Published : 10 Feb 2026, 01:43 AM
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে আড়াই দশক ধরে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তানজিরাল দিলশাদ দিতান, তার মতে নারী ভোটাররাই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয় ‘প্রধান নির্ধারক’ হয়ে উঠবেন।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে রাজনীতি ও সমাজের বিভিন্ন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচার ও বিশ্লেষণ কার্যক্রমে যুক্ত এই ভোটার বলছেন, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তার মতো কর্মজীবী নারীদের বড় অংশ দেখবেন তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সৈয়দ রাকিব হোসেনের মতে, তরুণ ভোটাররা চান চাকরির নিশ্চয়তা ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। নারী ভোটাররা চান নিরাপত্তা।
তিনি মনে করেন, ৫ অগাস্ট পরবর্তী ঘটনাবলীও নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণ ও নারী ভোটাররাই নির্বাচনের জয় ও পরাজয়ের বড় নির্ধারক হয়ে উঠবেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হবে। সে দিন একই সঙ্গে হবে গণভোট।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল।
‘মব’ সহিংসতা, মেয়েদের খেলায় বাধা দেওয়া, সাংস্কৃতিক আয়োজন পণ্ড, মাজারে হামলা, বাউল শিল্পী গ্রেপ্তার, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, ঢালাও গ্রেপ্তার, জামিন না দেওয়া, বিতর্কিত চুক্তি ও উন্নয়ন প্রকল্প ইত্যাদি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সহিংসতার পর বদলের যায় ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে গড়ে উঠে ছাত্র-জনতার আন্দোলন।
তাদের বড় অংশই ছিল তরুণ। আন্দোলনের সামনের কাতারে ছিলেন নারীরা।
সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দিলেও পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেছিলেন এখনকার এনসিপি নেতারা।
পেছন থেকে কৌশল নির্ধারণে বড় ভূমিকায় থাকার কথা উঠে আসে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির নেতাদের।
বলা হয়ে থাকে, সেটিকে পুঁজি করে একের পর এক বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদে তারা নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নেতাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড মাঝে মাঝেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
নির্বাচন ঘিরে এনসিপির জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ায় নতুন দলটির নেতৃত্বের একটি অংশ বেরিয়ে যায়, যা তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাকে উসকে দেয়।
নারীদের নিয়ে জামায়াত আমিরের বিতর্কিত বক্তব্য ঘিরে আলোচনো এখনো স্তিমিত হয়নি।

সংসদ নির্বাচনে নারী ভোটারদের ভূমিকা নিয়ে তানজিরাল দিলশাদ দিতান বলছিলেন, “রাজনৈতিক পালাবদলে যে বিভাজনের রাজনীতি ও মব সংস্কৃতির ডালপালা বেড়েছে, তার বিপরীতে নারীরা তাদের আর্থিক সাবলীলতা ও নিজস্ব বিকাশ যারা নিশ্চিত করতে পারছেন, তাদের দিকেই ঝুঁকছেন এ বৃহৎ অংশ।”
আরও বিশদ করে তিনি বলেন, “যেকোনো কর্মজীবী নারী-বিবাহিত, অবিবাহিত, সিঙ্গেল মা সবার জন্যই নিজের আর্থিক সাবলীলতা এবং নিজস্ব বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ। তার জন্য দরকার সামাজিক, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সুরক্ষা।
“দেশে এখন নারী, পুরুষ, শিশু কেউই সুরক্ষিত না। সেই সঙ্গে আগামী গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক দল নারীদের ‘রাণীর মতো’ অবস্থান দেওয়ার আশ্বাসে যেরকম বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাতে কর্মজীবী নারীরা কাকে ভোট দিতে পারে সেটা বলাই বাহুল্য।”
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার বিএনপির বড় প্রতিন্দ্বী দলে পরিণত হয়েছে জামাতে ইসলামী, যারা ইসলামপন্থি ও মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত ১০ দলকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনি মোর্চা গড়ে তুলেছে।
রাকিব হোসেনের মতে, আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের সময় কলাকৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখায় ভোটারদের এক তৃতীয়াংশ তরুণ জামায়াত জোটের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে।
তবে এক্ষেত্রেও তরুণ নারীদের ভোটের জোয়ার তাদের দিকে যাবে না বলে ধারণা তার।
রাকিব বলেন, “তরুণ ভোটাররা চাকরির নিশ্চয়তা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চায়, নারীরা চায় নিরাপত্তা। বিএনপি-জামায়াত দু’দলই এই ভোট ব্যাংক টানার জন্য ইশতেহার দিলেও আস্থা অর্জন করতে পারেনি। বিশেষত ৫ অগাস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম মানুষ দেখেছে, যা ভোটের মাঠে প্রভাব পড়বে।
“তরুণ ভোটাররা লেসার ইভিল বা কম খারাপকে বেছে নেবে। এক্ষেত্রে যারা জামায়াতকে ভোট দেবে, তারা মূলত দুর্নীতিমুক্ত এবং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আর আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ নারীদের একটা বড় অংশ বিএনপিকে বেছে নেবে।”

তরুণ পুরুষ ভোটাররা পরিবর্তন চান বলে মনে করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে সদ্য কর্মজীবনে পা দেওয়া লাবিক-ই আকবার খান।
তবে শেষ পর্যন্ত তরুণ নারীদের জোয়ারও যেহেতু প্রভাব রাখবে ভোটে, তাই জয়-পরাজয়ের হিসাবে বিএনপির পাল্লা ভারী হবে বলে মনে করেন তিনি।
লাবিক বলেন, “আসলে গদবাঁধা অনেক রাজনীতি তো দেখল দেশের মানুষ। এখন আসলে তরুণরা পরিবর্তন চাই। যেখানে তরুণদের কোনো কিছুর জন্য আন্দোলন করতে হবে না। তাদের চাকরিসহ সবখানে নিরাপত্তা থাকবে। তার অধিকার ফিরে পাবে। তো এটাই দেখছে তরুণরা।
“তবে আমি বলি কী, শেষমেশ দেখা যাবে বিএনপিই জিতে যাচ্ছে। তারাই জিতবে। জাস্ট তরুণরা যেন আগের বস্তাপঁচা রাজনীতির শিকার না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে।”
গত কয়েক মাসে ভোট নিয়ে মানুষের মনোভাব যাচাইয়ে কয়েকটি জরিপে প্রকাশ হয়েছে।
সবশেষ জরিপের মধ্যে বেসরকারি সংস্থা ইনোভিশন কনসাল্টিং তাদের তৃতীয় রাউন্ডের জরিপের ফল প্রকাশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে, উত্তরদাতাদের ৫২ শতাংশ বিএনপিকে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য উপযুক্ত দল মনে করে।
বিআরএআইএন ও ভয়েস ফর রিফর্ম নামের দুটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সহযোগিতায় ৫১৪৭ জন অংশগ্রহণকারীর টেলিফোন সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে জরিপটি করা হয়েছে।
ইনোভিশন কনসাল্টিং এর ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভের’ বা ‘জনগণের নির্বাচনি ভাবনা’ শীর্ষক এই জরিপের তৃতীয় রাউন্ড পরিচালিত হয় ১৬ থেকে ২৭ জানুয়ারির মধ্যে।
তৃতীয় রাউন্ডের জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ডেও অংশ নিয়েছিলেন।
জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা পছন্দ করেছেন জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটকে।
বেসরকারি সংস্থা— কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ (বিইপিওএস) যৌথভাবে আরেকটি জরিপ করেছে।
এই জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, উত্তরদাতাদের মধ্যে যারা আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন, তাদের প্রায় অর্ধেক (৪৮ শতাংশ) এখন বিএনপিকে সমর্থন করছেন।
জরিপে বলা হয়, ২০০৮ সালের পর যারা ভোটার হয়েছেন, তাদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি (৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ) জামায়াত ইসলামীকে পছন্দ করছেন।
গত ২০ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দুই ধাপে মাঠপর্যায়ে ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের উপরে জরিপটি চালানো হয়।

তরুণ ও নারী ভোটার কত?
আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে তিনটি নির্বাচনে কারচুপির ভোট, ভোট ডাকাতি, রাতে ভোট দেওয়াসহ নানা অভিযোগ ছিল। ভোটাররা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন, এমন আলোচনাই ছিল সর্বত্র।
প্রথমবার ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার।
গেল ১৭ বছরে মৃতদের বাদ এবং নতুন-বাদ পড়াদের যুক্ত করে নভেম্বরে হালনাগাদ তালিকায় ১৮ বছর ও তদুর্ধ্ব ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন।
চূড়ান্ত তালিকায় পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং হিজড়া ১ হাজার ২৩৪ জন ভোটার রয়েছেন।
তাদের মধ্যে সাড়ে ৪ কোটি ভোটারের বয়স ১৮-৩৫ বছরের মধ্যে।
যুব নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বয়সীরা তরুণ।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন,
“প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়স গ্রুপের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ হিসাব করলে ৪ কোটির বেশি।
“তাদের ভালো একটা অংশ যদি ভোট দেয়, তাহলে তাদের ভোট যেদিকে যাবে, সেদিকে একটা ভালো প্রভাব ফেলবে।”
ভাবনায় ভিন্নতা
গণ আন্দোলনে যেসব রাজধানীর যেসব এলাকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল তার মধ্যে যাত্রাবাড়ি এলাকা অন্যতম। একক এলাকা হিসেবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুও ঘটে এখানেই।
এ এলাকায় আন্দোলন জমাতে বড় ভূমিকা রাখে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তাই জুলাই পরবর্তী সময়ে তাদেরকে কেন্দ্র করে পুরো কওমি ঘরানার ভোট কোন দিকে যাবে তা নিয়েও রয়েছে আলোচনা।
তাদেরসহ সকল ইসলামি দল ও তাদের অনুসারীদের ভোট টানতে ‘এক বাক্স’ নীতির আলাপ ছিল রাজনীতির ময়দানে। ঐতিহাসিক মতভেদ ভুলে একসঙ্গে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক দলগুলোর জোট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। রাজনীতির নয়া মেরুকরণ হচ্ছে কিনা সেই আলোচনাও ছিল।
কিন্তু নির্বাচনি হিসাব-নিকাশে জোটে যোগ না দিয়ে ইসলামী আন্দোলন আলাদা হয়ে নির্বাচন করছে। কওমিপন্থী কয়েকটি দল যোগ দিয়েছে বিএনপি জোটে; কেউ রয়েছেন জামায়াতের সঙ্গে।
তবে কওমি ঘরানার সকল দলের প্ল্যাটফর্ম হেফাজতে ইসলাম এবং মূলধারার সকলে জামায়াতের সঙ্গে আক্বিদাগত বিষয়টি আবার সামনে এনেছে।

কওমি মাদ্রাসায় পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে এখন ব্যবসায় সম্পৃক্ত তরুণ নেয়ামত উল্লাহ বলেন, “দাঁড়িপাল্লার (জামায়াত) এরা তো সুবিধার না। এরা ক্ষমতায় আইলে তো বিপদ।”
সবশেষ হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী মুসলমানদের জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া ‘জায়েজ হবে না’ বলে মন্তব্য করলে এ ঘরানার ভোটাররা আরও উজ্জীবিত হোন। সেরকম লেখাও আসে তাদের শিক্ষার্থীদের ফেইসবুকের পোস্টে।
তরুণদের একটা অংশ বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কেউ কেউ মিছিলে যোগ দিতেন শুধু, আবার কেউ আদর্শিক কারণে বা সুবিধা নেওয়ার জন্য নেতৃত্বেও ছিলেন।
তবে তাদের যারা অন্যায় না করেও মামলা-হামলার ভয়ে পলাতক আছেন বা যারা এলাকায় থাকতে বাধ্য হয়ে ভোট দেবেন-তারা আগামী নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন তাও আলোচনা রয়েছে।
আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত একটি জেলার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, “আমি তো পলাতক। লুকিয়ে আছি। একের পর এক মামলা দিয়ে যাচ্ছে বিএনপির প্রার্থী। তারা নানা ভয়ে রাখছে এলাকার মুরুব্বিদের।
“কিন্তু এরা রাজনীতি বুঝে না। যদি বাধ্য হয় ভোট দিতে, পরিবারের সদস্যদের বলে দিছি বিএনপি প্রার্থীকে ভোট না দিতে। উনি যদি রাজনীতি বুঝতো, তাহলে এই এলাকা আওয়ামী লীগের। সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে তাদের কাছে ভোট চাইতো।”
তাহলে কী ভোটটা জামায়াত পাচ্ছে এবার- এমন প্রশ্নে বলেন, “না না। স্বতন্ত্র যিনি আছেন, উনি বিএনপি পরিবারের। কিন্তু দলীয় পরিচয় নেই, উনি অথবা আরেকজন আছেন। যিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু বড় পদে না। তাদের কেউ একজন হবে। নাহলেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে।”
তার আসনের বিএনপির প্রার্থীর বাইরে এ দুই প্রার্থীই এখন কারাগারে আছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী যিনি, তিনি আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে দলটির সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করায় তাকে আওয়ামী লীগ তকমা দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগের এক সাবেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে কাজ করা এক তরুণ আলাদাভাবে ভাবছেন। তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পুরনো রাজনৈতিক চর্চার কারণে যে নির্যাতন-নিপীড়ন হচ্ছে, তার বিপরীতে এসে সরাসরি দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার কথা বললেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের জয় এবং নানামুখী প্রবণতা দেখে তরুণদের ভাবনা বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সৈয়দ রাকিব হোসেন বলেন, “তরুণরা দেশের ভিত্তি। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা মাথায় রেখে আমার মনে হয়, মানুষ কম দুর্নীতিবাজ মানুষকে বেছে নেবে।
“টাকা পাচারের প্রভাব দেশের সকলের উপর প্রভাব পড়লেও তরুণদের অর্থনৈতিক বৈষম্যের সাথে মুখোমুখি হতে হয় বেশি। এজন্য তরুণদের বড় একটা অংশ জামায়াত-এনসিপিকে ভোট দেবে।”
আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাতের গণআন্দোলনে নারীরা সামনের কাতারে থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার আলোচনায় তারা উপেক্ষিত। ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদ ও বাধায় নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন চাপা পড়ে গেছে।
তাহলে ভবিষ্যতে নারীদের ক্ষেত্রে কী ঘটবে? জবাবে তরুণ কর্মজীবী নারী সামিহা তাবাসসুম বলছিলেন, নারীদের ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘সৎ’ ও ‘যোগ্য’ প্রার্থীরাই এগিয়ে থাকবেন।
তিনি বলেন, “সততা ও অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি যে প্রার্থী নির্বাচিত হলে নারীদের কোণঠাসা হওয়ার সম্ভাবনা নেই, নারীরা তাকেই বেছে নেবে।”
তবে এবার নারী-পুরুষ কেউই মার্কা দেখে ভোট দেবেন না বলে মনে করছেন সামিহা।
“গণঅভ্যুত্থানের পর এবার ভোটে মার্কা প্রাধান্য পাবে না। কারণ গণঅভ্যুত্থান পুরো জাতিকে বিশেষ করে নারীদের অনেকটাই রাজনীতি সচেতন করেছে। আর নতুন নারী ভোটারদের অনেকেই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। তাই এ বিষয়গুলোও তারা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেবেন বলে মনে হচ্ছে।”
নারী প্রার্থীদের দিকে নারী ভোটারদের ঝোঁক থাকতে পারে বলেও মনে করছেন তিনি।
ভোটের মাঠে নারীরা কী আমলে নিচ্ছেন জানতে চাইলে তানজিরাল দিলশাদ দিতান বলেন, “গত বছর থেকেই নারীদের কর্মস্থলে যাতায়াত নিরাপদ না। এর মধ্যে নারীদের কাজের সময় কমানোর কথা বলা হচ্ছে। কর্মঘণ্টা কমানো মানে অনেক ইন্ডাস্ট্রিতে নারীরা কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
“গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, মিডিয়া আউটলেট, সাংবাদিকতা, হেলথ কেয়ার এ নার্স শুধু মাত্র কয়েকটা উদাহরণ। এসব ক্ষেত্রে ইমার্জেন্সি কাজ থাকায় বাড়তি সময়ের প্রয়োজন হয়।”

গত অক্টোবরে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে পেশাজীবী মায়েদের কাজের সময় ৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৫ ঘণ্টা করার যে প্রতিশ্রুতি দেন।
নিউ ইয়র্ক সিটিতে ‘কোয়ালিশন অব বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন’ আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তার এই প্রতিশ্রুতির তুমুল সমালোচনা শুরু হয়।
তখন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ দাবি করেন, নারীদের প্রতি সম্মান দেখাতেই তাদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
নারী ভোটারদের ক্ষেত্রে ভোট না দেওয়ার আশঙ্কা দেখছেন কিনা, এমন প্রশ্নে সামিহা তাবাসসুম বলেন, “সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ওপরে বিশাল আক্রমণ আমরা দেখছি। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির ওপরে আর কোনো আক্রমণ, নিয়ম যেন না হয়, সেটার লক্ষ্য রাখতে হবে। একটা দেশে শিক্ষক, লেখক, শিল্পী সমাজ দেশের সম্পদ। তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা সরকারের কর্তব্য।
“কোন রাজনৈতিক দল সেটার ব্যবস্থা নিতে পারে সেটি বুঝতে হবে। না হলে অনেক ভুগতে হবে। তাই এখন সবার আগেই দেশ, দেশ বাঁচাতে হলে ভোট দিতে হবে। ভোট বয়কট করলে কাস্টিং ভোটের পার্সেন্টেজে হিসাব ভিন্ন হবে। তাই দেশে-বিদেশে বাংলাদেশিদের ভোট দেওয়াটা জরুরি।”

বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার তরুণ ভোটাররা ‘বেশি সচেতন’, তাই নির্বাচনে ভোট পড়ার হার বেশি হতে পারে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভালো একটা প্রভাব পড়বে। এদের অনেকেই প্রথমবার ভোটার, জীবনে কখনো ভোট দিতে পারে নাই। কাজেই তারা কিন্তু এই সবকিছু বিবেচনা করেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।
“কাজেই তাদের এই ভোটটা এবার খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তারা যেদিকে ভোট দেবে সেই প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে যাবে।”
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এই সদস্যের।
আগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় নির্বাচনে তার প্রভাব না পড়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “এটা হলপ করে বা একদম নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে ডাকসু নির্বাচনে যারা জিতছে, তারাই জাতীয় নির্বাচনে জিতবে। এ ধরনের কথা কিন্তু বলার কোনো সুযোগ নাই।”
তবে তরুণদের ভোট যে জাতীয় নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে নির্ধারক হয়ে উঠবে, এ ব্যাপারে তার কোনো ‘সন্দেহ নেই’।
নারী ভোটাররাই এবার ‘বড় জায়গায়’ রয়েছে, তবে প্রথমবার ভোটার হওয়া তরুণরাও এক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ভূমিক রাখবেন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন।
তিনি বলেন, “নারী এবং বিভিন্ন বয়সী ভোটারদের মধ্যে একটা তো ‘বড় জায়গায়’ থাকবে নিঃসন্দেহে নারী ভোটাররা। বাংলাদেশে ৫০ শতাংশের মতো ভোটার- যারা নারী। এছাড়া তরুণরা, প্রথমবার যারা ভোটার হয়েছেন তারাও গুরুত্বপূর্ণ।”

ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা কোন কোন বিষয় ভাববেন, এমন প্রশ্নে এই অধ্যাপক বলেন, “নারীদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত, আমার কাছে মনে হয় যে তাদের স্বাধীনতার জায়গাটুকু ও তাদের কর্মদক্ষতা। এবং তাদের উপরে যে ধরনের নারীবিদ্বেষ নারীর বিপরীতে অবস্থানকারী দলগুলো করেছে, তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করা।
“তো সেগুলো যদি নারীরা করতে পারেন, তাদের (সেসব দল) ক্ষেত্রে তারা অবশ্যই একটা বড় ভূমিকা পালন করবেন এই ভোটে। তাদের ভোট একটা বড় ব্যবধান তৈরি করবে।”
অন্যদিকে তরুণ ভোটারদের বিষয়ে তিনি বলেন, “আর যারা নতুন ভোটার, তাদের ক্ষেত্রে আমি মনে করি যে তারা যদি বাংলাদেশের ইতিহাস এবং সব কিছুকে গুরুত্ব দেয়, সেদিক থেকেও কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী যারা ছিল, সেই শক্তিকে তারা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনতে পারে।
“তবে নতুন ভোটারদের ক্ষেত্রে চব্বিশের আন্দোলন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হতে পারে। কারণ যেহেতু এটা তাদের ইমিডিয়েট পাস্ট একটা আন্দোলন এবং যেটির সঙ্গে তারা হয়তো অনেকেই যুক্ত ছিলেন। সুতরাং তাদের একটা গৌরবের জায়গা হয়তো সেটি। তো সেটাকে হয়তো ওরা বিবেচনায় আনবেন।”
তবে কোনো ‘পৃথক আন্দোলন’ বা ‘পৃথক একটি ঘটনাকে’ আমলে না নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদ্যয় ও এর ইতিহাসসহ ‘সবকিছুর একটা প্রতিফলন থাকে’ যেন, সেই প্রত্যাশা জোবাইদা নাসরীনের।
“তবে এখানে এটাও বলা প্রয়োজন, যারা ভোট দিতে যাবেন না আওয়ামী ভোটারের বাইরেও নানা চাপের কারণে কিংবা সংখ্যালঘুরা যারা, তারা তো অত্যন্ত চাপ ও অস্বস্তি, নিরাপত্তাহীনতায় আছেন, তারাও কিন্তু এই নির্বাচনে একটা বড় ভূমিকা রাখবে।”