করা হয় যাতে নাগরিকেরা শীতকালীন আমোদ-প্রমোদ করতে পারেন। সোভিয়েত আমলে এখানে প্রতি বছরেই ৩০০-এর বেশি কনফারেন্স, সেমিনার, প্রদর্শনী এবং নানাবিধ আয়োজন করা হত। এই কাজগুলি এখন সোচি শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ময়দানটির কেন্দ্রে আছে বিশাল প্রদর্শনী ভবন - সেন্ট্রাল প্যাভিলিয়ন যেটা অনেকটা বিয়ের কেকের আদলে নির্মিত হয়েছে, এটা সোভিয়েত আমলের স্তালিনীয় ক্লাসিক স্থাপত্যের ঐতিহ্যবাহী। ভবনটির মাথায় একটি উঁচু দণ্ড আছে, সে সমেত ভবনের উচ্চতা ৯৭ মিটার। বর্তমানে এই ময়দানে একটি বড় এমিউজমেন্ট পার্ক, কেবল কার, আরও অনেকগুলো ভবন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অঞ্চলের প্যাভিলিয়ন (বেলারুশ, আজারবাইজান, উজবেকিস্থান, কাজাখস্তান ইত্যাদি), স্কি-পার্ক, স্পেস ভবন, এবং খাবারদাবারের বিশাল আয়োজন ইত্যাদিতে ভরপুর। কেউ যদি রাশা যায়, তবে আগেই শপিং মলে ঢুঁ না মেরে এখানে কেনাকাটা করে দেখতে পারেন, ভাল শীত কাপড় ও স্যুভেনিরের সংগ্রহ আছে।

এখানেই লিহানের সাথে আমার পরিচয়। ছেলেটি নড়াইলের। টুকটাক জ্যোতির্বিজ্ঞান করে। ওর সাথে আমার দেখা বছর দুয়েক আগে কোনো এক বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার দিনে, পরীক্ষা শেষে এসে সে আমার সাথে দেখা করেছিল। আমার অফিসেই। অবশ্য ওকে আগে থেকেই ফেসবুকে চিনেছি। কথাবার্তা হত। তো সেদিন ও আমাকে রাশিয়ায় অ্যারোস্পেস পড়ার কথা বলেছিল। আমি অবশ্য উড়ায়ে দিসলাম। আরে ধুর! কীসের রাশা! তুমি রেসনিক-হ্যালিডে পড় নাই, আগে ঐটা পড়, ফিজিক্সে ব্যুৎপত্তি নাও। তাছাড়া, ও যাকে ফলো করতে চাচ্ছিল তার সম্পর্কেও আমার বিপরীত মত ছিল। হাউএভার, ২০২৫ এর ডিসেম্বরে মস্কো গিয়ে দেখি সে ব্যাটা হাজির, সে একটা অলটারনেট রিসার্চ ফান্ডও পেয়েছে, মস্কো এভিয়েশন ইনস্টিটিউটে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। আমাদের মস্কো ঘুরানোয় ওর কৃতিত্ব কম নয়, বিশেষ করে পুশকিনের একটি বই জোগাড় করে দিতে। আমাদের দশজনের গ্রুপকে ম্যাকডোনাল্ডসে পুরা ট্রিট সে একাই দিল। লিহানের প্রতি শুভকামনা।
ওদের কথা থেকে বুঝলাম, মস্কোর পড়াশোনায় গণিতের প্রাবল্য বিরাট। স্নাতক শিক্ষার প্রথম দুই বছর গণিতের নানা কোর্স করতেই চলে যায়। গণিতে যারা ভাল না করে তারা ঝরে যায়। আমি আরও কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি। শুনেছি, যেকোনো একাডেমিক ইভালুয়েশন বা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রুশীরা গণিত, এসাইনমেন্ট এবং ভাইভাকে গুরুত্ব দেয়। বেশির ভাগ মূল্যায়নেই মৌখিক আলাপের গুরুত্ব বেশি। ফলে ভাষা দক্ষতা ও প্রেজেন্টেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। গণিতে সবল থাকায় আমাদের সিফাত বা লিহানরা আজ মস্কো বিজয়ের পথে! তারা আমাদের হিরো, রুশ ভাষার ‘বগাতীর’, অজেয় বীর!
রুশী শীত উলের শীত। উলের জামাকাপড় পড়লে মস্কোর শীত চমৎকার উতরে যায় বলে মনে হল। অবশ্য সাইবেরিয়ার কথা আমার বলা শোভা পায় না। মস্কো দেখে ইরকুটস্ক্ সম্পর্কে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে কানাডার শীতের কথা বলতে পারি। সেখানে উল নয়, আপনাকে যুদ্ধ করতে হবে তুন্দ্রার ভয়ানক বাতাসের সাথে। ভয়াবহ উইন্ড চিল! এই বাতাস আপনার হাঁড় কেটে বসে যাবে। এজন্য কানাডার উইন্টার উইন্ড-চিলের উইন্টার, রাশার উইন্টার উলেন উইন্টার।

রুশদেশ ভ্রমণের কতকগুলো সমস্যা না বললেই নয়। প্রথমত, ইন্টারনেটহীনতা। নেট আছে, কিন্ত দরকারী অ্যাপগুলোয় আপনি ঢুকতে পারবেন না। অনেক জায়গায় পেইড ভিপিএনও কাজ করে না, এত শক্তিশালী জ্যামিং কাজ করে। বেশির ভাগ বাংলার নিউজ-পোর্টালে ঢোকা যায় না। ফেসবুক, হোয়াটস-অ্যাপ বন্ধ। ফলে একটা যোগাযোগ ব্ল্যাক-আউটে থাকতে হয়। দেশে কথা বলা তো দূর-কি-বাত! দ্বিতীয়ত, ভাষাসমস্যা। ইংরেজি খুব কম লোকে বলে। সোচি শহরে তাও-বা কিছু পর্যটক আসেন বলে কিছু ইংরেজিতে কাজ চালানো গেছে, মস্কোয় তথৈবচ অবস্থা। মেট্রো সিস্টেমে ইংরেজি অত্যন্ত ছোট অক্ষরে লেখা থাকে, বুঝতে অসুবিধা হয়। সমস্ত পাবলিক অ্যাড্রেস রুশ ভাষায়। ফলে এক দুর্লঙ্ঘ্য ভাষা-ব্যারিয়ার কাজ করে। তৃতীয়ত, বেশিরভাগ লেনদেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে হয়। ক্যাশ টাকার চল কম, আন্তর্জাতিক কার্ডগুলিও চলে না। ডিজিটাল পেমেন্ট বা ইন্টারনেটের জন্য চাই ওয়াই-ফাই কানেকশন – কিন্তু সবতাতেই ফোন নম্বর প্রয়োজন হয়, তার জন্য চাই সিমকার্ড, তার জন্য চাই পুলিশ ভেরিফিকেশন। ফলে এই চক্র থেকে একজন পর্যটকের মুক্তি সহজে মেলে না। স্থানীয় গাইড বা দেশী ছাত্র-ছাত্রীর সাহায্য না পেলে এই চক্র ভাঙা মুশকিল।

যুদ্ধের দেশ বলে সেখানে একটি আল্গা তটস্থ অবস্থা বিরাজ করে। সর্বত্র ব্যাগ স্ক্যান করা মুস্তাহাব। ব্যাপারটা খুবই পীড়াদায়ক। রুশজাতি সম্ভবত খুবই আমলাতান্ত্রিক। এটা সম্ভবত তাদের সোভিয়েত আমলের উত্তরাধিকার। যেকোনো কাজে একগাদা পেপার-ওয়র্ক করতে হয়। একটি উদাহরণ দেই। ভিসা বিষয়ে এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ ছাড়াও আমাদেরকে ৭টি এবং প্রতিটি বাচ্চার জন্য ১০টি করে আলাদা ফর্ম পূরণ করে নিয়ে যেতে হয়েছে। মস্কোর হোটেলে ১০ জায়গায় স্বাক্ষর দিতে হয়েছে। এত কাগজ তারা কোথায় রাখে আল্লা মালুম।
রুশী খাবারের সাথে ওতপ্রোতভাবে পরিচিতি পাওয়া গেছে তা বলা যাবে না। তবে হোটেলে যেমনটি খাইয়েছে সেটার কথা বলতে পারি। এদের খাবারে বিফ খুব প্রাধান্য পেয়েছে। চিকেন সমৃদ্ধ আইটেমগুলি স্বাদের নয়। বিফের নানা স্যুপ খেয়েছি- ভেজিটেবল্, বর্শ্ট্ , সলিয়াঙ্কা, বিফ ক্যাবেজ স্যুপ। খুবই সুস্বাদু, বিশেষ করে বর্শ্ট্ স্যুপের কথা না বললেই না। আমি একেবারে ফ্যান হয়ে গেছি। এছাড়া ট্রাউট, স্যামন, পাইক, স্টার্জিয়ন, হেরিং ইত্যাদি মাছের নানা আইটেম ছিল। অনেকদিন বাদে পর্ক ছাড়া চমৎকার সিজার সালাদ খেতে পেয়ে যারপরনাই আনন্দ পেয়েছি। আর নানা ফলের জ্যুস, বিশেষ করে বানানা শেক, দারুন লেগেছে। আইসক্রিমও ভাল, তবে অনেক বেশি ফ্লেভার যে চেখে দেখেছি তা নয়। কফিতে আমি কোনো বৈচিত্র্য পেলাম না। সেই একই ক্যাপুচিনো, অ্যামেরিকানো, ফ্ল্যাট হোয়াইট, লাটে। ধুর! রাশা গিয়ে যদি আমেরিকানো খেতে হয়! তবে রসিকজনদের জন্য কোনো ভাল খবর দিতে পারলাম না, রুশ ভোদকা কেমন সেটা চেখে দেখা হয়নি। দুঃখিত।
এসব বাদ দিলে পরাশক্তির রাজধানী হিসেবে মস্কো সুন্দর। পরিচ্ছন্ন এবং প্রশস্ত তার সড়কগুলি। চমৎকার আলোকসজ্জায় সজ্জিত। এর মলগুলি আধুনিক এবং সুন্দর সব জিনিসে ভরা। হেমহর্ম্যপুরী যথা। আপনার মন ভাল হয়ে যাবে। মেট্রোতে সারা শহর ঘোরা যায়। দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় কেমন সেটা আমার জানা হয়নি। তবে মস্কোর নারীরা সুন্দরী এবং চমৎকার সুবেশী। শাকিলা সিমকী যেমন বলেছেন, “মস্কোতে প্রথম যখন পা রাখি, … আমি এখানে এসে দেখছিলাম মস্কোর অপ্সরাদের। পুরো মস্কো জুড়ে এতো অপ্সরা ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ কারো কোন মাথা ব্যথা নেই বা মাথা নষ্ট হচ্ছে না। সব স্বাভাবিক। বলছিলাম রুশ নারীদের কথা। সারা পৃথিবী ঘুরে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি, কিন্তু রাশিয়া এসে রাশিয়ান মেয়েদের দেখে আমি মুগ্ধ । তাদের চালচলনে, পোশাকে, ব্যক্তিত্বে, হাঁটা-চলায় সব কিছুর মধ্যেই একটা স্টাইল আছে। মেরুদণ্ড টান টান করে হাতে ব্যাগ, কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে রুশ কন্যাদের হেঁটে চলা। মস্কোয় এই দৃশ্য এখানে রোজকার।” (বিবিসি নিউজ বাংলা, ২৪ জানুয়ারি ২০২০, https://www.bbc.com/bengali/news-51239655)।
আমি রুশ ভাসিলিসাদের পছন্দ করি। তাঁরা প্রত্যেকেই একেক জন রাজকুমারী।