প্রাণ-প্রকৃতি-মৃত্যু অথবা তারকোভস্কি

দেবাশিস চক্রবর্তী
Published : 11 April 2021, 07:15 AM
Updated : 11 April 2021, 07:15 AM



ছফার "পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ" বইটা প্রকৃতি উপাখ্যান হিসাবে পড়তে পারলেই সুখী হতাম। কিন্তু তা করা গেল না। রূপকের চোরাগোপ্তা হামলায় বারবার কানে কানে ফিসফিসিয়ে এবং কখনো কখনো জোর গলায় বলে গেছেন এটা মানুষের উপাখ্যান। সমাজের উপাখ্যান। পুরো বই জুড়ে যে ঋষি সুলভ আবেশ, ধ্যানী মগ্নতা আর প্রুস্তিয়ান মোমেন্টের ছড়াছড়ি; তাকেই বইয়ের উৎপত্তি এবং সারৎসার ভাবলে অসম্পূর্ণভাবে পড়া হবেই বলে মনে করি। পদে পদে যে শ্রেণীসংগ্রাম আর শিক্ষিত-সুশীল-বুদ্ধিজীবী সমাজের নর্ম-ভ্যালুকে নিয়ে যে অনায়াস শ্লেষ সেসব নজরআন্দাজ করা যায় না। এই নিয়ে শুরুতেই সলিমুল্লাহ খান দুর্দান্ত আলোচনা করেছেন। এই যে ঢাকার একজন বুদ্ধিজীবীর জেন বৌদ্ধ দর্শনের দৃষ্টিতে জগতকে দেখা, এর মধ্যে আধ্যাত্মিক-অসঙ্গায়িত মগ্নতা রয়েছে ভেবে বাতিল করে দেয়া যায় না। বরং ঢাকার বুদ্ধিজীবী-দার্শনিকদের মধ্যে এমনটা দেখা যেতেই পারে। ঐতিহাসিক পরম্পরাতেই তা আছে। কিন্তু রাহুল সাংকৃত্যায়নের "তিব্বতে সওয়া বছর" পড়তে পড়তে শুরতেই একটা ব্যপার চোখে জ্বালা ধরায় যে অতীশ দীপঙ্কর বা আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বাংলাদেশের (তখনকার পূর্ব বঙ্গের) মানুষ তা তিনি মানতেই পারছেন না। অতীশ ভারতবর্ষের বৌদ্ধ দার্শনিক এবং তিব্বতে গিয়ে তিনি তিব্বতিদের অনেকখানি উদ্ধার করেছেন এমনটা ভেবে পণ্ডিত রাহুল পুলক অনুভব করছেন। তার সময়েও ব্যাপারটা চাউর ছিল যে অতীশ বাংলাদেশের মানুষ। কিন্তু রাহুলের পক্ষে তা মানা সম্ভব ছিল না। তথ্য প্রমাণের চেয়ে তার অহমে লাগছে যে বৌদ্ধ দর্শনের এমন যুক্তিবাদী লোক কিভাবে বাঙাল হতে পারে। ইতিহাসে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া মুশকিল তবে তথ্য-প্রমাণ থাকে এবং এখন এটা প্রমাণিত যে অতীশ বাংলাদেশের লোক। আরও নির্দিস্ট করে বলতে গেলে ঢাকার কাছেই মুন্সিগঞ্জের (বিক্রমপুর) লোক। আমার এতসব বলার কারণ যতটা না নিজের জাতীয়তাবাদী উচ্ছ্বাস তার চেয়ে বেশি রাহুলের মনের ভিতরে সূক্ষ্ম অথচ টনটনে আধিপত্যবাদী মনোভাবের দিকে ইঙ্গিত করা। যা কিনা ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময়কালে কংগ্রেসের নেত্রীবৃন্দের পূর্ববঙ্গের প্রতি মনোভাবের মধ্যেও দেখা গেছে। নেহেরুও পূর্ববঙ্গকে ভারতবর্ষ মনে করেন নাই। এই মনোভাবের লিখিত প্রমাণও আছে। এখন আবারও ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন যাতে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি না হয়। এসব বলার কারণ এই না যে আমি প্রমাণ করতে চাচ্ছি পূর্ববঙ্গ ভারতবর্ষ। হয়তো পূর্ববঙ্গ কখনোই ভারতবর্ষ ছিলনা। বরং এসব বলার কারণ এই যে, পূর্ববঙ্গ ভারতবর্ষ না, এদের ভাষা বাংলা এই কারণে এই জমিতে উঁচুমাপের দার্শনিকের জন্ম হতেই পারে না, রাহুলের এমন মনোভাব নিম্নশ্রেণীর। আবার পূর্ববঙ্গে বন্যা হয়, জঙ্গল গাছপালা বেশি তাই এটা ভারতবর্ষ হতে পারে না, নেহেরুর এমন মনোভাবও একই নিম্নশ্রেণীর মনোভাবের ধারা প্রবাহ। এখানে বলে রাখা ভাল যে রাহুল এবং নেহেরুর সময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেই বার বার পূর্ববঙ্গ বলেছি।
বৌদ্ধ দর্শনের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থেকে রাহুল গিয়ে হাজির হয়েছিলেন তিব্বতে। কিন্তু এই হাজির হতে গিয়ে পোহাতে হয় বিস্তর ঝক্কি। সেসময় তিব্বত ছিল ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নিষিদ্ধ। রাহুল তার ইচ্ছা শক্তি আর প্রবল আগ্রহে বিস্তর ফন্দি ফিকিরের আশ্রয় নিয়ে নেপাল হয়ে গিয়ে পড়েন তিব্বতের লাসায়। পথে তার দেখা স্থানীয় মানুষের জীবনের গতিপ্রবাহের বর্ণনা থেকে একটা ব্যাপার পরিষ্কার হয় যে আধ্যাত্মিকতা যেমন মানুষের স্বাভাবিক গতি, তেমনি দুর্নীতিও। পদে পদে রাহুল এই ভেবে পুলকিত হন যে ভারতীয় বৌদ্ধ চিন্তাবিদেরা তিব্বতিদের যেমন উদ্ধার করেছেন, তেমন তিব্বতিরা এখনো পদ্মসম্ভব-শান্তরক্ষিত-অতীশের সৃষ্টিকর্ম অনেকাংশেই সংরক্ষণ করেছেন, ভারতীয়দের এক্ষেত্রে ব্যর্থতা নিয়ে তাকে বেশ হা-হুতাশ করতে দেখা যায়।



মৃত্যু এবং মৃত্যু পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সুবিস্তারিত উপন্যাসের নজির বাংলা ভাষায় বিরল। বাংলা মননশীল-সৃজনশীল বলে যে প্রকাশনা বাণিজ্য চালু আছে তার বাইরে আরও অনেক প্রকাশনা হয়, বিশেষ করে ইসলামী প্রকাশনা। রমজান মাসে বাইতুল মোকারমে যে ইসলামী বইয়ের মেলা হয় তার দিকে নজর দিলেই বোঝা যাবে এর কলেবর। সঙ্গত কারণেই মৃত্যু এবং মৃত্যু পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ধর্মীয় তত্ত্ব-তালাশ প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু উপন্যাস না। ইসলাম-এর দৃষ্টিকোণ থেকে মৃত্যু-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে কোন উপন্যাস রচিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আমার নজরে এখনো পড়ে নাই। যদি হদিস পাওয়া যায় তবে আগ্রহ নিয়ে পড়া যাবে। যাহোক, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেবযান উপন্যাসটি হয়তো সবচেয়ে কম পড়া হয়েছে এবং তার চেয়েও কম হয়েছে আলোচনা। বোধ করি তার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে। উপন্যাসের কাহিনীর পাটাতন উপনিষদের মতো সনাতন ধর্মের কিছু ধর্মীয় পুস্তক নির্ভর। মোট কথা, সমগ্র উপন্যাসের গা জুড়ে পরিষ্কার সনাতনী আমেজ লেগে আছে। আর ইনিয়ে-বিনিয়ে তাকে অগ্রাহ্য করা বা সার্বজনীন ভাবা অথবা চাপিয়ে দেয়ার মতো বেওকুফি করা যায় না। তাছাড়া, দ্বিতীয় একটা কারণ হতে পারে প্রবল সংস্কৃত বাংলার চাপ। গত শতাব্দীর সেই পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে যে উপন্যাসটি দুর্ভেদ্য তার দুটি সম্ভাব্য কারণ বোঝা গেলো। আরও একটি কারণ হতে পারে যে উপন্যাসটি শিক্ষিত সমাজের কাছে আজও অবধি অনাধুনিক হিসাবে বিবেচিত হয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে যে কম পরিচিত-আলোচিত তার পেছনে এই অনাধুনিক মনে হওয়া কাজ করে থাকতে পারে। অনাধুনিক মনে হওয়ার সোজা-সাপটা কারণ হচ্ছে এর ধর্মীয় বুৎপত্তি এবং মৃত্যু-পরবর্তী পরিস্থিতির মতো বিষয়বস্তু। ঘোরতর উপনিবেশিত বাংলা অঞ্চলের মানুষ – তা সে পশ্চিম বা পূর্ব বাংলাই হোক অথবা হিন্দুই হোক বা মুসলমানই হোক। এনলাইটেনমেন্ট থেকে শুরু করে পশ্চিমা আধুনিকতার যে প্রবল জোয়ার তা লিবারেলিজম এবং নিওলিবারেলিজমের হাত ধরে এখন পর্যন্ত জারি আছে। এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমা জ্ঞানে দীক্ষিত এবং যুক্তি দ্বারা পরিচালিত কোন বঙ্গসন্তানের পক্ষে এই উপন্যাসের কাহিনী পরম্পরাকে হজম করা খুব কঠিন হবে। মুখ্যত তারা কোন ঘটনা-বিষয় যে ঠিক না বেঠিক তা বিবেচনার জন্যও কখনোই পশ্চিমা জ্ঞান কাঠামোর বাইরে যান না-যাবেন না। মোটা দাগে শিক্ষিতজনের কাছে পশ্চিমায়ন মানেই আধুনিকায়ন। তাই এখানে সিদ্ধান্তগ্রহণের পেছনে স্থানিক কোন চিন্তা-দর্শন-ইতিহাস কাজ করে না। যদিওবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কিছু ধর্মীয় নীতি কাজ করে থাকে তারপরেও তা একান্ত নিজস্ব ধর্মীয় পরিসরে এবং ভিন্ন ধর্ম মতকে অগ্রাহ্য করেই। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে এই উপন্যাসটিকে কাজে লাগানো বা ভোগ করার বিপরীতে বেশ কিছু চিন্তাপ্রবাহজনিত প্রতিবন্ধতা হাজির আছে। তারপরও এটা উপন্যাস এবং কেউ কেউ বিভূতিভূষণের নাম দেখে হাতে তুলে নিতে পারেন। তাদের মধ্যে সনাতন ধর্মীয় চিন্তায় আগে থেকে নিবিষ্টরা খুব সঙ্গত কারণেই আপ্লুত হয়ে যেতে পারেন। তারপরও সনাতনী সীমানার মধ্যকার বা বাইরের কেউ এই উপন্যাসকে উপভোগ বা নিজের জীবনে কাজ লাগাতে পারেন না? বা কোন বিশেষ উপলব্ধিতে পৌঁছাবেন না?

আগেই বলেছি এর বিরুদ্ধে কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঘটনা কাজ করছে আর সামস্টিক অর্থে আমাদের সাহিত্য পাঠের গলদ কাজ করছে। হতে পারে এর কাহিনীর পাটাতন বিজাতীয় এবং প্রাচীন কেতাবাদি সম্বন্ধীয় জ্ঞান ঘেঁষা। যদি ধরেই নেই সব কল্পনা তাতেই বা ক্ষতি কি! কল্পনা ধরে নিয়েই, এই সুবিস্তৃত কল্পনালোকে মৃত বা জীবনের প্রাকৃতিক যে ইতিহাস-ছবি বিভূতি এঁকেছেন তা যেকোনো বাংলা ভাষাভাষী পাঠক আমলে নিতে পারেন, চিন্তিত হতে পারেন।



কাব্যিক এবং আধ্যাত্মিক জগতের নির্মাতা হিসাবে মশহুর আন্দ্রেই তারকোভস্কি। সিনেমার কবি, যে কবি পেয়েছিলেন দেবদূতের দেখা। তবে এখানে তারকোভস্কির সিনেমা নিয়ে কোন আলোচনা হাজির করার পরিকল্পনা নাই। তারকোভস্কি যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে কাজ করছেন ততদিনে সম্পদের সমবণ্টনের ভিত্তিতে একটি সমাজ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। সম্পদের সমবণ্টন অনেকখানি করা গেলেও ক্ষমতার সমবণ্টন করা গেলো কি? এই ক্ষমতার অসমবণ্টনের প্রভাব সেই সমাজের শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানেও সঙ্গত কারণে তার ছাপ রেখে গেছে বিভিন্ন-বিচিত্র মাত্রায়। তার বিস্তৃত-বিচিত্র প্রভাব এসে লাগে তারকোভস্কির গায়েও। পদে পদে তারকোভস্কি নাজেহাল। আমলা-কমিটি প্রধান-কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে পদে পদে তাকে বিকট-উদ্ভট পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এক সোলারিস সিনেমার সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির সংস্কৃতি বিভাগ যে ৩৫টি মন্তব্য দিয়েছিল তার দিকে তাকালেই যে কারও নাভিশ্বাস ছুটে যাবে। নাভিশ্বাস তারকভোস্কিরও ছুটেছে, দেবদূতের সাক্ষাৎ পাওয়ার পরও। ১৯৭০ সালের তার ডায়েরির একটা এন্ট্রির দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। তারকোভস্কি লিখছেন, "ভেবে অবাক হই, কখনো যদি পারতাম সব দেনা শোধ করে দিতে এবং প্রাথমিক অপরিহার্য জিনিসগুলো কিনতে- একটা সোফা, কিছু ফার্নিচার, একটা টাইপরাইটার, বইপত্র- যেগুলো আমার লাগবেই? তারপর গ্রামের বাড়ির সবকিছু ঠিকঠাক করা, মানে তো আরও টাকার ব্যাপার।"
তারকোভস্কির আশপাশের পরিবেশটাই বা কেমন ছিল? নান্দনিক-কাব্যিক বলে প্রাথমিক বিচারেই যে নির্মাতাকে নিয়ে আজও আমাদের উচ্ছ্বাস সেই নির্মাতার বুকে তার সময়-পারিপার্শিক পরিস্থিতি কেমন উচ্ছ্বাস তৈরি করছিল? এর জন্য তারকোভস্কির ডায়েরির ১৯৭৬ সালের দুইটা এন্ট্রির দিকে নজর দেয়া যাক।
"৩০ জুলাই
যাওয়ার কোন ঘর নেই আমার। সংস্কৃতির শেষ ছিটেফোঁটাগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে এই মৃত আবহমণ্ডলে; প্রথম কাজ হলো একটি ভিন্ন আবহমণ্ডল সৃষ্টি করে নেওয়া- এসব জগদ্দল পাথরের, হাঁদাদের কামড়াকামড়ি, বুর্জোয়া সংবেদনহীনতা থেকে পরিষ্কার দূরত্বে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব?
৩১ জুলাই
এখন মাঝরাত প্রায়।
গ্রামে ফেরা… লেখালেখি… কী নিয়ে? মনে হয় চারটি ফিল্ম শেষ পর্যন্ত বিশেষ অর্থবহ হয়ে উঠবে? মর্মান্তিক।
থিয়েটার… মস্কোতে থেকে যাওয়া এবং নিজেকে অপদস্ত হয়তে দেওয়া? একটি বই? গদ্য? ডাল-ভাতের কী হবে? ফিল্ম-স্ক্রিপ্ট?
হ্যাঁ, বুঝেছি।
নিজেকে সরিয়ে নেব?
চারপাশে ঘিরে আছে মিথ্যা, ভণ্ডামি ও মৃত্যু… ।
বেচারা রাশিয়া।"
আর বাকস্বাধীনতা? মতপ্রকাশের জন্যও কি ভুগতে হয়নি তারকোভস্কিকে? ডায়েরির ১৯৭৯ সালের আরেকটি এন্ট্রির দিলে লক্ষ্য করা যাক। তারকোভস্কি লিখছেন, "অভিনয়ের ওপর কাল একটা বক্তৃতা দিলাম, সিনেমা লেকচার হলে [প্রোপাগান্ডা অফিস]ঃ তেরোখোভা আর আমি একসঙ্গে হাজির হয়েছিলাম। আমার ধারণা, যতটুকু বলার ছিল- তারচেয়ে বেশি বলে ফেলেছি। এর ডিরেক্টর [কেজিবি'র একজন কর্নেল] আমাকে সতর্ক করে দিলেন, ভবিষ্যতে আর কোন বক্তৃতায় যেন এমন আচরণ না করি। মস্কো পার্টি কমিটিকে অশ্রদ্ধা করে কোন কথা বলা যাবে না; এবং সমালোচকদের করা যাবে না তীব্র সমালোচনা।"


ফিরে আসা যাক ছফার পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণে। কিছু ব্যাপার নিয়ে মনের মধ্যে কুয়াশা আছে। ছফার প্রিয় আপেল গাছটি যখন চুনের বিষে জর্জরিত, সে তখন ছফার স্বপ্নে উপস্থিত হয়ে যায়। আবার গ্রামের বাড়িতে ছফা যখন জমি-জমার মত দুনিয়াবি কাজে ব্যস্ত তখন কেউ যখন তার আদরের বেগুন গাছগুলোকে ভীষণ আক্রোশে সমূলে উপড়ে ফেলছে, তারাও আবার একইভাবে ছফার স্বপ্নে উপস্থিত। এই ব্যাপারগুলো কীভাবে পড়বো? ফ্রয়েড-লাঁকা বা, ইয়ুং? মানুষের চেনা-জানা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের যে ছবি, তার বাইরে কি কোন দৃশ্যের-স্পর্শের অতীত কোন জাল বিছিয়ে আছে? কল্পনার অতীত কোন জাল কি সমস্ত বস্তু জগত, প্রাণ-অপ্রাণের সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে সমস্ত অস্তিত্বকেই জাপটে ধরে আছে? এসব বোঝার এখতিয়ার কি সত্যি ভাষা নির্ভর মানুষের আছে?


আগ্রহের আরেকটি জায়গা ছিল ছফার বালক বেলার গল্পগুলো। আষাঢ়ে আম গাছের ঘটনাটা। প্রকৃতি মানে উদ্ভিদের সান্নিধ্যে মানব সন্তানের বেড়ে ওঠা আর তার সাথে ক্রমে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় তা-ই পড়তে পড়তে অবাক হই। পড়তে আরাম লাগে। জসীম উদ্‌দীন-দ্বিজেন শর্মা বা মনীন্দ্র গুপ্তের লেখায় তাদের বেড়ে ওঠার যে চিত্র চোখে ভেসে ওঠে, সেখানে বৃক্ষ-নদী-বিহঙ্গ ফিরে ফিরে আসে। তাদের মানস কাঠামোতে প্রকৃতির যে ছাপ পড়ে গেছে, তা-ই তাদের সকল প্রকাশে এসেছে। ভাবি আজকের যেই প্রকৃতির স্পর্শ বঞ্চিত অথচ সভ্যতার অবদানভোগী শহুরে যে প্রজন্ম বেড়ে উঠেছি-উঠছি তারা যখন একসময় ফেলে আসা জীবনের দিকে ফিরে তাকাবো, সেই দৃশ্যটা কেমন হবে? সেই শৈশব স্মৃতিদৃশ্য কি হবে কম্পিউটারের বিট-বাইটেরর তৈরি কোন জগতের প্রতি উৎসারিত কোন বিষাদবায়ু? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন চেতনাকে সংজ্ঞায়িত করে, লক্ষ লক্ষ লাইনের কম্পিউটার কোড লিখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সংজ্ঞায়িত করবে এবং সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যাপিত জীবনে ভোগ করবে, তাকে কতটা বুদ্ধিমান-ধীমান বলা উচিত হবে?

তথ্যসূত্র

১ The Marginal Men: The Refugees and the Left Political Syndrome in West Bengal, Prafulla K. Chakrabarti, Lumiere Books, Calcutta 1990, Page. 160
২ তারকভোস্কির ডায়েরি, রুদ্র আরিফ, প্রতিভাস, ২০১৭, পৃষ্ঠা ৩৯
৩ তারকভোস্কির ডায়েরি, রুদ্র আরিফ, প্রতিভাস, ২০১৭, পৃষ্ঠা ১৬৯-১৭০
৪ তারকভোস্কির ডায়েরি, রুদ্র আরিফ, প্রতিভাস, ২০১৭, পৃষ্ঠা ২৩০—২৩১

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক