Published : 15 Feb 2026, 02:05 AM
আন্দোলন, নির্যাতন আর কারাবাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দুই দশক পর আবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। জনরায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার পাওয়া দলটির সামনে জনআকাঙ্ক্ষা আকাশসম, পর্বতসম প্রতিবন্ধকতার বেড়াজাল।
চব্বিশের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৈরি ভিন্ন বাস্তবতা আর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জঞ্জালের স্তূপের চাপও থাকছে যথারীতি। এতকিছুর মধ্যে দেশ পরিচালনার গুরুভার সহজ হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
রাজনীতির মাঠের বিভক্তি আর বিভাজন দূর করে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চ্যালেঞ্জও বড় হয়ে দেখা দেবে সরকার পরিচালনায় দলটির এবারের নেতা তারেক রহমানের সামনে।
দুই দশক আগে ২০০১ সালে বিএনপির ক্ষমতায় থাকার সময় সরকার বা দলের পদে না থাকলেও দেশ পরিচালনার কাজ কাছ থেকে দেখেছেন তিনি; প্রভাবও ছিল তার।
ক্ষমতার পালাবদলে এরপর দীর্ঘ নির্বাসনে দূরে ছিলেন। তবে দল পরিচালনার কাজে যুক্ত থেকেছেন নিবিড়ভাবে। দু:সময়ে দলেকে উজ্জীবিত রাখতে পালন করেছেন কান্ডারির ভূমিকা। পরিকল্পনার ছক একেছেন দেশকে ঘিরে।
দেড় দশকের নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফেরার দিনেই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে সেই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। এবার ভোটের জনরায়ে পেলেন রাষ্ট্র পরিচালনার ভার। স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব বর্তে গেল জনগণের ভালোমন্দ দেখভালের আর দেশকে এগিয়ে নেওয়ার।
চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় বসতে যাওয়া দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও জানেন দেশ পরিচালনায় তার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী কী। সাংবাদিকরা সামনে পেয়ে সেসব জানতে চাইলেন এসব বিষয়েও। তিনিও তুলে ধরলেন তার অগ্রাধিকার।
গত ২৫ ডিসেম্বরে দেশে আসার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলন করলেন শনিবার। নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কী করতে চান আর কী করবেন না দিলেন তার আভাসও। প্রতিশ্রুতি দিলেন নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের।
শপথের আগে রোববার স্থায়ী কমিটির বৈঠক করার কথা রয়েছে তার। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠন, সম্ভাব্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নির্বাচন-পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা নির্ধারণ আর নতুন সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে সেখানেও আলোচনা হওয়ার কথা।
এবার কেমন করবে বিএনপি
দুই দশক আগে ক্ষমতায় থাকার সময়কার সমালোচনা এখনও শুনতে হয় বিএনপিকে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালে সরকারে থাকা অনেকের নানা 'অনিয়ম দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির অভিযোগের কথা কম নয়। কথিত হাওয়া ভবন নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা ডালাপালা মেলে ক্ষমতায় থাকার ও পরের সময়গুলোতে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা কাটিয়ে কতটা জনমুখী হবে নতুন নেতার বিএনপি সেই আলোচনা অনেকের মাঝে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২০৯ আসনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসছে এবারের ভিন্ন বাস্তবতায় কেমন করবে বিএনপি?
নতুন সরকারের সামনের চ্যালেঞ্জগুলোই বা কী? সেগুলো কাটিয়ে দেশ চালাতে কী কী করতে পারে দলটি? আগের সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে দেশকে এগিয়ে নিতে আর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে কী শিক্ষা নেবে দলটি।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিসহ সেই চ্যালেঞ্জগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা থাকায় বিএনপি এসব চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হবে।
নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসে শনিবার বিকালে তারেক রহমানও দেশি বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেছেন চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “সিরিয়াস চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থনীতি ঠিক করা, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।”

নতুন বাস্তবতায় নতুন চ্যালেঞ্জ
ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নৌকাবিহীন নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে বিএনপি। দলীয় ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক ২০৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা পাচ্ছে দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামকে। ইসলামপন্থি দলটি পেয়েছে ৬৮টি আসন।
নির্বাচনে অনেকটা একতরফা জয় পেলেও ‘নতুন বাস্তবতায়’ সরকার পরিচালনার কাজটি এক তরফা হবে না বলেই মনে করছেন রাজনীতি ও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। দলটির সামনে যেসব সংকটের তালিকা নাগরিক সমাজ, ভোটার ও ব্যবসায়ীরা তুলে ধরছেন সেগুলোও দলটির কাছে পাহাড়সমই মনে হবে।
দেড় বছর ধরে অন্তবর্তী সরকারের করতে না পারা কাজগুলোর সঙ্গে দেড় যুগ ধরে দেশ পরিচালনা করা আওয়ামী লীগ সরকারের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকটও ভোগাবে সরকারপ্রধান হিসেবে নতুন ভূমিকায় আসতে যাওয়া তারেক রহমানকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত দিনে যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলো ‘একপাক্ষিক শাসনব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেছিল তা কাটিয়ে ওঠার চাপ ও প্রত্যাশা থাকবে সবার আগে। সঙ্গে আওয়ামী লীগের সঙ্গে চির বৈরিতার বিভেদ বা বিভাজনের রাজনীতি ঘুচিয়ে দেশকে এক করার চ্যালেঞ্জ হবে মুখ্য। এমন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর তাগিদকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা।
দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতের সঙ্গে ভোটের মাঠে শুরু হওয়া বৈরিতা কাটানোর মাধ্যমে বিভাজনের রাজনীতিকে দূরে ঠেলে তারেক দেশকে কোন পথে নিয়ে যাবেন সেই প্রত্যাশার কথাও বলেছেন অনেকে।
এর খানিক রেশ দেখা গেছে নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্যে। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘বাধ্য করা হলে রাজপথেও’ নামবেন তারা। সেদিন রাতে ডাকসু নেতারা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
রাজনীতির বিপরীতে প্রধান বাধা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজের স্থবিরতা কাটিয়ে গতি আনা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন অনিশ্চিত পরিবেশের কারণে বিনিয়োগ, উৎপাদনের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এর থেকে উত্তীর্ণ হতে বিএনপিকে শক্ত হাতে অর্থনীতিকে গতিশীল করার উদ্যোগ নিতে হবে।
তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে চড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত নিরাময় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করাসহ বহুমুখী চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হবে বিএনপিকে।

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, তারা অর্থনীতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, প্রশাসনে নিবিড় মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি উন্নয়নের অগ্রাধিকার ঠিক করেছেন।
তারা বলেন, ইতোমধ্যে নির্বাচনি বক্তব্যে তারেক রহমান এবং নির্বাচনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্যে এসেছে অর্থনীতি সচল, আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কথা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আগে ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা থাকলেও নতুন পরিবেশে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে দলটিকে।
“আমরা একটি বিভাজিত জাতি। ভাষা, সংস্কৃতিতে মিল হলেও চরম বিভক্তি, দ্বন্দ্ব, হানাহানি নির্ভর জাতি। এর থেকে উত্তরণ লাগবে কারণ বিভাজিত জাতি সামনে এগুতে পারে না। এজন্য বিএনপির ইশেতহারে যে রেইনবো ন্যাশন্সের কথা বলা হয়েছে, তা অর্জন চ্যালেঞ্জের হবে।”
ফলপ্রকাশের পর জামায়াত জোটের পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলো সামলানোকে প্রথম ধাক্কা বলে মনে করেন তিনি।
বদিউল আলম বলেন, “গত দেড় বছরে বিএনপির অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বসহ এসবের যদি মূলোৎপাটন করা না যায়, আগের সরকার যে পথে হেঁটেছে, সেদিকেই অভিযুক্ত হবে বিএনপি। সফলতার পথে বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।”
দুর্নীতিগ্রস্থ আমলা, রাজনীতিবিদ ও বড় ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করার তাগিদ দেন তিনি।
নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনেও এ প্রসঙ্গে বক্তব্য এসেছে তারেক রহমানের। তিনি বলেন, “সবাই যার-যার যোগ্যতা অনুযায়ী ব্যবসা করবে। কোনও বিশেষ মহলকে সুযোগ দিতে চাই না।”
রাজনীতির বিশ্লেষক খালিদুর রহমান বলেন, বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন অর্জন করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, এটি তাদের জন্য একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক অবস্থান নিশ্চিত করলেও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জকে একেবারে লঘু করে না।
বিএনপির সামনে রাজনৈতিক চাপ সম্পর্কে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, “জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে, যা রাজপথ ও ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি করে।
“যদি দলটি সক্রিয় বিরোধী শক্তি হিসেবে রাজপথমুখী কৌশল গ্রহণ করে, তাহলে তা সরকার পরিচালনায় বিএনপির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ চাপ সৃষ্টি করতে পারে।”
রাজনৈতিক চাপের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিচার ও দলটির রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়েও বিএনপিকে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছেন তিনি।
তিনি বলেন, “নিষিদ্ধ অবস্থায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর রাজনীতি পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক পরিসরে চাপ সৃষ্টি হতে পারে, এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যখন কৌশলগত বা নৈতিক ভুল করেছে, তখন প্রতিপক্ষের পুনরুত্থান ত্বরান্বিত হয়েছে।”
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও বিএনপির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন বদিউল আলম মজুমদার।
তার ভাষ্য, বিদেশিদের সঙ্গে মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক নির্ধারণ ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে স্বার্থের ভিত্তিতে একমুখী নতজানু সম্পর্কের উর্ধ্বে উঠে বিদেশ সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হবে।
নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেছেন, সব দেশের সঙ্গেই সমতার ভিত্তিতে তার নতুন সরকারের পলিসি নির্ধারণ হবে।

অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য সামলাতেও বেগ পেতে হবে
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মত অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানোর কঠিন কাজও করতে হবে নতুন সরকারকে।
ব্যবসায়ীরা চাইছেন দেশে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার পাশাপাশি রপ্তানি বাড়াতে শিল্পে জ্বালানি সংকট কাটাতে ত্বরিৎ পদক্ষেপ নেবে নতুন সরকার। ব্যবসার ব্যয় কমাতে উচ্চ সুদের হার কমানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার চান তারা।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, উদ্যোক্তা থেকে সাধারণ মানুষ সবাই চেয়েছিল একটা রাজনৈতিক সরকার আসুক। সাধারণ মানুষের কাছে এমন সরকারের যেমন জবাবদিহি থাকে, তেমনি বিনিয়োগের আস্থা বাড়ে।
এখন নির্বাচিত এ সরকারের কাছে শিল্পে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রত্যাশার কথা বলেন তিনি।
“সর্বোপরি কোনো ধরনের যেন দুর্নীতি না হয় সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখা,” যোগ করেন তিনি।
পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে এক বছরের ব্যবধানে দেশি কূপগুলো থেকে দৈনিক ১৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন কমে দৈনিক ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ সংকট কাটানোর চেষ্টা চলেছে। এতেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস মেলেনি।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী মালিকানার বহু শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ায় এবং বিনিয়োগ সেভাবে না বাড়ায় শিল্পে গ্যাস সরবরাহ খুব বেশি সংকট তৈরি করেনি। নতুন সরকারের সময়ে বিনিয়োগে চাঙ্গাভাব এলে গ্যাস সরবরাহে টানা পড়ার শঙ্কা তৈরি হতে পারে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতে স্বল্প সময়ে নতুন সরকার কতটুকু কী করতে পারবে তা নিয়ে সংশয়ের কথাও আসছে আলোচনায়।
এর সঙ্গে ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো, অর্থপাচার বন্ধ করে তারল্য সরবরাহ ঠিক রাখা, মূল্যস্ফীতি বাগে রেখে নীতি সুদহার কমানোর কাজগুলোও দক্ষতার সঙ্গে করতে হবে তারেক রহমানের সরকারকে।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের দৃষ্টিতে সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান তৈরি।
একই সঙ্গে বিএনপি তার ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার বিপরীতে যে প্রত্যাশা মানুষের তৈরি হয়েছে- তার ব্যবস্থাপনা অপর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি।
তিনি বলেন, “কারণ যে হারে অনেক বিচ্যুতি আর্থিক খাতে দেখা গেছে।সেটা তো আর রাতারাতি বদলাই যাবে না। কিন্তু তাদের ইশতেহারে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এখন তাদের ইমিডিয়েট চ্যালেঞ্জটা হলো এই প্রত্যাশাটাকে একটা বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে আসা।
“আমরা (বিএনপি) ইমিডিয়েটলি কী করতে যাব এবং সেটা করার ক্ষেত্রে সামনের বাজেটে কী প্রত্যাশা করতে পারি- সেটা নিয়ে একটা বাস্তবমুখী কর্মসূচির ধারণা আগে থেকে দিতে হবে। যাতে মানুষ বাজেট দেখে আবার হতাশ না হয়ে যায়।”

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে জিডিপির ৫ শতাংশ করে বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি বিএনপি দিলেও তা এখন কীভাবে সম্ভব- এমন প্রশ্ন তুলে তাদেরকে একটা ‘বাস্তবায়নযোগ্য’ বাজেট তৈরি করা এবং সেখানে গুরুত্ব কোন বিষয়গুলি দেবেন তা এখনই কর্মসূচির মধ্যে নিয়ে আসার কথা বলেন এ অর্থনীতিবিদ।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন ‘প্রভাবশালী’ ব্যবসায়ী এবং ‘অলিগার্ক’দের ‘কারসাজি’ বন্ধের সঙ্গে দলীয় কর্মীদের ‘চাঁদাবাজি’ বন্ধের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। দলীয় কর্মীদের শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে এসে মুক্তবাজার অর্থনীতি নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।
কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর ‘কাঠামোগত বাধাগুলো’ কাটানোর পরামর্শ তার।
তার ভাষ্য, “বড় বাধাগুলো আমার মতে তিন জায়গায়। একটা হলো ব্যাংকিং খাতে। দ্বিতীয় হলো জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতে বিশেষ করে গ্যাসের যে সংকট আর তৃতীয় হলো ট্রেড লজিস্টিক মানে বিশেষ করে বন্দরের যে সমস্যাগুলো আর এনবিআর এ সব থেকে যে ঝামেলাগুলো।”
ব্যাংক খাতের দূরাবস্থা কাটানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের ‘অতিমূল্যায়ন’ রোধে বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো সংশোধনে তাদের পদক্ষেপ কী হবে, গ্যাস সংকটে চাহিদা ব্যবস্থাপনা স্বল্প মেয়াদে কী হবে সেই কর্মসূচি থাকার কথা বলেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ বা ব্যবসায়ীদের মত প্রায় অমিল মন্তব্য এসেছে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মুখেও।
সরকারের ‘প্রথম চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের কথা বলেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। অন্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে তিনি আগের সরকারের সময় ‘নষ্ট’ করে ফেলা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পুনরুদ্ধার, বাংক লুট, সীমাহীন দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা, নিজেদের স্বার্থের ভিত্তিতে অন্য দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশার বিষয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা অজিত দাস বলেন, বিগত দেড় বছর যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ছিল বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন ও ইতিহাসকে মুছে দেওয়া, ‘মবের’ মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাপ তৈরি থেকে শুরু করে মানুষ হত্যা- এমন পরিস্থিতি যেন আর না ঘটে।
এক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারকে কঠিন হওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ’ এর মত পদক্ষেপও দেখতে চান না।
“সরকারি কাজের ক্ষেত্রে জনজীবনে যে দুর্ভোগ দেখেছি সে বিষয়ে সুস্থ, সুশৃংখল নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মপন্থা নতুন সরকার গঠন করবেন এ প্রত্যাশা।”
বিএনপি জোট সরকারের শেষ সময়ের দিকে ২০০৫ সালের মে থেকে ২০০৬ সালের জুলাই পর্যন্ত
পুলিশের মহাপরির্দশকের দায়িত্বে থাকা আব্দুল কাইয়ুম এখন দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য। তার পর্যবেক্ষণ, “চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। মানুষের মন, মানসিকতার পরিবর্তন এসেছে। মানুষ সত্যিকারের গণতন্ত্র দেখতে চায়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা চায়। মানুষ সম্মান চায়, তার পাওনা চায়।”
গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রতিবাদী ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগের মনমানসিকতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করা যাবে না। নতুন যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে দেশ চালাতে হবে। সেভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।