আমাদের সুহৃদ তোফাজ্জল হোসেন
আমরা, তোফাজ্জল হোসেন (১৯৩৭-২০১৭) ও আমি, এক সময়ে প্রতিবেশী ছিলাম। আমাদের কৈশোরে। ১৯৪৮-এ। পড়তামও একই স্কুলে। তোফাজ্জল ক্লাস এইটে। আমি নাইনে। আমার সদ্যপ্রয়াত ভাই, আমানুল ইসলাম পড়তো ক্লাস সেভেনে। আমরা ছেলেরা স্কুলে যেতাম পায়ে হেঁটে। প্রথা ছিল সেটাই। বেগম বাজার থেকে আরমানিটোলা হয়ে কখনো জিন্দাবাহার দিয়ে কখনো-বা নয়াবাজারের পথে। তোফাজ্জল অবশ্য বেশী দিন বেগম বাজারে থাকে নি, চলে গেছে অন্য পাড়ায়। তবু তাকে তো জানতাম। জানবার বিশেষ কারণ ছিল সে ফুটবল খেলতো। আমাদের সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুল তখন বেশ চৌকস ছিল, খেলাধুলার দিক দিয়েও। ইউজিন, রহিম, খালেক, এরা ছাত্রজীবনেই নাম করেছিল ফুটবল প্লেয়ার হিসেবে। তোফাজ্জলও ওই দলেই ছিল। পরে খেলতো আজাদ স্পোটিং ক্লাবে। ওই ক্লাব যারা গড়ে তুলেছে তোফাজ্জল তাদের একজন। ক্লাবে ছিল বক্শিবাজার, সাতরওজা, আগা সাদেক রোডের ছেলেরা।
পরে জেনেছি তোফাজ্জল কবিতাও লিখতেন। ফুটবল প্লেয়ার ও কবিকে এক সঙ্গে দেখতে আমার মোটেই অসুবিধা হয় নি। আমি দেখতে পাই তোফাজ্জল ফুটবলের শৃঙ্খলা কবিতায় এনেছেন, কবিতার সুষমাকে নিয়ে গেছেন ফুটবলে। খেলার মাঠের শ্রম ও কবিতার অনুশীলন দু'য়ের মিলে একটা দ্যুতি দেখতে পাই তাঁর কাজে। কৌশোরেই তাঁর লেখা গান ছাপা হয় হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিক গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কলন 'একুশে ফেব্রæয়ারী'তে। হাসান ভাইয়ের সঙ্গে তোফাজ্জলের যোগাযোগ ছিল, হাসান ভাইও কিন্তু ফুটবল প্লেয়ার ছিলেন; সাহিত্যচর্চা ও খেলাধুলার এই দু'য়ের চর্চা তিনিও একসঙ্গেই করতেন, অল্পবয়সে। পরবর্তী জীবনেও দেখেছি হাসান ভাইয়ের সব কাজের মধ্যেই ওই দুই জিনিস মিলেমিশে থাকতোÑ কাব্য এবং খেলাধুলা।
তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে আমার যে খুব ঘন ঘন দেখা হয়েছে তা নয়। আমরা এক কলেজে পড়ি নি। বিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের ছাত্র ছিলাম। কিন্তু জানতাম তিনি আছেন। শেষ দেখা জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে। সেখানে কয়েকজনকে সম্বর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন আমিও ছিলাম। বললেন, শরীর ভালো যাচ্ছে না। তাকিয়ে দেখলাম কথাটা সত্য। বললেন, তাঁর কয়েকটা বই পাঠাবেন। বই তিনি আর পাঠাতে পারেন নি, পরে পেয়েছি তাঁর পুত্র তারিক সুজাতের মাধ্যমে।
আটচল্লিশে আমরা থাকতাম মধ্যবিত্ত পাড়াতে। নিম্ন মধ্যবিত্তও বলা যায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রথম দিনগুলোর দৈন্যদশা ছিল সর্বত্র প্রকাশিত। পাড়ার রেশন দোকানটি ছিল খুবই জরুরী প্রতিষ্ঠান; রেশন কার্ড ছিল মস্ত ভরসা। রেশনে কাঁকরমেশানো চাল, দুর্গন্ধযুক্ত গম, ময়লা চিনি, এসব পাওয়া যেত। সন্ধ্যার পর ইলেকট্রিক বাল্বগুলোকে মনে হতো আলো ছড়াচ্ছে টর্চ লাইটের; হ্যারিকেনই ছিল ভরসা। মোড়ের কাছে তেলের আড়ৎ ছিল, হাজী সাহেবের; জানতাম তিনি শহর মুসলিম লীগের একজন নেতা, শুনতাম তিনি তেলে ভেজাল মেশান। এর মধ্যেই আমরা বেড়ে উঠছিলাম। মধ্যবিত্ত বিকশিত হচ্ছিল। ওই শ্রেণী যে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক নানা ক্ষেত্রে দায়িত্ব নেবে এটা নিশ্চিত ছিল, অনুভবও করা যেত। রাজনীতির ব্যাপারটাই ছিল সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যবিত্তই তাতে নেতৃত্ব দেবে এটা তো স্থির হয়েই ছিল; তাদের একাংশ যে সমাজ-পরিবর্তনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে এটাও ছিল স্বাভাবিক। ঘটছিলও তেমনটা। কিন্তু এর মধ্যে চলে এসেছে উন্নয়নের চিন্তা। উন্নয়ন মানে পুঁজিবাদী ধারায় অগ্রগতি; যার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল মুসলিম লীগের ওই নেতার আড়তে ভোজ্যতেলের সঙ্গে বিপজ্জনক ভেজাল মেশানোতে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তো বামপন্থীদের পরিচালনাতেই সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু তারপর যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জিতলো, কিন্তু ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলো না। এলো আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। আর্থ-সামাজিক সমস্ত তৎপরতা চলে গেল পুঁজিবাদী ধারার উন্নয়নের অধীনে। সমাজের সুস্থ বিকাশ বিকৃত হলো উন্নয়নের নামাধীন ব্যক্তিগত মুনাফাবৃদ্ধির তৎপরতায়। গোটা সমাজ তার শিকার হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙে গেছে, কিন্তু পুঁজিবাদী উন্নয়নের সেই ধারার অবসান ঘটে নি। উল্টো ওই ধারা আগের চাইতেও সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে।
অসম উন্নয়নের ধাক্কাতে পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গীয় অংশ যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় শাসকেরা তখন উদ্বিগ্ন হয়ে নানান রকমের হাতুড়ে চিকিৎসা ধরেছিল, তার মধ্যে একটা ছিল পাকিস্তান কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল ইন্ট্রিগ্রেশন প্রতিষ্ঠা। তোফাজ্জল তখন সরকারের তথ্য বিভাগে কাজ করেন। তাঁকে করা হয়েছিল ওই কাউন্সিলের আবাসিক পরিচালক। প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে, এখন যেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তারই একাংশে কাউন্সিলের একটি সুন্দর গ্রন্থাগার ও আধুনিক মিলনায়তন খোলা হয়েছিল। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মিলনায়তনে গেলে তোফাজ্জলের সঙ্গে দেখা হতো; না-দেখা হলেও তাঁর উপস্থিতিটা টের পেতাম। এখন মনে হয় পাকিস্তান যে একটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক রাষ্ট্র ছিল তার অনেক প্রমাণের ভেতর কৌতুককর ছোট্ট একটা প্রমাণ এই যে তোফাজ্জলকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার কর্তব্য-পালনে। তোফাজ্জল তো রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের লোক; তাঁর আকাক্সক্ষা তো পাকিস্তানকে রক্ষা করা ছিল না, ছিল পূর্ববঙ্গকে স্বাধীন করা।
কেবল স্বাধীন করা নয় তোফাজ্জলের আকাক্সক্ষাটা ছিল পূর্ববঙ্গকে সমৃদ্ধ করা। উন্নতির বিপরীতে বিকাশকে সম্ভব করে তোলা। যে-বিকাশ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল তাকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনা। তোফাজ্জলের লেখা বইগুলোতে ওই আকাক্সক্ষাটাকেই দেখতে পাই। তিনি কবিতার বই লিখেছেন, হৃদয় রক্তরাগে, একুশ ভুবনময়, নতুন যুগের ভোরে নামে, তাঁর কবিতাসমগ্রও প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বিপন্ন পৃথিবী বিপন্ন জনপদ, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ও আগামী পৃথিবী নামের বই। তথ্য ও গবেষণা সমৃদ্ধ বড় একটি বই লিখেছেন তিনি, নাম জাতিসংঘ। ছোট্ট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রকাশনা প্রগতিশীল রুশ ও উর্দু কবিতা।
তাঁর সব রচনাতেই আছে চলমান উন্নতির ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ। এই উন্নতি প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস করছে, মানুষের বিশেষ করে শিশুদের জীবনে অভিশাপ বহন করে নিয়ে আসছে; উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমাদের এই পৃথিবী, মানবজাতির এই বাসভ‚মি, যে মনুষ্য-বসবাসের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে সেই সত্যটাকেই তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এবং অকাট্য যুক্তি দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর বলবার মূল কথাটা এই যে বিপদ এখন একেবারে ঘাড়ের ওপর, তাই কেবল সতর্ক হলেই চলবে না, বিপদকে ঠেকানোই চাই। বিপদটা কোনো একটি দেশের নয়, গোটা পৃথিবীর, সমস্ত মানবজাতির; এবং তার জন্য পুঁজিবাদী উন্নতিকে নিয়ে আসতে হবে মানুষ ও প্রকৃতির মঙ্গলের ধারাতে। কবিতায় ও গদ্যে তিনি এই কথাটাই জোর দিয়ে বলেছেন।
তাঁর কবিতা থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি দেয়া যাক। শিশু, বিশ্ব ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট বইটির শেষে 'শিশু-অধিকার' নামে একটি কবিতা আছে, তাতে তিনি বলেছেন,
এই পৃথিবী বলতে গেলে একটি নহে আস্ত দু'টি
কেউ যদিও নিত্যদিনে জীবনরক্ষী বস্তুরাশি
খুঁজতে গিয়ে হাজার পাকে নিজেকে হারায় নিজ ঠিকানায়
চোখে যে তার গোলকধাঁধা, জীবনটাই এই জীবনের
নিত্যদিনের আস্ত বোঝা,
কেউ-বা আবার এক তুড়িতে সবটুকু নেয় লুটেপুটে
বলিহারী এই পৃথিবী নিছক তার সেবাদাসী;
মুখোশ-পরা মুখের নিচে আসল রূপটি লুকিয়ে আছে
দস্যুগণ আর লুটেরাদের
মূল সমস্যাটা ওইখানেই, ওই বৈষম্যেই। বৈষম্যই দারিদ্র্য সৃষ্টি করেছে, উল্টোটা নয়। কবিকে সেজন্যই বলতে হচ্ছে,
বিশ্বজোড়া 'উন্নতি' আর 'গণতন্ত্র' একেই বলে,
তাকেই বলে 'সভ্যতা' আর 'জীবনমানের অগ্রগতি'।
বক্তব্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই, যেমন নেই উপলব্ধিতে।
গরীব দেশে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ তোফাজ্জলকে বিশেষভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছে। তখনকার বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটানা তিন বছর ধরে তিনি একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন, যেখানে তাঁর বলবার বিষয়টা ছিল এশিয়াতে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ। এ নিয়ে তিনি বইও লিখেছেন। তাতেও বলার মূল কথাটা একটিই; জনসংখ্যা বৃদ্ধি দারিদ্র্য বৃদ্ধি করছে আবার দারিদ্র্যের কারণেই জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে। এর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে উন্নতির ধারায় পরিবর্তন আনা, উন্নতি যাতে বৈষম্যমূলক না হয় তার ব্যবস্থা করা। জনসংখ্যা নিয়ে-লেখা বইটির শেষাংশেও একটি কবিতা আছে, নাম 'পরিবেশ'। যেখানে তিনি লিখেছেন,
প্রাণের অপর নাম পরিবেশ,
আজ তার উপলব্ধি চাই
চাই ভারসাম্য, আমার শ্যামল সুন্দর
নিঃশঙ্ক পৃথিবী এক
নিঃসীম নিরাপত্তায়
'ভারসাম্য' কথাটা জরুরি। পুঁজিবাদী উন্নতিতে ভারসাম্য নেই, আছে বৈষম্য, যার দরুন পৃথিবী এখন নিঃশঙ্ক নয়, মানুষ ও প্রকৃতির নিরাপত্তা পদে পদে বিঘিœত। তোফাজ্জল হোসেন দেখে যাননি, তার আগেই তিনি চলে গেলেন, থাকলে তাঁকে দেখতে হতো পৃথিবী যে কতটা শঙ্কায় পড়েছে, উন্নয়ন যে কেমন ভঙ্গুরদশায় রয়েছে করোনা ভাইরাসের এক ধাক্কাতে সেসব খবর কীভাবে উন্মোচিত হয়ে গেল। সহ্য করতে হতো এই দুঃসংবাদ যে পৃথিবীর মানুষ এমন সর্বজনীন বিপদে আগে কখনো পড়েনি; বিশেষভাবে বিপন্ন হয়েছে দরিদ্র দেশ এবং দরিদ্র মানুষ। অথচ পৃথিবীর তো অত্যাশ্চর্য ও অকল্পনীয় সব উন্নতি ঘটেছে।
তোফাজ্জল তাঁর বিপন্ন পৃথিবী বিপন্ন জনপদ নামের বইটি উৎসর্গ করেছেন শহীদ সিরাজউদ্দিন হোসেন ও শহীদ গিয়াসউদ্দিন আহমদকে। এঁরা তাঁর আপনজন ছিলেন। গিয়াসউদ্দিন ছিল আমার কৈশোরের বন্ধু এবং কর্মজীবনে সহকর্মী। আমরা একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়েছি, কলেজেও তাই, বিশ্ববিদ্যালয়েও, গিয়াস ইতিহাসে আমি ইংরেজি সাহিত্যে। শিক্ষকতাও করেছি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংল্যান্ডে যে পড়তে গেছি সেও গেছে একই বৃত্তি নিয়ে। আল-বদরদের তৈরি গোপন তালিকায় গিয়াসউদ্দিনের নামের পাশে আমার নামটিও ছিল; বেঁচে গেছি ওই নয় মাস ফেরারী ছিলাম বলে। মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদদের মতোই সিরাজউদ্দিন হোসেন ও গিয়াসউদ্দিনও ছিলেন অনড় দেশপ্রেমিক। একাত্তরের শহীদরা কী চেয়েছিলেন তার কথা তোফাজ্জল তাঁর বইয়ের উৎসর্গ-পত্রটিতে লিখেছেন, কবিতার আকারে। ওই আকাক্সক্ষার কথা আমরাও জানি, আমাদের সকলেরই তো একই আকাক্সক্ষা ছিল; একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাসভ‚মির। সেই আকাক্সক্ষাকে চুরমার করে দিতে চেয়েছিল একাত্তরের হানাদার পাকিস্তানীরা। তোফাজ্জল লিখেছেন,
এরি মাঝে ছদ্মবেশী ভিন্নরূপী কাপুরুষ জঘন্য পিশাচ
হায়েনার মূর্তিরূপী নৃশংস দোসর, হিংসাক্র‚র ডানা মেলে
জমকালো হাতের ইঙ্গিতে
হ্যাঁ, ছদ্মবেশ ধরেই এসেছিল তারা, ছদ্মবেশটা ধর্মরক্ষার, আসলে রক্ষা করতে চাইছিল পুঁজিবাদী শোষণকেই, যে শোষণ জমকালো আবরণের আড়ালে ঢেকে রাখতে চেয়েছিল তার নৃশংস হাতটিকে। হাতটি উন্নতিরও। হাতের মালিকদের উন্নতি, বাদবাকিদের পদদলন।
তোফাজ্জল হোসেন আশাবাদী মানুষ ছিলেন। তিনি জানতেন যে পরিবর্তন সম্ভব। পরিবর্তনের পক্ষেই লিখেছেন। এবং সেই লক্ষ্যে কাজও করেছেন। তিনি যুক্ত ছিলেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর সঙ্গে; একেবারে প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই। বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতির সঙ্গে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদের তিনি উৎসাহী ও সক্রিয় কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন। তবে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয় মুকুল ফৌজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। কৈশোরে আজাদ পত্রিকার মুকুলের মহফিল পাতায় আমিও লিখতাম; বেগম বাজারের বসবাস গুটিয়ে আমরা যখন সদ্যস্থাপিত আজিমপুর কলোনিতে উঠে আসি, তখন সেখানে মধ্যবিত্তের সুস্থ বিকাশের ধারাতে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছিল, মুকুল ফৌজও ছিল তার অংশ। আমার তাতে যোগ দেয়া ঘটে নি, কিন্তু আমার যে ভাইটির কথা শুরুতে উল্লেখ করেছি সে ছিল বেশ সক্রিয়। মুকুল ফৌজে অন্যসব অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত ছিল প্রতিদিনের প্যারেড, সে প্যারেডে ছেলেদের দৃপ্ত অংশগ্রহণ দেখে মনে হতো তারা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। অনেক পাড়াতেই তখন মুকুল ফৌজের শাখা ছিল। তোফাজ্জলের সংযোগ ছিল কেন্দ্রীয় সংগঠনের সঙ্গে। সংগঠনটি থেকে মুকুল নামে যে পাক্ষিক পত্রিকাটি বের হতো তিনি তাঁর সম্পাদকের একজন ছিলেন। মুকুল ফৌজ ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়, কিন্তু তাকে সজীব রাখার কাজে তোফাজ্জল নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন শেষ অবধি। মুকুল ফৌজ এক সময়ে বিলীনই হয়ে গেছে। কেবল ওটিই নয় তো, অন্য যে-কয়টি কিশোর সংগঠন সক্রিয় ছিল সেগুলোর প্রত্যেকটি ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন তাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। 'উন্নতি' গ্রাস করে ফেলেছে সুস্থ বিকাশের অনেক সম্ভাবনাকেই, রেহাই দেয় নি কিশোরদের জন্য বিকশিত হবার আন্দোলনকেও। তার বদলে এখন এসেছে কিশোর অপরাধ। কিশোর গ্যাং তৎপর হয়ে উঠেছে। যারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নয় সেই ছেলেমেয়েরা আটক আছে ঘরের ছোট্ট কোণে, তাদের কোনো সামাজিক সাংস্কৃতিক জীবন নেই। তোফাজ্জল হোসেনরা চেয়েছিলেন কিশোররা সামাজিক হোক, সাংস্কৃতিকচর্চার মধ্য দিয়ে বড় হোক, তাদের প্রস্তুতিতে তাদের নিজেদের এবং দেশের সকল মানুষের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় হয়ে উঠুক।
তোফাজ্জল হোসেনের লেখাগুলোর একটি উক্তি বার বার এসেছে, সেটি হলো 'শেষ কথা'। তাঁর শেষ কথাটি কি? শেষ কথাটি হলো বিশ্ব যেভাবে চলছে সেভাবে চললে মানুষ বাঁচবে না, একে বদলাতে হবে। বদলাতে হলে কি করা চাই? সে-কথাটা তোফাজ্জল খুব জোর দিয়ে বলেননি। তিনি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে যুক্ত থাকলেও তিনি প্রচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করতেন; লোকে বলতো তিনি নির্ভৃতচারী। তবে যা বলতে চেয়েছেন সেটা কিন্তু সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর অনূদিত ছোট একটি কবিতার-বইতে। বইয়ের নাম প্রগতিশীল রুশ ও উর্দু কবিতা। কবিতাগুলো তিনি খুব যতেœর সঙ্গে অনুবাদ করেছেন। সব ক'টি কবিতাতেই সমাজ-পরিবর্তনের আবশ্যকতা ও প্রস্তুতির বিষয়ে বক্তব্য আছে। একেবারে শেষের কবিতাটির শেষ তিনটি পঙক্তি এই রকমের : "আমার বুকে জ্বলছে আগুন/ বিপ্লব তুমি গর্জে ওঠো/ জেনো, আমি প্রস্তুত"। উর্দুভাষী ওই কবি তাঁর নিজের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে অন্যদেরকেও ডাক দিয়েছেন সামাজিক বিপ্লবের আন্দোলনে যোগ দিতে। ওই ডাকটা তোফাজ্জল হোসেনও দিয়ে গেছেন, ভিন্নভাবে। বলছেন, উন্নতি অনেক হয়েছে, এবার আসুন আমরা মানবিক হই।
