কঙ্গোয় ইবোলায় মৃত্যু ৪ হাজার পার, সেনাসদস্যদের আগুনে পুড়ল চিকিৎসা কেন্দ্র
সেনাসদস্যরা ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং বকেয়া বেতনের দাবিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনের ফলে পরিস্থিতি চরম সংকটময় রূপ নিয়েছে দেশটিতে।
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় ইবোলা মহামারীতে মৃতের সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়া এই ইবোলা প্রাদুর্ভাব সামলাতে কর্তৃপক্ষ যখন হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই সেনাসদস্যরা একটি চিকিৎসা কেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
এবিসি নিউজ লিখেছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বকেয়া বেতনের দাবিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন, যার ফলে মহামারী রোখার চেষ্টা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
বৃহস্পতিবার কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মে দেশটির পূর্বাঞ্চলে মহামারী ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ৮,৩০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪,০১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যেই প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্র ইটুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়াতে বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ইবোলা তদারকি দলের সদস্যরা।
অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বেতন না পেয়ে তারা ‘টাকা নেই, তথ্য নেই!’ এবং ‘মাসের পর মাস বেতন বন্ধ’ লেখা ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নামেন।
সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় রোগীদের তথ্য সংগ্রহ ও চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে এবিসি নিউজ।
এমন সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই বুনিয়ার উপকণ্ঠে কিগনজে এলাকার একটি আশ্রয়শিবিরে সেনাসদস্যরা অস্ত্র খুঁজতে গিয়ে সেখানকার ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডের পর আশ্রয়শিবিরে থাকা প্রায় ১৯ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ জীবন বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে জাতিসংঘের সিনিয়র ইবোলা সমন্বয়ক জুলিয়েন হার্নেস বলেন, “একটি চিকিৎসা কেন্দ্র হারানো মানে বড় ধরনের ক্ষতি; আমাদের আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, এর ফলে আক্রান্ত মানুষগুলো তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।”
এদিকে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ (এমএসএফ) জানিয়েছে, কঙ্গোয় ইবোলা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত তাদের এক কর্মী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
তাকে চিকিৎসার জন্য বিশেষ বিমানে নেদারল্যান্ডসের লেডেন ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের আইসোলেশন ইউনিটে নেওয়া হয়েছে। এমএসএফ সতর্ক করে বলেছে, কঙ্গোয় এই সংকটের মানবিক বিপর্যয় অভূতপূর্ব রূপ নিয়েছে। এই মহামারীতে দেশটিতে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
অবশ্য সংকট সামাল দিতে বুতেম্বোসহ বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ গবেষণাগার বা ‘মোবাইল ল্যাব’ ব্যবহার করা হচ্ছে।
বুতেম্বোর চিকিৎসা কেন্দ্রের চিকিৎসক লোটা কালুবি জানান, আগে যেখানে পরীক্ষার ফলাফলের জন্য ৭২ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হত, এখন মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যেই রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। এতে জরুরি প্রয়োজনে ল্যাব স্থানান্তরিত করে দ্রুত পরীক্ষা চালানো সম্ভব হচ্ছে।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, সীমিত সম্পদ নিয়ে এই মহামারী সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ মহামারীকেও (১১ হাজার মৃত্যু) ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে আফ্রিকা সিডিসি জানিয়েছে, নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কাগজে-কলমে কিছুটা কম দেখা যাচ্ছে; জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে যেখানে সপ্তাহে গড়ে ৮৫০ জন আক্রান্ত ও ৪৭০ জনের মৃত্যু হচ্ছিল, সেপ্টেম্বরে তা কমে সপ্তাহে গড়ে ৪৯০ জন আক্রান্ত ও ২৩০ জনের মৃত্যুতে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু এই হার কমা মূলত নিরাপত্তাহীনতা ও স্থানীয়দের অসহযোগিতার কারণেই ঘটছে। ইবোলা প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনার পক্ষে কথা বলায় সম্প্রতি এক স্থানীয় রাজনীতিককে পিটিয়ে হত্যা করেছে উত্তেজিত জনতা।
মূলত রোগটিকে ‘ভুয়া’ মনে করা এবং সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অবিশ্বাসের কারণে ইবোলা নিয়ন্ত্রণ করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
