Published : 29 Jan 2026, 10:59 PM
গণভোটের প্রশ্নে ‘বিভ্রান্ত’ হওয়া নিয়ে ফেইসবুক পোস্টে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে আলাদা বিভাগ করার বিষয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
জুলাই সনদে থাকা কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে বিভাগ করার বিষয়টি আদৌ গণভোটের চার প্রশ্নের ভেতরে আছে কি-না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি।
গণভোটে যেভাবে এক প্রশ্নে ৮৪টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পক্ষে জনগণের অনুমোদন নেওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছে, তাতে ‘চালাকি’ দেখছেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ।
তার ভাষায়, “‘হ্যাঁ' ভোট দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে”– এটি একটি “বিভ্রান্তিকর এবং অসৎ দাবি।”
স্বাধীনতার পর দেশে চতুর্থবারের মত গণভোট হতে যাচ্ছে, যেখানে দেশের প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের সঙ্গে প্রবাসের লাখ দশেক ভোটার তাদের রায় দেবেন।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর জনগণের মতামত নিতে এই গণভোট। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য একটি ব্যালটের বাইরে গণভোটের জন্য একটি অতিরিক্ত ব্যালট পেপার দেওয়া হবে।
সেখানে লেখা থাকবে: “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?” (হ্যাঁ/না)

এরপর ওই ব্যালটে চারটি প্রশ্ন থাকবে।
ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।”
এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে ভোটার মতামত জানাবেন।
এসব প্রশ্নের মধ্যে ৮৪টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কথা আসিফ সালেহ লিখলেও তার এই বক্তব্য সঠিক না হওয়ার কথা বলেছে সরকারি বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি)।
পিআইবি পরিচালিত ‘বাংলা ফ্যাক্ট’ ফেইসবুক পাতার এক ফটোকার্ডে বলা হয়েছে, “জুলাই জাতীয় সনদে ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাব সংবিধান সংস্কারের সাথে সম্পর্কিত। কেবল এগুলোর ওপরই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
“এই প্রস্তাবগুলোকেই সংক্ষেপে গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপন করা হবে। কুমিল্লা-ফরিদপুর বিভাগ হওয়াসহ বাকি ৩৭টি প্রস্তাব গণভোটের অংশ নয়।”
ওই ফটোকার্ডে আসিফ সালেহকে আক্রমণও করা হয়েছে, বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগের গবেষণা সেল সিআরআই-এর ম্যাগাজিন হোয়াইট বোর্ডের পরামর্শক পর্ষদের সদস্য’ ছিলেন তিনি।

কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গণভোটের প্রশ্নে নেই
রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ১৭টি বিষয়ে ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের পূর্ণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে ৮৪ দফার জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
৮৪টি দফার মধ্যে যেসব বিষয়ে যে রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো রেখে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ওই সনদ স্বাক্ষর হয় গত ১৭ অক্টোবর।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের যে ৮৪ দফা, তার মধ্যে ৪৭টি বিষয়কে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’ এবং বাকি ৩৭টি বিষয়কে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’ হিসাবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয় সে সময়।
সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে যে সংস্কার, সেগুলো বাস্তবায়নের একটি উপায় হিসাবে গণভোটের বিষয়টি আসে। রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ পেরিয়ে ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
প্রথমে ৪৭টি বিষয়কে সংবিধান সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত ধরা হলেও পরে আদেশের আওতায় আরেকটি যুক্ত করা হয়।
সেটি হচ্ছে, “সংসদ, সংসদের কমিটি এবং সদস্যদের অধিকারের সীমা ও দায় সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন: সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৮(৫) সংশোধন সাপেক্ষে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদের কমিটিসমূহ ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার, অধিকারের সীমা এবং দায় নির্ধারণ করা হবে।”
জুলাই সনদের ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে আলাদা বিভাগ করার কথা থাকলেও সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত যে ৪৮টি বিষয়ে গণভোট হচ্ছে, সেখানে এ বিষয়টি নেই।
সরকারি ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে’ সংস্কার সংক্রান্ত বিষয় হিসেবে এ বিষয়টি গণভোটের বাইরে রাখা হয়েছে।
জুলাই সনদের ৬৮ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, “কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন: ভৌগোলিক অবস্থান ও যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে ২ (দুই)টি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করা হবে।”
জানতে চাইলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮টি দফা বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি নিতে গণভোট হচ্ছে। এর মধ্যে কুমিল্লা ও ফরিদপুর আলাদা বিভাগ করার বিষয় নেই।
“আর সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত দফাগুলোর বাইরে যেগুলো, সেগুলোর সংস্কার কাজ সরকার আইন বা অধ্যাদেশ, বিধি কিংবা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করবে।”
সামগ্রিকভাবে জুলাই সনদের ওপর জনগণের মনোভাব গণভোটের মধ্য দিয়ে আসবে মন্তব্য করে ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এটা নিয়ে জনগণের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি আছে, কমিশনের সদস্যরাও সেটা স্বীকার করেন। তবুও প্যাকেজ আকারে এটা দিতে হয়েছে, প্রতিটি ইস্যু ধরে গণভোট করার সুযোগ যেহেতু নেই।”

আন্দোলন-বিতর্ক পেরিয়ে গণভোটের প্রশ্ন
সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অস্পষ্টতা আর কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বয়কটের মধ্যে ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে সই করে অন্তর্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ২৫টি রাজনৈতিক দল। পরে আরও একটি দল সনদে সই করে।
বাস্তবায়ন পদ্ধতি না থাকায় সনদে সই করেনি গণঅভ্যুত্থানে সামনে সারিতে থাকা নেতাদের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি। আর সনদে থাকা কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে সই করেনি বামধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
জুলাই সনদ সই হওয়ার ১২ দিনের মাথায় ২৮ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ হস্তান্তর করে ঐকমত্য কমিশন।
দুই বিকল্প দিয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি এবং এর আলোকে গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের কথা বলা হয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে।
কিন্তু এই বিকল্পের মধ্যে জুলাই সনদের বিভিন্ন দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট উল্লেখ না করায় তীব্র আপত্তি জানায় বিএনপি। প্রস্তাবিত গণপরিষদকে সময় বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি তুলে দলটি বলে, কমিশন তাদের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করেছে।
এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট এবং প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের আলোকে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে আন্দোলনে নামে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠনের পক্ষে থাকলেও বিএনপি চাচ্ছিল, উচ্চকক্ষ গঠন হবে নিম্নকক্ষে নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যানুপাতে। জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের দাবিকে নির্বাচন পেছানোর ‘ষড়যন্ত্র’ হিসাবে বর্ণনা করছিল দলটি।
দুই রাজনৈতিক শিবিরের বিরোধপূর্ণ অবস্থার মধ্যে ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দেন, একইদিনে হবে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট।
গণভোটের প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আগের সুপারিশের বাইরে এসে মাঝামাঝি একটা অবস্থান নিতে দেখা যায় তাকে।
একটি প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের যে সুপারিশ কমিশন করেছিল, সেখান থেকে চারটি প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের ঘোষণা ওই ভাষণে তিনি দেন।
পুরোনো খবর:
'হ্যাঁ' ভোট দিলেই পরিবর্তন আসবে–এমন দাবি বিভ্রান্তিকর, অসৎ: আসিফ সালেহ
জুলাই সনদ: তিন কুল রেখেও 'মন পাচ্ছেন না' ইউনূস
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি, গণভোটে কী প্রশ্ন
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে: প্রধান উপদেষ্টা
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে রাষ্ট্রপতির সই: রাষ্ট্রপতির দপ্তর
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে জুলাই সনদ 'লঙ্ঘিত' হয়েছে: সালাহউদ্দিন