বার্ট্রান্ড রাসেল: ‘ফ্যানাটিসিজম হলো বিশ্বের জন্য এক নম্বর বিপদ’
আমি বলব ভালোবাসা হলো প্রজ্ঞার রাস্তা, আর ঘৃণা হলো বোকামি। এই দুনিয়া দিন দিন আরও বেশি পরস্পরসম্পর্কিত হয়ে উঠছে, এবং এখানে আমাদের এই সত্যটি সহ্য করা শিখতে হবে যে কিছু মানুষ এমন কথা বলবে যা আমাদের পছন্দ নয়। আমরা কেবল সেইভাবেই একত্রে বাস করতে পারব।
বার্ট্রান্ড রাসেল (১৮৭২–১৯৭০) ছিলেন আধুনিক কালের অন্যতম বহুমুখী এবং প্রভাবশালী চিন্তাবিদ। তিনি একজন অসাধারণ গদ্যলেখকও বটে। তাঁর দীর্ঘজীবনে তিনি একাধারে বিখ্যাত গণিতবিদ থেকে বিশ্ববিখ্যাত পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালে পরিণত হন। তাঁর কর্মজীবন দুটি বিরল প্রতিশ্রুতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল: যুক্তির মাধ্যমে সত্যের কঠোর সন্ধান এবং মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তির জন্য গভীর সহানুভূতিশীল আন্দোলন। রাসেলের কাজ একদিকে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনকে নতুন রূপ দিয়েছিল, অন্যদিকে কুড়ি শতকের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
রাসেল ব্রিটিশ অভিজাততন্ত্রের এক উচ্চ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন; তাঁর দাদা লর্ড জন রাসেল দুইবার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে তাঁর শৈশব কেটেছে চরম একাকীত্বের মধ্য দিয়ে। খুব ছোটবেলাতেই তিনি এতিম হয়ে যান এবং তাঁর কঠোর, অত্যন্ত ধার্মিক দাদীর কাছে লালিত-পালিত হন। এই একাকী পরিবেশের মধ্যে রাসেল গণিতের মাঝে সান্ত্বনা খুঁজে পান। পরবর্তীতে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন যে, গণিত চূড়ান্ত নিশ্চিত কি না — তা জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে সেসময় আত্মহত্যা করা থেকে বিরত রেখেছিল। নিশ্চিত জ্ঞানের এই মানসিক তাড়নাই তাঁকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি জ্ঞানের এক অবিচল ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য আজীবন সাধনা শুরু করেন। রাসেল তাঁর আত্মজীবনীতে লিখছেন, অক্টোবর ১৮৯০ সালে তিনি কেম্ব্রিজে ভর্তি হলেন। সেখানে তিনি মাইনর স্কলারশিপ পেয়েছিলেন এবং গণিত নিয়ে ভর্তি হলেন। একইরকম গণিত নিয়ে পড়তে ভর্তি হয়েছেন চার্লস পার্সি স্যাঙ্গার (১৮৭১-১৯৩০)। হোয়াইটহেড বলে দিয়েছেন, ভর্তি পরীক্ষায় এই দুজন খুব ভাল করেছে। তো কী একটা কাগজ দিতে রাসেল গেছেন স্যাঙ্গারের রুমে, তিনি ছিলেন না, কিন্তু রাসেল তার বইয়ের শেলফের বইগুলো দেখে মুগ্ধ হলেন। পরে যখন দেখা হল, তখন রাসেল বললেন, ‘দেখলাম তোমার কাছে ড্রেপারের দুইখণ্ডের ইন্টেলেকচুয়াল ডেভেলপমেন্ট অফ ইউরোপ বইটা আছে, এটা তো খুব দারুন বই’। স্যাঙ্গার প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘এতজনের সাথে আলাপ হল, অথচ একমাত্র তুমিই বোধহয় এই বইটার নাম শুনেছ’। আলাপ চলতে লাগল এবং আধা-ঘন্টার মধ্যেই তারা পরস্পরের জীবনব্যাপি বন্ধুতে পরিণত হলেন। স্যাঙ্গার হঠাৎ মারা গেলেন ১৯৩০-এ, কিন্তু তিনি ব্যারিস্টারি করে খুব নাম কামিয়েছিলেন। অঙ্কে নাকি তার মাথা খুব তুখোড় ছিল, কোন একটা প্রব্লেম নিয়ে কাজ করার সময়ে প্রব্লেমটা রাসেল বোঝার আগেই স্যাঙ্গার অর্ধেক এগিয়ে যেতেন। রাসেল বলছেন, ‘জীবনে আমি এমন দ্বিতীয় কারুকে দেখিনি যার একইসাথে পেনিট্রেটিং বুদ্ধিমত্তা আর হার্দিক উষ্ণতার পারফেক্ট কম্বিনেশন ছিল’।
বিশ শতকের শুরুতে, রাসেল দর্শনকে কাল্পনিক ও বিমূর্ত তত্ত্ব থেকে দূরে সরিয়ে সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক বিশ্লেষণের দিকে নিয়ে যান। এর মাধ্যমে তিনি দর্শনের জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। রাসেল তাঁর মেন্টর ও সহকর্মী অ্যালফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেডের সাথে একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নেন: প্রমাণ করা যে সমস্ত গণিত আসলে বিশুদ্ধ যুক্তি থেকে উদ্ভূত। এই প্রচেষ্টার ফসল ছিল তিন খণ্ডের মহাকাব্যিক গ্রন্থ ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ (১৯১০–১৯১৩)। বইটি অত্যন্ত জটিল হলেও, এটি ভাষা এবং গাণিতিক কাঠামো সম্পর্কে দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
গণিত ও যুক্তি নিয়ে গবেষণার সময় রাসেল তৎকালীন ‘সেট থিওরি’-র মধ্যে একটি মারাত্মক ত্রুটি আবিষ্কার করেন, যা এখন ‘রাসেলের প্যারাডক্স’ নামে পরিচিত। ধরা যাক একটি লাইব্রেরির ক্যাটালগের কথা, যা এমন সমস্ত ক্যাটালগের তালিকা তৈরি করে যেগুলো নিজেদের তালিকায় নিজেদের নাম রাখে না। এখন প্রশ্ন হলো, এই ক্যাটালগটি কি নিজের নাম তালিকায় রাখবে? যদি রাখে, তবে নিয়ম অনুযায়ী তা রাখা উচিত নয়; আর যদি না রাখে, তবে নিয়ম অনুযায়ী অবশ্যই রাখতে হবে। এই সরল যৌক্তিক দ্বন্দ্বটি গণিতের ভিত্তিকেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সাধারণ ভাষায়, কোনো গ্রামে একজন নাপিত আছেন যিনি এমন সবার দাড়ি কেটে দেন যারা নিজেদের দাড়ি নিজেরা কাটেন না, প্রশ্ন হল নাপিতবাবুর দাড়ি কামাই করে কে?
ইউরোপ যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন রাসেলের চিন্তাভাবনায় এক গভীর পরিবর্তন আসে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে মানবজাতিকে তার নিজস্ব ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি থেকে রক্ষা করার জন্য কেবল তাত্ত্বিক দর্শন যথেষ্ট নয়। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে একজন উগ্র, আপসহীন সামাজিক সমালোচক হয়ে ওঠেন। রাসেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে এই যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী লোভ এবং গণ-উন্মাদনা চালিত এক অর্থহীন হত্যাকাণ্ড। তাঁর যুদ্ধবিরোধী লেখার কারণে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর অধ্যাপনার পদ কেড়ে নেওয়া হয় এবং ১৯১৮ সালে তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনি স্বভাবসুলভভাবে জেলের ভেতরের সময়টিকেও কাজে লাগান এবং সেখানে বসেই গাণিতিক দর্শনের ওপর একটি আস্ত পাঠ্যবই লিখে ফেলেন।
পারমাণবিক যুগের সূচনার সাথে সাথে রাসেল বিশ্বশান্তি আন্দোলনের এক অগ্রগামী নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৫৫ সালে তিনি আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথে যৌথভাবে ‘রাসেল-আইনস্টাইন ইশতেহার’ প্রকাশ করেন, যেখানে মানবজাতিকে সতর্ক করা হয়েছিল যে পরমাণু অস্ত্র মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি। আশি বছর বয়সের কোঠায় পৌঁছেও পরমাণু অস্ত্র-নিরোধী বিক্ষোভে আইন অমান্য করার উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে তিনি দ্বিতীয়বার কারাবরণ করেন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের অপরাধ তদন্ত ও নিন্দা করার জন্য 'আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল' গঠন করেন।
রাসেলের তীক্ষ্ণধী মেধার পাশাপাশি তাঁর সহজবোধ্য লেখার শৈলীও প্রশংসনীয় ছিল। তিনি সাধারণ মানুষের জন্য সুখ, শিক্ষা থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে ডজনখানেক বই লিখেছেন। রাসেলের মতে, একটি অর্থপূর্ণ মানব জীবনের জন্য দুটি মূল উপাদানের প্রয়োজন ছিল। তিনি তাঁর তিন খণ্ডের আত্মজীবনীতে সুন্দরভাবে লিখেছেন: ‘সহজ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী তিনটি আবেগ আমার জীবনকে পরিচালিত করেছে: ভালোবাসার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, জ্ঞানের অনুসন্ধান এবং মানবজাতির দুঃখকষ্টের জন্য অসহনীয় সহানুভূতি’। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সহানুভূতিহীন জ্ঞান হলো নিষ্ঠুর, আর জ্ঞানহীন সহানুভূতি হলো অসহায়। ১৯৭০ সালে ৯৭ বছর বয়সে রাসেল মারা যান। তাঁর বহুমুখী ও গুরুত্বপূর্ণ লেখার মাধ্যমে মানবিক আদর্শ ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ১৯৫০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি সাহিত্যে এই পুরস্কারটি পেয়েছিলেন, কারণ তাঁর বিশাল সাহিত্যকর্ম কৌতুক ও রসবোধের মাধ্যমে এক বিশাল সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে জটিল দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনাগুলোকে পৌঁছে দিয়েছিল, বলে নোবেল কমিটি মনে করেছিল। কানাডার ম্যাকমাস্টার লাইব্রেরিতে ‘রাসেল আরকাইভ’ আছে যেখানে তাঁর বা তাঁকে লেখা প্রায় ১ লক্ষ পত্র, তাঁর ৩,৫০০ ব্যক্তিগত বই এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত লেখালেখি ও জিনিস গবেষকদের জন্য সংরক্ষিত আছে।
একটি কৌতূহলোদ্দীপক আলাপ না দিলেই নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে বার্ট্রান্ড রাসেলের দেখা হয়েছিল ১৯১২ সালে ইংল্যান্ডে। রঠা’র লেখালেখি সম্পর্কে রাসেলের মন্তব্য মোটাদাগে পজিটিভ হলেও, উষ্ণ বলা যাবে না। তবে দুয়েকটি চিঠিতে তিনি রঠা’র জ্ঞানতাত্ত্বিক অ্যাপ্রোচকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সেই ব্যাখ্যার একটি স্পষ্ট রূপায়ণ নিমাই চ্যাটার্জিকে লেখা রাসেলের দুটি অপ্রকাশিত চিঠিতে পাওয়া যায়। ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৩ তারিখে আর্ল রাসেল লিখেছিলেন: “লোয়েস ডিকিনসন যে সাক্ষাতের [রঠা’র সাথে] কথা লিখেছেন, সেটি আমার অস্পষ্টভাবে মনে আছে। এর আগে আরও একটি ঘটনা ছিল, যখন রবীন্দ্রনাথের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়; রবার্ট ট্রেভেলিয়ান এবং লোয়েস ডিকিনসন তাঁকে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। আমি স্বীকার করছি যে তাঁর আধ্যাত্মিক ভাব (mystic air) আমাকে আকর্ষণ করেনি এবং আমার মনে আছে আমি চেয়েছিলাম তিনি যেন আরও ডাইরেক্ট হতেন। তাঁর আচরণ ছিল মৃদু প্রকৃতির এবং কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো (soft, rather elusive, manner), যা দেখে মনে হতো যে সরাসরি কোনো ভাববিনিময় (straightforward exchange) বা যোগাযোগ থেকে তিনি হয়তো দূরে সরে (shy away) থাকবেন। নিজের প্রতি অতিরিক্ত মগ্নতার (self-asorbtion) কারণে তাঁর প্রগাঢ়তা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই, তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনাগুলো ছিল কেবলই আপ্তবাক্যের (of dicta) মতো, এবং সেগুলো নিয়ে যুক্তি-তর্ক করা সম্ভব ছিল না”। পরবর্তীকালে, ২৬ এপ্রিল ১৯৬৭ তারিখের একটি চিঠিতে রাসেল রবীন্দ্রনাথের যুক্তির পথ থেকে এই পলায়নকে আরও তীব্রভাবে আক্রমণ করে বলেন: “অসীম নিয়ে তাঁর কথাবার্তা অস্পষ্ট এবং অর্থহীন। দুর্ভাগ্যবশত, বহু ভারতীয় যে ধরণের ভাষা পছন্দ করেন, তার আসলে কোনো অর্থই হয় না” ।
১৯৭৫ সালে প্রকাশিত রাসেলের জীবনীগ্রন্থ ‘দ্য লাইফ অফ বার্ট্রান্ড রাসেল’-এর লেখক রোনাল্ড ডব্লিউ ক্লার্ক রাসেল সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর সূচনাকথনের ভাবার্থ নিচে দিচ্ছি –
লিওনার্দো বা নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর যেমন তাঁদের নিয়ে লেখা হয়েছে, ঠিক তেমনি বারট্রান্ড রাসেলের মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিন ধরে মানুষ তাঁর সম্পর্কে লিখে চলবেন। বিশ শতকের দর্শনে তাঁর প্রভাব হবে ধারাবাহিক আলোচনার বিষয়বস্তু। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ‘নো-কনস্ক্রিপশন ফেলোশিপ’-এর জন্য তাঁর কাজের মাধ্যমে প্যাসিফিজমে যে-প্রভাব পড়েছিল, তা ইতিমধ্যেই অধ্যয়ন করা হচ্ছে। যথেষ্ট সময় অতিবাহিত হলে হয়ত শেষ পর্যন্ত যুদ্ধোত্তর দশকগুলোতে শুরু হওয়া পারমাণবিক বিতর্কে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে, এবং আজ যতটুকু পাওয়া যায় তার চেয়েও বেশি রাসেলের অবস্থান পরিবর্তনের ন্যায্যতা সম্পর্কে ভাল ধারণা পাওয়া যাবে। তাঁর ‘প্রতিরোধমূলক-যুদ্ধ পর্যায়’ (preventive-war phase) নামে পরিচিত সময়টি সম্পর্কেও একই ধরনের অনেক কিছু সামনে আসতে পারে। লুসি ডোনেলি, লেডি কনস্ট্যান্স ম্যালিসন এবং সর্বোপরি লেডি অটোলাইন মোরেল-এর কাছে লেখা রাসেলের চিঠিগুলো সম্পূর্ণ প্রকাশিত হলে তখন তা এমন একজন মানুষের গভীর মানসিক জটিলতা উন্মোচন করবে, যার কাছে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজই বিপজ্জনক ছিল না, কোনো অনুসন্ধানই অসম্ভব ছিল না।
এই হলো সেই পরমারাধ্য মানুষ, নানা বিপরীত স্রোতের এক বান্ডিল, যিনি বুদ্ধিমত্তার প্রতি ভয়ানক প্যাশনওয়ালা এক নিবেদিতপ্রাণ ধীসত্তা। প্রায়শই যৌক্তিক তর্ককে অযৌক্তিক চরম সীমায় নিয়ে যেতেন; জন্মগতভাবে একজন আবেগপ্রবণ ইমোশনাল অভিযাত্রী যিনি সারাটা জীবনই অনাথ-যৌবন (orphaned youth) এবং অকাল-বিবাহের (too-early marriage) দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন। সামগ্রিকভাবে এই রাসেল তাঁর উপাদানগুলোর সমষ্টির চেয়েও অনেক বড়, মহাকাব্যিক অনুপাতের একজন মানুষ, যিনি হতাশা এবং প্রায়-বিপর্যয়ে জর্জরিত একটি জীবনকাল ধরে সংগ্রাম করে গেছেন; যৌবনে যিনি ছিলেন একজন মজ্জাগত সংশয়বাদী, আর বৃদ্ধ বয়সে ‘কখনও বশ্যতা স্বীকার না করার সাহস’ নিয়ে এক চমৎকার ব্যক্তিত্ব।
বার্ট্রান্ড রাসেলের প্রভাব কেবল তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা থেকে আসেনি, যদিও এই অস্ত্র তিনি শত্রু ও বন্ধু উভয়ের বিরুদ্ধে সমভাবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর প্রায়-শতবর্ষ-ছোঁয়া জীবনও তাঁকে সাহায্য করেছিল; তাঁর বংশমর্যাদাও ভূমিকা রেখেছিল। তাঁর রোমান্টিক কারণগুলোও সহায়ক হয়েছিল, অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত হলেও এসব রোমান্টিকতার জন্য তিনি মাঝেমধ্যে যুদ্ধে নামতেও পিছপা হননি।
যখন তিনি জন্মগ্রহণ করেন, বুড়ি রাণীমা’র (রাণী ভিক্টোরিয়া) দুনিয়াজোড়া বিস্তৃত সাম্রাজ্যের ওপর শাসন করার তখনও তিন দশক বাকি। যখন তিনি মারা যান, মানুষ ততদিনে চাঁদে হেঁটে ফিরে এসেছে। যখন তিনি তরুণ, মানুষ তখন গণিতের যৌক্তিক ভিত্তির সন্ধানে এক নিরাসক্ত আনন্দ নিয়ে মেতে থাকত; আর তিনি মারা যাওয়ার আগে সেই ভিত্তিটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল এবং তা কম্পিউটার শিল্পের জন্ম দিতে সাহায্য করেছিল। এভাবেই রাসেল জেনারেল গ্রান্টের প্রেসিডেন্সিকে নিক্সনের শাসনের সাথে, জুলু যুদ্ধকে (Zulu wars) পরমাণু অস্ত্র-নিরোধী বিবেকের সীমান্ত-পেরুনো গণজোয়ারের সাথে যুক্ত করেছিলেন। তিনি উনিশ শতকের অন্ত্যভাগের আশাবাদের স্মৃতি-অবশেষকে ওই সময়ের তমসাচ্ছন্ন আতঙ্কের (ডার্ক টেরর) সাথে মিলিয়েছিলেন।
চারটি প্রজন্ম জুড়ে বিস্তৃত তাঁর এই জীবনকাল যেমন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি এনেছিল আশীর্বাদও। শিক্ষাক্ষেত্রে এটি সত্য যে, তাঁর উদ্ভাবনগুলো তাঁর মৃত্যুর অনেক আগেই দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে—তাঁর বুদ্ধিবৃত্তি বা প্যাশন যা-থেকে কখনোই দূরবর্তী ছিল না—তাঁর ক্রুসেডীয় উদ্দীপনা সাধারণ মানুষের জন্য এমন এক মুক্তির ন্যায্যতা দিয়েছিল যা আগে কেবল তাঁর নিজস্ব অভিজাত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। শান্তির রাজনীতিতে (politics of peace) তাঁর রেকর্ড ছিল নিজের চাওয়ার চেয়েও বেশি বিতর্কিত এবং সম্ভবত তাঁর শত্রুরা যা স্বীকার করতে চাইবে তার চেয়েও বেশি সফল। পাগওয়াশ আন্দোলন—আশার সেই স্বল্পালোকিত আন্তর্জাতিক বাতিঘর—যাকে তিনি অস্তিত্বে আসতে উৎসাহিত করেছিলেন, এবং যার প্রভাব সি.এন.ডি. (C.N.D.)-কে ছাড়িয়ে গিয়েছিল যার প্রতীক তিনি হয়ে উঠেছিলেন, তা হয়তো শেষ পর্যন্ত মানুষকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু গণিতে, যেখানে তিনি ‘আনন্দের সত্যিকারের চেতনা, উল্লাস, মানুষের চেয়েও বড় কিছু হওয়ার অনুভূতি’ খুঁজতেন, সেখানে তিনি শেষ পর্যন্ত তাঁর তৈরি করা সুরম্য ইমারতের নিচে সফলভাবে খননকর্মীদের কাজ করতে দেখেছিলেন। দর্শনে তিনি এতটাই দীর্ঘজীবী ছিলেন যে তাঁর বিপ্লবী ধারণাগুলোকে প্রথমে অপব্যবহৃত হতে, তারপর গৃহীত হতে, এবং পরে ইতিহাসের অংশ হতে দেখেছেন; আর সেই হিসেবে পরবর্তী ব্যবচ্ছেদ ও সংশোধনের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু তাঁর স্পিরিটটি টিকে ছিল, এক ধরনের দৃঢ় আশাবাদের ওপর ভর করে তিনি বেঁচে ছিলেন। তাঁর এই আশাবাদের সাথে পরকালের আশার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাঁর জীবনব্যাপি ইতিবাচক মনোভাব কোনো নারকীয় শাস্তির ভয়ের দ্বারাও প্রভাবিত ছিল না। অর্থাৎ, রাসেল এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি পরকালের সুখের আশায় অপেক্ষা করার লোক ছিলেন না, আবার ঈশ্বরের শাস্তির ভয়েও (নরকের ভয়ে) ভীত ছিলেন না। কোনো ধর্মীয় লোভ বা ভয় ছাড়াই তিনি সম্পূর্ণ ইহজাগতিক এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীকে নিয়ে ইতিবাচক ভাবতেন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তাঁর এই আজীবন টিকে থাকা মানসিক শক্তি ও সৎ চেতনা কোনো অলৌকিক বিশ্বাসের ধার ধারত না। আফটারঅল, হি ওয়াজ আ ‘রাসেল’।
রাসেলের বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা এখানে দেওয়া যেতেই পারে। তিনি প্রায় ৭০টির মত বই, অসংখ্য প্যাম্পফ্লেট ও ইশতেহার-মূলক রচনা এবং সুপ্রচুর চিঠিপত্র রচনা করেছেন, যার প্রায় পুরোটাই ম্যাক্মাস্টার ইউনিভার্সিটির ‘রাসেল আর্কাইভে’ আছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই হল – জার্মান সোশাল ডেমোক্রেসি (১৮৯৬), অ্যান এসে অন দ্য ফাউন্ডেশনস অফ জিওমেট্রি (১৮৯৭), প্রিন্সিপলস অফ ম্যাথেমাটিকস (১৯০৩), প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা (তিন খণ্ডে, হোয়াইটহেডের সাথে, ১৯১০, ১৯১২, ১৯১৩), ফিলোসফিকাল এসেজ (১৯১০), প্রবলেমস অফ ফিলোসফি (১৯১২), আওয়ার নলেজ অফ দ্য এক্সটার্নাল ওয়ার্ল্ড (১৯১৪), পলিটিকাল আইডিয়ালস (১৯১৭), মিস্টিসিজম অ্যান্ড লজিক (১৯১৮), ইন্ট্রোডাকশোন টু ম্যাথমেটিকাল ফিলোসফি (১৯১৯), ইকারাস অর দ্য ফিউচার অফ সায়েন্স (১৯২৪), হোয়াট আই বিলিভ (১৯২৫), এবিসি অফ রিলেটিভিটি (১৯২৫), অন এডুকেশন (১৯২৫), অ্যান আউটলাইন অফ ফিলোসফি (১৯২৭), ম্যারেজ অ্যান্ড মরালস (১৯২৯), দ্য কনকোয়েস্ট অফ হ্যাপিনেস (১৯৩০), ইন প্রেইজ অফ আইডলনেস (১৯৩৫), হিস্ট্রি অফ ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি (১৯৪৫), আনপপুলার এসেজ (১৯৫০), হিউম্যান সোসাইটি ইন এথিকস অ্যান্ড পলিটিকস (১৯৫৪), হিস্ট্রি অ্যাজ অ্যান আর্ট (১৯৫৪), লজিক অ্যান্ড নলেজ (১৯৫৬), হোয়াই আই অ্যাম নট আ ক্রিশ্চিয়ান (১৯৫৭), মাই ফিলোসফিকাল ডেভেলপমেন্ট (১৯৫৯), দ্য বেসিক রাইটিংস অফ বার্ট্রান্ড রাসেল (ডেনন ও এগনার সম্পাদিত, ১৯৬১), ওয়ার ক্রাইমস ইন ভিয়েতনাম (১৯৬৭), দ্য অটোবায়োগ্রাফি অফ বার্ট্রান্ড রাসেল (তিন খণ্ডে, ১৯৬৭-৬৯), মাই ওন ফিলোসফি (১৯৭২)।
বাংলা অনূদিত এই সাক্ষাৎকারটি মুদ্রিত হয়েছিল বার্ট্রান্ড রাসেলের বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ (The Future of Science, Wisdom Library, a division of Philosphical Library, New York. 1959. Pp.55-86.) নামক গ্রন্থে।
ছবি: সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে জন ফ্রিম্যান-এর সাথে বার্ট্রান্ড রাসেল
১৯৩৭ সালে একটি ভবিষ্যদ্বাণী লিখেছিলাম যে, আমি যখন মারা যাব তখন 'দ্য টাইমস' পত্রিকা আমার সম্পর্কে কী লিখবে। সেই শোকবার্তায় বলা হয়েছিল:
“নব্বই বছর বয়সে থার্ড আর্ল রাসেল, বা তিনি নিজেকে যে নামে ডাকতে পছন্দ করতেন—বার্ট্রান্ড রাসেলের— মৃত্যুর মাধ্যমে এক দূর অতীতের সাথে একটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। তাঁর দাদা লর্ড জন রাসেল ছিলেন ভিক্টোরীয় যুগের প্রধানমন্ত্রী, যিনি এলবা দ্বীপে নেপোলিয়নের সাথে দেখা করেছিলেন; তাঁর মাতামহী ছিলেন ইয়াং প্রিটেন্ডারের (Charles Edward Stuart (1720–1788)) বিধবার বান্ধবী। যৌবনে রাসেল গাণিতিক যুক্তিবিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন বটে, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর কিছু খামখেয়ালীপনা প্রকাশ পায় যেটা তাঁর আচরণে বা চিন্তায় সুবিবেচনার অভাব প্রকাশ করে। এটি তাঁর পরবর্তী লেখনীতে ক্রমশ প্রভাব রেখেছিল।
“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জনপরিসরে তিনি কোনো ভূমিকা নেননি, বরং যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগেই তিনি একটি নিরপেক্ষ দেশে পালিয়ে যান। ব্যক্তিগত কথোপকথনে তিনি বলতেন যে, খুনে পাগলদের একে অপরকে হত্যা করার কাজে নিয়োজিত রাখাই ভালো। তবে কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের উচিত এই কাজ চলার সময় পাগলদের থেকে দূরে থাকা। সৌভাগ্যবশত এই দৃষ্টিভঙ্গি বেন্থামের কথা মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু এই মানসিকতা আজকাল বিরল হয়ে উঠেছে। কারণ, বর্তমান যুগ এটি স্বীকার করে যে হিরোইজমের নিজস্ব একটি মূল্য আছে, যা কেবল তার উপযোগিতার ওপর নির্ভর করে না।
একথা সত্য, একদা সভ্য পৃথিবীর অনেকটাই এখন ধ্বংসস্তূপ, কিন্তু কোনো সুবিবেচক ব্যক্তিই এটি স্বীকার করতে পারবেন না যে, এই মহান সংগ্রামে ন্যায়ের জন্য যাঁরা মারা গেছেন তাঁরা বৃথা মারা গেছেন।
“তাঁর জীবনে, নানান একগুঁয়েমি সত্ত্বেও, এক ধরণের প্রাচীনপন্থী ধারাবাহিকতা ছিল, যা উনিশ শতকের শুরুর দিকের অভিজাতবংশীয় দ্রোহীদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর নীতিগুলো বেশ কৌতূহলোদ্দীপক ছিল, সেগুলি যেমনই হোক না কেন, তা তাঁর কাজকে পরিচালিত করেছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এমন কোনো তিক্ততা দেখাননি – যা তাঁর লেখায় দেখা যেত – বরং তিনি একজন সদালাপী ব্যক্তি ছিলেন, এমনকি মানবিক সহানুভূতি বর্জিতও ছিলেন না। তাঁর অনেক বন্ধু ছিল। তিনি তাদের প্রায় সবাইকে ছাড়িয়ে বেঁচে ছিলেন। তা সত্ত্বেও যাঁরা রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে বুড়া বয়সেও তাঁকে পূর্ণ আনন্দময় মনে হতো, যার বড় কারণ ছিল তাঁর অটুট স্বাস্থ্য। কারণ, রাজনৈতিক কারণে তাঁর শেষ বছরগুলোতে তিনি রেস্টোরেশনের পর মহাকবি মিলটনের মতোই বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তিনি ছিলেন এক মৃত যুগের শেষ উত্তরসূরী”।
আমি লক্ষ করছি, আমি আমার মৃত্যুর যে তারিখটি অনুমান করেছিলাম তা হলো ১৯৬২ সাল। যা অশুভভাবে কাছে চলে আসছে এবং এটি আমাকে কিছুটা শঙ্কিত করতে শুরু করেছে।
জন ফ্রিম্যান: আচ্ছা, আপনি খুব বেশি শঙ্কিত হওয়ার আগে, আসুন আমরা রসিকতা করে লেখা এই শোকবার্তাটি পরখ করে দেখি এবং দেখি এটি আসলেই কতটা সত্য। শুরু করার জন্য, আসুন সেই সুদূর অতীতে ফিরে যাই। লর্ড রাসেল, আপনার একদম শুরুর স্মৃতি কোনটি?
বার্ট্রান্ড রাসেল: মনে হচ্ছে, আমার একদম শুরুর স্মৃতি হলো যখন দুই বছর বয়সে একটি ঘোড়ার গাড়ি থেকে পড়ে যাওয়া। আর আমার কিছুটা স্পষ্ট স্মৃতি হলো আমার বাবার মৃত্যুর পর রিচমন্ড পার্কের ‘পেমব্রোক লজ’-এ আমার দাদা-দাদীর বাড়িতে পৌঁছানো, যখন আমার বয়স ছিল তিন বছর।
ফ্রিম্যান: আপনি কীভাবে আপনার দাদা-দাদীর তত্ত্বাবধানে এলেন? আপনার মা-ও কি মারা গিয়েছিলেন?
রাসেল: হ্যাঁ, তিনিও। আমি যখন দুই বছরের, তখন তিনি মারা যান।
ফ্রিম্যান: বাবা-মা সম্পর্কে আপনার কোনো স্মৃতি আছে?
রাসেল: খুব কম। মায়ের কথা কিছুই মনে নেই। বাবার কথা মনে আছে, তিনি একবার আমাকে লাল অক্ষরে ছাপা একটি লিফলেট দিয়েছিলেন। লাল অক্ষরগুলো আমাকে আনন্দ দিয়েছিল।
ফ্রিম্যান: আপনি কি ছোটবেলা থেকেই একজন সংশয়বাদী ছিলেন নাকি প্রচলিত রীতিনীতিতে বিশ্বাস করতেন?
রাসেল: না না, খুব কম বয়সে আমি সংশয়বাদী ছিলাম না। আমি গভীরভাবে ধার্মিক ছিলাম এবং খুব ধীরে ধীরে ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আমার প্রচলিত বিশ্বাসগুলো হারিয়েছি। আমার মনে আছে, যখন আমার চার বছর বয়স, তখন তারা আমাকে ‘লিটল রেড রাইডিং হুড'-এর গল্প বলেছিল এবং আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম যে আমাকে একটি নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে, এবং আমার প্রচণ্ড বিস্ময় হয়েছিল যে আমি নেকড়ের পেটের ভেতরে ছিলাম, স্বর্গে নয়।
ফ্রিম্যান: এটাই কি হয়তো সংশয়বাদের শুরু ছিল?
রাসেল: হ্যাঁ।
ফ্রিম্যান: বলুন তো, ছোটবেলায় কি প্রার্থনা করতেন?
রাসেল: ওহ, হ্যাঁ।
ফ্রিম্যান: কখন আপনি তা বন্ধ করলেন?
রাসেল: মনে হয় যখন আমার বয়স বারো বা তেরো বছর।
ছবি- ছোট্টবেলার রাসেল
ফ্রিম্যান: মনে করেন কি যে আপনার শৈশব সুখে কেটেছিল?
রাসেল: কম-বেশি। তবে খুব একাকী ছিলাম। আমার এক ভাই ছিল যে আমার চেয়ে সাত বছরের বড় এবং তার সাথে আমার খুব একটা যোগাযোগ ছিল না। সমবয়সী অন্য শিশুদের সাথেও আমার তেমন মেলামেশা ছিল না, তাই এটি একটি নিঃসঙ্গ শৈশব ছিল, তবে এটি অসুখী ছিল না।
ফ্রিম্যান: পেছন ফিরে যদি তাকান, অর্জিত সমস্ত জ্ঞান দিয়ে, আপনি কি বলবেন যে কোনো এক নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিই বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের একটি চালিকাশক্তি ছিল?
রাসেল: আমি ঠিক জানি না। আমি মনে করি এটি একটি সম্ভাব্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। তবে মনে হয় অন্য ধরণের অনুপ্রেরণাও আছে; যেমন খাঁটি উচ্চাকাঙ্ক্ষাও কখনো কখনো এটি করতে পারে।
ফ্রিম্যান: কম বয়সে আপনি কি অপরাধবোধ বা পাপের অনুভূতি দ্বারা আচ্ছন্ন ছিলেন?
রাসেল: ওহ, হ্যাঁ। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমার প্রিয় স্তোত্র কোনটি এবং আমি বেছে নিয়েছিলাম ‘পৃথিবীর মোহে আমি শ্রান্ত এবং নিজের পাপের ভারে অবশ’ ।
ফ্রিম্যান: তখন বয়স কত ছিল?
রাসেল: ছয় বছর। যেসব বিষয়ে আমি অপরাধবোধ অনুভব করতাম তা হলো—নিষেধ করা সত্ত্বেও ব্ল্যাকবেরি খাওয়া; এবং আমার মনে আছে একবার পারিবারিক প্রার্থনার সময় আমার দাদী যখন 'অনুতপ্ত পুত্র' -এর গল্পটি পড়েছিলেন, আমি পরে তাঁকে বলেছিলাম: "আমি জানি আপনি কেন আজ ওটা পড়েছেন: কারণ আমি আমার জগটি ভেঙে ফেলেছিলাম।"
ফ্রিম্যান: আপনি কি এখন পেছন ফিরে তাকিয়ে মনে করেন যে আপনার শৈশব থেকে পাওয়া এমন কোনো দুর্ভাগ্যজনক স্মৃতি আছে যা আপনি বয়ে বেড়িয়েছেন?
রাসেল: হ্যাঁ, মনে হয় তা সত্য। যেমন যৌনতার বিষয়ে পারিবারিক মনোভাব নিশ্চিতভাবেই অত্যন্ত রক্ষণশীল ও পিউরিটানিক ছিল।
ফ্রিম্যান: এবার আপনার স্কুল জীবনের কথায় আসা যাক।
রাসেল: আমার দাদী পাবলিক স্কুল পছন্দ করতেন না। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বেশ প্রথাবিরোধী ছিল, এবং তিনি মনে করতেন ঐ স্কুলসিস্টেম এক ধরণের পুরাতন প্রথাগত প্রতিষ্ঠান।
ফ্রিম্যান: আপনি কি প্রথাগত শিক্ষাই পছন্দ করতেন?
রাসেল: না, সেই সময়ে নয়। আমি বেশ সন্তুষ্ট ছিলাম, এবং এখন পেছন ফিরে তাকিয়েও আমি সন্তুষ্ট বোধ করি। কারণ, আমি যেকোনো স্কুলে যা শিখতাম তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেই শিখেছিলাম।
ছবি- (বামে) ইউক্লিড মহাশয় (খ্রীষ্টপূর্ব ৩৩০/৩২৫-২৭০); মূল গ্রিক ‘এলিমেন্টস’ থেকে প্রথম ইংরেজি অনুবাদ (১৫৭০) ‘লর্ড মেয়র অফ লন্ডন’ হেনরি বিলিংস্লে (১৫৩৮-১৬০৬); আসিফুজ্জামান কর্তৃক বাংলায় অনূদিত ‘এলিমেন্টস’ প্রকাশক বাংলা একেডেমি (২০২৬)।
ফ্রিম্যান: সেই বয়সে কী ধরণের শিক্ষা নিয়েছিলেন? যেমন, ক্লাসিকস কি পড়েছিলেন?
রাসেল: একটি নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত। আমি কখনো ধ্রুপদী সাহিত্য পছন্দ করিনি। গণিতই ছিল আমার পছন্দ। গণিতের প্রথম পাঠটি আমি পেয়েছিলাম আমার ভাইয়ের কাছ থেকে, যিনি আমাকে ইউক্লিড দিয়ে শুরু করিয়েছিলেন। আমার মনে হয়েছিল এটি আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর জিনিস। পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু থাকতে পারে বলে আমার মনেই হয়নি। কিন্তু আমার মনে আছে যে প্রথম পাঠটি হতাশাজনক ছিল। কারণ, তিনি বলেছিলেন: "এখন, আমরা স্বতঃসিদ্ধ দিয়ে শুরু করব।" আমি বললাম: "সেগুলো কী?" এবং তিনি বললেন: "আরে সেগুলো এমন জিনিস যা তোমাকে মেনে নিতে হবে, যদিও সেগুলো প্রমাণ করা যায় না"। তাই আমি বললাম: "যদি তুমি প্রমাণই করতে না পারো তবে আমি কেন সেগুলো মেনে নেব?" এবং তিনি বললেন: "ঠিক আছে, তুমি যদি না মানো তবে আমরা এগোতে পারব না।" তবে আমি দেখতে চাইছিলাম কতদূর এগুনো যায়, তাই আমি সাময়িকভাবে সেগুলো মেনে নিয়েছিলাম।
ফ্রিম্যান: নিজের সন্তানদের কীভাবে শিক্ষিত করেছিলেন?
রাসেল: বিভিন্ন উপায়ে শিক্ষিত করেছি। তাদের জন্য আধুনিক স্কুল খোঁজার চেষ্টা করেছি। তবে তথাকথিত প্রগতিশীল শিক্ষার কিছু জিনিস আমার পছন্দ হয়েছে আবার কিছু জিনিস পছন্দ হয় নাই। আমি ঠিক যা চাই তেমনটি কখনো খুঁজে পাইনি।
ফ্রিম্যান: আপনার নিজের কোনো সন্তানকে কি সাধারণ পাবলিক স্কুলে পাঠিয়েছিলেন?
রাসেল: হ্যাঁ, আমার ছোট ছেলে ইটন-এ গিয়েছিল।
ফ্রিম্যান: এবং সফল হয়েছিল?
রাসেল: হ্যাঁ, বেশ সফল হয়েছিল।
ফ্রিম্যান: কোন বিষয়টি আপনাকে প্রথম গণিতবিদ হওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল?
রাসেল: আমি গণিত বেশ কয়েকটি কারণে পছন্দ করতাম। প্রথমত, খাঁটি আনন্দ যা মানুষ সঙ্গীত বা কবিতা থেকে পায়—গণিত আমাকে সেই আনন্দ দিয়েছিল। তাছাড়া, আমি মনে করতাম গণিতই হলো মহাবিশ্বকে বোঝার চাবিকাঠি, এবং আমি গণিতের সাহায্যে সব ধরণের দৈনন্দিন জিনিসের ব্যাখ্যা খুঁজে পেতাম। আমার মনে আছে একবার আমার একজন নতুন গৃহশিক্ষক এসেছিলেন যিনি জানতেন না আমি কতটা জানি, এবং আমি একটি মুদ্রা ঘোরালাম, এবং তিনি বললেন: 'তুমি কি জানো সেই মুদ্রাটি কেন ঘোরে?' আমি বললাম: 'হ্যাঁ, কারণ আমি আমার আঙুল দিয়ে একটি যুগল বল তৈরি করেছি,' এবং তিনি বললেন: 'তুমি যুগল বল সম্পর্কে কী জানো?' আমি বললাম: 'ওহ, আমি যুগল বল সম্পর্কে সব জানি!'
ফ্রিম্যান: তখন আপনার বয়স কত ছিল?
রাসেল: আমার বয়স নিশ্চয়ই বারো বা তেরো বছর ছিল।
ফ্রিম্যান: সামগ্রিকভাবে, আপনার জীবন থেকে জিজ্ঞেস করছি: গণিত বা দর্শনের সাধনা আপনাকে ধর্মীয় অনুভূতির কোনো ধরনের বিকল্প দিয়েছে কি?
রাসেল: হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই দিয়েছে। বয়স প্রায় চল্লিশ হওয়া পর্যন্ত আমি মনে করি, আমি সেই ধরনের তৃপ্তি পেয়েছিলাম যা প্লেটো বলেছেন যে গণিত থেকে পাওয়া যায়। এটি ছিল একটি চিরন্তন জগৎ, সময় যেখানে থমকে দাঁড়ায়! এটি এমন এক জগৎ যেখানে এক ধরনের পারফেকশনের সম্ভাবনা ছিল, এবং আমি নিশ্চিতভাবেই এর থেকে ধর্মীয় তৃপ্তির অনুরূপ কিছু পেয়েছিলাম।
ফ্রিম্যান: জীবনের কোন সময়টিতে, বা জীবনের কোন ঘটনাটি আপনাকে দর্শন থেকে আবার কিছুটা সামাজিক কাজ এবং রাজনীতির দিকে ফিরিয়ে নিয়েছিল?
রাসেল: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আমাকে ভাবিয়েছিল—'গজদন্ত মিনারে’ বাস করা আর চলবে না। এই পৃথিবী বড্ড খারাপ। আমাদের এটি লক্ষ রাখতে হবে। আমি একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে ভেবেছিলাম, এবং আমি এখনও মনে করি যে, ব্রিটেন যদি নিরপেক্ষ থাকত এবং জার্মানরা একটি দ্রুত বিজয় লাভ করত তবে বিশ্বের জন্য এটি অনেক ভালো হতো। তা হলে আমরা নাৎসি বা কমিউনিস্টদের কারোকেই পেতাম না। কারণ, তারা উভয়েই ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফসল। যুদ্ধ সংক্ষিপ্ত হতো; এত বেশি ধ্বংসলীলা হতো না।
ফ্রিম্যান: নীতিগতভাবে হত্যার বিরুদ্ধে আপনার কখনো কি কোনো নৈতিক আপত্তি ছিল?
রাসেল: ওহ, না। আমি এই ধরনের কোনো জেনারেল রুল পছন্দ করি না।
ফ্রিম্যান: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে আপনি আসলে কতটা সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালিয়েছিলেন?
রাসেল: যতটা আমি পারতাম। আমি সব জায়গায় যেতাম, বক্তৃতা দিতাম এবং যুদ্ধবিরোধী বিবেকবানদের সাহায্য করার জন্য যা যা করা সম্ভব সব করতাম। যেখানেই পারতাম আমি এটি নিয়ে লিখতাম।
ফ্রিম্যান: অজনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে কি আপনার কোনো কুখ্যাতি ছিল? নাকি আপনাকে কেবল একজন খ্যাপাটে হিসেবে গণ্য করা হতো?
রাসেল: আমাকে কখনো পচা ডিম ছুঁড়ে মারা হয়নি, তবে একবার আমার প্রায় তার চেয়েও খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমি একটি গির্জায় শান্তিকামীদের একটি সভায় ছিলাম এবং তখন সেখানে কলোনিয়াল সৈনিক এবং মদ্যপ মুখরা নারীদের একটি মিশ্র দল আক্রমণ করেছিল। মদ্যপ নারীরা মরচে ধরা পেরেক ভরা তক্তা নিয়ে এসেছিল, যা দিয়ে তারা সবার মাথায় আঘাত করছিল, এবং কলোনিয়াল সৈন্যরা তা দেখছিল এবং হাততালি দিচ্ছিল, আর পুলিশ দেখছিল কিন্তু কিছুই করছিল না। মহিলাদের পিঠের সব পোশাক ছিঁড়ে ফেলেছিল এবং তাদের মারাত্মক বিক্ষত করা হয়েছিল। মরচে পড়া পেরেকধারী নারীরা ঠিক আমাকে আক্রমণ করতে যাচ্ছিল—আমি বুঝতে পারছিলাম না এই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত—তখন কেউ একজন পুলিশের কাছে গিয়ে বলল: 'দেখুন, আপনাদের সত্যিই এই নারীদের থামানো উচিত, আপনারা জানেন, তিনি একজন বিশিষ্ট লেখক।' 'ওহ,' পুলিশ বলল। 'হ্যাঁ, তিনি একজন সুপরিচিত দার্শনিক।' 'ওহ,' পুলিশ বলল। 'এবং তিনি একজন আর্লের ভাই!' এবং তারপর পুলিশ ছুটে এসে আমাকে রক্ষা করল।
ফ্রিম্যান: এই কি সেই সময় যখন আপনি জেলে গিয়েছিলেন?
রাসেল: না, এটি তার আগের ঘটনা।
ফ্রিম্যান: আপনি ঠিক কী কারণে জেলে গিয়েছিলেন?
রাসেল: একটি নিবন্ধ লেখার জন্য। আমি এই ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলাম যে, এই নিবন্ধটি ছিল উদ্দেশ্যমূলক এবং এটি 'ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে খারাপ সম্পর্ক সৃষ্টির কারণ হতে পারে'। কারণ, আমি উল্লেখ করেছিলাম কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের দিয়ে ধর্মঘট ভাঙানো হচ্ছিল। মনে করা হয়েছিল আমার এটি করা উচিত হয়নি।
ফ্রিম্যান: আপনার বিচার কি জুরি দ্বারা হয়েছিল নাকি ম্যাজিস্ট্রেটের দ্বারা?
রাসেল: লন্ডনে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের দ্বারা। এবং তিনি বলেছিলেন এটি ছিল 'সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ'। তিনি আমাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। প্রথমে এটি ছিল একজন সাধারণ অপরাধী হিসেবে ছয় মাস; পরে আপিল করা হলে এটিকে ফার্স্ট ডিভিশনে ছয় মাসে পরিবর্তন করা হয়েছিল।
ফ্রিম্যান: যার মানে আরও নম্র বা শিথিল আচরণ?
রাসেল: হ্যাঁ, অবশ্যই। এটি একটি মৌলিক পার্থক্য।
ফ্রিম্যান: পেছন ফিরে তাকিয়ে আপনার কি মনে হয় যে আপনার বিচার ও কারাবাসের সময় আপনার ফেলোশিপটি কেড়ে নিয়ে ট্রিনিটি কলেজ বুদ্ধিমানের মতো বা ন্যায়সঙ্গত কাজ করেছিল?
রাসেল: না, অবশ্যই না। বিশেষ করে যেহেতু তারা এটি করেছিল যখন মামলাটি বিচারাধীন ছিল। দেখুন, তরুণ ফেলোরা সব যুদ্ধে চলে গিয়েছিল, আর তখন কলেজের শাসনভার গিয়ে পড়ে বুড়োদের হাতে। বুড়োরা ভাবল, 'আমাদেরও অবদান রাখতে হবে—আমরা যুদ্ধ করতে পারি না কারণ আমরা খুব বৃদ্ধ,' এবং তাদের অবদান ছিল আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া!
ফ্রিম্যান: অনুরূপ একটি ঘটনা অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ঘটেছিল, যখন নিউ ইয়র্ক সিটি কলেজে আপনার নিয়োগ বাতিল করা হয়েছিল। আসলে কী ঘটেছিল?
রাসেল: ওহ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমি সম্পূর্ণ দেশপ্রেমিক ছিলাম, আমি যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলাম এবং সে বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ অর্থোডক্স।
ফ্রিম্যান: তা সত্ত্বেও আপনাকে আরেকটি কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল?
রাসেল: আহ, কিন্তু সেটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। সেটি ছিল বিবাহ এবং নৈতিকতা সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।
ফ্রিম্যান: কিন্তু আপনি যখন নিউ ইয়র্ক সিটি কলেজে নিযুক্ত হয়েছিলেন, তখন তো আপনার দৃষ্টিভঙ্গি তাদের নিশ্চয়ই জানা ছিল?
রাসেল: ওহ, হ্যাঁ। সভ্য মানুষেরা তা নিয়ে মাথা ঘামাত না, কিন্তু নিউ ইয়র্কে অশিক্ষিত আইরিশ লোকেদের একটি বিশাল জনতা ছিল এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পুরোটাই মূর্খতায় ভরা।
ফ্রিম্যান: নিউ ইয়র্কে চাকরি হারানোর পর আপনার কী হয়েছিল? আমেরিকায় কি আপনার অন্য কোনো চাকরি ছিল?
রাসেল: আমি জানতাম না আমার কোনো চাকরি থাকবে কি না। আমাকে সম্পূর্ণভাবে সমাজচ্যুত করা হল। কোনো সংবাদপত্র আমার লেখা একটি শব্দও ছাপত না, কোনো ম্যাগাজিন একটি শব্দও ছাপত না, কোনো হল আমাকে সেখানে বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি দিত না। যার ফলে আমি আমার জীবিকার সমস্ত উপায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের নিয়মের কারণে আমি সেই সময়ে ইংল্যান্ড থেকে কোনো টাকাও আনতে পারছিলাম না, তাই আমি অনাহারে থাকার আশঙ্কা করছিলাম। আমার তিনটি সন্তান ছিল যাদের আমি শিক্ষিত করে তুলছিলাম, তাদের মধ্যে দুজন বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া এবং একজন ছোট ছিল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে আমাদের সবাইকে খুব বাজে ভাবে ভুগতে হবে। তাই হতো, যদি না ডক্টর বার্নস নামের একজন ব্যক্তি আমার সাহায্যে এগিয়ে আসতেন এবং আমাকে একটি চাকরি দিতেন।
ফ্রিম্যান: এটাই কি জীবনের একমাত্র সময় যখন আপনার আসলেই টাকার খুব অভাব হয়েছিল?
রাসেল: জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আমার কেবল চলার মতো ছিল, এবং জীবনের বাকিটা সময় মোটামুটি নিরাপদভাবে চলার মতো ছিল। কিন্তু ওই সময়ে আমি আসলেই জানতাম না যে আমি কীভাবে আমার সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে যাব।
ফ্রিম্যান: একাডেমিক জীবনের পটভূমি বোঝার জন্য অত্যন্ত আগ্রহের বিষয় হিসেবে আমি কি আপনাকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারি কি না—আপনার পরিবার কি আপনার জন্য কোনো বড় সম্পত্তি রেখে গিয়েছিল, নাকি আপনি সারা জীবন যা পেয়েছেন তা নিজেই উপার্জন করেছেন?
রাসেল: আমার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ রেখে যাওয়া হয়েছিল। আমি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হই, তখন আমার কাছে সঞ্চিত পুঁজি থেকে বছরে প্রায় ৬০০ পাউন্ড আমি পেতাম। তারপর আমি একজন সোশালিস্ট হয়ে উঠি এবং সিদ্ধান্ত নেই যে আমার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থের ওপর বেঁচে থাকা উচিত নয়। তখন আমি ধীরে ধীরে আমার পুঁজি বিভিন্ন খাতে বিলিয়ে দিই যেসব খাত আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতাম। তারপর থেকে আমি সম্পূর্ণ আমার উপার্জনের ওপর বেঁচে আছি।
ফ্রিম্যান: কর্মজীবনে আপনি যেসব আদর্শের পক্ষে বিশেষ সমর্থন জুগিয়েছেন, এখন পেছন ফিরে তাকিয়ে আপনি কি মনে করেন যে সামগ্রিকভাবে সেই সমর্থন সফল হয়েছে?
রাসেল: এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনি কোন বিষয়গুলোর কথা ভাবছেন তার ওপর। আপনি যাকে যৌন সম্পর্কিত প্রশ্ন বলতে পারেন সেই সম্পর্কিত আমার দৃষ্টিভঙ্গি, আমি মনে করি, ব্যাপকভাবে সফল হয়েছে—বলতে চাইছি, পৃথিবী সেই পথেই এগিয়েছে; এবং শিক্ষার ক্ষেত্রেও তা বড় সফলতা এনেছে। এবং আমি যে বিষয়গুলোতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলাম তার একটি ছিল নারীদের সমতা, এবং সেটি অবশ্যই সম্পূর্ণ সফল হয়েছে। এছাড়াও আমি প্রথম থেকেই একজন সমাজতন্ত্রী ছিলাম এবং এখন ইংল্যান্ডে যথেষ্ট সমাজতন্ত্র রয়েছে এবং এতে আমি আনন্দিত। সুতরাং আমি কিছু সন্তোষজনক সাফল্য পেয়েছি বটে; কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে মোটেও তা নয়।
ফ্রিম্যান: আপনি কি মনে করেন যে সামগ্রিকভাবে পৃথিবীতে সংশয়ীদের চাইতে ফ্যানাটিকদের দরকার বেশি, নাকি তারা বেশি বিপজ্জনক?
রাসেল: ওহ, অনেক বেশি বিপজ্জনক। ফ্যানাটিসিজম হলো বিশ্বের জন্য এক নম্বর বিপদ, সবসময়ই তা ছিল, এবং এটি অপরিমেয় ক্ষতি করেছে। আমি একথা বলতে পারি যে ফ্যনাটিসিজমের বিরুদ্ধে আমি ফ্যানাটিকই ছিলাম।
ফ্রিম্যান: কিন্তু তাহলে আপনি কি অন্য কিছু জিনিসের বিরুদ্ধেও ফ্যানাটিক নন? যেমন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে আপনার বর্তমান প্রচারণার কথা বলতে পারি—আপনি কি আপনার সমর্থকদের কিছু চরম বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে উৎসাহিত করবেন যেমনটি তারা করে থাকেন, এবং সেটি কি ফ্যানাটিসিজম নয়?
রাসেল: আমি মনে করি না সেটি ফ্যানাটিসিজম। না। বলতে চাইছি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফ্যানাটিক হতে পারেন, কিন্তু আমি তাদের সমর্থন করি এ কারণে যে আমরা শান্ত-সুবোধ, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ যা কিছু করি, প্রেস তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, এবং সংবাদমাধ্যমে খবর হওয়ার একমাত্র উপায় হলো এমন কিছু করা যা দেখতে উগ্র মনে হয়। সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনা হলো যে মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, এবং এটি একটি অত্যন্ত বাস্তব সম্ভাবনা। কিন্তু ধরে নিচ্ছি যে এটি ঘটবে না। তবুও আমি লক্ষ লক্ষ মানুষের যন্ত্রণায় মারা যাওয়ার চিন্তা সহ্য করতে পারি না। কিন্তু সেটাই ঘটছে বিশ্বের নির্বোধ এবং ক্রূর শাসকদের কারণে।
ফ্রিম্যান: এটি কি সত্য নাকি মিথ্যা যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আপনি কমিউনিজমের বিরুদ্ধে, সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধমূলক যুদ্ধের ওকালতি করেছিলেন?
রাসেল: এটি সম্পূর্ণ সত্য, এবং আমি এর জন্য অনুতপ্ত নই। আমার এখনকার ভাবনার সাথেও এটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমি বরাবর যা ভেবেছিলাম তা হলো – পারমাণবিক অস্ত্র আছে এমন দুটি দেশ যদি পরমাণু যুদ্ধ করে তাহলে চূড়ান্ত পর্যায়ের বিপর্যয় হবে। গত যুদ্ধের ঠিক পরেই এমন একটি সময় ছিল, যখন আমেরিকানদের পারমাণবিক অস্ত্রের মনোপলি ছিল এবং তারা ‘বারুচ প্রস্তাবের’ (Baruch proposal) মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্রকে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রস্তাব দিয়েছিল, এবং আমি মনে করেছিলাম এটি তাদের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত উদার প্রস্তাব, যা বিশ্ব গ্রহণ করলে খুব ভালো হতো। এমন নয় যে আমি পারমাণবিক যুদ্ধের ওকালতি করেছিলাম, তবে আমি মনে করেছিলাম যে বারুচ প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য রাশিয়ার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা উচিত। আমি মনে করেছিলাম যে তারা যদি ক্রমাগত প্রত্যাখ্যান করতে থাকে তবে আসলে যুদ্ধে যাওয়া প্রয়োজন হতে পারে। সেই সময়ে পারমাণবিক অস্ত্র কেবল এক পক্ষের কাছেই ছিল, এবং তাই সম্ভাবনা ছিল যে রাশিয়ানরা নতি স্বীকার করত। আমি ভেবেছিলাম তারা নতি স্বীকার করবে, এবং আমি এখনও মনে করি যে তেমনটি হলে এখনকার মত দুটি যুযুধান পক্ষ হয়ত থাকত না, যাদের উভয়ের হাতেই সমান পরিমাণে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র আছে। এর ফলে এখন ভয়ানক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে।
ফ্রিম্যান: ধরুন তারা নতি স্বীকার করল না, আপনি কি তার ফলাফল বা পরিণতির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত ছিলেন? আমাকে তাদের ভয়াবহতা সম্পর্কে এতক্ষণ যা বলেছেন, তা সত্ত্বেও কি আপনি এই অস্ত্রগুলো রাশিয়ানদের ওপরও ব্যবহার করতেন?
রাসেল: আমি করতাম। সেগুলো অবশ্য এই আধুনিক অস্ত্রগুলোর মতো এতটা খারাপ ছিল না। তাদের কাছে তখনো হাইড্রোজেন বোমা ছিল না, তাদের কাছে কেবল পরমাণু বোমা ছিল (এবং সেটিও যথেষ্ট খারাপ, তবে এটি হাইড্রোজেন বোমার মতো কিছু নয়)। আমি তখন ভেবেছিলাম এবং আশা করেছিলাম যে রাশিয়ানরা নতি স্বীকার করবে। কিন্তু অবশ্যই আপনার চাল ধরে ফেললে তো আপনি আর হুমকি দিতে পারেন না।
ফ্রিম্যান: উনিশ শতককে কি আপনি মোটাদাগে নস্টালজিয়া এবং আফসোসের দৃষ্টিতে দেখেন?
রাসেল: এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনি কী নিয়ে ভাবছেন তার ওপর। তখন পৃথিবী দেখতে এখনকার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর ছিল। প্রতিবার যখন আমি এমন কোনো জায়গায় যাই, যেটা অনেক আগে থেকেই জানতাম, সেটা আমাকে এখন দুঃখিত করে। একটির পর একটি সৌন্দর্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং এর জন্য আমি গভীরভাবে অনুশোচনা করি। কিন্তু যখন আইডিয়ার কথা আসে, তখন মনে হয় আগের চেয়ে এখন তো অনেক ভাল হয়েছে। ভণ্ডামি কমেছে এবং এতে আমি আনন্দিত।
ফ্রিম্যান: আপনি কি কোনো আত্মজীবনী লিখেছেন?
রাসেল: আমি লিখেছি, হ্যাঁ।
ফ্রিম্যান: আপনি কি এটি আপনার জীবনদ্দশায় প্রকাশ করার অনুমতি দেবেন?
রাসেল: না, আমি মারা যাওয়ার আগে নয়। প্রথমত, কারণ এটি তখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ হবে না। এবং দ্বিতীয়ত, কারণ এমন সব জিনিস রয়েছে যা খুব তাড়াতাড়ি বলা উচিত নয়। আমি মারা যাওয়ার পরও হয়তো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে—আমি জানি না।
ফ্রিম্যান: একটি শেষ প্রশ্ন: লর্ড রাসেল, ধরুন এই ফিল্মটি ১,০০০ বছর পর আপনার বংশধররা দেখছে, আপনার যাপন করা জীবন এবং তা থেকে শেখা পাঠ সম্পর্কে সেই প্রজন্মকে কী বলা মূল্যবান বলে আপনি মনে করবেন?
রাসেল: আমি দুটি জিনিস বলতে চাই, একটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং একটি নৈতিক। বুদ্ধিবৃত্তিক যে জিনিসটি আমি তাদের বলতে চাই তা হলো: তুমি যখন কোনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছ বা কোনো দর্শন বিবেচনা করছ, তখন নিজেকে কেবল জিজ্ঞেস করো – ফ্যাক্টগুলো কী এবং সেই তথ্য কোন সত্যকে সমর্থন করে। তুমি যা বিশ্বাস করতে চাইছ বা যা বিশ্বাস করলে হিতকর সামাজিক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছ, সেটা যেন তোমাকে কখনো বিচ্যুত না করে। বরং কেবল তথ্যগুলো কী তা দেখ। নৈতিক যে জিনিসটি আমি তাদের বলতে চাই তা খুব সরল। আমি বলব ভালোবাসা হলো প্রজ্ঞার রাস্তা, আর ঘৃণা হলো বোকামি। এই দুনিয়া দিন দিন আরও বেশি পরস্পরসম্পর্কিত হয়ে উঠছে, এবং এখানে আমাদের এই সত্যটি সহ্য করা শিখতে হবে যে কিছু মানুষ এমন কথা বলবে যা আমাদের পছন্দ নয়। আমরা কেবল সেইভাবেই একত্রে বাস করতে পারব। আমরা যদি একসাথে বাঁচতে চাই এবং একসাথে মরতে না চাই, তবে আমাদের দয়া (পরোপকার) ও দরদ (সহনশীলতা) শিখতেই হবে। এই গ্রহে মানবজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এটি অত্যাবশ্যক।
