জগদীশচন্দ্র বসুর ‘পলাতক তুফান’ একটি উৎকৃষ্ট ব্যঙ্গ-রসাত্মক গল্প

আশরাফ আহমেদ
Published : 6 Sept 2011, 03:04 PM
Updated : 27 May 2022, 11:58 AM


গবেষকরা যে গল্পটিকে বাংলা ভাষায় কল্পবিজ্ঞান হিসেবে সর্বপ্রাচীন অথবা প্রথমদিককার অন্যতম বলে বিবেচনা করে থাকেন, সেটি হচ্ছে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর 'পলাতক তুফান'১-৪ । জগদীশচন্দ্র বসু একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ছিলেন। 'পলাতক তুফান'নামে তাঁর একটিমাত্র প্রকাশিত গল্পের কথাই আমরা জানি। কাজেই বিজ্ঞানে ব্যবহৃত শব্দ এবং তথ্য সংযোগ করে লেখা সেই গল্পটি একটি কল্পবিজ্ঞান বলে সাধারণ পাঠকরা সহজেই গ্রহণ করবেন। কল্পনার সাথে বিজ্ঞানের মিশ্রণ দেখে গবেষকরাও গল্পটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম বা প্রথমদিককার কল্পবিজ্ঞান বিবেচনা করলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক ও গবেষক সিদ্ধার্থ ঘোষ নির্দ্বিধায় গল্পটিকে 'একটি অনবদ্য এস੶এফ੶ কাহিনী' বলে আখ্যায়িত করেছেন (পৃ ১৫৮)। একই ভাবে ২০০৭ সালে 'অব্যক্ত' বইটির একটি পুণর্মুদ্রণ সংখ্যায় শ্যামল চক্রবর্তী 'পলাতক তুফান বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের প্রথম রচনা হিসেবে বিবেচিত হয়' বলে উল্লেখ করেছেন ('প্রসঙ্গ কথা' পৃ ৯)।

কিন্তু সম্প্রতি জগদীশচন্দ্র বসুর বাংলা বই 'অব্যক্ত' প্রকাশনার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে বইটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে আমি আবিষ্কার করলাম যে, কোনো সংজ্ঞাতেই 'পলাতক তুফান'কে কল্পবিজ্ঞান বলা যায় না। আমার এরকম মনে হবার কারণ ১৯২৯ সালে সাহিত্যের একটি শাখা হিসেবে 'কল্পবিজ্ঞান' বা 'সায়েন্স ফিকশন' শব্দগুচ্ছের পুণরাবির্ভাবের পর এখন অধিকাংশের গ্রহণযোগ্য কল্পবিজ্ঞানের যে সংজ্ঞা দাড়িয়েছে, সেই আলোকে গল্পটিকে বিশ্লেষণ করার ফলে।

বাংলা কল্পবিজ্ঞান গবেষকরা বিখ্যাত মার্কিন কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভের প্রণীত সংজ্ঞাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আসিমভের মতে কল্পবিজ্ঞান হচ্ছে 'সাহিত্যের একটি শাখা যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে মানুষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে রচিত হয়' (Science fiction can be defined as that branch of literature which deals with the reaction of human beings to changes in science and technology)। এর বাইরেও বিভিন্ন লেখক কল্পবিজ্ঞানকে বিভিন্ন ভাবে সঙ্গায়িত করেছেন। সূক্ষ্মতা বিবেচনায় তাতে মতভেদ থাকলেও মোটা দাগের সংজ্ঞাটিতে টিতে কোনো পার্থক্য নেই। তাঁদের মতে কল্পবিজ্ঞান হলো, প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানকে কল্পনা দ্বারা প্রসারিত করে বর্তমান বা ভবিষ্যতের কাল্পনিক কোনো অবস্থাকে গল্পে রূপদান।

এভাবে কল্পবিজ্ঞান রচনার প্রথম শর্ত হচ্ছে এটি হতে হবে কাল্পনিক। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে কল্পনাটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। আর অধিকাংশ লেখকের মতে কল্পবিজ্ঞানের তৃতীয় শর্তটি হতে হবে ভবিষ্যতমুখী। অর্থাৎ আজকের বৈজ্ঞানিক-কারিগরি তথ্য বা জ্ঞান ভবিষ্যতে অনেক উন্নত হয়ে বর্তমানে বিরাজমান অথবা ভবিষ্যতে উদ্ভুত নতুন কোনো সমস্যার সমাধানে কাল্পনিক গল্প।

প্রথমবারের মতো জগদীশচন্দ্র বসুর 'নিরুদ্দেশের কাহিনী' প্রকাশিত হবার পূর্বে জনৈক হেমচন্দ্র বিশ্বাসের 'রহস্য নামক গল্পটিকে কেহ কেহ বাংলায় রচিত প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বলতে চেয়েছেন১-২। গল্পটি পড়ে আমি তাতে কোনো বৈজ্ঞানিক বা অবৈজ্ঞানিক 'কল্পনা' এবং 'ভবিষ্যতমুখীতা'র কোনো সন্ধান পাইনি। তদুপরি খ্যাতিমান কল্পবিজ্ঞান লেখক ও গবেষকরা১-৪ কল্পবিজ্ঞান সংজ্ঞার শুধুমাত্র 'ভবিষ্যতমুখীতা'র শর্ত পূরণের অভাবের জন্য আমার মতোই গল্পটিকে কল্পবিজ্ঞান নয় বলে মতবাদ ব্যক্ত করেছেন।

এখন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর নিরুদ্দেশের কাহিনী অথবা পলাতক তুফান কি সত্যিকার অর্থে কোনো 'ভবিষ্যতমুখীতা'র ইঙ্গিত দিয়েছেন? উত্তর হচ্ছে না। গল্পটিতে প্রতিষ্টিত বিজ্ঞান নির্ভরতা আছে। কল্পনা আছে। কিন্তু ভবিষ্যদখীতা একেবারেই নেই। ওপরে উল্লিখিত যে সংজ্ঞার আলোকে একটি গল্প বা উপন্যাসকে কল্পবিজ্ঞান আখ্যায়িত করা যায়, 'পলাতক তুফান'-এর তা প্রাপ্য নয়।

'পলাতক তুফান' তাহলে সাহিত্যের কোন শাখার অন্তর্গত? আমার বিবেচনায় বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে তখনকার শাসক ও বুদ্ধিজীবীদের ভ্রান্ত ধারণাকে ব্যঙ্গ করে এটি একটি উৎকৃষ্ট স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গ-রসাত্মক রচনা। লেখাটি যে কল্পবিজ্ঞান নয় তা প্রথমে আলোচনা করবো। এরপর গল্পটির ব্যঙ্গ-রসাত্মক চরিত্রটিও উদ্ঘাটন করব। তার আগে গল্পটির সারসংক্ষেপটি জেনে নেয়া যাক।


পলাতক তুফান ও নিরুদ্দেশের কাহিনী: 'পলাতক তুফান' গল্পটি 'নিরুদ্দেশের কাহিনী' নামে (অব্যক্ত' পৃ ১৫২) বাংলা ১৩০৩ (খৃষ্টিয় ১৮৯৬) সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল । কুন্তলীন নামক কেশতৈলের বাণিজ্যিক প্রচারণার উদ্দেশ্যে এক 'কুন্তলীন পুরষ্কার' রচনা প্রতিযোগীতায় ছদ্মনামে 'নিরুদ্দেশের কাহিনী' রচনা করে তিনি ৫০ টাকার পুরষ্কারটি জিতে নিয়েছিলেন১, ২, ৩। পরবর্তীতে বাংলা ১৩২৮ সালের আশ্বিন মাসে কিছুটা পরিবর্তন সহ 'পলাতক তুফান' নামে লেখকের প্রথম, 'অব্যক্ত' গ্রন্থে প্রকাশিত হয় (অব্যক্ত' পৃ ৫৫)। গল্পের দুটি সংস্করণে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। তা সত্ত্যেও মূল কাহিনীতে কোনো তারতম্য নেই। আলোচনায় যাবার আগে কাহিনীর সারসংক্ষেপটি জেনে নেয়া যাক।

'আধ ঘণ্টার মাঝে ব্যারোমিটার দুই ইঞ্চি নামিয়া যাওয়ায়' আবহাওয়া অপিস থেকে কলকাতাবাসীকে পরদিন প্রচণ্ড ঝড়-জলোচ্ছাসের পূর্বাভাসের কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। সবাই প্রস্তুত হয়ে থাকলেও পরদিন কিছুই না ঘটায় উদ্ভট সব মন্তব্য করে করে উচ্চশিক্ষায়তনের প্রধান থেকে শুরু করে বড়লাট ও পত্রিকার সম্পাদকও আবহাওয়া অপিসের মুণ্ডুপাত করতে লাগল। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিকরা ঝড়টি কেন হলো না, মরিয়া হয়ে তা খুঁজতে লাগল। বিলাতের বৈজ্ঞানিক পত্রিকা ন্যাচার-এ এক বৈজ্ঞানিক 'থিওরি এই যে, অদৃশ্য ধুমকেতুর আকর্ষণে বায়ুমণ্ডল আকৃষ্ট হইয়া উর্ধে চলিয়া গিয়াছে' বলে লেখা হলো। ইউরোপের অন্যান্য বিজ্ঞানীরাও এধরণের অনুমান নির্ভর ও তুফানের সাথে পুরোপুরি সম্পর্কহীন কিছু বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মত্ত হলেও কেউ কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না। গল্পের এই প্রথমাংশের শেষে লেখক জানালেন যে উত্তরটি একমাত্র তাঁরই জানা আছে। গল্পের দ্বিতীয় অংশে লেখক সিংহলের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করে প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পতিত হলেন। জাহাজের মাস্তুল ও লাইফ বোট ভেঙে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হলে তাঁর 'হঠাৎ এক কথায় আর-এক কথা মনে পড়িল। বৈজ্ঞানিক কাগজে ঢেউয়ের উপর তৈলের প্রভাব সম্প্রতি পড়িয়াছিলাম। তৈল যে চঞ্চল জলরাশিকে মসৃণ করে এ বিষয়ে অনেক ঘটনা মনে হইল'। সাথে সাথে নিজের মাথার অবশিষ্ট কয়গোছা চুল রক্ষার্থে স্নেহময়ী কন্যার দেয়া এক শিশি 'কুন্তলীন' তেল সাগরে নিক্ষেপ করা মাত্র সমুদ্রের ঢেউ এবং বায়ূমণ্ডলের তুফানটিও শান্ত হয়ে গেল। তেলের এই (বৈজ্ঞানিক?) গুণের ফলে সমুদ্রেই মৃত্যু হওয়ায় তুফানটি আর কলকাতা পর্যন্ত পৌছাতে পারেনি। তুফান না হওয়ার রহস্য এ ভাবেই উন্মোচিত হয়ে গল্পের ইতি ঘটলো।

যদিও 'পলাতক তুফান'কেই ('অব্যক্ত' পৃ ৫৫) গল্পের চূড়ান্ত রূপ বলে বিবেচনা করতে হবে, গল্পের দুটি সংস্করণের তুলনা থেকে পরবর্তী অধ্যায়গুলোর আলোচনা বুঝতে সহায়ক হবে। তাই দুটোর পার্থক্যের মূল অংশগুলো নিচে তুলে ধরছি।

১।'নিরুদ্দেশের কাহিনী'র মূল গল্পে কিছু কিছু ইংরেজি শব্দ এবং পত্রিকার নাম রোমান হরফে লেখা হয়েছিল যা 'পলাতক তুফান'এ হয় তুলে দেয়া হয়েছে অথবা বাংলা অনুবাদ হিসেবে লেখা হয়েছে। যেমন, ইংরেজিতে Simla Meteorological Office কে বাংলায় সিমলা হাওয়া অফিস বলা হয়েছে। ভারত ও বিলাতের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম যেমন বিলাতের Nature, ফ্রান্সের La Nature, Scientific American, যুক্তরাষ্ট্রের Scientific American, এবং Reuter er Agent, Times, Pioneer, Civil and Military Gazette, Statesman, ইত্যাদি পত্র-পত্রিকার নাম দ্বিতীয় সংস্করণে বর্জন করে (নেচার ছাড়া) শুধু 'বৈজ্ঞানিক পত্রিকা' এবং 'কাগজ' লেখা হয়েছে। আগে যেসব ইংরেজি বাক্য রোমান হরফে লেখা হয়েছিল পরে সেগুলোর বাংলা অনুবাদ বাংলা হরফে লেখা হয়েছে। রোমান হরফে Ceylon, কে বাংলায় লঙ্কাদ্বীপ বলা হয়েছে।

২।'নিরুদ্দেশের কাহিনী'তে 'বাংলা গভর্ণমেন্ট হইতে ডায়মন্ড হারবারের Sub-Divisional Officer এর নিকট তারে খবর হইল Stop all outgoing vessels, এই সংবাদ মুহূর্তমধ্যে কলিকাতায় প্রচারিত হইল।' বাক্যটি 'পলাতক তুফান'এ বাদ দেয়া হয়েছে।

৩।'নিরুদ্দেশের কাহিনী'তে Reuter এর Agent, Times এ টেলিগ্রাম করিলেন –"দি Capital of our Indian empire in danger।" 'পলাতক তুফান'এ বাদ দেয়া হয়েছে।

৪।'নিরুদ্দেশের কাহিনী'তে 'কেহ কেহ বলিলেন যে সেই সময় ছোটলাট ডায়মণ্ডহারবার পরিদর্শন করিতে যান। তাহার দোর্দণ্ড প্রতাপে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায়। তাহার ভয়ে ঝড় পৃষ্ঠভঙ্গ দিয়েছে' বাক্যটি 'পলাতক তুফান'এ বাদ দেয়া হয়েছে।

উপরোক্ত যে বাক্যগুলো 'পলাতক তুফান'এ বাদ দেয়া হয়েছে বলে ২ থেকে ৪ ক্রমিক নম্বরে দেখানো হয়েছে, এর একটি রাজনৈতিক কারণ ছিল বলে সহজেই অনুমান করা যায়। গল্পটি কাল্পনিক এবং ব্যঙ্গাত্মক হওয়ার ফলে সরকারী-বেসরকারী কোনো প্রতিষ্ঠানই নিজেদেরকে হাস্যরসের শিকার হিসেবে দেখতে চাইবে না। তদুপরি সাবডিভিশনাল অফিসার এবং ছোটলাট শুধু ব্যক্তি বিশেষই নন, তাঁরা ছিলেন বাংলা তথা ভারতবর্ষের ভাগ্যবিধাতা ইংরেজ প্রভুদের জাত ও প্রচণ্ড ক্ষতার উৎস। তাদের অপমান করা মানে পুরো ইংরেজ শাসকদের অপমান করা। গল্পটি 'কুন্তলীন পুরষ্কার' নামের একটি অখ্যাত পুস্তিকায় প্রকাশিত হলেও সেটি কোনো ইংরেজ সাহেব বা তাদের অত্যুৎসাহী কোনো বাঙালি কর্মচারীর নজরে আসায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন, তেমন ধারণা করা আমাদের জন্য অযৌক্তিক নয়। সম্ভবতঃ সেই কারণে লেখক গল্পটির জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত ও উপভোগ্য ব্যাংগরসের দুটি বাক্য পরবর্তী সংস্করণে, অর্থাৎ 'পলাতক তুফান'-এ বাদ দিয়েছিলেন।

একই কারণে বিশ্ববিখ্যাত সংবাদ সংস্থা রয়টার এবং টাইমস এর উদ্ধৃতি দিয়ে পরিবেশিত সংবাদটিও পলাতক তুফান-এ বাদ দেয়া হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। গল্পটি যে কাল্পনিক ছিল, এ থেকে তা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৫।'নিরুদ্দেশের কাহিনী'তে 'এবার Oxford British Association Herr StÜrm, F.R.S., "On a Vanished Typhoon" সম্বন্ধে এক প্রবন্ধ পাঠ করিবেন। তাহা লইয়া বিশেষ আন্দোলন হইবার সম্ভাবনা' বাক্যদ্বয়ের পরিবর্তে 'পলাতক তুফান'এ 'এক অতি বিখ্যাত জার্মান অধ্যাপক পলাতক তুফান সম্বন্ধে অতি পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধ পাঠ করিয়া সমবেত বৈজ্ঞানিক মণ্ডলীর বিষ্ময় উৎপাদন করিয়াছিলেন' লেখা হয়েছে।
৬। শুধু তাই নয়, উপরোক্ত বাক্য প্রতিস্থাপনের পর 'পলাতক তুফান'এ বায়ূমণ্ডলের বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্বলিত নতুন দুইটি বিশাল অনুচ্ছেদ রসালোভাবে যোগ করা হয়েছে।
৭। 'নিরুদ্দেশের কাহিনী'তে 'তোমার ব্যাগে এক শিশি 'কুন্তল-কেশরী" দিয়াছি, জাহাজে প্রত্যহ ব্যবহার করিও, নতুবা নোনা জজ লাগিয়া এই দুই একটি দ্বীপের চিহ্নও থাকিবে না' উক্তিটির পর 'পলাতক তুফান'এ কুন্তল-কেশরী তেলের আবিষ্কার সম্পর্কে কৌতুকপূর্ণ এবং অবৈজ্ঞানিক কিন্তু বিনোদনমূলক এক বিশাল গল্পের অবতারণা করা হয়েছে।
৮। 'নিরুদ্দেশের কাহিনী'তে 'পাতালপুরী হইতে যেন রুদ্ধ দৈত্যগণ' এর বদলে দ্বিতীয় সংস্করণে 'কোথা হইতে যেন রুদ্ধ দৈত্যগণ' লেখা হয়েছে।
৯। 'নিরুদ্দেশের কাহিনী'র সর্বশেষ 'কত সহস্র সহস্র প্রাণী যে এই সামান্য এক বোতল কুন্তলীনের সাহায্যে অকাল মৃত্যু হইতে রক্ষা পাইয়াছে, কে তাহার সংখ্যা করিবে?' বাক্যটিতে 'কুন্তলীন' এর পরিবর্তে 'পলাতক তুফান'-এ 'তৈল' লেখা হয়েছে।
১০। 'নিরুদ্দেশের কাহিনী'তে গল্পের শেষে Scientific American ম্যাগাজিনের যে একটি প্যারাগ্রাফ ইংরেজি রোমান হরফে সংযোজিত করা হয়েছিল, 'পলাতক তুফান'-এ তা বাদ দেয়া হয়েছে।

ক্রমিক নম্বর ৫, ৭, এবং ১০-এ উল্লিখিত তথ্যগুলো নিয়ে নিচে, পলাতক তুফান' একটি স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গ বা হাস্যরসাত্মক গল্পঃ অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

'পলাতক তুফান' কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়
পাঠক, ওপরে বর্ণিত গল্পটিতে আপনারা কি কোনো ভবিষ্যতমুখিতার ইঙ্গিত পেয়েছেন? তেল দিয়ে তুফানের ধংসাত্বক ক্রিয়া বন্ধ করা থেকে লেখক কি ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন? স্মরণে রাখুন লেখক দেড়শ সোয়াশ বছর আগে শুধু তাঁর সময়ে নয়, আমাদের সময়ের বিচারেও একজন বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ছিলেন ও আছেন। তাঁর মতো লোক কি প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে জানা তেল ও পানির বিপরীত ধর্মকে পুঁজি করে ভয়ংকর সামুদ্রিক ঝড়কে আয়ত্বে আনার পরামর্শ দিতে পারেন? এতে তাঁর সারা জীবনে সঞ্চিত বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ধুলায় মিশে যাবে না? উত্তর হল, হ্যাঁ। বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে আমাদের সোজাসাপটা ও অপর্যাপ্ত জ্ঞানকে ব্যঙ্গ করতেই তিনি এমন অবৈজ্ঞানিক একটি সমাধান আমাদের দিয়েছেন। নিচের আলোচনায় তাই বোঝানোর চেষ্টা করেছি।

পুরো গল্পটির আবশ্যিক কাঠামোয় তখনকার জ্ঞানের বিচারে যাকে হয়তো বিজ্ঞান বলা যেতে পারে তা মাত্র তিনটি বাক্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ১, 'আধ ঘণ্টার মাঝে ব্যারোমিটার দুই ইঞ্চি নামিয়া গিয়াছে'। ২, 'একবার এক বৈজ্ঞানিক 'নেচার' কাগজে লিখিয়াছিলেন বটে; তাহাঁর থিওরি এই যে, অদৃশ্য ধুমকেতুর আকর্ষণে বায়ুমণ্ডল আকৃষ্ট হইয়া উর্ধে চলিয়া গিয়াছে'। এবং ৩, বৈজ্ঞানিক কাগজে ঢেউয়ের উপর তৈলের প্রভাব সম্প্রতি পড়িয়াছিলাম। তৈল যে চঞ্চল জলরাশিকে মসৃণ করে এ বিষয়ে অনেক ঘটনা মনে হইল'। কলকাতাবাসী তুফানটির কিছুই না জানার কারণ খুঁজতে গিয়ে এর বাইরেও জনৈক অধ্যাপকের বয়ানে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক, বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদান পদার্থের ধর্ম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু তাতে অতিরিক্ত কিছু হাস্যরস আনা ও কলেবর বৃদ্ধি ছাড়া গল্পের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। লেখকের ভাষায়, 'যদিও অধ্যাপক মহাশয় পদার্থ কেন পলায়ন করে না, এ সম্বন্ধে অকাট্য যুক্তি প্রয়োগ করিলেন,তথাপি তুফান কেন পলায়ন করিল, এ সম্বন্ধে কিছুই বলিলেন না'।

ব্যারোমিটারের পারদ বা অন্য কোনো তরল পদার্থের উঠানামায় বায়ুচাপ পরিবর্তিত হয় তা ঠিক এবং মাত্র দুই ঘণ্টায় দুই ইঞ্চি কমে যাওয়ার অর্থ শীঘ্রই তীব্র ঝড়ের পূর্বাভাষ। গল্পটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ই হচ্ছে ঝড় তুফান। কাজেই ব্যারোমিটারের সঠিক প্রয়োগে গল্পের গ্রহণযোগ্যতা ও শ্রীবৃদ্ধি দুইই হয়েছে। কিন্তু এতে কল্পনার কোনো রেশই নেই!
ধুমকেতুর আকর্ষণে 'বায়ুমণ্ডল'-এর উর্ধে চলে যাওয়ার কাল্পনিক যে তথ্যটি লেখক গল্পে এনেছেন তাতে অবিশ্বাস করার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা থেকে জানা যায় যে আমাদের নভোমণ্ডলে ধুমকেতুর সাথে দুর্যোগের সম্পর্ক নিয়ে কুসংস্কারের কথা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই জানা ছিল । তদুপরি গ্রহ-নক্ষত্র-ধুমকেতু-গ্রহাণুপুঞ্জের পারস্পরিক আকর্ষণের কথা কোপার্নিকাস, গ্যালেলিও ও নিউটনের আবিষ্কারের সূত্র থেকে জানা ছিল। বায়ু এবং বায়ুমণ্ডল যে বিভিন্ন পদার্থের সমষ্টি তা বিজ্ঞানের যে কোনো ছাত্রেরই জানা কথা। তাই ধুমকেতুর আকর্ষণে 'বায়ুমণ্ডল' (বায়ুমণ্ডল বলতে পৃথিবীপৃষ্ঠের চারিদিক ঘিরে রাখা পাঁচ মাইল উঁচু বায়বীয় আবরণকেই বুঝায়) উর্ধে চলে যাওয়ার বক্তব্যটি নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পনা না হলেও সাধারণ পাঠকের কানে অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য শোনায়। এই বক্তব্যের ভেতর দিয়ে লেখক যে তাঁর গল্পে হাস্যরস আনার চেষ্টা করেছেন আমার তাতে সন্দেহ নেই কারণ অক্সিজেনে শ্বাস নেওয়া কোনো প্রাণীরই'বায়ুমণ্ডল'-শুণ্য পৃথিবীতে কয়েক সেকেন্ডও বেঁচে থাকার কথা নয়। এবং এই জ্ঞানটি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর ছিলো না, তা কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবেন না। পাঠককে হাসানোর জন্যই তিনি বেনামী বিজ্ঞানী নামে তা বলেছেন।

সবশেষে 'তৈল যে জলরাশিকে মসৃণ করে' অর্থাৎ পানির ঢেউকে নিবারণ করে, প্রাচীনকাল থেকেই তা মানুষের জানা ছিল। আজ থেকে দুই হাজার বছর পূর্বে, খৃস্টিয় প্রথম শতকে সেইন্ট পল প্যালেস্টাইন থেকে রোমের পথে যাত্রা করে সমুদ্রের বিশাল ঢেউ থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন জাহাজ থেকে তেল পানিতে ঢেলে দিয়ে১০। ঘটনাটিকে তখনকার বিজ্ঞানীরা তো নয়ই, সাধারণ মানুষই বিশ্বাস করতে পারেনি। ফলে সেটি একটি গুজব বলেই ধরে নেয়া হয়েছিল। এরপর থেকে বহু নাবিক তীরে ফিরে একই পন্থা অবলম্বন করে উত্তাল ঢেউ থেকে প্রাণ বাচিয়েছিলেন বললেও কেউ তা বিশ্বাস করত না। কিন্তু ১৭৭৪ সালেই মার্কিন বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন বিলাতে বসে তেল -পানি ও বাতাসের এই ধর্ম নিয়ে গবেষণা করেছিলেন বলে সাম্প্রতিক এক গবেষকের উদ্ধৃতি থেকে জানতে পারি ১১। তাছাড়া কল্পবিজ্ঞান লেখক জুলেস ভার্ণ ১৮৮২ সালে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত তার 'ডিক স্যান্ডস অ্যান্ড দি বয় ক্যাপ্টেইন' নামক বইতে পাহাড়সম ঢেউ থেকে বাঁচতে তেলের এই মাহাত্ম্যটিকে ঠিকই ব্যবহার করেছিলেন (পৃঃ ১৩৫)১২। তদুপরি এ রকম বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা এবং তেলের বিবরণ উল্লেখ করে ১৮৮৬ সালে পুরো একটি বইও প্রকাশিত হয়েছিল বলে জানা যায়১৩। তেলের ঢেউ-বিধ্বংসী এতো গল্প শুনে শুনেই এর একটি নবতর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বুরো অব নেভিগেশন ১৮৮৬ সালে ঘটনাগুলোর একটি ছক প্রকাশ করে১৩। জগদীশচন্দ্র বসু সম্ভবতঃ তেমন একটি সংবাদের ভিত্তিতেই দশ বছর পরের গল্পটিতে লিখেছেন 'বৈজ্ঞানিক কাগজে ঢেউয়ের উপর তেলের প্রভাব সম্প্রতি পড়িয়াছিলাম। তৈল যে চঞ্চল জলরাশিকে মসৃণ করে এ বিষয়ে অনেক ঘটনা মনে হইল'।

এখন আমরা ঢেউকে মসৃণ করার বৈজ্ঞানিক কারণটি জানি কিন্তু সেটি এই আলোচনায় কোনো কাজে আসবে না বলে এক্ষণে নয়, এই অধ্যায়ের শেষে বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা এও জানি যে খনিজ, মৎস্য অথবা উদ্ভিদ উৎসের ওপর নির্ভর করে তেলের গুণাগুণের তারতম্য হয়। দুই চা-চামচ পরিমাণ ভোজ্য তেল এক একর জলরাশির ওপর অবস্থান করে জলের ঢেউকে শান্ত করে দিতে পারে১৪। উদ্ভিদজাত ভোজ্যতেল ছাড়াও পিপা ভর্তি তিমি মাছের তেলও একই কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু একই ফল পাওয়া গেলেও পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে কেউ খনিজ তেল বা পেট্রোলিয়াম ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায় না ১৫। এতোসব জানা থাকলেও তেলের মূল্য এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা বিবেচনা মাথায় রেখে কোনো বিজ্ঞানী, রাজা-মহারাজা বা বন্দর-রক্ষকই সমুদ্রে তেল ঢেলে ঝড় নিবারণের পথ তখনও বাতলে দেননি, এখনও দেন না।

জগদীশচন্দ্র বসুর কুন্তলীন তেলের শিশিটি কতোবড় ছিলো তা আমাদের জানা নেই। সেটিকে যদি আজকের একটি ১-লিটার বোতলও ধরি তবে তার ধারণ ক্ষমতা ছিল ১০৫ চা-চামচেরও কম পরিমাণ তেল। অর্থাৎ সেই তেল দিয়ে তিনি সমুদ্রের মাত্র ৫২ একর, যা অর্ধ বর্গকিলোমিটারেরও কম, জলরাশির উপরিভাগ ঢেকে দিতে পেরেছিলেন। তিন দিন সমুদ্রযাত্রার পর তেল ফেলে তিনি তুফানটি বন্ধ করতে পেরেছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সর্বোচ্চ প্রায় অর্ধ বর্গকিলোমিটার জলরাশির ঢেউকে শান্ত করে তিনি কি বঙ্গোপসাগরের প্রায় সাড়ে আট লক্ষ বর্গ কিলোমিটার (বঙ্গোপসাগরের আয়তন) জলরাশির তাণ্ডবকে পরাস্ত করেছিলেন? আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর মতো প্রথিতযশা পদার্থবিদের পক্ষে এই সহজ অংকের হিসাবটা নিশ্চয়ই খুব কঠিন কিছু ছিল না। গল্পে শুধুমাত্র হাস্যরস আনার জন্যেই অংকের এই অমিলটা মাথায় রেখেই তিনি তেল ও পানির সম্পর্কের পুরনো এই জ্ঞানটাকে কাজে লাগিয়েছিলেন, এটিই সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হওয়া উচিৎ।
আবহাওয়া অফিসের বিশেষ কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বিফলে গেলে বিজ্ঞানী মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল কিনা জানি না, জানার প্রয়োজনও নেই। আবহাওয়ার পূর্বাভাস করা হয় কিছুটা বৈজ্ঞানিক মাপজোখ, কিছুটা ঐতিহাসিক তথ্য, এবং কিছুটা অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বছর তিরিশ আগেও বাংলাদেশেতো বটেই, এই খোদ আমেরিকাতেও আবহাওয়ার পূর্বাভাষকে যাদুকরের ভেল্কিবাজি বলে মস্করা করা হতো। বর্তমানে এটি অনেক বিজ্ঞান সম্মত হওয়ায় পূর্বাভাসটিও প্রায় ক্ষেত্রেই সঠিক প্রমাণিত হলেও মাঝে মাঝে পূর্বাভাস অনুযায়ী কিছুই ঘটে না। আর এর কারণ খুঁজতে বিজ্ঞানীদের অহেতুক পেরেশানী করতে হয় বলে শুনিনি! অথচ তিনি লিখেছেন 'এখনও এ বিষয় লইয়া বৈজ্ঞানিক জগতে ঘোরতর আন্দোলন চলিতেছে' (পৃ ৫৭, অব্যাক্ত)। গল্পে হাস্যরসের প্রয়োজনেই তিনি নিজ পেশাগত গোত্রকে নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন।

সর্বোপরি বিজ্ঞান বা এর প্রয়োগ সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য যে তিনটি তথ্য তিনি দিয়েছেন তার কোনোটিই নতুন, কাল্পনিক বা নিজস্ব ছিল না, ছিলো না ভবিষ্যৎমুখী। ব্যারোমিটার আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৬৪৩ সালে ইতালীতে, ভারতবর্ষেও অন্ততঃ ১৮৭৬ এর আগেই এর ব্যাপক ব্যবহার ছিল ১৬। ধুমকেতুর ধ্বংসাত্বক ক্ষমতা নিয়ে মানুষের অহেতুক ভয় এবং তেল-পানির বিপরীত ধর্মের (১০-১৫) জ্ঞানও আমাদের অতি প্রাচীন। ফলে কল্পবিজ্ঞান সংজ্ঞার পূর্বে উল্লিখিত তিনটি শর্তের একটি, প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তথ্য ব্যবহার করেও গল্পটিতে বিজ্ঞানের প্রাগ্রসরতায় কল্পনার অভাব রয়েছে। এবং সর্বোপরি কল্পবিজ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, ভবিষ্যতমুখীতার অভাবেও গল্পটিকে কল্পবিজ্ঞান আখ্যায়িত করতে আমার ঘোরতর আপত্তি আছে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি বচনে প্রচ্ছন্নভাবে ব্যঙ্গ ও হাস্যরসাত্মক উক্তির উপস্থিতিতে 'পলাতক তুফান' গল্পটিকে নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষার একটি প্রথম কাতারের হাস্যরস বা ব্যঙ্গাত্মক শ্রেণিভুক্ত রচনা বলে বিবেচনা করি।

'নিরুদ্দেশের কাহিনী' গল্পের শেষে পুনশ্চে কলকাতাবাসী প্রস্তাবিত তুফানটি থেকে কীভাবে রক্ষা পেলো এর কারণ হিসাবে বিশ্ববিখ্যাত সাইন্টিফিক আমেরিকান পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ইংরেজিতে একটি অনুচ্ছেদ ছাপা হয়েছে। বিজ্ঞানকে ভয় পাওয়া পাঠক ইংরেজিতে সাইন্টিফিক আমেরিকান এর লেখা দেখে কিন্তু না পড়েই, অতি সহজে ব্যাপারটিকে বৈজ্ঞানিক বলে ধরে নেবেন। কিন্তু ধৈর্য ধরে পড়তে গেলেই দেখতে পাবেন যে মূল গল্পের মতোই এটি একটি রম্য-রচনা। তাতে সামুদ্রিক ঝড় নিয়ন্ত্রণে 'কুন্তলীন' তেলের উপযোগীতা বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে এই গল্পটি জগদীশচন্দ্র বসু লিখেছিলেন তখনকার বাজারে প্রচলিত 'কুন্তলীন' তেলের প্রচারণায় ব্যবহারের জন্য এক রচনা প্রতিযোগীতায়। গল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্যই যে তা করা হয়েছে যে কোনো অনুসন্ধিৎসু পাঠকের দৃষ্টি এড়াতে পারে না। সাইন্টিফিক আমেরিকান পত্রিকার ইংরেজি অনুচ্ছেদটি যে আগের দুই পর্বে বাংলায় লিখিত ব্যঙ্গ বা রম্যরচনার বিজ্ঞান অংশের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গল্পটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে লেখক চাতুর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তাতে কৌতুক থাকলেও পাঠকের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা এনে গল্পটির সাহিত্য মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সাময়িকীর উদ্ধৃতি দিয়ে তৎকালীন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আকারে কিছু প্রকাশ করা পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। এছাড়া বিরাগভাজন হওয়া সহ বৈজ্ঞানিক সাময়িকীটির মামলারও বাদী হয়ে যেতে পারেন, তা মাথায় রেখেই পরবর্তীতে জগদীশচন্দ্র বসু এই অনুচ্ছেদটি 'পলাতক তুফান' থেকে বাদ দিয়েছিলেন বলে আমার বিশ্বাস।


আরেকটি ব্যাপার এখানে পুনরুল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। তেল ঢেলে সাগরের পানির ঢেউকে শান্ত করার গল্পের ধারণাটি কোনোভাবেই জগদীশচন্দ্র বসুর একান্ত নিজস্ব ছিল না। তার গল্পটি প্রকাশের ১৪ বছর আগে ১৮৮২ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক জুল ভার্ণ এর ২৭৫ পৃষ্ঠার 'ডিক স্যান্ডসঃ দি বয় কেপ্টেইন' উপন্যাসের ১৩ ১৩৫ নম্বর পৃষ্ঠার কয়েকটি বাক্য লক্ষ করুন: …the sea was furious, and dashed vehemently upon the crags on either hand. "Now my lads!", he cried to his crew, "now's your time, out with your oil! Let it run. Ready for the order, the negroes poured out the oil, and the raging waters were stilled as if by magic". (সাগরটি ছিল ক্রুদ্ধ, এবং দুই পাশের প্রস্তরখণ্ডে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছিল। শোনো বালকগণ, তিনি (ক্যাপ্টেন) তার খালাসীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেন, "এখনই তেল ঢালার মোক্ষম সময়, তোমাদের তেল ছেড়ে দাও"। হুকুম পালনে প্রস্তুত নিগ্রো (খালাসী)রা তেল ঢেলে দিল, এবং গর্জাতে থাকা পানির ঢেউ শান্ত হয়ে গেল, যেন ইন্দ্রজালের ন্যায়।) পাঠক এবার এই বাক্যগুলোর সাথে ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত 'পলাতক তুফান' গল্পে সমুদ্রের বুকে 'সাক্ষাৎ কৃতান্ত সম পর্বতপ্রমাণ ফেনিল এক মহা উর্মি'র দিকে তেলের শিশিটি ছুড়ে দেয়ার পরের বাক্যটির তুলনা করুনঃ 'আমি জীব আশা পরিহারি সমুদ্র লক্ষ করিয়া কুন্তলীন বাণ নিক্ষেপ করিলাম। ছিপি খুলিয়া সমুদ্রে নিক্ষেপ করিয়াছিলাম, মুহূর্ত মধ্যে তৈল সমুদ্রে ব্যাপ্ত হইয়াছিল। ইন্দ্রজালের প্রভাবের ন্যায় মুহূর্ত মধ্যে প্রশান্ত মূর্তি ধারণ করিল'।
সবশেষে যে যুক্তিতে 'পলাতক তুফান'কে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কল্পবিজ্ঞান বলে বিবেচনা করা হয়, সে সম্পর্কে কয়েকটি মন্তব্য করা প্রয়োজন।

বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক ও গবেষক সিদ্ধার্থ ঘোষ ১৯৮৯ সালে তার 'বাংলা সাইন্স ফিকশনের ঐতিহ্য' প্রবন্ধের শুরুতেই গল্পটিকে 'একটি অনবদ্য এস এফ কাহিনী' বলে আখ্যায়িত করেছেন (পৃ ১৫৮,)। অথচ কি কারণে সেটি 'অনবদ্য' বা কি কারণে 'এস এফ', গল্পের বিষয় থেকে দুই অনুচ্ছেদের আলোচনায় তার কিছুই তিনি উল্লেখ করেন নি! তিনি যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন, তা হচ্ছে 'নিরুদ্দেশের কাহিনী' গল্পের উপশিরোনাম বা সাবটাইটেল হিসেবে ব্যবহৃত 'বৈজ্ঞানিক রহস্য' শব্দগুচ্ছে। সিদ্ধার্থ ঘোষের ভাষায় 'সায়েন্স-এর সাথে ফিকশন বা ফ্যান্টাসিকে যুক্ত করে জোড়-কলম শব্দ দুটি ইংরেজিতে আবির্ভূত হওয়ার বহু পূর্বেই জগদীশচন্দ্র স্বাধীন ও সচেতনভাবে এই বাংলা পরিভাষা নির্মাণ করেছেন। সায়েন্স ফিকশনের বাংলা পরিভাষা কি হবে, বিজ্ঞান-ভিত্তিক গল্প না কল্পবিজ্ঞানের গল্প অথবা এই দুই প্রতিশব্দের এক্তিয়ার সংক্রান্ত বিতর্কের নিস্পত্তি ঘটাতে পারে 'বৈজ্ঞানিক রহস্য'। এই আলোচনা থেকে বোঝা যায় শ্রীসিদ্ধার্থ ঘোষ গল্পের বিষয়বস্তু নয়, তাঁর কথিত, জগদীশচন্দ্র বসু ব্যবহৃত উপশিরোনামের ওপর ভিত্তি করেই গল্পটিকে কল্পবিজ্ঞান বলে ধরে নিয়েছেন। দূর্ভাগ্যবশতঃ দে'জ পাবলিশার্স এর পূনর্মূদ্রিত 'অব্যক্ত নামে বইয়ের যে পিডিএফ কপিটি আমার হাতে আছে, তাতে 'নিরুদ্দেশের কাহিনী' গল্পের কোনো উপশিরোনাম নেই
তেল দিয়ে তুফান নিবারণের বৈজ্ঞানিক কোনো কারণ জগদীশচন্দ্র বসু নিজে না দিলেও কোনো কোনো আলোচক তেল ও পানির 'পৃষ্ঠটান' বা 'সারফেস টেনশন' ধর্মের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন (১, ৪)। গল্পটিকে কল্পবিজ্ঞান এর আওতায় আনার যুক্তি হিসেবেই তাঁরা তা করেছেন। অথচ জগদীশচন্দ্র বসু গল্পের প্রথম পর্বে জার্মান অধ্যাপকের বক্তৃতার সূত্র ধরে তেল ও পানি মিশ্রণ না হওয়ার কারণ হিসেবে দুটোর 'আপেক্ষিক গুরুত্ব' বা 'স্পেসিফিক গ্রাভিটি' ধর্মের পার্থক্যের কথা বলেছেন (পৃ ৫৭, অব্যাক্ত) । কিন্তু তেল দিয়ে তুফান নিবারণের সহায়ক হিসেবে কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ বা ব্যাখ্যার কথা গল্পের কোথাও উল্লেখ করেননি। তাতে ব্যঙ্গ বা হাস্যরসাত্মক সৃষ্টিতে গল্পটির কোনো অঙ্গহানি হয়েছে বলে মনে হয় না।

গল্পের প্রয়োজন না হলেও প্রাসঙ্গিক অনুসন্ধিৎসার খাতিরে বর্তমানে বহুল-স্বীকৃত রাসায়নিক এবং ভৌত-বৈজ্ঞানিক কারণ দুটি এখানে উল্লেখ করছি। এক বাক্যে রাসায়নিক কারণটি হলো, তেল একটি পর্দার মতো কাজ করে পানি ও বাতাসের পারস্পরিক আকর্ষণকে বাধাগ্রস্ত করার ফলে পানির ঢেউ স্তিমিত হয়ে পড়ে১৪। বিষদভাবে ব্যাখা করলে বলতে হয় যে, পানি ও বাতাসের উপাদানে (চার্জড পার্টিকেল অর্থাৎ পানির ধনাত্বক প্রোটোন-হ্যড্রোজেন এবং বাতাসের ঋণাত্বক-অক্সিজেন) পরস্পরকে আকর্ষণ করার গুণাগুণ আছে। এই আকর্ষণের ফলে বাতাস পানিকে টেনে শুণ্যে তুলে নিতে চায়। পানি বেশি উপরে উঠে গেলে পানি-বাতাসের আকর্ষণ দূর্বল হয়ে যাওয়াতে পানি সাগরের বুকে ফিরে আসে। বারবার এই ঘটনা ঘটতে থাকলে পানিতে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। ঢেউ পানিতে আছড়ে পড়লে পরবর্তী ঢেউয়ের উচ্চতা বাড়তে থাকে। ঢেউ বাড়লে সগরের বুকে নৌকা বা জাহাজ দুলতে থাকে কিন্তু বাতাসের বেগের কোনো তারতম্য হয় না।
এখন তেল যে পানিতে মিশ খায় না, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই তা ছেলেবুড়ো সবাই জানেন। বৈজ্ঞানিক কারণটি হচ্ছে তেলের অণুতে পানি বা বাতাসকে আকর্ষণ করার অংশ অতি সামান্য। তেলের অণুর দুটি অংশ থাকে, ক্ষুদ্রতর মাথাসম অংশটি পানিকে আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু এর চেয়ে অনেক, অনেক বড় লেজসম অংশটুকু পানিকে তীব্রভাবে বিকর্ষণ করে। ফলে সেই সামান্য অংশের মাথাটি পানিতে ডুবিয়ে সে বৃহত্তর লেজটি উপরে বাতাসের দিকে উঁচিয়ে রাখে, হাঁস যেমন লেজ উঁচিয়ে মাথাটি পানির নিচে রেখে খাবারের সন্ধান করে, ঠিক তেমনি ভাবে। তেল পানির ওপর এভাবে নিশ্ছিদ্র চাদরের একটি পাতলা স্তর সৃষ্টি করে পানিকে ঢেকে দেবার ফলে বাতাস পানিকে স্পর্শ করতে পারে না। ফলে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় না১৪

১৫ বছর আগে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তেল ঢেউকে স্তিমিত করার ভৌত-বৈজ্ঞানিক কারণটি ব্যাখ্যা করেছেন১৭। তাঁদের ব্যাখ্যা হলো পানিতে তেলের 'তল-স্থিতিস্থাপকতা' বা 'সারফেস ইলাসটিসিটি' কমে গিয়ে 'ঢেউয়ের শক্তি' বা 'ওয়েভ এনার্জি' দূরীভূত হয় বলেই ঢেউ স্তিমিত হয়ে যায়। তাঁরা আরো দেখিয়েছেন যে, উপরে উল্লিখিত 'পৃষ্ঠটান' বা 'সারফেস টেনশন' এবং 'আপেক্ষিক গুরুত্ব' বা 'স্পেসিফিক গ্রাভিটি' ঢেউকে শান্ত করার বিশেষ কোনোই অবদান রাখে না১৭

'পলাতক তুফান' একটি স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গ বা হাস্যরসাত্মক গল্প। গল্পটিতে ব্যারোমিটার নামে একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ব্যবহারের কথা উল্লেখ করলেও 'নিরুদ্দেশের কাহিনী' তখনকার শিক্ষত সমাজ, বুদ্ধিজীবী, ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের বিজ্ঞান সম্পর্কে ভ্রান্ত ও অপ্রতুল জ্ঞানকে ব্যঙ্গ করেই লেখা হয়েছিলো বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তখনকার বিবেচনায় আমরা যদি ব্যারমিটারের ব্যবহার, ধুমকেতুর আকর্ষণে বায়ূমণ্ডলের উধাও হওয়া এবং তেল দ্বারা পানির ঢেউকে মসৃণ করার বিষগুলোকে বৈজ্ঞানিক বলে ধরেও নেই, গল্পটি পড়লে দেখা যায় লাইনে লাইনে না হলেও এর পরতে পরতে ও পাতায় পাতায় কৌতুক, ব্যাঙ্গরস ও হাস্যরসের ছড়াছড়ি। বিজ্ঞানের বিষয়কে ভিত্তি করে তার পূর্বেও বাংলা ভাষায় অন্তত আরো দুটি ব্যঙ্গ ও হাস্যরসাত্মক গল্পের কথা আমরা জানি। কিন্তু কাহিনীর বিন্যাশ, ভাষা ও বর্ণনার চাতুর্য্যে 'পলাতক তুফান' সেগুলোর চেয়ে অনেক, অনেক উচ্চে। গল্পটিকে তাই আমি একটি অতি উন্নতমানের বিনোদনমূলক বা হাস্যরসাত্মক গল্প বলেই বিবেচনা করি।

'পলাতক তুফান' গল্পের শুরুতেই'কয়েক বৎসর পূর্বে এক অত্যাশ্চার্য ভৌতিক কাণ্ড ঘটিয়াছিল' বাক্যটি দ্বারা লেখক তার পাঠককে এক অজানা রহস্য রসে নিমজ্জিত করে ফেলেন। একটি বিশেষ দিনে ও সময়ে বৃটিশ ভারতের রাজধানী কোলকাতা প্রচণ্ড সামুদ্রিক ঝড়ে তলিয়ে যাবে বলে সরকার থেকে প্রচার চালানো হয়। কিন্তু সবাই প্রস্তুত হয়ে থাকলেও সেদিন কিছুই ঘটলো না। পূর্বাভাষটি ফলপ্রসু না হওয়াতেই এই কল্পকাহিনীর অবতারণা।

প্রথমেই 'ঝড়টি কোন দিকে গিয়াছে তাহার অনুসন্ধানের জন্য দিক দিগান্তরে লোক প্রেরিত হইল, কিন্তু তাহার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না'। এই বাক্যটির মাঝেও একটি প্রচ্ছন্ন কৌতুকের আভাষ পাওয়া যায়, কারণ মোকাবেলা করতে প্রস্তুত হয়ে থাকা অঘটনটি না ঘটলে মানুষ সাধারণতঃ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। অথচ তা না করে ঝড়টিকে খুঁজে বের করার জন্য দিক দিগান্তরে লোক পাঠানো হল!

আগের অধ্যায়ে যেমন বলা হয়াছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস করা হয় কিছুটা বৈজ্ঞানিক মাপজোখ, কিছুটা ঐতিহাসিক তথ্য, এবং কিছুটা অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বছর ত্রিশেক আগেও বাংলাদেশেতো বটেই, এই খোদ আমেরিকাতেও আবহাওয়ার পূর্বাভাষকে যাদুকরের ভেল্কিবাজিই মনে করা হতো।

পত্রপত্রিকাগুলো ছিল বিজ্ঞানের এই সীমাবদ্ধতা বুঝতে অনিচ্ছুক। ধারণা করা যায় তারা আবহাওয়া অপিসের কোনো যুক্তিই আমলে না নেয়ায় প্রধান ইংরেজি পত্রিকা 'এত দিনে বুঝা গেল যে বিজ্ঞান সর্বৈব মিথ্যা' বলে সম্পাদকীয় মন্তব্য করে বসল! এরপর অন্যরা লিখলো 'যদি তাহাই হয়, তবে গরীব ট্যাক্সদাতাদিগকে পীড়ন করিয়া হাওয়া অফিসের অকর্মণ্য অফিস রাখিয়া লাভ কি? তখন 'বিবিধ সংবাদপত্র তারস্বরে বলিয়া উঠিলেন 'উঠাইয়া দেও'। এই উক্তিগুলি দ্বারা বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের তথাকথিত শিক্ষত সমাজের অপ্রতুল জ্ঞান অথবা অবজ্ঞাকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে।
তীব্র সমালোচনার মুখে বিজ্ঞানে আরো অনভিজ্ঞ সরকার দেখলো বিপদ! তারাও বুঝলো, তাইতো! আবহাওয়া অপিস সম্প্রতি ব্যারোমিটার থার্মোমিটার কিনতে 'লক্ষাধিক টাকা'র শ্রাদ্ধ কেন করা হলো, সেই প্রশ্ন এসে গেল। অপ্রয়োজনীয় এই যন্ত্রগুলো এখন 'ভাঙা শিশি বোতলের মূল্যেও বিক্রয় হইবে না'। এখানে লক্ষ টাকার জিনিসকে ভাঙা শিশি বোতলের সাথে তুলনা করে আগেকার ব্যাঙ্গোক্তিকে হাস্যরসে পরিণত করা হল। এখন সমালোচনা থেকে উদ্ধার পেতে সরকার কলকাতা মেডিক্যাল কলেজকে অনুরোধ করল আবহাওয়া অপিসের ব্যরোমিটারটি দিয়ে বায়ূচাপের সাথে মানুষের রক্তচাপের সম্পর্ক খুঁজে দেখতে এক অধ্যাপক নিয়োগ করতে। উল্লেক্ষ্য, ব্যারোমিটার হচ্ছে বাতাস বা আবহাওয়ার চাপ নির্ণায়ক যন্ত্র। পাঠক লক্ষ করুন, বায়ূচাপের সাথে রক্তচাপের কিছুটা যোগসূত্র থাকলেও প্রস্তাবটি যে হায়কর, তা বুঝতে কারো উচ্চশিক্ষিত হবার প্রয়োজন পড়ে না! অথচ রাষ্ট্র চালকরা তাই করলেন। এখানে রাষ্ট্রের বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞানকে কটাক্ষ বা ব্যঙ্গ করা হলো।

এবার বিজ্ঞান সম্পর্কে উচ্চশিক্ষিতের সীমাবদ্ধতা বোঝাতে এবং/অথবা সরকারকে আরো কটাক্ষ করতে কলেজের প্রিন্সিপালের উত্তরটি শোনা যাক। প্রথমে কলকাতার মানুষ কী কী ধরণের চাপের ভেতরে আছে তা বোঝাতে তিনি একটি কৌতুকপূর্ণ ছক বানালেন। সেই ছকে বায়ূচাপের সাথে তুলনা করে আরো লিখলেন যে কলকাতাবাসীরা এমনিতেই বিভিন্ন দ্রব্যমূল্য, রোগশোক, এবং একাধিক ট্যাক্সের বোঝার চাপের মধ্যে আছে। ব্যারোমিটার চালানোর জন্য প্রস্তাবিত অধ্যাপকের নিয়োগ 'বায়ূর দুই-এক ইঞ্চি চাপের ইতর-বৃদ্ধি 'বোঝার ওপর শাকের আটি' স্বরূপ হইবে'! প্রিন্সিপাল এভাবে সরকারকে শুধু ভর্ৎসনাই করলেন না, ব্যারোমিটার সম্পর্কে নির্বোধের মতো উক্তি সহ তিনি তখনকার উচ্চশিক্ষিতদের বিজ্ঞান জ্ঞানের একটি চিত্র তুলে ধরেছিলেন। তখনকার যুগে যেমন সত্যি ছিল, এখনও আমরা জানি যে বায়ূচাপ দুই ইঞ্চি কমে যাওয়া অর্থ হচ্ছে মহা প্রলয়ের পূর্বাভাষ! অথচ তিনি এটিকে 'ইতর-বৃদ্ধি' বলছেন! তিনি আরো লিখলেন 'তবে সিমলা পাহাড়ে (আবহাওয়া অপিস) বায়ূর চাপ ও অন্যান্য চাপ অপেক্ষাকৃত কম। সেখানে উক্ত অধ্যাপক নিযুক্ত হইলে বিশেষ উপকার দর্শিতে পারে'। (পাঠক লক্ষ করুন যে প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজ প্রিন্সিপাল আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর নিজ উদ্যোগ, খরচ ও প্রচেষ্টায় বিজ্ঞান সাধনার প্রধান অন্তরায় হয়েছিলেন।)

এরপর 'কোনো অদৃশ্য ধুমকেতুর আকর্ষণে বায়ুমণ্ডল (অর্থাৎ ঝড় – লেখক) আকৃষ্ট হইয়া উর্ধে চলিয়া গিয়াছে' বলে অভিমত বিলাতের বিখ্যাত 'নেচার' বিজ্ঞান সাময়িকীতে ব্যক্ত হলেও তা অনুমান নির্ভর বলেই বিবেচিত হল। পাঠক লক্ষ করুন ধুমকেতু যে গ্রহ বা গ্রহাণুকে আকর্ষণ পূর্বক ধ্বংস করে পৃথিবীতে বিপর্যয় আনতে পারে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ এমন কুসংসারে বিশ্বাস করতো। এমন একটি 'বৈজ্ঞানিক কারণ' যে 'নেচার' এর মতো নামীদামী বিজ্ঞান সাময়িকী কখনোই থিওরি হিসেবে লিখবে না তা বলাই বাহুল্য। গল্পে আরেকটি হাস্যরস আনার জন্যই এই দাবি করা হয়েছে। পরের বাক্যেই 'এসব অনুমান মাত্র। এখনও এবিষয় লইয়া বৈজ্ঞানিক জগতে ঘোরতর আন্দোলন চলিতেছে' লিখে তা শুধরেও দেয়া হয়েছে। পাঠক লক্ষ্য করুন কোনো বিতর্কিত বিষয় নিয়ে বিজ্ঞানীরা কখনো 'ঘোরতর আন্দোলন'এ লিপ্ত হন না। গল্পে রস সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই লেখ এই শব্দ দুটোর ব্যবহার করেছেন।

'পলাতক তুফান'টির সন্ধান পেতে আরো অনেক বৈজ্ঞানিক কারণ খোঁজা হলো যদিও এর কোনোটিই সমস্যার কোনো সুরাহা করতে পারল না। বিলাতে এক সম্মেলনে দীর্ঘ বক্তব্যদাতা কিন্তু গ্রহণযোগ্য কোন সিদ্ধান্তে আসতে না পারা বিজ্ঞানীকে ব্যাঙ্গাত্বকভাবে চিহ্নিত করেছেন এভাবেঃ 'এক অতি বিখ্যাত জার্মান অধ্যাপক 'পলাতক তুফান সম্বন্ধে অতি পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধ পাঠ করিয়া সমবেত বৈজ্ঞানিকমণ্ডলীর বিষ্ময় উৎপাদন করিয়াছিলেন'। এই বাক্যটির প্রথমাংশ এক অতি বিখ্যাত জার্মান অধ্যাপক টি পূর্বেকার 'নিরুদ্দেশের কাহিনী'তে জার্মান ভাষায় Herr StÜrm, F.R.S বলা হয়েছে। পাঠক লক্ষ করুন, জার্মান ভাষায় Herr শব্দটি ইংরেজিতে মিস্টার বা লর্ড, বা বাংলায় নেতা, এর সমকক্ষ। পরের জার্মান StÜrm শব্দটি ইংরেজি 'স্টর্ম' বা বাংলায় 'তুফান' অর্থ বোঝায়। ইংরেজি ভাষায় স্যার এর উচ্চারণ এবং জার্মান ভাষায় হার এর উচ্চারণের মূল পার্থক্য হলো' স' এবং 'হ'-তে। পাঠক লক্ষ করুন, বাংলাদেশে অঞ্চলের ভেদাভেদে অনেক ক্ষেত্রেই 'স'-কে 'হ' উচ্চারণ করা হয়। যেমন ঢাকাইয়া এবং বাউওনবাইড়ার (ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়) 'সকল' (বা সক্কল)কে 'হজ্ঞল' বলা হয়! 'নিরুদ্দেশের কাহিনী'তে পুরো বাক্যটি 'এবার Oxford British Association Herr StÜrm, F.R.S., "On a Vanished Typhoon" সম্বন্ধে এক প্রবন্ধ পাঠ করিবেন' লেখা হয়েছিল। পুরো বাক্যটির অর্থ হচ্ছে এবার অক্সফোর্ড বৃটিশ এসোসিয়েশনে জনাব তুফান এফ আর এস একটি 'পলাতক তুফান' সম্বন্ধে প্রবন্ধ পাঠ করবেন। এখানে লেখক শব্দের খেলা, ইংরেজিতে যাকে এনাগ্রাম বলা হয়, তা প্রয়োগ করে গল্পটিকে আরো রসাত্মক করার চেষ্টা করেছিলেন। বাংলা ভাষার পাঠকরা জার্মান ভাষার এই শব্দগুলো অর্থ না জানায় বাক্যটির রসবঞ্চিত ছিলেন বলেই লেখক 'পলাতক তুফান'এ বাক্যটি পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
এরপর সেই কল্পিত অধ্যাপকের বক্তৃতায় বায়ু এবং তার উপাদানগুলো যেমন অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, ইত্যাদির ভৌতিক ধর্ম আলোচনাকালে প্রচলিত সামাজিক আচার নিয়ে বেশ কিছু হাস্যরসাত্মক মন্তব্য করা হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আমি এখানে শুধু হাস্যরসাত্মক মন্তব্য বা উক্তিগুলো এখানে উল্লেখ করছি। বস্তুর ভর বা ওজনে পার্থক্য বোঝাতে 'লঘু, 'গুরু', এবং 'আপেক্ষিক গুরুত্ব (স্পেসিফিক গ্রাভিটি)র ব্যবহার নিয়ে তিনি হাস্যরসের মাধ্যমে উপরে উল্লিখিত 'শব্দের খেলা' বা ইংরেজিতে যাকে বলে 'এনাগ্রাম' এর আশ্রয় নিয়েছেন। ১) আপেক্ষিক গুরুত্ব সম্পর্কে যে বৈজ্ঞানিক সত্য বর্ণিত হইল তাহা যে পৃথিবীর সর্বস্থানে প্রযোজ্য, এ সম্বন্ধে সন্দেহ আছে; কারণ ইণ্ডিয়া নামক দেশে যদিও পুরুষ জাতি গুরু (শ্রেষ্ঠ অর্থে) তথাপি তাঁহারা উন্মুক্ত (হালকা এবং সমাজে স্বাধীনতা অর্থে) আর লঘু (মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অর্থে) স্ত্রীজাতিই সে দেশে আবদ্ধ (পরাধীনতা অর্থে)'। ২) একই ভাবে পদার্থের উপর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবের ফলে তুফান যে কোথাও পালিয়ে যেতে পারে না তা বোঝাতে গিয়ে একটি বিশাল প্যারাগ্রাফ ব্যবহার করেছেন। 'মানুষ মরিয়া গিয়া যখন ভূত হয়, তখন তাহার উপর পৃথিবীর আর কোনো কর্তৃত্ব থাকে না। কেহ কেহ বলেন মরিয়াও নিষ্কৃতি নাই। ৩) 'কিন্তু যতদিন পার্থিব পদার্থ জীবিত থাকে, ততদিন পৃথিবী ছাড়িয়া পলায়ন করিতে পারে না'। পদার্থ মাত্রই মাধ্যাকর্ষণ বলে ভূপৃষ্ঠে আবদ্ধ থাকে'।

'পলাতক তুফান' এর দ্বিতীয় অংশটিও একটি কৌতুকপূর্ণ গল্প। এতে কলকাতার সাম্ভব্য ঝড়টি না হওয়ার একটি বৈজ্ঞানিক কারণ একাধিক হাস্যরসের সাথে হাতে কলমে দেখানো ও ব্যখ্যা করা হয়েছে। লেখক সমুদ্রপথে সিংহল যাত্রা করবেন। তাঁর মাথার অবশিষ্ট গুটিকয় চুল বাঁচানোর ইচ্ছায় স্নেহময়ী কন্যা এক শিশি তেল সাথে দিয়ে দিলেন। প্রচণ্ড সমুদ্রিক ঝড়ে জাহাজটি ডুবে যাওয়ার অবস্থা হলে লেখক তেল এবং পানির বিপরীত ধর্মের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের কথা বিবেচনায় নিলেন। সাথে সাথে তিনি তেলের শিশির ছিপি খুলে সমুদ্রের পানিতে নিক্ষেপ করলেন। ফলে 'ইন্দ্রজালের প্রভাবের ন্যায় মুহূর্তমধ্যে সমুদ্র প্রশান্ত মূর্তি ধারণ করিল'। এখন দেখা যাক এতে হাস্যরস কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। মাসখানেক প্রচন্ড জ্বরে ভুগে লেখকের মাথা প্রায় চুলশুণ্য হয়ে গেলে বায়ু পরিবর্তনের জন্য লংকাদ্বীপ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় ভূগোল-তত্বের ছাত্রী তাঁর ৮ বছরের কন্যা জানতে চাইল'বাবা, দ্বীপ কাহাকে বলে?' প্রশ্নটি করলেও 'উত্তর পাইবার পূর্বেই "এই দ্বীপ" – ইহা বলিয়া প্রশান্ত সমুদ্রের ন্যায় আমার বিরল-কেশ মস্তকে দুই এক গোছা কেশের মণ্ডলী দেখাইয়া দিল'। এখানে লেখক নিজের টাক মাথাকে নিজেই ব্যঙ্গ করে গল্পে হাস্যরসের জোগান দিচ্ছেন। পরবর্তী বাক্যেও একই ধারার কৌতুক দেখতে পাই। কন্যা এরপর লেখককে বললো 'তোমার ব্যাগে এক শিশি কুন্তল-কেশরী দিয়াছি; জাহাজে প্রত্যহ ব্যবহার করিও, নতুবা নোনা লাগিয়া এই দু একটি দ্বীপের চিহ্নও থাকিবে না'।
এখন এই কুন্তল-কেশরী তেলের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক তেলটি আবিষ্কারের আরেক আঁষাঢ়ে, হাসির গল্পের অবতারণা করলেন। গল্পটি হুবহু আমি বলব না, তবে সংক্ষেপে এইরূপ: সার্কাসের এক কৃষ্ণ-কেশরী সিংহ (সিংহ কখনো কালো হয় না – গল্পে অদ্ভুতরসের প্রয়োগ) সমুদ্রপথে বিলাত থেকে আসার পথে এতোই কেশরশুণ্য হয়ে পড়ে যে 'এ দেশে পৌছিবার পর সিংহ এবং লোমহীন কুকুরের বিশেষ পার্থক্য রহিল না'। সিংহের সাথে কি কুকুরের তুলনা চলে? – হাস্যরস। ইংরেজ সার্কাসওয়ালা এবার 'এক সন্যাসীর পদধুলি লইয়া বর প্রার্থনা করিলেন। একে ম্লেচ্ছ, তাহাতে সাহেব! ভক্তের বিনয় ব্যবহারে সন্যাসী একেবারে মুগ্ধ হইলেন এবং বরস্বরূপ স্বপ্নলব্ধ অবধৌতিক তৈল দান করিলেন।' এখানে দুটি বিষয় লক্ষনীয়। প্রথমতঃ বেনিয়া নামে পরিচিত বস্তুবাদী ইংরেজদেরই একজনের অপার্থিব জগতে বিচরণকারী (ভারতীয়) সন্যাসীর পদধুলি গ্রহণ। এটি ইংরেজদের প্রতি এক কটাক্ষপূর্ণ উক্তি। দ্বিতীয়ত: ভারতের সংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু, এখানে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা, সন্যাসীরা যাদের গোত্রভুক্ত, বিদেশী ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতো বা চলে। কিন্তু সাহেবরা শাসকশ্রেণিভুক্ত বলে ম্লেচ্ছ বা খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্যেও সন্যাসী বিগলিত চিত্তে ইংরেজ সার্কাসওয়ালাকে ভক্ত হিসেবে গ্রহণ করলেন। এই বাক্য দ্বারা কট্টর ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও কটাক্ষ করা হলো। শুধু তাই নয়, আত্মপ্রবঞ্চণার নমুনা হিসেবে সন্যাসী তেলটি নব্য ভক্তকে দান আগে সেটিকে সংস্কারমুক্ত বা 'অবধৌতিক' করে নিয়েছিলেন! অর্থাৎ ম্লেচ্ছ ইংরেজের ছোঁয়ায় তেলটি অপবিত্র হবে না, অর্থাৎ এর কার্যক্ষমতা হারাবে না!

পরের ঘটনাটি পাঠক নিশ্চই ধরতে পেরেছেনঃ তৈল প্রলেপের এক সপ্তাহের মধ্যেই সিংহের লুপ্ত কেশর গজাইয়া উঠিল। এরপরের বাক্যটিতে এই পর্বের হাস্যরসের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছেঃ 'কেশহীন মানব ও তস্য ভার্যার পক্ষে উক্ত তৈলের শক্তি অমোঘ।' হাস্যরসকে আরো বেগবান করতে সহজ ভাষায় 'সমস্ত স্ত্রীজাতি'র পরিবর্তে তিনি 'তস্য ভার্যা' ব্যবহার করেছেন। হাসির খোরাককে আরো সুস্বাদু করতে তেলটির এই সংবাদটিকে লেখক 'অতি বিখ্যাত মাসিক সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায়' স্থান করিয়ে দিয়েছিলেন।

এরপরের রসালো বর্ণনা দীর্ঘ হলেও ঘটনা সামান্য। জাহাজে লঙ্কাদ্বীপ যাত্রাকালে সামুদ্রিক প্রচণ্ড তুফানে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে লেখক টলতে টলতে তেলের শিশির ছিপি খুলে 'জীব আশা পরিহরি' সমুদ্র লক্ষ করিয়া কুন্তল-কেশরী বান নিক্ষেপ' করলেন। আর অমনি 'সাক্ষাৎ কৃতান্ত সম পর্বতপ্রমাণ ফেনিল এক মহা উর্মি' 'ইন্দ্রজালের প্রভাবের ন্যায় মুহূর্ত মধ্যে (সমুদ্র) প্রশান্ত মূর্তি ধারণ' করায় তুফান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লক্ষনীয় যে, আচার্য জগদীশ্চন্দ্র বসুর মতো ব্যক্তি গল্পটিতে এবার তেলটির বৈজ্ঞানিক ধর্মের কথা বিস্মৃত হয়ে এর 'ঐন্দ্রজালিক' 'বাণ'-সম গুণাবলীর কথাই শুধু মনে করতে পারলেন!

এ হেন গল্পকে যদি ব্যঙ্গ-রসাত্মক না বলে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বলে আখ্যায়িত করা হয়, তবে আমার বলার কিছু নেই।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর 'অব্যাক্ত' গ্রন্থটি পাঠ করলেও বোঝা যায় সাধারণ পাঠকের কাছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি কঠিন বিজ্ঞানকে সহজ ও রমনীয় করে উপস্থিত করার চেষ্টা করেছেন। আমার ধারণায় তিনি তা করেছিলেন সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞানমুখী করে তোলার জন্য। এর বাইরেও তিনি বিলাতের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীর কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্যের সমুচিত জবাব দিয়েছেন এবং প্রতিদ্বন্ধী ফ্রান্স ও জার্মান রমনীদের কেশ এর তাঁর আবিষ্কৃত বিপরীতমুখী বৈজ্ঞানিক ধর্মের উল্লেখ করে নির্মল কৌতুক ও হাস্যরসের উদ্রেক করেছেন। এ ছাড়াও তাঁর আবিষ্কৃত ও উদ্ভাবিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া বর্ণনাকালে তিনি তখনকার প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থা এবং মানসিকতা নিয়ে প্রায়ই ব্যাঙ্গত্মক-রসালো মন্তব্য করে বৈজ্ঞানিক রচনাগুলোকে উচ্চতর সাহিত্যে উন্নীত করেছেন। 'পলাতক তুফান' গল্পে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা তথ্যের চেয়ে ব্যঙ্গরসের প্রাধান্য এতো বেশি যে তা কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা যায় না।

উল্লেখপঞ্জী
১।দীপ ঘোষ ও শন্তু বাগ, প্রথম বাংলা তথা ভারতীয় কল্পবিজ্ঞানের সন্ধানে | কল্পবিশ্ব পত্রিকা (kalpabiswa.in), ২০২০। ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বরে সর্বশেষ পঠিত বা নামান (ডাউনলোড)।
২।সিদ্ধার্থ ঘোষ, বাংলা সাইন্স ফিকশনের ঐতিহ্য, নির্মাল্য আচার্য সম্পাদিত এক্ষণ (সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা) শারদীয় সংখ্যা বাংলা ১৩৯৫ সন, ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড, কলিকাতা। ১৯৮৯ সায়েন্স ফিকশন – সির্দ্ধাথ ঘোষের কলমে | কল্পবিশ্ব পত্রিকা (kalpabiswa.in)
৩।মুহিত হাসান, বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর আদিপর্ব – প্রথম আলো, ৩০শে নভেম্বর, ২০১৮, বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির আদিপর্ব (prothomalo.com)। ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বরে সর্বশেষ পঠিত বা নামান (ডাউনলোড)।
৪।প্রদোষ ভট্টাচার্য, হেমেন্দ্রকুমার রায় ও বাংলা কল্পবিজ্ঞান, হেমেন্দ্রকুমার রায় ও বাংলা কল্পবিজ্ঞান | কল্পবিশ্ব পত্রিকা (kalpabiswa.in)
৫।অব্যক্ত https://grontho.net/%E0%A6%85%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4/
৬।আশরাফ আহমেদ, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর অব্যক্ত, ঢাকা থেকে প্রকাশিত 'বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি' সাময়িকীর ৫-২১ পৃষ্ঠা, ২০২১
৭।Eric McMillan, Editor Eric's What Is Science Fiction? The Greatest Literature of All Times -, ২০২১ What Is Science Fiction? – The Greatest Literature of All Time (editoreric.com) ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বরে সর্বশেষ পঠিত বা নামান (ডাউনলোড)।
৮।https://www2.jpl.nasa.gov/comet/news59.html
৯।Planetary Motion: The History of an Idea That Launched the Scientific Revolution (nasa.gov)
১০। Oil on troubled waters: A reappraisal of the storm tactics described in Acts 27 – James Beresford, 2014 (sagepub.com)
১১।Charles Cox, Suppression of breakers in stormy seas by an oil film, International Journal of Maritime History ভলিউম 27 পৃ 1–9 (২০১৫) Untitled (escholarship.org)
১২।Dick Sands : the boy captain : Verne, Jules, 1828-1905 : Free Download, Borrow, and Streaming : Internet Archive
১৩।[PDF] The Use Of Oil To Lessen The Dangerous Effect Of Heavy Seas – Do (formrage.com)
১৪।এক চা-চামচ ভোজ্য তেল আধা একর পানির ঢেউকে শান্ত করে দিতে পারেঃ What the Physics?! | How Oil Calms Waves | PBS LearningMedia
১৫।Why Did 19th Century Sailors Dump Oil in the Sea While Sailing? » Science ABC
১৬।On Simultaneous Variations of the Barometer in India Author(s): J. A. Broun Source: Proceedings of the Royal Society of London, Vol. 25 (1876 – 1877), pp. 24-39 Published by: Royal Society Stable URL: https://www.jstor.org/stable/113448 Accessed: 24-01-2022 15:12 UTC), IMD | History
১৭।Peter Behroozi, Kimberly Cordray, William Griffin, অ্যান্ড Feredoon Behroozi, The calming effect of oil on water, American Journal of Physics, Volume 75, Issue 5, pp. 407-414 (2007). May 2007, DOI: 10.1119/1.2710482 The calming effect of oil on water – NASA/ADS (harvard.edu)

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক