রুশ তেলে নিষেধাজ্ঞায় বাজার চাঙ্গা পুরনো ট্যাংকারের

রুশ তেলের বেঁধে দেওয়া মূল্যসীমা কীভাবে কার্যকর হবে সে বিষয়ে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় কিছু নির্দেশনা দিলেও শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Dec 2022, 12:54 PM
Updated : 6 Dec 2022, 12:54 PM

রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ব্যবসায় লাগাম টানতে পশ্চিমাদের মরিয়া চেষ্টার মধ্যে তেল বহনে সক্ষম পুরনো ট্যাংকারের বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া ও নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া এড়াতে পশ্চিমা নৌযান কোম্পানিগুলো যখন রাশিয়ার তেলের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা মেনে চলতে অবিচল, তখন নতুন কোম্পানিগুলো ওই শূন্যস্থান পূরণে ঢুকে পড়ছে।

এর পাশাপাশি তারা এমন সব পুরনো ট্যাংকারও সংগ্রহ করছে, স্বাভাবিক সময়ে যেগুলো বাতিলের খাতাতেই ফেলে দেওয়া লাগতো বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সোমবার থেকে সমুদ্রপথে অপরিশোধিত রুশ তেলের আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে; এর ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারি থেকে জ্বালানি আমদানিও নিষিদ্ধ হওয়ার কথা।

জোটভুক্ত দেশগুলোর কোম্পানি ও ব্যক্তিদের ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের উপরে কেনা অপরিশোধিত রুশ তেলের চালান অন্যত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে অর্থায়ন, কেনাবেচা, পরিবহন ও বিমা করার উপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইইউ; এটিও সোমবার থেকেই কার্যকর হয়েছে।

রয়টার্স লিখেছে, ভারত ও চীনে রাশিয়ার তেল পাঠাতে আগ্রহী নৌযানের গগনচুম্বী ভাড়ার সুযোগে পকেট ভরা মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে গ্রিক ও নরওয়ের মালিকরা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেকর্ড দামে পুরনো ট্যাংকার বেচেছেন।

সুইজারল্যান্ডের ফাইন্যান্সিয়াল হাব জেনিভা থেকে পরিচালিত ফ্র্যাক্টাল শিপিংয়ের মতো ট্যাংকার ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোও এ পরিস্থিতির ফায়দা লুটছে। 

বছরখানেকেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্র্যাক্টাল দুবাইতে ২৩টি তেল ও জ্বালানি ট্যাংকার জড়ো করতে পেরেছে, যেগুলোর বেশিরভাগই বাল্টিক ও বাল্টিক সমুদ্রবন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে এশিয়া যাচ্ছে বলে দেখাচ্ছে রেফিনিটিভ এইকনের জাহাজ ট্র্যাকিং প্রযুক্তি।

ফ্র্যাক্টালের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ ফিলিপিস বলেন, বিশ্বজুড়ে যত ট্যাংকার আছে সেগুলোর ওপর চাপ বাড়বে এবং নৌযান ও নৌপথে মাল পরিবহনের খরচ মহামারীর সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যাবে বুঝতে পেরে বছরখানেক আগেই তিনি পুরনো ট্যাংকার জোগাড়ের ভাবনা কার্যকরে নামেন।

কিন্তু চলতি বছরের মাঝামাঝি নৌযানগুলোর নতুন মালিকরা তাকে রুশ তেলের ব্যবসায় যেতে চাপ দিতে থাকেন।

“অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরে আমাদেরকে বিপুল সংখ্যক ট্যাঙ্কার দেওয়া হয়। যারা সেগুলো দিয়েছেন, তারা আমাদের রাশিয়ার তেলের ব্যবসায় যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা নিতে বলেন,” বলেছেন দীর্ঘদিন ধরে শিপিং ইন্ডাস্ট্রিতে থাকা এ ব্যক্তি।

বড় বড় পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলো সাধারণত ১৫ বছরের পুরনো ট্যাংকার ব্যবহার বন্ধ করে দেয়; সেসব ট্যাংকারের বেশিরভাগই পরে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ফ্র্যাক্টালের বহরে এখন যত ট্যাংকার আছে, তার সবগুলোই ১৩ থেকে ১৯ বছর ব্যবহৃত হয়েছে বলে কোম্পানিটির ওয়েবসাইটেই দেখা যাচ্ছে।

নতুন কোম্পানিগুলো যখন রাশিয়ার তেলের ব্যবসার ভাগ পেতে আগ্রহী হয়ে উঠছে, তখন সেকেন্ড-হ্যান্ড তেলের ট্যাংকারের দামও লাফিয়ে বাড়া শুরু করেছে। বিশেষ করে, অনেকেই আফ্রাম্যাক্সের নৌযানগুলোর ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন, যেগুলো সর্বোচ্চ ৬ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল বহন করতে পারে। এই ট্যাংকারগুলো রাশিয়ার বাল্টিক বন্দরে অপরিশোধিত তেল লোডিংয়ের জন্যও সবচেয়ে উপযুক্ত।

আফ্রাম্যাক্সের ২০ বছর বয়সী ট্যাংকারের দাম ১ জানুয়ারিতেও ছিল এক কোটি ১৮ লাখ ডলার, এখন সেই দাম ৮৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ২০ লাথ ডলারে, বলছে মূল্য নির্ধারণকারী কোম্পানি ভেসেলসভ্যালু।

এখন পর্যন্ত চলতি বছর আফ্রাম্যাক্সের এ ধরনের ১৪৮টি ট্যাংকার বিক্রির খবর মিলেছে, ২০২১ সালের একই সময়ের তুলনায় যা ৫ শতাংশ বেশি।

সোমবার পর্যন্ত এশিয়ার বাজারে তেল পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না, সুতরাং ফ্র্যাক্টাল এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপক কোম্পানিগুলোকে নিয়ম ভঙ্গকারী বলা যাবে না।

ফ্র্যাক্টাল এমনকী কোনো রুশ মালিকানাধীন কোম্পানির সঙ্গেও লেনদেন করেনি, যার ফলে সমুদ্র বাণিজ্যে অর্থায়নকারী পশ্চিমা ব্যাংকগুলোরও আমাদের ক্ষেত্রে আপত্তি থাকার কথা নয়, বলেছেন ফিলিপস।

রুশ তেলের দাম বেঁধে দেওয়ায় ফ্র্যাক্টালের মতো কোম্পানিগুলো যতক্ষণ ৬০ ডলারের নিচে কেনা রাশিয়ার তেল পরিবহন করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের এমনিতেও কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না।

ট্যাংকারগুলোর নতুন মালিকরা মূলত রুশ তেল পরিবহন করে দু-হাতে টাকা কামাতে চাইছেন।

“ভূমধ্যসাগরে প্রতিদিন ৮০ হাজার ডলার আয় করা নৌযানগুলো প্রতিদিন এক লাখ ৩০ হাজার ডলার আয় করতে পারছে, যদি তারা রুশ তেল পরিবহনে নামে,” বলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী।

মহামারীর কারণে চাহিদা কমে যাওয়ায় জ্বালানি সংরক্ষণে ট্যাংকারের উপর তেল কোম্পানিগুলোর নির্ভরশীলতা বাড়ায় ২০২০ সালে অল্প কিছুদিন অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকারের দাম বেড়ে গিয়েছিল। ওই সময়টুকু বাদ দিলে এখন ট্যাংকারের যে দাম, ২০০৮ সালের পর আর কখনোই তেমনটা দেখা যায়নি।

বিনিয়োগ ব্যাংক জেফেরিসের বিশ্লেষক ওমার নোকতা জানিয়েছেন, এখন কোনো কোনো যাত্রায় ট্যাংকারগুলো দিনপ্রতি এক লাখেরও বেশি ডলার কামাতে পারছে।

“তেলের দামের মূল্যসীমা নির্ধারণ রাশিয়ার রপ্তানির উপর কেমন প্রভাব ফেলবে তা সামনে দেখা যাবে, কিন্তু যেটা স্পষ্ট সেটা হচ্ছে, তেলের ট্যাংকারের উপর চাপ বাড়ছে এবং সেগুলোকে এখন দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে হচ্ছে,” বলেছেন তিনি।

বাল্টিক ও কৃষ্ণ সাগর থেকে রুশ তেল এশিয়ায় পৌঁছে দিতে ট্যাংকারগুলোর এখন কয়েক সপ্তাহ লাগে। আগে রাশিয়ার তেলের ‍মূল ভোক্তাই ছিল ইউরোপ, সেসময় ট্যাংকারগুলোর যাত্রাপথ ছিল মাত্র কয়েকদিনের।

মহামারীর কারণে নৌযান নির্মাণও থমকে আছে; এমনকী আগামী বছরও খুবই অল্প সংখ্যক তেলের ট্যাংকার ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছেন নৌযান কেনাবেচায় জড়িত ব্যবসায়ীরা। 

রেফিনিটিভ এইকনের নৌযান ট্র্যাকিংয়ের তথ্য দিয়ে রয়টার্স ফ্র্যাক্টালের ১৮টি ট্যাংকারের গতিপথ পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে ১২টিই গত ২ মাসের মধ্যে রুশ বন্দুরগুলোতে তেল লোড করেছে।

এই ট্যাংকারগুলো হয় প্রথমবার, নয়তো ইউক্রেইন যুদ্ধের পর প্রথমবার অথবা এক বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবার ‍রুশ বন্দর থেকে তেল নিয়েছে বলে দেখাচ্ছে রেফিনিটিভ এইকনের তথ্য।

দুটি ট্যাংকার নিয়মিত বিরতিতেই রুশ বন্দরগুলোতে ভিড়ছে।

ফ্র্যাক্টালের ব্যবস্থাপনায় থাকা চার্ভি ট্যাংকার সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি রাশিয়ার বাল্টিক বন্দর প্রিমরস্ক থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে পরে ভারতের সিক্কায় গিয়ে মাল খালাস করে।

এই ট্যাংকার আগে ছিল নরওয়ের ভিকেন শিপিংয়ের মালিকানাধীন, নাম ছিল স্ট্রভিকেন। এর আগে এটি কখনোই রুশ বন্দরে যায়নি বলে ২০১০ সাল থেকে রেফিনিটিভ এইকনের তথ্য বলছে।

ডাফনে ৫ নামের আরেকটি ট্যাংকারও একসময় ভিকেন শিপিংয়ের মালিকানাধীন ছিল, এখন এটি ফ্যাক্টালের ব্যবস্থাপনায়। এই ট্যাংকারও ইউক্রেইনে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম নভেম্বরের ১১ তারিখ প্রিমরস্কে যায় এবং এশিয়ার পথে সুয়েজ খালের দিকে যাত্রা করে।

হাতবদল হওয়ার আগে ট্যাংকারটির নাম ছিল ক্রনভিকেন।

ভিকিং শিপিং জানিয়েছে, তারা তাদের নৌযানগুলো রুশ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেনি। অবশ্য নৌযানগুলোর নতুন ক্রেতারও নাম জানায়নি তারা।

রুশ তেলের বেঁধে দেওয়া মূল্যসীমা কীভাবে কার্যকর হবে সে বিষয়ে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় কিছু নির্দেশনা দিলেও শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

রাশিয়া বলেছে, তারা মূল্যসীমা মেনে চলবে, এমন কারও কাছে তেল বিক্রি করবে না। সে হিসেবে অনেক জায়গায় তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে, অনেকে এমনকী নিষেধাজ্ঞা অমান্যের পথেও হাঁটতে পারে।

নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে ভেনিজুয়েলা ও ইরানের তেল রপ্তানি করেছে এমন নৌযানগুলোর চাহিদাও বাড়তে পারে। এ ধরনের অনেক নৌযান এরই মধ্যে রাশিয়ার তেলের ব্যবসায়ও এসে পড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

“মূল্যসীমা নির্ধারণ খুবই বিভ্রান্তিকর। অবশ্যই আমরা রাশিয়ার তেল নিয়ে ব্যবসা করে যাওয়া কোম্পানি হতে চাই। ব্যবসায়ী হিসেবে আপনাকে লাভ করতেই হবে,” বলেছেন ফ্র্যাক্টালের ফিলিপস।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক