২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫ কার্তিক ১৪৩৩

কর্মক্ষেত্রে ‘উপযুক্ত বিরতির’ দাবি জানাচ্ছেন চীনের কর্মীরা

অতিরিক্ত খাটুনি, কম বেতন ও দুর্বল শ্রম সুরক্ষার প্রতিবাদে কর্মীরা এবার সাধারণ পণ্য ও সেবা বর্জনের ডাক দিয়েছেন।

কর্মক্ষেত্রে ‘উপযুক্ত বিরতির’ দাবি জানাচ্ছেন চীনের কর্মীরা

গত বছর বেইজিংয়ের শিচাহাই এলাকায় চীনের জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে আট দিনব্যাপী ছুটির প্রথম দিন চীনা পতাকায় সজ্জিত একটি দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন রিকশাচালকরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Sep 2026, 03:21 PM

Updated : 29 Sep 2026, 03:21 PM

অক্টোবরের শুরুতে টানা সাত দিনের জাতীয় দিবসের ছুটির কারণে হওয়া উৎপাদনের ব্যাঘাত পোষাতে তার আগে ও পরের সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়তি কাজ করানোর ব্যাপকভাবে প্রচলিত রীতি নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন চীনের কর্মজীবীরা।

অতিরিক্ত খাটুনি, কম বেতন ও দুর্বল শ্রম সুরক্ষার প্রতিবাদে কর্মীরা এবার সাধারণ পণ্য ও সেবা বর্জনের ডাক দিয়ে সরাসরি নিয়োগকর্তাদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরির নতুন কৌশল নিয়েছেন।

চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে ‘ছুটির বদলে ক্ষতিপূরণমূলক অতিরিক্ত কাজের বিরুদ্ধে ওঠা আওয়াজ উপেক্ষা করা যায় না’ শীর্ষক বিষয়টি ৩৬ কোটি বারের বেশি দেখা হয়েছে এবং এটি নিয়ে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি আলোচনা হয়েছে।

জাতীয় দিবসের ছুটির আগে পর্যটন খাতের ২৭ বছর বয়সী কর্মী সুজি লি বলেন, “সাপ্তাহিক ছুটি কেড়ে নিয়ে টেনেহিঁচড়ে বানানো এই ছুটির দিনগুলোতে আমি ভ্রমণ করব না, খাবার অর্ডার দেব না, এমনকি ট্যাক্সিতেও উঠব না। কোনো কেনাকাটাই করব না। কারণ যে নিয়ম আমার পাওনা ছুটি কেড়ে নেয়, তার পেছনে আমি এক টাকাও খরচ করবো না।”

এই নিয়মকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা’ জড়িত থাকায় নীতিনির্ধারকরা এটি বন্ধ করছেন না।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অসন্তোষের মূলে আছে চীনের ক্রমবর্ধমান রপ্তানি নির্ভর প্রবদ্ধি মডেল, যা ব্যয় ও পণ্যের দাম কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার তীব্র প্রতিযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর ফলে একদিকে মজুরি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়, অপরদিকে ওভারটাইমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

রয়টার্স লিখেছে, শ্রম অধিকার আদায়ে কর্মীরা নিজেদের কেনাকাটার ক্ষমতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা বেইজিংয়ের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে বন্টনের জন্য বেইজিংয়ের ওপর ক্রমশ চাপ বাড়ছে।

এই ক্ষোভ কেবল অনলাইনেই সীমাবদ্ধ নেই, তার প্রমাণ সুপ্রিম পিপলস কোর্টের তথ্যেও মেলে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে ৬ লাখ ৪৮ হাজার শ্রম বিরোধের মামলা আদালতে গড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৭.৫ শতাংশ বেশি।

নিউ জার্সির রুটগার্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মিংওয়েই লিউ বলেন, “এটি এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত, যা চীনা অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সংকটকে উন্মোচিত করছে। আগে বেশি খাটার বিনিময়ে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যেত, তা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। পদোন্নতি, মজুরি বৃদ্ধি বা চাকরির নিশ্চয়তা কমে গেলেও অতিরিক্ত কাজের চাপ কমেনি।”

এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে চীনের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘সাইবারস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব চায়না’ কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

চলতি মাসের শুরুতে একটি অটোল্যাম্প উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হঠাৎ ১০৭ জন তরুণ কর্মীকে ছাঁটাই করলে গ্রাহকদের আপত্তির মুখে ফোল্কসভাগেনসহ অন্য বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে বাধ্য হয়। এর আগে আগস্টে বিনা মজুরিতে অতিরিক্ত খাটুনির প্রতিবাদে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে অভিযোগ জানানোর পরামর্শও ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে।

গত জুলাইয়ে উইচ্যাট অ্যাপে ‘উইকেন্ড অফ শপিং’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়, যেখানে যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মীদের সপ্তাহে দুদিন পূর্ণ ছুটি দেয় তাদের তালিকা তৈরি করা হতো, যাতে মানুষ কেবল তাদের কাছ থেকেই কেনাকাটা করে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ব্যবহারকারী যুক্ত হওয়ার পর সেপ্টেম্বরে নানা অজুহাতে অ্যাপটি বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অ্যাপ নিয়ে অনুসন্ধান করলেও কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

চীনভিত্তিক ইন্টারনেট নজরদারি সংস্থা ‘চায়না ডিজিটাল টাইমস’-এর প্রতিষ্ঠাতা শিয়াও চিয়াং বলেন, সেন্সরশিপের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে সরকার এই আন্দোলনকে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করার এক ‘সৃজনশীল প্রতিরোধ’ হিসেবে দেখছে।

তবে অ্যাপটি বন্ধের খবরে কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমেও কর্মীদের প্রতি সহানুভূতি দেখা গেছে। ‘ছিলু ইভনিং নিউজ’ লিখেছে, “সময়মতো কাজ শেষ করা আর দুদিনের সাপ্তাহিক ছুটি পাওয়া যেন এখন বিলাসিতা। প্রাথমিক উত্তেজনা থিতিয়ে যাওয়ার পর কর্মীদের বিশ্রামের অধিকার সুরক্ষায় নীতিমালার যে বড় দুর্বলতা রয়েছে, তা এখনই সমাধান করা প্রয়োজন।”

এদিকে ক্রেতাদের মন জয় করতে চিনি শোধনাগার, ছাপাখানা ও রেস্তোরাঁসহ কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘দুদিন ছুটির নিয়োগকর্তা’ হিসেবে ঘোষণা করতে শুরু করেছে।

মিংওয়েই লিউ একে একটি ইতিবাচক সংকেত মনে করেন। কনসালটেন্সি ফার্ম ‘অ্যাপারচারচায়না’-এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়ালিং জিয়াংয়ের মতে, ক্রেতা ও নাগরিক হিসেবে চীনা জনগণের অধিকারের এই টানাপড়েন সরকারের জন্য ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠবে।