১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কীভাবে অপসারণ করা যায়

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানো একজন বিচারপতিকে অপসারণের মতই কঠিন।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কীভাবে অপসারণ করা যায়

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 11 Oct 2026, 05:08 PM

Updated : 11 Oct 2026, 05:08 PM

ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগের বিষয়গুলো সামনে আসার পর ভারতীয় কংগ্রেস এবং তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টিসহ বিরোধী দলগুলো জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে সোচ্চার হয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ মাসে তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দুজন—সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী—অন্তত ১৪ বার ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

এ নিয়ে দিল্লির রাজপথ যখন উত্তাল, তখন প্রশ্ন আসছে, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কী?

অন্য নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে নিয়ম কি একই?

দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য তাদের গ্রেপ্তার বা বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষাই কতটা?

ভারতের সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী এসব প্রশ্নের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে দেশটির সংবাদপত্র দ্য হিন্দু।

কীভাবে নিয়োগ পান প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনাররা?

ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদে নির্বাচন পরিচালনার ‘তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের’ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশনকে।

এই অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফা অনুযায়ী, পার্লামেন্টে প্রণীত কোনো আইনের অধীনে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন।

কিন্তু এসব নিয়োগের পদ্ধতি নির্ধারণ করে পার্লামেন্ট দীর্ঘদিন কোনো আইন প্রণয়ন করেনি। ফলে নির্বাহী বিভাগের হাতে নিয়োগের ক্ষমতা থাকলে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্ন ওঠে।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আনুপ বারানওয়াল জনস্বার্থে একটি মামলা করেন। তার বক্তব্য ছিল, নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নিয়োগের প্রচলিত ব্যবস্থা অসাংবিধানিক। তখন নিয়োগের ক্ষমতা ছিল নির্বাহী বিভাগের হাতে।

মামলায় বলা হয়, সময়ের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আদালতের কাছে স্বাধীন, কলেজিয়াম ধাঁচের একটি নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশনা চাওয়া হয়।

২০২৩ সালের মার্চে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ আনুপ বারানওয়াল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় রায় দেয়।

ওই রায়ে বলা হয়, পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হবে তিন সদস্যের একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে।

কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতি।

নতুন আইনে কী পরিবর্তন এসেছে?

সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পর ভারতীয় পার্লামেন্ট ২০২৩ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত এবং মেয়াদসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইনটি কার্যকর হয়।

নতুন আইনে নিয়োগের সুপারিশকারী কমিটির কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়। এখন কমিটিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্য।

অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত ব্যবস্থায় প্রধান বিচারপতির যে ভূমিকা ছিল, নতুন আইনে তার পরিবর্তে রাখা হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে।

এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের নিয়োগ দেন।

আইনে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনেরও বিধান রয়েছে। এ কমিটি পাঁচজনের একটি তালিকা তৈরি করে নিয়োগের সুপারিশকারী কমিটির বিবেচনার জন্য পাঠায়।

তবে নতুন নিয়োগব্যবস্থার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে নিয়োগ কমিটিতে রাখার সিদ্ধান্ত সংবিধানসম্মত কি না, সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে সেখানে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি এস সি শর্মার দ্বৈত বেঞ্চে এ বিষয়ে বিভক্ত রায় হয়।

কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৩ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করে করা মামলাগুলো বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর আবেদন জানিয়েছিল।

বিচারপতি দত্ত মামলাগুলো সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর প্রয়োজন দেখেননি। অন্যদিকে বিচারপতি শর্মা মনে করেন, মামলাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত থাকায় বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানি হওয়া উচিত।

কীভাবে অপসারণ করা যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে?

ভারতের সংবিধানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে অপসারণের বিরুদ্ধে কঠোর সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে যেভাবে এবং যে কারণে অপসারণ করা যায়, একই পদ্ধতিতে ও একই কারণে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে।

অর্থাৎ, প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার কারণে নির্ধারিত সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে অপসারণ করা সম্ভব।

এ জন্য ভারতীয় পার্লামেন্টের দুই কক্ষ লোকসভা ও রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অপসারণ প্রস্তাব পাস হতে হবে। কোনো একটি কক্ষে প্রস্তাব পাস হলেই হবে না; উভয় কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি অপসারণের আদেশ দিতে পারবেন। এ প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে ১৯৬৮ সালের বিচারক (তদন্ত) আইনের অধীনে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ক্ষেত্রে এই কঠোর সুরক্ষার উদ্দেশ্য হল, নির্বাহী বিভাগের চাপ বা রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে যেন তাকে সহজে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া না যায়।

অন্য নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের পঞ্চম দফা অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ ছাড়া অন্য কোনো নির্বাচন কমিশনার বা আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে অপসারণ করা যায় না।

অর্থাৎ, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের জন্য পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির সমর্থন প্রয়োজন হলেও অন্য কমিশনারদের ক্ষেত্রে তার সুপারিশই সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত শর্ত।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কি গ্রেপ্তার করা যায়?

বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে গ্রেপ্তারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নটি সামনে এসেছে।

২০২৩ সালের আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনার থাকুন কিংবা অতীতে এ দায়িত্বে থাকুন, দায়িত্ব পালনকালে বা দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে কোনো কাজ করা, কোনো বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা কোনো কথা বলার কারণে তার বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা গ্রহণ করা বা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সুরক্ষা থাকবে।

এ বিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সুরক্ষা শুধু দায়িত্বে থাকা কমিশনারদের জন্য নয়; সাবেক কমিশনারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তবে ১৬ ধারায় সরাসরি বলা হয়নি যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। ধারাটিতে আদালতে দেওয়ানি বা ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণ বা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সুরক্ষার কথা আছে। কিন্তু সেখানে ‘গ্রেপ্তার’, ‘তদন্ত’ বা ‘পুলিশি হেফাজত’—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়নি।

তাই এই ধারাকে সব পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার থেকে দায়মুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা যায় না।

এ সুরক্ষার পরিধিও নির্দিষ্ট। দায়িত্ব পালন বা দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করা কিংবা কোনো বক্তব্য দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। ফলে দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো কাজের ক্ষেত্রেও একই সুরক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।