জাপান সফরে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারে ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
ফেইসবুকে মঙ্গলবার সকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের তিনটি ছবিও পোস্ট করেছেন তিনি।
জাপান সফরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রী নিজের ফেইসবুক পেইজে এক পোস্টে বলেছেন, “জাপানে আমার ঐতিহাসিক সফর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।”
তারেক রহমান লিখেছেন, “আজ জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি-এর সঙ্গে আমার অত্যন্ত ফলপ্রসূ শীর্ষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে আমরা গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রতি আমাদের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। আমাদের আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল এই অংশীদারত্বকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য বাস্তব ও দৃশ্যমান সুযোগে রূপান্তর করা।”
চার দিনের সরকারি সফরে স্থানীয় সময় সোমবার সকাল সোয়া ৯টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সরকারপ্রধান ও তার সফরসঙ্গীরা নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কানতেই’-এ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণা আসে।
এতে বলা হয়, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিতে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি’ নামে এগিয়ে নেওয়া হবে। এ উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যযোগাযোগপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করবে দুই দেশ।
এর মাধ্যমে শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা এবং প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বাড়ানো হবে।
এ জন্য চারটি ক্ষেত্রে কাজ করা হবে—যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা জোরদার করা।
এরপর নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি লেখেন, “কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার এবং অভিন্ন সমৃদ্ধি অর্জনে জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।”
তার পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেইসবুকে এ পোস্ট দিলেন।
তারেক রহমান লেখেন, “পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমার বাবা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, এই সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। আমার মরহুমা মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তার জাপান সফর ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিলেন।”
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, “বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে জাপানের পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া উদ্যোগের আওতায় ৫ হাজার কোটি জাপানি ইয়েন (প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলার) জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।
“আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ কোটি জাপানি ইয়েন (প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার) বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও আমাদের উৎসাহব্যঞ্জক আলোচনা হয়েছে।
“এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। এসব বিনিয়োগ দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করবে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে এবং আমাদের তরুণ কর্মশক্তির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।”
তারেক রহমান বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আমি একটি বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছি।
“পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে সহযোগিতা এবং দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরের মধ্যে উচ্চগতির রেল যোগাযোগ স্থাপন ও আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।”
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাথে বৈঠকের ফলাফল তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ফেইসবুকে লিখেছেন, “আমাদের শীর্ষ বৈঠকের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় (Bay of Bengal Industrial Growth Belt; BIG-B) উদ্যোগকে যৌথ সমৃদ্ধির একটি নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার অভিন্ন অঙ্গীকার।
“এই নবায়িত সহযোগিতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগসেতু হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (Economic Partnership Agreement-EPA) দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জোরদার এবং আমাদের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব নিয়েও আমরা আলোচনা করেছি।”
তারেক রহমান তার পোস্টে লেখেন, “রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য জাপানের অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রতি আমি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদাপূর্ণভাবে এবং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের অব্যাহত ও সক্রিয় সম্পৃক্ততার আহ্বান জানিয়েছি।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম, এ কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের উন্নয়নযাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে জাপান একটি বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে থেকেছে। জাপানের বন্ধুত্ব, উদারতা এবং দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য আমি বাংলাদেশের জনগণের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি।”
তিনি লিখেছেন, “গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর বাংলাদেশ যখন নতুনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমার সরকার বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থবহ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, “বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে আমি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, জাপান সরকার এবং জাপানের জনগণকে তাঁদের উষ্ণ আতিথেয়তা ও বাংলাদেশের প্রতি অব্যাহত আস্থা রাখার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
বাংলাদেশ ও জাপানের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি একটি অধিকতর শক্তিশালী, উন্নত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারেক রহমান।
ফেইসবুকে তারেক রহমান মঙ্গলবার সকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের তিনটি ছবিও পোস্ট করেছেন।
