সমঝোতামূলক বিশ্বের কেন্দ্রে জাতিসংঘকে দেখতে চায় বাংলাদেশ: তারেক রহমান
কালো রঙের স্যুট ও লাল টাই পরিহিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলায় বক্তৃতা দিচ্ছেন।
যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির তীব্র চাপের মুখে থাকার কথা তুলে ধরে জাতিসংঘে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সমঝোতামূলক বিশ্বের কেন্দ্রে জাতিসংঘকে দেখতে চায় বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তৃতা করেন তিনি।
তুমুল করতালির মধ্যে সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে নিজের প্রথম ভাষণ দিতে মঞ্চে ওঠেন তিনি। এতে বাংলাদেশের ‘গণতান্ত্রিক নবযাত্রার’ কথা তুলে ধরেন তিনি।
সাধারণ পরিষদের এ অধিবেশনে সভাপতিত্বের আসনে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
কালো রঙের স্ট্রাইপ স্যুট ও লাল টাই পরিহিত তারেক রহমান বাংলায় বক্তৃতা দেন।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি।
“আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।”
২১ মিনিটের বক্তৃতায় ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার গল্প শোনান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশের নির্বাচিত নেতা হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে, সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ, এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা।
‘‘এজন্যই আমরা বলি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ-সবার জন্য বাংলাদেশ’।”
বিশ্ব মানবতার প্রতিও বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, তারপর দীর্ঘ পাঁচ দশকের ত্যাগ-তিতিক্ষা-আন্দোলন এবং চব্বিশের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈষম্যমুক্ত, ন্যায় বিচারভিত্তিক কল্যাণকর রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাংখা বাস্তবায়নে নেওয়া পরিকল্পনার কথা।
তিনি বলেন, ‘‘রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।
“জনগণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে, আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যে রাষ্ট্রে দলমত, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকলেই নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে।”
জাতিসংঘের এ মঞ্চে দাঁড়িয়ে অতীতে বক্তব্য রেখেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
সেই স্মৃতি তুলে ধরার সময় কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন জাতিসংঘের মঞ্চে প্রথমবার বক্তৃতা দিতে আসা তারেক রহমান।
তার প্রয়াত বাবা-মায়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘‘জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে, এই মুহূর্তে, আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই, আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে, আজ আমিও, আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে, এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।”
অতীতের রেওয়াজ বজায় রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাষণ দেন বাংলায়।
বাংলাদেশের অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এবং বিনিয়োগ পরিবেশ, সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
‘‘সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশবান্ধব, একটি নিরাপদ এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে চলছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে, আমরা অংশীদারিত্ব উদ্ভাবন এবং দেশি বিদেশী বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই ।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এক-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পথ ধরে তাদের বড় ছেলে তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
আগের বছর ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন।
সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগ করা এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
‘জনগণই আমাদের ক্ষমতার উৎস’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ।
‘‘এই বাংলাদেশে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে, জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়াতাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। আমি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে অভিনন্দন জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।”
‘থ্রি আর’ কৌশলে বাংলাদেশ গড়বে সরকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম-খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে, বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করছে।
‘‘ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার
পুনরুদ্ধার, সংস্কার, পুনর্গঠনের অর্থাৎ থ্রি আর কৌশল অনুসরণ করছে।”
তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়।
‘‘দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট আপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থ বছরে ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে।
দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীদের সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
‘‘নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনা-বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।
‘সরকার অর্থনীতিতেও গণতন্ত্রায়ন চায়’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে। সেই লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যেই, ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড এর মত বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে, সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে।
‘‘প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’-কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে। প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।”
‘নারীদের উন্নয়ন ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
‘‘নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনা-বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।”
আরও পড়ুন
তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজের বৈঠক
জলবায়ু অভিযোজনে নদী-খাল খনন করছি: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যানের বৈঠক
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ৪ বৈশ্বিক পদক্ষেপ চান প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৫ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
