জগদানন্দ রায়ের ‘শুক্রভ্রমণ’ কি আদৌ কোনো কল্পবিজ্ঞান?

বাংলায় কল্পবিজ্ঞানের প্রবর্তক হিসেবে খ্যাত জগদানন্দ রায়ের পুনর্মূল্যায়নে প্রাবন্ধিক আশরাফ আহমেদ

আশরাফ আহমেদআশরাফ আহমেদ
Published : 29 Sept 2022, 08:55 AM
Updated : 29 Sept 2022, 08:55 AM

নন্দিত কল্পবিজ্ঞান লেখক শ্রীসিদ্ধার্থ ঘোষ তিনটি গল্পকে বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের আদিযুগের বলে উল্লেখ করেছেন (১)। এর একটি হচ্ছে শ্রীজগদানন্দ রায়ের ‘শুক্রভ্রমণ। এই গল্পটিকে  শ্রী ঘোষ, এবং দীপ ঘোষ ও সন্তু বাগ গবেষকদ্বয়ও কল্পবিজ্ঞান বলে বিবেচনা করেছেন (২)। জগদানন্দ রায় শান্তিনিকেতনে বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। গল্পটি ১৯১৪ সালে, মতান্তরে ১৮৯২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বলে সিদ্ধার্থ ঘোষ উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দীপ ঘোষ ও সন্ত বাগ নামে দুই গবেষক কঠোর পরিশ্রম করে,জার্মানীর হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত মাসিক ভারতী পত্রিকা যাতে গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় তা সংগ্রহ করে, এই দ্বিমতের অবসান ঘটিয়েছেন (২)। তাঁরা নির্ণয় করেছেন যে গল্পটি আসলে ১৮৯৫ সালের  ভারতী পত্রিকার ১৯তম বর্ষে দুই কিস্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল। এই হিসেবে তাঁরা ‘শুক্রভ্রমণ’ গল্পটিকে বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রাচীন কল্পবিজ্ঞান বলে অভিহিত করেছেন।

পড়ার পর ‘শুক্রভ্রমণ’কে আদৌ বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বা কল্পবিজ্ঞান বলে বিবেচনা করা যায় কিনা তা নিয়ে আমার মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এর প্রধান কারণ বিজ্ঞান নিয়ে গল্পটিতে ভবিষ্যতমুখীতার অভাব। আজ থেকে সোয়াশ বছর পূর্বে গল্পটি যখন লেখা হয়, পাশ্চাত্য বা ভারতীয় সাহিত্যে ‘কল্পবিজ্ঞান’ বলে কোন ধারার সৃষ্টি হয় নি। গেল শতাব্দীর তিরিশের দশকে আমরা সাহিত্যে ‘কল্পবিজ্ঞান’ নামে নতুন একটি ধারার প্রথম ধারণা পাই (৩)। পরবর্তীতে অনেক লেখকই তাঁদের নিজ নিজ দৃষ্টিকোন থেকে কল্পবিজ্ঞান এর সংজ্ঞা দিয়ে গেছেন।

মার্কিন কিংবদন্তী কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভের মতে কল্পবিজ্ঞান হচ্ছে ‘সাহিত্যের একটি শাখা যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে মানুষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে রচিত হয়’ (৩)। এর সাথে গবেষকরা আসিমভের আরো একটি উক্তি যোগ করে থাকেন। তা হচ্ছে ‘মানুষ যতোক্ষণ বিজ্ঞানের যথার্থতা বা যৌক্তিকতা বুঝতে পারবে না এবং তা তাঁদের গল্পের উপযোগী করে ব্যবহার করতে পারবে না, ততোক্ষণ সত্যিকারের কল্পবিজ্ঞানের জন্ম হবে না’(২,৪)। এর বাইরেও বিভিন্ন লেখক কল্পবিজ্ঞানকে বিভিন্ন ভাবে সঙ্গায়িত করেছেন। সূক্ষ্মতা বিবেচনায় তাতে মতভেদ থাকলেও মোটা দাগের সঙ্গাটিতে কোনো পার্থক্য নেই। তাঁদের মতে কল্পবিজ্ঞান হলো প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানকে কল্পনা দ্বারা প্রসারিত করে ভবিষ্যতের কাল্পনিক কোনো অবস্থাকে গল্পে রূপদান।

এভাবে কল্পবিজ্ঞান রচনার প্রথম শর্ত হচ্ছে এটি হতে হবে কাল্পনিক। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে কল্পনাটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। আর অধিকাংশ লেখকের মতে কল্পবিজ্ঞানের তৃতীয় শর্তটি হতে হবে ভবিষ্যত্মুখী। অর্থাৎ আজকের বৈজ্ঞানিক-কারিগরি তথ্য বা জ্ঞান ভবিষ্যতে অনেক উন্নত হয়ে বর্তমানে বিরাজমান অথবা ভবিষ্যতে উদ্ভুত-যোগ্য নতুন কোনো সমস্যার সমাধানে কাল্পনিক গল্প।

কল্পবিজ্ঞানের এই সংজ্ঞা অনুসরন করলে দেখা যাবে বিজ্ঞান-ভিত্তিক হলেও ভবিষ্যত্মুখীতার অভাবে ‘শুক্রভ্রমণ’ কল্পবিজ্ঞান শ্রেণিতে পড়ে না। বিস্তারিত আলোচনায় যাবার আগে গল্পটি সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক।     

শুক্রভ্রমণ: ‘শুক্রভ্রমণ’ এর মূল গল্পটি যা ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তা আমার হাতে নেই। যেটি আছে তা হলো অন্তর্জালে পাওয়া ১৯১৪ সালে এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত জগদানন্দ রায় রচিত ৩২ টি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলিত ‘প্রাকৃতিকী’ নামে একটি বইয়ের শেষ অধ্যায় হিসেবে (৫)। প্রথম ৩১টি বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখিত হলেও শেষ ‘শুক্রভ্রমণ’টিই তাঁর একমাত্র কাল্পনিক গল্প, যার মাঝে মহাকাশ বিজ্ঞানের অনেক তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রতিটি অধ্যায়ই সুলিখিত ও সুশৃঙ্খল। প্রথমেই সাবধান করে দেয়া দরকার যে গল্পটিতে শুক্রগ্রহ সম্পর্কে যে যে তথ্য প্রদান করা হয়েছে তার অধিকাংশই বর্তমানের পাঠকের কাছে ভুল বলে প্রতীয়মান হবে। পরের একটি পরিচ্ছেদে এই গড়মিলের উৎপত্তি নিয়ে বিষদ আলোচনা করেছি। এক্ষণে তথ্যের সত্যমিথ্যা যাচাই না করে গল্পটি পড়ে বা শুনে যাওয়াই উত্তম। প্রথম পুরুষে লেখা এই গল্পের প্রধান চরিত্র পুরনো জিনিসের দোকান থেকে ভাঙাচোরা কয়েকটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র কিনে শখের বিজ্ঞান চর্চা করেন। এই চর্চায় কথিত বিজ্ঞানুরাগী এক বন্ধু ছিলেন লেখকের অবলম্বন। বন্ধুটির বৈজ্ঞানিক মেধা এমনই ছিল যে তাঁর আবিষ্কৃত স্বয়ংক্রিয় একটি জাহাজ ‘কলসাহায্যে চালানো দূরের কথা, রজ্জুদ্বারা সাধারণ উপায়ে চালাইতে গিয়াও, তরীখানি নাকি, উল্টাইয়া বিপরীতভাবে চলিতে আরম্ভ করিয়াছিল’। শুধু তাই নয়, নিজে কিছু করতে না পারলেও এই বাগাড়ম্বর বন্ধুটি টমাস আলভা এডিসনের আবিষ্কৃত ফোনোগ্রাফ ‘যন্ত্র সর্বাংজ্ঞ সুন্দর হইতে যে এখনও অনেক গবেষণা ও চিন্তার আবশ্যক, … দুই একটি নূতন উদাহরণ দ্বারা তাহা’ বুঝিয়ে দিতেন। এহেন বন্ধুটি একদা লেখককে ছোট একটি বই থেকে শুক্রগ্রহসম্পর্কিত অধ্যায়টি পাঠ ও মন্তব্যকালে লেখক চোখ বন্ধ করে তা শুনছিলেন। এই পর্যায়েই কল্পনায় লেখকের শুক্রভ্রমণটি শুরু হয়।       লেখক নিজেকে শুক্রগ্রহের বিষুবরেখার সন্নিকটে ‘চিরতমসাবৃত’ অংশের পূর্বাংশে আবিষ্কার করেন এবং সেখানকার আকাশের তারা অবলোকন করে নিজ আবাসভূমি পৃথিবী ও এর চাঁদকেও সনাক্ত করতে সক্ষম হলেন। এক সময়ে শুক্রপৃষ্ঠে ক্ষণিক আগে পৌঁছানো তাঁর সেই সবজান্তা বন্ধুকেও দেখতে পান। শুধু অন্ধকারই নয়, সূর্যালোকের অভাবে সেখানে প্রচণ্ড শীত এবং একই সাথে নিজের পদক্ষেপনের শব্দও বিকট ছিল। অচিরেই লেখক ‘শরীরের তুলনায় মস্তকটি অত্যন্ত বৃহৎ’, ‘হস্তপদ দীর্ঘনখযুক্ত’ এবং ‘সর্বশরীর ঘনকৃষ্ণলোমাবৃত’ ‘সম্পূর্ণ উলংজ্ঞ’ ‘বর্বর গুহাবাসী’ এক ‘বনমানুষ’ দেখে প্রথমে ভয় পেলেও শেষ পর্যন্ত ওরই আহবানে তাদের গুহায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। গুহাটি আগুন জ্বালিয়ে আলোকিত। এরা উদ্ভিদভোজী। সূর্যের আলোর অভাবে এরা মাটির নিচে গ্রহাভ্যন্তরের তাপ ব্যবহার করে উদ্ভিদ জন্মায়। দুই বন্ধু মিলে অতিথিপরায়ন এই বর্বরজাতির প্রস্তুত আহারও বিনা বাক্যব্যায়ে উদরস্থ করেন। এক ধরণের শাক খেয়ে দশ দিন নিশ্চিন্তে উপোস থাকা যায়। দুই বন্ধু গুহা থেকে বের হয়ে মেঘমুক্ত আকাশে তাকালে গ্রহ-নক্ষত্রমণ্ডলীকে পৃথিবী-পৃষ্ঠ থেকে দৃশ্যমানের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল ও স্পষ্টভাবে দেখতে পেলেন। কারণ হিসেবে সূর্যালোকহীন শুক্রের চির অন্ধকার এই অংশের বায়ূমণ্ডলে জলীয় বাস্পের উপস্থিতি নেই বলে সাব্যস্ত করলেন। নিজের সাথে থাকা ১২-ঘণ্টা সময় নির্দেশক একটি ঘড়ি, আকাশে বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান, এবং ২২৪ দিন ১৮ ঘণ্টায় এক শুক্রবর্ষের জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তাঁরা দুই সপ্তাহকাল গুহাবাস করছেন বলে নির্ণয় করলেন। এবার তাঁরা বর্বরদের সহায়তায় প্রচুর রসদ সংগ্রহ করে আরেক ভৃত্যসম বর্বর অনুগত সহচরের মাথায় বোঝা চাপালেন। এবং শুক্রের আলোকিত অংশ পর্যবেক্ষণের জন্য গ্রহটির বিষুবরেখার সমান্তরালে পূর্বদিকে যাত্রা শুরু করলেন।   তাঁদের পায়ের আওয়াজের স্থায়ীত্বের কারণ খুঁজতে গিয়ে শুক্রপৃষ্টের বায়ূর অধিক ঘণত্বকে দায়ী করলেন। নিস্তব্ধ নিথর প্রান্তরে কোনো প্রাণের চিহ্ন না পেলেও একসপ্তাহ চলার পর তাঁরা এক বৃহৎ ও উন্নত স্থাপত্যকলার নিদর্শন এক অট্টালিকার ভগ্নস্তুপ দেখে এই গ্রহে অতীতে কোনোকালে এক অতি উন্নত প্রাণির অস্তিত্ব ছিল বলে ধারণা করলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁরা সুদূরে আলোর ছটা দেখে নিকটবর্তী হয়ে সেটিকে এক সুউচ্চ তুষার পর্বত বলে সনাক্ত করলেন। একই সাথে শুক্রের আলোকিত অংশটি যে পর্বতের বিপরীত দিকে আধা মাইল দূরে অবস্থিত সে সম্পর্কেও ধারণা করলেন। বর্বর ভৃত্যটির ধারালো নখ দিয়ে বরফের অপেক্ষাকৃত ছোট পর্বতগাত্রটি আরোহনের উপযুক্ত হলে তাঁরা অপর পাড়ে যাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু উঁচু স্থান থেকে ভেঙে পড়া তুষারপিণ্ডের সাথে এক মিনিট পতনের পর তুষার-সমুদ্র জলে পতিত হলেন। একটি নৌকা তীরবেগে এসে তাঁদের উদ্ধার করে একটি বড় জাহাজে নিয়ে তুলল। জাহাজটি ছিল বিদ্যুত চালিত এবং হালকা এলুমিনিয়ামের তৈরী যেন, এর ধারণক্ষমতা বেশী হয়। জাহাজের নাবিকদের গঠন পৃথিবীর মানুষের মতো। তাঁদের ছিল কৃষ্ণকেশ, উজ্জ্বল চোখ ও সুশ্রী মুখমণ্ডল যা ‘পৃথিবীতে বিরল’। লেখক তাঁদের উদ্যমশীল ও উন্নতজাতিসমভূত বলে ধারণা করলেন। এরা সভ্যতা ও বিজ্ঞানে পৃথিবীর পাশ্চাতের বিজ্ঞান থেকে শ্রেষ্ঠ কিন্তু জ্যোতির্বিদ্যায় হীন কারণ শুক্রের আলোকিত অংশের গগণমণ্ডল কৃষ্ণমেঘাচ্ছন্ন থাকে। অন্যদিকে উন্নত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের অধিকারী হওয়ায় সূর্য প্রদক্ষিণরত শুক্রগ্রহের কক্ষাভ্যন্তরে ঘুর্ণায়মান বরুণগ্রহ (বুধ) এবং সূর্য সম্পর্কে পার্থিব বিজ্ঞানীদের থেকে বেশি ওয়াকেবহাল।   নৌবিদ্যায় কুশল এই নাবিকরা তাঁদের রাষ্ট্রীয় ব্যায়ে সুউচ্চ পর্বতটি পাড়ি দিয়ে শুক্রের অন্ধকার অংশে যাবার অভিযানে এসেছিল। কিন্তু অদ্ভুত তিনটি প্রাণি দেখতে পেয়ে অশেষ যত্ন ও আতিথেয়তা প্রদর্শন এবং পরস্পরের ভাষা আয়ত্ব করে সেই অভিযান বন্ধ রেখে দেশে ফিরে চলল। কারণ ভিনগ্রহের জীবদের নিজের দেশে জীবন্ত নিয়ে যেতে পারলে ওরা বিশেষভাবে পুরষ্কৃত হবে। যাত্রাপথে বর্বর ভৃত্যটির আলাদা থাকার ব্যবস্থা করতেও তারা ত্রুটি রাখল না। শুক্রভ্রমণের মূল গল্পের এখানেই শেষ।           

‘শুক্রভ্রমণ’-এ বৈজ্ঞানিক তথ্যের সাথে আমাদের জ্ঞানের গড়মিল ও এর কারণঃ লেখক শুক্রগ্রহে অবস্থানকালে গ্রহটির ভূগোল, বায়ূমণ্ডল, আবহাওয়া,উদ্ভিদ, মানুষের মতো প্রাণী, তাঁদের খাদ্য, আচরণ, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রগতি যা যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, সেইসব গল্পাকারে লিপিবদ্ধ করেছেন।

লেখক যে যে বৈজ্ঞানিক বা বিজ্ঞান-সম জ্ঞান বা তথ্যের উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছে শুক্রের বায়ূমণ্ডলের ঘণত্ব পৃথিবীর বায়ূমণ্ডল থেকে বেশি, শুক্রগ্রহে সভ্য ও বর্বর মানুষরূপী প্রাণি আছে, বর্বর প্রাণিরা গ্রহাভ্যন্তরের তাপ দ্বারা খাদ্য হিসেবে উদ্ভিদ চাষ করে, শুক্রগ্রহের একটি অংশ সর্বদা সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে এবং অপর অংশ সূর্যের বিপরীতমুখী হয়ে সর্বদা অন্ধকার থাকে, শুক্রগ্রহের তাপমাত্রা অত্যধিক ঠাণ্ডা হলেও সেখানে তাঁর মতো পৃথিবীর মানুষ অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে, সুউচ্চ তুষার-পর্বত রয়েছে, আলোকিত অংশের সভ্য শুক্রবাসীদের সূর্য এবং বরুণ বা বুধগ্রহ সম্পর্কে জ্ঞান পৃথিবীবাসীদের চেয়ে উন্নত হলেও পৃথিবী এবং দূরবর্তী অন্যান্য গ্রহ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই কারণ তাদের ভৌগলিক অবস্থানই এর জন্য দায়ী।   

গল্পটি লেখার সময়ে নৃতাত্বিক গবেষণায় পৃথিবীর বিভিন্ন জাতীর আবাস, খাদ্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতি সম্পর্কে অনেকটাই জানা ছিল। পৃথিবীতে আফ্রিকার অন্ধকার অরণ্যের ‘অসভ্য’ কালো মানুষ এবং পশ্চিমের ‘সভ্য’ ও ‘উন্নত’ সাদা মানুষের ন্যায় প্রাণী তিনি শুক্রগ্রহের অন্ধকার ও আলোকিত অংশে দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁদের আচরণও পৃথিবীর মানুষের মতোই ছিল। এ থেকে বোঝা যায় শুক্রগ্রহকে তিনি পৃথিবীর মতোই ধরে নিয়েছিলেন। 

শুক্রগ্রহের পৃষ্ঠ থেকে দৃশ্যমান আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলী এবং পৃথিবী ও আমাদের চাঁদের যে বর্ণনা তিনি নভোচারীর দৃষ্টিতে দিয়েছেন, সেটি পাঠক হিসেবে আমার কাছে খুবই স্বাভাবিক মনে হয়েছে। তেমনি শুক্রগ্রহটির বিষুবরেখা, পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী হেঁটে সূর্যালোকের দেখা পাওয়া, পৃথিবী থেকে শুক্রগ্রহের বৎসর বড় হওয়া, ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের বর্তমান জ্ঞানের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য বা স্বাভাবিক মনে হয়েছে। কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছে শুক্রগ্রহের আবহাওয়া, তাপমাত্রা, ভূগোল এবং একটি বর্ষের স্থায়ীত্বের যে হিসাব বা বর্ণনা নিয়ে।

গ্রহটিতে পৌঁছে তিনি শীত অনুভব করেছেন এবং পশুর ছাল-নির্মিত পোষাক পরে শীত নিবারণ করেছেন। তিনি সেখানে বরফাচ্ছাদিত হিমশীতল সুউচ্চ পর্বত পেরিয়েছেন, পানিতে ভাসমান নৌকায় চড়েছেন। অথচ আমরা জানি শুক্রগ্রহের গড় তাপমাত্রা ৪৫৩ (৪৩৭-৪৮২) ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি (৬)। পৃথিবীপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে নথিভুক্ত করা হয়েছিলো ১৯২১ সালে আফ্রিকার লিবিয়ার মরুভূমিতে। ৫৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কোনো প্রাণি কোনোক্রমে কয়েকঘণ্টা টিকে থাকতে পারলেও ৪৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে মানুষের দেহ পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যাওয়ার কথা।

শুক্রের আবহাওয়া সম্পর্কে তিনি লিখেছেন সেখানে বায়ূতে পানির আর্দ্রতা অত্যধিক, পানির বৃষ্টি হয়, পানির বরফপাত হয়। অথচ আমরা জানি পানি নয়, শুক্রগ্রহটি সর্বদা কার্বনডাই অক্সাইড ও সালফিউরিক এসিডের ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকে (৬)।    

চাঁদের একটি পিঠ যেমন কখনোই সূর্যের আলো দেখতে পায় না, শুক্রগ্রহের একটি পিঠকেও তিনি তেমনি অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখেছেন ও বলেছেন। অথচ আমরা জানি শুক্রগ্রহের একটি বৎসরের দৈর্ঘ তার দিনের দৈর্ঘ থেকে কম হলেও সে খুব ধীরিগতিতে নিজ অক্ষরেখার চারদিকে ঘুরছে। ফলে শুক্রের কোনো পিঠই চাঁদের মতো সর্বদা আলোকিত বা সর্বদা অন্ধকার থাকে না। (সূর্যকে প্রদক্ষিণ করা শুক্রগ্রহের বৎসর পৃথিবীর প্রায় ২২৪.৭ দিনের সমান কিন্তু শুক্রের একটি দিন পৃথিবীর ২৪৩ দিনের সমান) (৬)। অর্থাৎ শুক্রের দিন অথবা রাতের দৈর্ঘ শুক্রের বৎসরের দৈর্ঘ থেকে বেশি হলেও দুই পিঠই সুর্যের আলো দেখতে পায়। শুধু তাই নয়, শুক্রের বৎসরের হিসাব দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন এটি পৃথিবীর ২২৪ দিন ১৮ ঘণ্টার সমান (৫)!  

ওপরে উল্লিখিত তিনটি প্রধান গড়মিলের জন্য কল্পবিজ্ঞান হিসাবে গল্পটির আবেদন নষ্ট হয়নি কিন্তু বাস্তবিক বা রিয়ালিস্টিক না হয়ে আপাতদৃষ্টিতে এটিকে অলীক বা ফ্যান্টাসি বলে মনে হয়।   কিন্তু ‘প্রতিকৃতী’ বইয়ের অন্য যে কোনো প্রবন্ধ পাঠে লেখককে একজন প্রবল বিজ্ঞান-সচেতন মানুষ বলেই প্রতীয়মান হয়। তিনি শুক্রগ্রহের আবহাওয়া, তাপমাত্রা, ভূগোল এবং একটি বর্ষের স্থায়ীত্ব সম্পর্কে এমন অবৈজ্ঞানিক চিন্তাপ্রসূত তথ্য দেবেন তা ধরে নিতে কষ্ট হয়। তাই শুক্রগ্রহ সম্পর্কে আজ থেকে দেড় দুইশত বৎসর পূর্বে আমাদের বা বৈজ্ঞানিক মহলের জ্ঞান কি ছিল তা জানতে তৎপর হলাম।     

অন্তর্জালের গুগল-এ ‘শুক্রগ্রহ’, ‘শুক্রগ্রহের ইতিহাস’, বা ‘শুক্রগ্রহ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের ইতিহাস’ লিখে অনুসন্ধান করলে এবং পরিচিত কোনো জ্যোতির্বিদকে জিজ্ঞেস করলে যে উপাত্তগুলো বেরিয়ে আসে তার অধিকাংশেই গ্রহটি সম্পর্কে আমাদের বর্তমান জ্ঞানের বাইরে বিশেষ কিছু উল্লেখ থাকে না। কাংক্ষিত তথ্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী বাক্যটি লেখা হয় এইভাবেঃ ‘১৯২০ এর দশকে উন্নতমানের দূরবীন আবিষ্কার এবং বিশেষ করে ১৯৬০ এর দশকে গ্রহটিতে পাঠানো কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো তথ্যের আগে শুক্রগ্রহের বিশেষ কিছুই আমরা জানতাম না’। যে দুটি প্রবন্ধে আমার উত্তর পেলাম এর একটি হলো নাসায় সংরক্ষিত বৃটিশ এস্ট্রোনোমিক্যাল এসোসিয়েশনের একটি প্রবন্ধ (৭)। আর তাতেই ‘শুক্রভ্রমণ’ গল্পটিকে এখনকার জ্ঞানে না হলেও তখনকার সময়োপযোগী একটি বিজ্ঞান ভিত্তিক কাহিনী বলে প্রতীয়মান হলো।  

উক্ত প্রবন্ধের শুরুর দিকে লেখক শুক্রগ্রহের প্রণয়ণ করা ভূগোল ‘১৯৬০ দশকের আগে সামান্যই উপকারী ছিল’ স্বীকার করেই দেখিয়েছেন যে গ্রহটির ভূগোল, আবহাওয়া, দিনের দৈর্ঘ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা সময়ের সাথে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তা ছাড়াও বিষয়গুলো নিয়ে একই সময়কার দুই বা ততোধিক বিজ্ঞানীদের মাঝে যথেষ্ট মতপার্থক্যও ছিল (৭)।

তাতে দেখা যায় ১৬৬৫ খৃব্দ থেকেই জ্যোতির্বিদরা ধারণা করতেন যে শুক্রপৃষ্ঠে আকাশচুম্বী পাহাড় রয়েছে যার চূড়াগুলো বরফাচ্ছাদিত থাকে। পরবর্তী প্রায় তিনশত বছর ধরে ক্রমান্বয়ে অধিকতর শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র নির্মানের সাথে সাথে তাঁরা আরো মনে করতেন যে গ্রহটিতে পৃথিবীর মতোই নদীনালা এবং গাছপালা রয়েছে। একইভাবে তাঁরা বিশ্বাস করতেন আমাদের চাঁদের মতোই শুক্রগ্রহের একপিঠ সর্বদা সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে বলে সবসময় আলোকিত থাকে। আর অপর পিঠ সূর্যের মুখ দেখতে পায় না বলে সর্বদা অন্ধকার ও শীতাচ্ছন্ন থাকে। এসব বিশ্বাসের বিপরীত ধারণা পোষণকারীর অভাবও ছিল না। তা সত্ত্যেও ১৯৬০ এর দশকের আগে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকার ফলে গ্রহটি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান শ্রীজগদানন্দের মতোই ছিল।

১৯৬৩ ও পরবর্তী বছরগুলোয় শুক্রগ্রহ পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথিবী থেকে পাঠানো বেশ কয়টি মহাকাশযান পাঠানো হয় (৬)। খুব কাছে থেকে তোলা তাদের পাঠানো ছবিতে দেখা যায় উপরোক্ত সব ধারণাই ভুল ছিল। অর্থাৎ বরফাচ্ছাদিত পর্বতশৃংগ, নদনদী ও গাছপালা বা জীবীত কোনো প্রাণী থাকার থাকার কোনোই সম্ভাবনা নেই। কারণ, শুক্র-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা কোথাও ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেই, নেই পানি ও শ্বাস নেয়ার অক্সিজেন! 

এতো জানার পরও শুক্রের এক পিঠ সূর্যের দিকে স্থির হয়ে থাকার ধারণাটি ১৯৫৫ পর্যন্ত কোনো কোনো জ্যোতির্বিদ বিশ্বাস করতেন (৭)।

একটি উদাহরণ দিয়ে তৎকালীন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও ‘শুক্রভমণ’ এর বক্তব্যের সমতা তুলে ধরছি। শুক্রপৃষ্ঠে পূর্ববর্তী জ্যোতির্বিদিদদের অবলোকনকৃত বরফাচ্ছন্ন পর্বতশৃংগকে (পিক ক্যাছিং দি সানলাইট- জোহান হিয়েরোনিমাস শ্রটার, ১৭৭৯) সমর্থন করে ১৮৭৮ সালে বেলজিয়ামের এটিনে ট্রেভিলট লিখেছিলেন ‘দক্ষিণ মেরুরটি উজ্জ্বলতম এবং মেরুদেশীয় ছোপ (চূড়া অর্থে) গুলো স্পষ্ট দেখা যায়।…মেরুদেশীয় বিন্দুগুলোকে মনে হয় চূড়া ও সূচাগ্রের ন্যায় জ্বলজ্বল করছে’ (৭)। সম্ভবতঃ এই ধরণের সমসাময়িক কোনো তথ্যের উপর ভিত্তি করেই শুক্রভ্রমণ-এ জগদানন্দ লিখেছেন ‘পার্থিব জ্যোতির্ব্বিদ্‌গণ দূরবীক্ষণ দ্বারা শুক্রমণ্ডল পরিদর্শন কালে, ইহার প্রান্তে যে উজ্জ্বল রেখা দেখিয়া থাকেন, তাহা যে এই তুষার পর্ব্বতই সূর্য্যকিরণোদ্ভাসিত হইয়া উৎপন্ন করে, তাহাও বুঝা গেল’ (৫)। এবং ‘এতদ্ব্যতীত গগনমণ্ডল অধিকাংশ সময়ই যেরূপ ঘোর কৃষ্ণামেঘাচ্ছন্ন থাকে, তাহা দেখিয়া নিকৃষ্ট জোতিষিক জ্ঞানের জন্য, ইহাদের বুদ্ধিবৃত্তির উপর কোন দোষারোপ করা গেল না’ (৫)।

কাজেই ১৮৯৫ সালে জগদানন্দ রায় তার ‘শুক্রভ্রমণ’এ গ্রহটির যে বর্ণনা দিয়েছেন তা সেই সময়ে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আলোকেই দিয়েছেন। সময়ের বিচারে তাঁর সেই কল্পনাগুলো তাই অলীক কিছু ছিল না। শুধু জগদানন্দই নন, এই ১৬৫৬ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত অনেকেই এই রকম ধারণাকে পুঁজি করেই শুক্রগ্রহকে নিয়ে কল্পবিজ্ঞান রচনা করেছেন (৮-৯)।  

‘শুক্রভ্রমণ’ কি আদৌ কোনো কল্পবিজ্ঞান? এখন দেখা যাক কল্পবিজ্ঞান হিসেবে ‘শুক্রভ্রমণ’ কতোটুকু সার্থক। কল্পবিজ্ঞান সংজ্ঞার তিনটি আবশ্যিক উপাদান যথা কাল্পনিক, প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান নির্ভরতা এবং ভবিষ্যতমুখীতার (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য) আলোকে বিবেচনা করলে গল্পটি কাল্পনিক সন্দেহ নেই। কারণ, যেখানে এখনও মানুষ শুক্রে পদার্পন করতে পারেনি লেখক আজ থেকে সোয়াশ বছরেরও আগে কল্পনায় সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর কল্পনাটি ছিল তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় স্বপ্নে দেখা অবাস্তব কোনো ঘটনার মতো।   ‘শুক্রভ্রমণ’ কি কল্পবিজ্ঞান সংজ্ঞার দ্বিতীয় শর্ত, প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান নির্ভর কোনো গল্প? উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ; ওপরের পরিচ্ছেদের আলোচনায় আমরা দেখেছি, বর্তমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিবেচনায় না হলেও যে সময়ে গল্পটি লেখা হয়েছিল তখনকার প্রচলিত বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসের সাথে তাঁর কোনো সঙ্ঘর্ষ নেই। শুধু জগদানন্দ রায়ই নন, তাঁর পূর্বে ও পরে বেশ কিছু লেখক আগেকার ভ্রান্ত তথ্য বা ধারণার ওপর ভিত্তি করেই কল্পকাহিনী লিখেছেন (৮-১০)। এভাবে  সহজেই আমরা ধরে নিতে পারি যে ‘শুক্রভ্রমণ’ গল্পটি কল্পবিজ্ঞান সংজ্ঞার দ্বিতীয় উপাদান বা শর্তটিও পালন করতে পেরেছে। এখন কল্পবিজ্ঞান সংজ্ঞার তৃতীয় উপাদান ‘ভবিষ্যতমুখীতা’র (২-৪) দিকে তাকানো যাক। মানুষ এখনও যেখানে শুক্রগ্রহে পদার্পন করতে পারেন নি, সেখানে সেখানে তাঁর শুক্রগ্রহ বর্ণনা সম্বলিত ভ্রমণটি অবশ্যই ভবিষ্যতমুখীতার পরিচয় দেয়। শুধু তাই নয়, গ্রহপৃষ্ঠে তিনি যা যা দেখেছেন ও অনুভব করেছেন সে সবেরও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। ফলে আপাতদৃষ্টিতে গল্পটিকে ভবিষ্যতমুখী বলেই প্রতীয়মান হয়, এবং এটিকে বাংলা সাহিত্যে রচিত প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বলে ধরে নিতে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু অচিরেই আমরা দেখতে পাব যে গল্পটিতে বিজ্ঞান নিয়ে কোনো ভবিষ্যত্মুখীতা নেই। পূর্বের পরিচ্ছেদে আমরা দেখেছি শুক্রগ্রহের ভূগোল, আবহাওয়া, মানুষ-সদৃশ প্রাণি ও বৎসরের স্থায়ীত্বের হিসাব নিয়ে শ্রীজগদানন্দ যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা গ্রহটি নিয়ে পৃথিবীতে সেই সময়ে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আলোকেই দিয়েছেন। তাতে লেখকের চিন্তায় বৈজ্ঞানিক কোনো প্রাগ্রসরতা ছিল না। কাল্পনিক এক শুক্রভ্রমণ বর্ণনাকালে শুক্রগ্রহ নিয়ে সেই সময়কার আমাদের যে যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ছিল, গল্পের আকারে লেখক তাই একে একে বিবৃত করে গেছেন। লক্ষ করুন, লেখক শান্তিনিকেতনে বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। একজন সফল শিক্ষকের কৌশল অবলম্বন করেই বিজ্ঞানের দুরূহ তথ্য তিনি গল্পছলে বলে গেছন। সাধারণ পাঠকের নিকট দুর্বোধ্য বিজ্ঞানকে আকর্ষণীয় করতে প্রায়শই তিনি নিজেকে বোকা বানিয়ে অথবা তাঁর বাগাড়ম্বর বন্ধুটির মুখ দিয়ে দার্শনিক তত্ত্ব উচ্চারণ করিয়ে হাস্যরস আনার চেষ্টা করেছেন। পৃথিবীতে বড় মস্তিষ্ক নিয়ে প্রথম মানুষের উৎপত্তি যে আফ্রিকায় হয়েছিল তা ১৮৮৫ সালের (যখন প্রথম ‘শুক্রভ্রমণ প্রকাশিত হয়) বহু পূর্বে, ১৮৭১ সালেই চার্লস ডারউইন দিয়ে গেছেন (১১)। এর সাথে পাশ্চাত্যের ‘সভ্য’ ও ‘সুশ্রী’ (সাদা অর্থে) মানুষ কর্তৃক ‘অন্ধকার মহাদেশ’ বলে খ্যাত কালো মানুষদের অসভ্য ও বর্বর বলে প্রাচীনকাল থেকে আখ্যায়িত করার প্রবণতা থেকে আমরা আজও মুক্ত হইনি। শ্রীজগদানন্দ শুক্রগ্রহে যে মোটাবুদ্ধি ও কৃষ্ণকায় ‘বনমানুষ’ দেখেছিলেন তাঁরা আমাদের মনে চিত্রিত আফ্রিকার কালো মানুষের মতোই ছিলেন। এই প্রাণিগুলোর শারিরীক গঠন বা আচরণ বর্ণনাকালে লেখককে কোনো কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়নি, প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে তিনি যেতে পারেননি। শুধু তাই নয়, তখনকার যুগে কৃষ্ণ বা বাদামী ভৃত্য বা কৃতদাসের যে যে আচরণ পৃথিবীতে প্রত্যক্ষ করা যেত, শুক্রগ্রহের ‘বর্বর’ প্রাণিদের মাঝেও তিনি অবিকল তেমন সেবামূলক আচরণই প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাতে ভবিষ্যৎ বা ভিন্ন কল্পনার রেশ মাত্র ছিল না। সূর্যের আলো পায় না বলে শুক্রগ্রহের অন্ধকার অংশের গুহাবাসীরা মাটির নিচে উদ্ভিদের চাষ করে তাদের খায়ের চাহিদা মেটায় বলে আমরা জানতে পারি। লক্ষ করুন, লেখক এখানে গাছ বা শস্য না বলে ‘উদ্ভিদ’ (যাহা ভূমি ভেদ করে উপরে ওঠে) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। পাঠক আরো লক্ষ করুন যে ‘ব্যাঙের ছাতা’ ইংরেজিতে যাকে মাশরুম মলা হয়, সেটিও এক ধরণের উদ্ভিদ, এবং পৃথিবীতে নানা ধরণের ব্যাঙের ছাতা উৎপন্ন হয়, যার অনেক প্রজাতিই আমাদের খাদ্য তালিকায় পড়ে। শুধু তাই নয়, ১৬৫০ সাল থেকেই ফ্রান্সে মাটির নিচে গুহাভ্যন্তরে ব্যাপক ভিত্তিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৬৫ সালে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাঙের ছাতা চাষের প্রচলন হয় (১২)। কাজেই ১৮৮৫ সালে শ্রীজগদানন্দ শুক্রগ্রহের গুহাভ্যন্তরে উদ্ভিদ চাষের যে উদাহরণ দিয়েছেন তা পৃথিবীতে লব্ধ তাঁর জ্ঞানের আলোকেই দিয়েছেন কিন্তু তাতেও বিজ্ঞান নিয়ে ভবিষ্যত্মুখীতার কিছুই নেই। শুক্রগ্রহের মানুষ সদৃশ্য সভ্য প্রাণীদের জলযান বা জাহাজটিকে তিনি বিদ্যুৎচালিত বলে উল্লেখ করেছেন। কেহ কেহ এই তথ্যটিকেও লেখকের ভবিষ্যৎ-বৈজ্ঞানিক চিন্তা বলে ভেবে থাকতে পারেন, কারণ তখনো ভারতে কৃত্রিম উপায়ে উৎপন্ন তাপ-বিদ্যুতের প্রচলন শুরু হয়নি বলা চলে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, ‘শুক্রভ্রমণ’ প্রকাশের ৫৬ বৎসর পূর্বে, ১৮৩৯ সালেই রাশিয়ায় বিদ্যুৎ-চালিত নৌকা আবিষ্কৃত হয় (১৩)।  শুধু তাই নয়, বইটি প্রকাশের ১৫ বৎসর পূর্বে, ১৮৮০ সাল থেকেই ইউরোপে বিদ্যুৎ-চালিত নৌযানের স্বর্ণযুগের সূচনা হয়েছিল (১৩)। কাজেই ‘শুক্রভ্রমণ’-এ শ্রীজগদানন্দের বিদ্যুত-চালিত জাহাজের ধারণাটিকে কোনোক্রমেই বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যত্মুখীতার পরিচয় দেয় না।  

একইভাবে তখনকার বিশ্বে সভ্যতা এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি উৎকর্ষতায় ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গদের একচেটিয়া আধিপত্যের যে উদাহরণ আমাদের সামনে আছে, শুক্রগ্রহের প্রাণীদের মাঝে শ্রীজগদানন্দ ঠিক তেমনটিই দেখেছিলেন। এই দুটি ক্ষেত্রেও বিবর্তনশীল ভবিষ্যতে কাল্পনিক মানুষ বা মানুষরূপী প্রাণীর পরিবর্তীত আকৃতি, আচরণ বা চিন্তা-চেতনার কোনো উল্লেখ তিনি করেন নি। এই বিচারেও কাল্পনিক ‘শুক্রভ্রমণ’ কোনো ভবিষ্যত্মুখীতার প্রমাণ দেয় না।

এই প্রসঙ্গে প্রাচীন দুটি কল্পবিজ্ঞান কাহিনীতে বর্ণিত প্রাণিদের উদাহরণ আমরা টানতে পারি। কল্পবিজ্ঞানের গুরু আসিমভ এবং জ্যোতির্বিদ কার্ল সাগান ১৬৩৪ সালে জ্যোতির্বিদ জ্যোহানেস কেপলার রচিত সোমনিয়াম (স্বপ্ন) নামে যে বইটিকে প্রথম কল্পবিজ্ঞান বলে বিবেচনা করেছেন (১৪) তা হচ্ছে ‘সোমনিয়াম’ (১৫)। সেই বইতে চাঁদের কাল্পনিক সরীসৃপ জাতীয়  প্রাণিগুলোর সাথে পৃথিবীর কোনো প্রাণিরই সাদৃশ্য ছিল না । শুধু তাই নয় ১৮৯৮ সালে এইচ জি ওয়েলস এর বহুল পরিচিত ‘ওয়ার অব দা ওয়ার্লডস’-এ (১৬) মঙ্গলগ্রহ থেকে আগত প্রাণিদের ক্ষেত্রেও আমাদের অপরিচিত এবং কাল্পনিক প্রাণির পরিচয় পাই। সেই গ্রহের ত্রিপদ বিশিষ্ট যন্ত্র-দানব এবং এক ধরণের জীবাণু পৃথিবীকে আক্রমণ করেছিল। এ দুটি উপন্যাসের বাইরে এবং ১৮৯৫ সালের পূর্বের শুক্রভ্রমণ সম্পর্কে আরো দুটি কল্পবিজ্ঞানের উল্লেখ দেখতে পাই সায়েন্স ফিকশন বা ‘এস-এফ এন্সাইক্লোপিডিয়া’ নামক অন্তর্জাল-ভিত্তিক প্রবন্ধগুচ্ছের আলোচনায় (৮)। কাজেই বিশ্বসাহিত্যেও ‘শুক্রভ্রমণ’ প্রথম কল্পবিজ্ঞান প্রতীয়মান হয় বলে যে ধারণা দেয়া হয়েছে (১-২) তা সম্ভবতঃ যুক্তিতে টেকে না।

এই আলোচনার পরও কেউ হয়তো বলতে চাইবেন যে, বাংলা সাহিত্যে শুক্র বা অন্য কোনো গ্রহে ভ্রমণ নিয়ে শ্রীজগদানন্দ রায়ের ‘শুক্রভ্রমণ’ এর আগে কেউ রচনা করেন নি। এই বিবেচনায় এবং আমাদের গ্রহনক্ষত্রের জ্ঞান যেহেতু বিজ্ঞান নির্ভর, কাল্পনিক ‘শুক্রভ্রমণ’ তাই একটি কল্পবিজ্ঞান।  যদি তাই হয়, তবে প্রাচীন গ্রিক উপকথায় আইকরাস ও ডুডেরাস নামে দুই ভাই নিজেদের ডানায় আঠা দিয়ে পাখির পালক লাগিয়ে আকাশে উড়েছিলেন, সেই গল্পটিকেও তো কল্পবিজ্ঞান বলতে হয়। একইভাবে আমাদের দেশে প্রচলিত চাঁদে বসে সাদা চুলের এক বুড়িমা চরকায় যে সূতা বুনে চলেছেন, সেটিকেও কল্পবিজ্ঞান বলতে হয়।

গ্রিক উপকথার অথবা চাঁদের বুড়ির গল্পটিকে যেহেতু কল্পবিজ্ঞান বলা যাবে না, কল্পনায় শুধুমাত্র শুক্রগ্রহে যাত্রাকেও কল্পবিজ্ঞান বলে আমি মেনে নিতে পারি না। ‘শুক্রভ্রমণ’ গল্পটিকে বরং একটি বিজ্ঞান-ভিত্তিক গল্প বলাই শ্রেয়।

তথ্যপঞ্জী

১।     সিদ্ধার্থ ঘোষ, বাংলা সাইন্স ফিকশনের ঐতিহ্য, নির্মাল্য আচার্য সম্পাদিত এক্ষণ (সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা) শারদীয় সংখ্যা বাংলা ১৩৯৫ সন, ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড, কলিকাতা। ১৯৮৯ সায়েন্স ফিকশন – সির্দ্ধাথ ঘোষের কলমে | কল্পবিশ্ব পত্রিকা (kalpabiswa.in)

২।     প্রথম বাংলা তথা ভারতীয় কল্পবিজ্ঞানের সন্ধানে | কল্পবিশ্ব পত্রিকা (kalpabiswa.in) ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর নামানো বা ডাউনলোডকৃত

৩।    Editor Eric's The Greatest Literature of All Times - Eric McMillan, ২০২১ What Is Science Fiction? - The Greatest Literature of All Time (editoreric.com) ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর নামানো বা ডাউনলোডকৃত।

৪।     Amardeep Singh: Early Bengali Science Fiction (lehigh.edu) ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর নামানো বা ডাউনলোডকৃত।

৫।    জগদানন্দ রায়, শুক্র-ভ্রমণ ও প্রাকৃতিকী। Prakritiki : Ray, Jagadananda : Free Download, Borrow, and Streaming : Internet Archive ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।

৬।    Overview | Venus – NASA Solar System Exploration ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত। Venus: The Atmosphere, Climate, Surface, Interior and Near-Space Environment of an Earth-Like Planet | SpringerLink

৭।     প্যাট্রিক মুর, দি ম্যাপিং অফ ভেনাস (শুক্র), ১৯৮৫। 1985JBAA...95...50M (harvard.edu) ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।

৮।    ভেনাস (শুক্র), সায়েন্স ফিকশন এনসাইক্লোপিডিয়া SFE: Venus (sf-encyclopedia.com) ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।

৯।    ফোর সায়েন্স ফিকশন নোভেলস দ্যাট এক্সপ্লোর লাইফ অন ভেনাস (শুক্র), অক্টোবর, ২০২০। https://studybreaks.com/culture/reads/novels-venus-life/ ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।

১০)   উয়েইনবাম এর ভেনাস (শুক্র)। Parasite Planet - Wikipedia ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।

১১।   এরিকা লোরেইন মিলাম, ডারউইন এবং মানুষের ক্রমবিবর্তন, সায়েন্স, ২২শে জানুয়ারি, ২০২১। Darwin and human evolution (science.org) ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই নামানো বা ডাউনলোডকৃত।

১২।   ব্যাঙের ছাতা চাষের ইতিহাস। Sustainable living info, courses, products & services | lowimpact.org ২০২২ সালের ১৪ই জুলাই পঠিত।

১৩। বিদ্যুত-চালিত নৌযান।        Electric boat - Wikipedia

১৪।   কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাস, উইকিপিডিয়া। History of science fiction - Wikipedia

১৫।  জোহানেস কেপলার, সোমনিউয়াম – একটি স্বপ্ন, ১৬৩৪। Somnium - A Dream, by Johannes Kepler - Frosty Drew Observatory & Sky Theatre

১৬।  এইচ জি ওয়েলস, দি ওয়ার অফ দি ওয়ার্লডস, ১৮৯৮। The War of the Worlds, by H. G. Wells - Free ebook - Global Grey ebooks

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক