Published : 17 Sep 2026, 11:35 PM
২০১২ সালে সিরিয়ায় নিখোঁজ হওয়া মার্কিন সাংবাদিক অস্টিন টিসকে সুপরিকল্পিত অভিযান চালিয়ে অপহরণ করা হয়েছিল, যার ছক কষা হয়েছিল এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।
অপহরণ অভিযানে জড়িত দলের সাবেক এক সদস্য দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সাবেক মেরিন ক্যাপ্টেন ও সাংবাদিককে তুলে নেওয়ার অভিযানে তৎকালীন সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরাসরি অনুমোদন ছিল।
অস্টিনকে তার পরিচিত ও অত্যন্ত বিশ্বস্ত এক চালকের গাড়িতে উঠতে দেখা গিয়েছিল। এতদিন ধরে ধারণা করা হত, গাড়িটি হয়ত সরকারি কোনো তল্লাশি চৌকির সামনে পড়েছিল এবং সেখান থেকেই আকস্মিকভাবে তাকে আটক করা হয়।
তবে বিবিসি-র অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, তার উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মোটেই আকস্মিক কোনও ঘটনা ছিল না।
‘হয়ার ইজ অস্টিন টিস?’ (অস্টিন টিস কোথায়?) শীর্ষক নতুন এক অনুসন্ধানী পডকাস্ট সিরিজে এসব অজানা তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিসি।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনপড়ুয়া ও সাবেক মার্কিন মেরিন ক্যাপ্টেন অস্টিনকে নিখোঁজ হওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে চোখ বাঁধা ও চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল।
১২ বছর পর বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হলে সিরিয়ার বিভিন্ন কারাগার থেকে হাজার হাজার বন্দি মুক্তি পান, তবে তাদের মধ্যে অস্টিন টিস ছিলেন না। গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া বিভিন্ন গোপন আস্তানার স্থানাঙ্ক ধরে মার্কিন কর্তৃপক্ষ তাকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে খুঁজেছে, কিন্তু কোনও সন্ধান পায়নি।
সিরিয়ার সাবেক এক সামরিক কমান্ডার দাবি করেছেন অস্টিনকে মেরে ফেলা হয়েছে, তবে অনেকে এই দাবি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং তার কোনো মরদেহও পাওয়া যায়নি। তবে আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শত শত পৃষ্ঠার অভ্যন্তরীন নথি উদ্ধার করা হয়েছে, যা অস্টিনকে আসাদ সরকারই আটকে রেখেছিল বলে প্রথম নিশ্চিত প্রমাণ দেয়।
২০১২ সালের অগাস্টে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের সময় দামেস্কের নিকটবর্তী দারায়া থেকে অস্টিন টাইস নিখোঁজ হন।
অস্টিনকে কীভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং এর পেছনে কারা ছিল, তা জানতে আসাদ সরকারের অনুগত মিলিশিয়া বাহিনী ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সেস’-এর (এনডিএফ) সাবেক সদস্য আবু আলির সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি।
তিনি জানান, অস্টিনের গাড়িচালক ( এই চালক বেশ কিছুদিন ধরে আসাদ সরকারকে গোপন তথ্য দিচ্ছিল) এনডিএফ- এর এক জ্যেষ্ঠ সদস্যকে জানান যে, অস্টিন বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘুরে প্রতিবেদন তৈরি করছেন। বিপজ্জনক এলাকাগুলোতে গিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের জন্য নিয়মিত খবর লিখছিলেন তিনি।
গাড়িচালক এনডিএফ-এর যে সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তিনি ছিলেন আসাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও এনডিএফ প্রধান বাসাম আল-হাসানের ভাগ্নে সাকর রুস্তম। এই তথ্য হাসানের কাছে পৌঁছানোর পর তিনি সরাসরি প্রেসিডেন্ট আসাদকে ফোন করেন।
আবু আলির দাবি অনুযায়ী, আসাদ ফোনে নির্দেশ দেন, “তাকে আমাদের কাছে নিয়ে এসো।”
তবে অস্টিনকে সঙ্গে সঙ্গেই ধরা হয়নি। গাড়িচালক পরামর্শ দেন, অস্টিন কী করছেন সে বিষয়ে আরও তথ্য পেতে কিছু দিন নজরদারি চালিয়ে যাওয়া দরকার। সামরিক প্রশিক্ষণ থাকায় অস্টিন মাঝে মাঝে বিদ্রোহীদের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ দিতেন, যা দেখে আসাদের অনুগতরা তাকে সাংবাদিকের চেয়ে কোনও গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) এজেন্ট মনে করেছিল।
নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে, গাড়িচালক অস্টিনের ম্যাকবুক, স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার ও অন্যান্য জিনিসপত্রভর্তি ব্যাকপ্যাক লুকিয়ে এনডিএফের কাছে জমা দেন পরীক্ষার জন্য।
২০১২ সালের ১১ অগাস্ট দামেস্কের কাছে বিদ্রোহীদের একটি নিরাপদ আস্তানায় ৩১তম জন্মদিন উদযাপন করেন অস্টিন। সেখানে সুইমিং পুল, ফ্রি সিরিয়ান আর্মির যোদ্ধা, টেলর সুইফটের গান ও হুইস্কি ছিল। নিজের শেষ টুইটে তিনি লিখেছিলেন, “এক কথায় এটি জীবনের সেরা জন্মদিন।”
এরপর লেবানন যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন অস্টিন। কিন্তু তাকে নিরাপদ স্থানে না নিয়ে গাড়িচালক সরাসরি দামেস্কের উপকণ্ঠে তাহুনেহ এলাকার এক সরকারি স্থাপনায় নিয়ে যান, যেখানে এনডিএফ সদস্য আবু আলি আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন।
ভবনের ফটকে পৌঁছাতেই চালক গাড়ি থামিয়ে অস্টিনের দিকে পিস্তল তাক করেন। অস্টিন প্রথমে ভেবেছিলেন তিনি মজা করছেন, কিন্তু সত্য উপলব্ধি করার পর চেক বই বের করে গাড়িচালককে যেকোনো পরিমাণ অর্থ দেওয়ার আকুতি জানান।
কিন্তু এনডিএফের সদস্যরা তখনই তাকে ধরে চোখ বেঁধে ফেলে। আবু আলি জানান, মার্কিন সাংবাদিককে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়টি তখনই ফোন করে প্রেসিডেন্ট আসাদকে নিশ্চিত করেন হাসান।
বহু বছর ধরে গাড়িচালকের পরিচয় রহস্যে ঘেরা ছিল। বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে আসে, সেই চালক ছিলেন হামিদ আবু ওবেইদ, যিনি হোমসের গাজা থেকে আসা ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারের সন্তান।
পারিবারিক দারিদ্র্য ও সিরীয় নাগরিকত্ব না থাকায় তাকে নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট, বাড়ি ও অস্ত্রের প্রলোভন দিয়ে এই বিশ্বাসঘাতকতা করানো হয়েছিল। কিন্তু অপহরণের পর তাকে কেবল একটি পিস্তল দেওয়া হয়।
আসাদ সরকারের পতনের পর, ঘটনাটি মার্কিন দূতাবাসে ফাঁস করে দেওয়ার হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে অর্থকড়ি নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান আবু ওবেইদ। বর্তমানে তারও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
অস্টিনের মা ও পরিবারের সদস্যরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যেভাবে স্বজনের খোঁজে পথ চেয়ে আছেন, ঠিক একইভাবে নিখোঁজ চালক আবু ওবেইদের পরিবারও এখন তার সন্ধানে দিন গুনছে।