Published : 13 Apr 2026, 09:28 PM
মাঝে মাঝে মনে হয়—আমরা আর খবর পড়ি না, আমরা এক ধরনের পুনরাবৃত্তি পড়ি। একই দৃশ্য, একই ভাষা, একই উত্তেজনা: কোথাও মাজারে আগুন, কোথাও কবর ভাঙা, কোথাও ‘ধর্ম রক্ষার’ নামে একজন মানুষকে পিটিয়ে বা কুপিয়ে হত্যা করা। ঘটনাগুলো আলাদা নয়—এগুলো একই প্রবাহের অংশ। এগুলো এমনই এক সমাজের লক্ষণ, যেখানে ভয় ধীরে ধীরে বিশ্বাসকে গ্রাস করে নিচ্ছে, আর বিশ্বাসের জায়গা দখল করছে নিয়ন্ত্রণ, শুদ্ধতার দোহাই, এবং জনতার তাৎক্ষণিক বিচার। প্রশ্নটা তাই আর কেবল ‘কী ঘটছে?’ না—প্রশ্নটা হলো, ‘আমরা কী হয়ে উঠছি?’
প্রচলিত কথা—ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। তা একসময় নড়বেই, নিজস্ব নিয়মে। সে নিয়মের ভেতর আরোপ করা জোর-জবরদস্তির অনিয়মকেই সত্য বা সঠিক মনে করা গা-জোয়ারি প্রবণতা আমাদের ঠেলে দিচ্ছে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে। যেখান থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা নেই বরং এ প্রবণতার স্বাভাবিকীকরণ হচ্ছে।

১৮৯৯ সালে ইউক্রেনীয় শিল্পী মাইকোলা পিমোনেনকো’র আঁকা চিত্রকর্ম
ক. মাজার আক্রমণ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উত্থান
মাজারে আগুন লাগে—এই বাক্যটা এখন আর আমাদের চমকে দেয় না। যেন খবরের ভেতরে ঢুকে থাকা এক ধরনের অভ্যাস হয়ে গেছে। কোথাও কবর খুঁড়ে লাশ তুলে নেওয়া হয়, কোথাও কোনো পীরকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে ফেলা হয়, আবার কোথাও একদল মানুষ নিজেদের ‘তৌহিদী জনতা’ বলে পরিচয় দিয়ে মাজারে হামলা চালায়। আমরা কয়েক মুহূর্ত থেমে যাই, ক্ষোভ প্রকাশ করি, তারপর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই—যেন এগুলো ঘটতেই পারে।
কিন্তু এই ‘স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া’-ই সবচেয়ে অস্বাভাবিকতা।
এ ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা মনে হলেও, এদের ভেতরে কাজ করে একই মানসিকতা—এক ধরনের ক্রমশ সংগঠিত হয়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক বোধ, যা ভিন্নধারাকে শুধু অস্বীকারই করে না, মুছে ফেলতে চায়। এই মুছে ফেলার প্রবণতা হঠাৎ করে জন্মায় না; এটা তৈরি হয় ধীরে ধীরে—ভয়, অনিশ্চয়তা, এবং একতান্ত্রিক ধর্মবোধের ভেতর দিয়ে। ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে, ঈমানের ভাষা ব্যবহার করে, ‘শুদ্ধতা’র ভাষা ব্যবহার করে—একটি ভিন্ন ধারাকে অবৈধ ঘোষণা করা, এবং তারপর তা নির্মূল করার চেষ্টা করা।
কিন্তু আগুন আসলে কোথায় জ্বলে উঠছে? মাজারের চূড়ায়, না মানুষের ভেতরে?
এ প্রশ্নই আমাদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় ধর্মের ভেতরের দুই ভিন্ন প্রবাহের দিকে। একদিকে আছে আচার, শুদ্ধতা, নিয়ন্ত্রণ—যেখানে ধর্ম একটি কাঠামো, একটি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অন্যদিকে আছে অনুভব, আত্মিকতা, সম্পর্ক, প্রেম—যেখানে ধর্ম একটি যাত্রা, একটি আত্মমগ্ন পাঠ-অভিজ্ঞতা। সূফীবাদ এই দ্বিতীয় ধারার প্রতিনিধিত্ব করে।
ইসলামের যে ধারাকে আমরা সূফীবাদ বলে চিনি, তা কোনোদিনই কেবল একটি অনুশীলন ছিল না; ছিল এক ধরনের অভ্যন্তরীণ যাত্রা—যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকার, অহংকার, ভয়, লোভ—এসবের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এখানে স্রষ্টা কেবল বিধানদাতা নন, প্রিয়জনও। এখানে ভয় নয়, ভালোবাসা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শাস্তি নয়, আত্মসমর্পণ গুরুত্বপূর্ণ। এ জায়গাটা inherently নম্র, ব্যক্তিগত, এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখানে কাউকে জোর করে ঢোকানো যায় না, কাউকে টেনে বের করাও যায় না। এবং ঠিক এ কারণেই এটা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর।
কিন্তু সমস্যাও হয় ঠিক এখানেই। কারণ এই নরম জায়গাটা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তাকে সহজে সংজ্ঞায়িতও করা যায় না। আর যেটাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না, সেটাকে ‘ভুল’ বলে চিহ্নিত করা সহজ।
ধর্ম যখন কেবল নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সেটাকে সহজে সাজানো যায়। কে ঠিক, কে ভুল—তা নির্ধারণ করা যায়। একধরনের নিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা মানুষের কাছে আরামদায়ক। কিন্তু সূফী চেতনা সেই আরাম ভেঙে দেয়। মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে বলে। বলে, তুমি যা করছো, তার ভেতরে তুমি কোথায়? তুমি যে প্রার্থনা করছো, সেখানে তোমার হৃদয় আছে কি? তুমি যে ধর্ম পালন করছো, তা কি তোমাকে মানুষ বানাচ্ছে, না কেবল একজন অনুসারী?
এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর ও বিপজ্জনক, কারণ তা বাইরে নয়, ভেতরে আঘাত করে।
ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি—যেখানে ধর্ম কাঠামোগত হয়েছে, সেখানে তার ভেতরের মরমি ধারাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে যেমন খারিজি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের ব্যাখ্যাকেই একমাত্র সত্য মনে করে অন্যদের বিরুদ্ধে সহিংস হয়ে উঠেছিল, তেমনি পরবর্তী সময়েও সূফী ধারাকে ‘অতিরিক্ত’ বা ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই প্রবণতা শুধু ইসলামে সীমাবদ্ধ নয়। খ্রিষ্টান ইউরোপে ইনকুইজিশনের সময় ‘শুদ্ধ বিশ্বাস’ রক্ষার নামে হাজার হাজার মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। হিন্দু সমাজেও বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় বা সামাজিক বিচ্যুতির অভিযোগে মানুষকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই জিনিস, common—একটি গোষ্ঠী নিজেদের ব্যাখ্যাকেই একমাত্র বৈধ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
এখানে ধর্ম নয়—ধর্মের দখলদারিত্ব কাজ করে। যখন কোনো সমাজে ধর্ম ধীরে ধীরে একটি কাঠামোয় পরিণত হয়—যেখানে ‘শুদ্ধতা, নিয়ন্ত্রণ, একক রূপ’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—তখন মরমি চেতনার ধারাগুলো সেখানে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই অস্বস্তি এখন আর নিছক মতপার্থক্যে আটকে নেই। এটা রাস্তায় নেমে এসেছে। ‘তৌহিদী জনতা’ নামের ব্যানারে যখন মাজারে হামলা হয়, তখন সেটা কেবল একটি ধর্মীয় বিতর্ক থাকে না; সেটা হয়ে ওঠে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দম্ভে ভর করা এমন এক সাম্প্রদায়িক শক্তি, যা নিজের ব্যাখ্যাকেই একমাত্র বৈধ সত্য হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায়। এর ভেতরে ধর্ম যতটা না কাজ করে, তার চেয়ে বেশি কাজ করে ক্ষমতার অনুভূতি—আমি ঠিক, তাই আমি ভাঙতে পারি, পুড়িয়ে দিতে পারি, মুছে ফেলতে পারি। আর এ জায়গাতেই ধর্ম সবচেয়ে বেশি বিকৃত হয়—যখন তা আত্মশুদ্ধির পথ না হয়ে অন্যকে ঠিক করার অস্ত্র হয়ে ওঠে।
আজকের তৌহিদী জনতা কিংবা মবের ঘটনাগুলো সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই এক নতুন রূপ। এখানে ধর্মীয় আবেগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে ক্ষমতার অনুভূতি। ‘আমিই সঠিক’—এই বিশ্বাস যখন ‘তাই আমি শাস্তি দেব’—এ অবস্থানে পৌঁছে যায়, তখন ধর্ম আর আধ্যাত্মিক থাকে না; হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্ত্র। যে অস্ত্র খুব সহজেই সহিংসতায় রূপ নেয়।

অজানা শিল্পীর আঁকা মনসুর আল-হাল্লাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য
খ. ভিন্নমত, বিচার ও সহিংসতার রাজনীতি
যে মানুষটিকে তারা আক্রমণ করছে, যে পীর বা সাধককে তারা ভ্রান্ত বা ভণ্ড মনে করছে, সে সত্যিই কেমন—এই প্রশ্নের বা জিজ্ঞাসার উত্তর মেলা কঠিন।
কোনো সুফি ভন্ড হতে পারে অন্যের দৃষ্টিতে। হতে পারে সে আসলে স্বঘোষিত পীর। কিন্তু তাকে বিচার করার চেয়ে প্রাণে মেরে ফেলে একটা ত্রাসের রাজত্ব, এটা সভ্য সমাজের আরচণ হতে পারে না। মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু ধারণাকে না। একটা বিকাশমান বা অসম্পূর্ণ জীবনকে হঠাৎ করে শেষ করে দিলে সেটি আর স্বাভাবিক পরিণতির ভেতর দিয়ে যেতে পারে না; বরং তা অন্যের আবেগ, ক্ষোভ, এবং স্মৃতির ভেতর দিয়ে এক ধরনের স্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়। তখন সেই মানুষটি আর কেবল ব্যক্তি থাকে না—হয়ে ওঠে গল্প, প্রতীক, কখনো কখনো ‘নায়ক’, কিংবদন্তীও।
এখানেই সবচেয়ে বড় বিদ্রূপটা ঘটে। যে মানুষটিকে তুমি ‘ভুল’ প্রমাণ করতে চেয়েছিলে,
তাকে হত্যা করে তুমি তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাও, যেখানে তাকে প্রশ্ন করা কঠিন হয়ে যায়। স্বাভাবিক জীবনপ্রক্রিয়ায় একজন মানুষের বিচার হয় তার কাজের ধারাবাহিকতায়। সময় তাকে খণ্ডন করে, সংশোধন করে, কখনো মুছে ফেলে। কিন্তু তাকে হত্যা করলে সে প্রক্রিয়াটাই বন্ধ হয়ে যায়। তার জায়গায় তৈরি হয় কিংবদন্তি। ফলে যে কাজটা ‘সংশোধন’ হিসেবে করা হচ্ছিল, সেটাই উল্টো হয়ে দাঁড়ায় ‘মহিমান্বিতকরণ’-এ।
আমরা ভাবি, কাউকে সরিয়ে দিলেই তার প্রভাব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু হত্যা কোনো পরিসমাপ্তি নয়—এটা অনেক সময় শুরু। দরগা, আখড়া, পীর এ জাতীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে মর্মান্তিক বিরোধ থেকে দীর্ঘস্থায়ী সূফীপ্রতীক সৃষ্টির বিয়োগান্তক পরিণতি হয়। মরমি প্রেমবাদে বিয়োগান্তক পরিণতিই দীর্ঘস্থায়িত্ব লাভ করে থাকে নিঃসন্দেহে। অনেকটা,
ধর্মে যদি না হয় আমার গতি,
মর্মে হবো প্রেমের অধিপতি।
ইতিহাস এই সত্যটা বারবার দেখিয়েছে। সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল—এথেন্সের তরুণদের ’ভ্রান্ত’ করে তোলার অভিযোগে। তাকে বিষপান করানো হয়েছিল, যেন তার চিন্তার প্রভাব থেমে যায়। কিন্তু আজ আমরা সক্রেটিসকে জানি, তার চিন্তা পড়ি, আর যারা তাকে হত্যা করেছিল, তাদের বিচার ইতিহাস নিজেই করেছে। ইনকুইজিশনের নামে যে অসংখ্য মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, তাদের অপরাধ ছিল—তারা ভিন্নভাবে ভাবত, ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করত। কিন্তু আগুন তাদের চিন্তাকে পোড়াতে পারেনি; বরং সেই দমনই নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছে।
ইসলামের ভেতরেও একই ঘটনা ঘটেছে। মনসুর আল-হাল্লাজকে তাঁর উচ্চারণের জন্য হত্যা করা হয়েছিল। তাঁকে মুছে ফেলতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যু তাঁকে আরও মহান করে তুলেছে—এক বিতর্কিত মানুষ থেকে বিরাট আধ্যাত্মিক প্রতীকে পরিণত করেছে। একটা সমাজ যদি ভ্রান্তিকে ভ্রান্তি হিসেবে প্রমাণ করার বদলে মানুষটিকে মুছে ফেলতে চায়, তাহলে সে আসলে নিজের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। কারণ যুক্তি যেখানে শক্তিশালী, সেখানে ছুরির প্রয়োজন হয় না।
যখন যুক্তি দিয়ে কোনো কিছুকে সরানো যায় না, তখন আগুন ব্যবহার করা হয়। মাজারে আগুন দেওয়া, লাশ তুলে নেওয়া—এসব কেবল শারীরিক সহিংসতা না, এগুলো এক ধরনের প্রতীকী ঘোষণা: ‘আমরা এটা মানি না, তাই এটা থাকবে না।’
একটি মাজার পুড়িয়ে দেওয়া যায়, একটি কবর ভেঙে ফেলা যায়, একজন মানুষকে হত্যা করা যায়। কিন্তু যে অনুভূতির ভেতর থেকে ভিন্নমত ও ভাবনার জন্ম—সেটাকে কীভাবে ধ্বংস করবে? এ লড়াইটা তাই আসলে সূফী আর অ-সূফীর না। এটা ভালোবাসা বনাম নিয়ন্ত্রণের লড়াই। এটা ভেতরের স্বাধীনতা আর বাইরের কাঠামোর লড়াই।

ইকোয়েডোরিয়ান শিল্পী হোয়াকিন পিন্তো’র আঁকা ইনকুইজিশনের শিকার এক নারী
গ. প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, রাষ্ট্র ও মব-মানসিকতার সংকট
সমাজের দায়, রাষ্ট্রের দায়—এসব বললে কথাটা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু আসলে প্রশ্নটা আরও জটিল। আগে কি এমন ছিল না? ধর্মের নামে সহিংসতা কি ছিল না? ইতিহাস বলবে—ছিল। কিন্তু তার চরিত্র আলাদা ছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষার একটা দীর্ঘ সময় ছিল, যখন মতভেদ ছিল, তর্ক ছিল, কখনো কখনো কঠোর অবস্থানও নেওয়া হতো—কিন্তু তার ভেতরে একটা কাঠামো ছিল। একটা পদ্ধতি ছিল—বিচার করার, ব্যাখ্যা করার, মতভেদের মুখোমুখি হবার। সেখানে কে কী বলবে, কে কাকে খণ্ডন করবে, কোন মত কতটা গ্রহণযোগ্য—এসবের একটা আপাত-শৃঙ্খলা ছিল। সেই শৃঙ্খলা সবসময় ন্যায়সঙ্গত ছিল না, কিন্তু তা সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিতও ছিল না।
আজকের বাস্তবতায় আমরা যে দৃশ্যটা দেখি—সামান্য অভিযোগ, গুজব, বা ‘ধর্ম অবমাননা’র একটি অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে হঠাৎ করে মানুষ জড়ো হয়ে যায়, উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তারপর মুহূর্তের মধ্যে সহিংসতা—এটা কেবল ধর্মীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটা এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত সংগঠিত ক্ষমতার বিস্ফোরণ। এখানে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেয় না, কিন্তু প্রত্যেকে নিজেকে ন্যায্য মনে করে। যেন বিচার করার অধিকার হঠাৎ করেই সবার হাতে চলে এসেছে।
প্রশ্নটা তখন আসে—এই অবস্থার দায় কার? ধর্মীয় শিক্ষার? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের? রাষ্ট্রের? নাকি ভিন্নমত পোষণকারীর?
ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় ধর্মশিক্ষা এসে দাঁড়িয়েছে কেবল আচার-অনুশীলনের ভেতর। কীভাবে নামাজ পড়তে হবে, কীভাবে চলতে হবে—এসব শেখানো হয়; কিন্তু কেন, কীভাবে, এর ভেতরের নৈতিকতা, মানবিকতা, আত্মিক শুদ্ধি—এসব প্রায় অনুপস্থিত। ফলে মানুষ ধর্মকে বোঝে না, কেবল অনুসরণ করে। আর অন্ধ অনুসরণ খুব সহজেই উত্তেজনায় রূপ নেয়, কারণ সেখানে নিজের ভেতরের কোনো পরিশোধন নেই—শুধু বাহ্যিক আনুগত্য আছে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই রকম সংকট দেখা যায়। একসময় তারা সমাজে একটি বৌদ্ধিক ও নৈতিক ভারসাম্য তৈরি করত—ভুল-শুদ্ধ বিচার করার, মতভেদকে সামলানোর একটা ন্যূনতম জায়গা ছিল। এখন বেশিরভাগই আচারসর্বস্ব ও পরমত-অসহিষ্ণু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করছে আবেগ, গুজব, এবং দ্রুত বিচার করার মানসিকতা—যেখানে যুক্তির চেয়ে উত্তেজনা দ্রুত কাজ করে।
আর রাষ্ট্র?
রাষ্ট্রের কাজ ভিন্নমতকে শাস্তি দেওয়া না; রাষ্ট্রের কাজ সহিংসতাকে থামানো। কেউ কোনো পীরকে মানুক বা না মানুক, কোনো মাজারকে গ্রহণ করুক বা প্রত্যাখ্যান করুক—তা তার বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু সেই বিশ্বাসের নামে যদি সে অন্যের ওপর হামলা চালায়, তখন তা আর বিশ্বাস থাকে না—হয়ে ওঠে অপরাধ। রাষ্ট্র যদি ভিন্নমত দমন করতে নামে, তাহলে সে নিজেই আরেক ধরনের মব হয়ে ওঠে। আর যদি মবকে ছাড় দেয়, তাহলে আইন ভেঙে পড়ে। তাই রাষ্ট্রের একমাত্র পথ—চিন্তার স্বাধীনতাকে রক্ষা করা, এবং সহিংসতাকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা।
ধর্মীয় নৈতিকতা, আত্মিক শিক্ষা, এবং বৌদ্ধিক শৃঙ্খলার জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। মানুষ ধর্মের গভীরতা থেকে সরে গিয়ে তার সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে বাহ্যিক রূপটাকে আঁকড়ে ধরেছে। সেখানে প্রশ্ন নেই, আত্মসমালোচনা নেই, ধৈর্য নেই—শুধু দ্রুত প্রতিক্রিয়া আছে। আর দ্রুত প্রতিক্রিয়া খুব সহজেই সহিংসতায় পরিণত হয়।
কিন্তু একটা প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত আবার সেখানেই ফিরে আসে—ধর্ম কি মানুষকে নম্র করবে, না কি তাকে আরও কঠিন করে তুলবে?
যদি ধর্ম আমাদের ভেতরের সহিংসতাকে বৈধতা দেয়, তাহলে সমস্যা ধর্মে না—আমাদের বোঝাপড়াহীন অবোধ সমাজধর্মে। যদি ধর্ম আমাদের ভেতরের নরম জায়গাটাকে জাগিয়ে তোলে, তাহলে কোনো মবই শেষ পর্যন্ত টিকতে পারে না। কারণ মব ভয় থেকে জন্ম নেয়, আর সূফী চেতনা—ভয়কে ভেঙে দেয় ভালোবাসার মাধ্যমে।
মাজারে আগুন লাগানো যায়। মানুষকে হত্যা করা যায়। সঠিক বা বেঠিক কণ্ঠরোধ করা যায়। কিন্তু ভালোবাসাকে মুছে ফেলা যায় না। কারণ সূফীবাদ কোনো প্রতিষ্ঠান না—এটা মানুষের ভেতরের নম্রতা, এক প্রেমাকর্ষণ, এক আত্মসমর্পণ।
যতদিন মানুষ তার ভেতরের এই নম্র সুর খুঁজে পাবে, ততদিন সূফীবাদ থাকবে—মাজার থাকুক বা না থাকুক।