পুলিশ হেফাজতে তরুণীর মৃত্যু ঘিরে ইরানে ‘বিক্ষোভে গুলি, ৫ নিহত’

মাশা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় নিন্দা এবং দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 Sept 2022, 11:35 AM
Updated : 20 Sept 2022, 11:35 AM

পুলিশ হেফাজতে এক তরুণীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানের কুর্দি অঞ্চলে বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে কুর্দিদের এক মানবাধিকার সংগঠন।

মাশা আমিনি নামের ২২ বছর বয়সী ওই তরুণীর মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে বিক্ষোভ-সহিংসতার তৃতীয় দিন সোমবার নিরাপত্তা বাহিনী গুলি ছুড়লে এদের মৃত্যু হয় বলে মানবাধিকার সংগঠনটির বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশের বাসিন্দা মাশাকে দিনকয়েক আগে গ্রেপ্তার করেছিল ইরানের নীতি পুলিশ; পরে তার কোমায় চলে যাওয়া ও মৃত্যুর খবর আসে।

এ ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানী তেহরানসহ ইরানে অসংখ্য শহরে বিক্ষোভ হয়।

সোমবার মাশার বাড়ি যে কুর্দি শহরে, সেই সাকেজে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ২ জন নিহত হয়েছে বলে টুইটারে জানিয়েছে হেনগাও হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন।

এর বাইরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে দিভানদারেহতে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পঞ্চম ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে দেহগোলানে, সেটিও কুর্দি শহর। 

হেনগাওয়ের এই প্রতিবেদনের তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ৭টি প্রদেশের কিছু কিছু শহরে ‘সীমিত’ বিক্ষোভ হলেও পুলিশ তা নিয়ন্ত্রণে এনেছে।

একাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন; ‘বিক্ষোভে মৃত্যু সংক্রান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের’ খবরকে প্রত্যাখ্যান করে তারা আহত ২ ব্যক্তিকে দেখিয়েছে, যারা নিজেরাই তাদের মৃত্যুর খবরকে গুজব অ্যাখ্যা দিয়েছেন।

তবে মাশার মৃত্যু ঘিরে ইরানিরা যে ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। টুইটারে পারসিয়ান হ্যাশট্যাগ ‘মাশাআমিনি’র উল্লেখ ২০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। 

ইরানের নীতি পুলিশ ইসলামী ওই প্রজাতন্ত্রের নাগরিকরা শরিয়া আইন মানছে কিনা, নারীদের চুল ঢাকা এবং জনসমক্ষে ঢিলেঢালা পোশাক পরে না আসার বিধান মানা হচ্ছে কিনা, সেসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি চালায়।

মাশার মৃত্যু বিষয়ে তারা জানিয়েছে, নীতি পুলিশের হাতে আটক অন্য নারীদের সঙ্গে অপেক্ষারত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ২২ বছর বয়সী ওই তরুণী।

তবে মাশার বাবা বলছেন, তার মেয়ে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিল না এবং তার মেয়ের পায়ে আঘাতের দাগ দেখা গেছে। পুলিশই তার মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী বলেও তিনি দাবি করেছেন।

মাশার মৃত্যু ঘিরে ইরানের মধ্যে কুর্দিস্তানেই ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে; ৮০ লাখ থেকে এক কোটি সংখ্যালঘু কুর্দি অধ্যুষিত ওই অঞ্চলে কর্তৃপক্ষ এর আগেও অনেক বিক্ষোভ-সহিংসতা দমন করেছে।

সোমবারের বিক্ষোভ-সংঘর্ষে ৭৫ জন আহত হয়েছে বলেও জানিয়েছে হেনগাও। টুইটারে তাদের পোস্ট করা এক ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদেরকে পুলিশের দিকে পাথর ছুড়তে দেখা গেছে। এর মধ্যে একজনকে ‘দিভানদারেহতে যুদ্ধ চলছে’ বলতে এবং পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে, এমন অভিযোগ করতে শোনা গেছে।

ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

সোমবার ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশের রাজধানী সানানদাজে ইন্টারনেট যোগাযোগ প্রায় পুরোপুরিই বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে টুইটারে জানিয়েছে ইন্টারনেটে যোগাযোগে বিধিনিষেধের বিষয়টি পর্যবেক্ষণকারী গ্রুপ নেটব্লকস।

রয়টার্স জানিয়েছে, হেনগাও কুর্দিস্তানে প্রাণঘাতী সহিংসতার খবর দিলেও ইরানের অন্যত্র বিক্ষোভে হতাহতের তাৎক্ষণিক কোনো খবর পাওয়য়য়া যায়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা ভিডিওতে মাশার মৃত্যুর প্রতিবাদে তেহরান, রাশত, মাশহাদ ও ইসফাহানসহ একাধিক শহরে বিক্ষোভের চিত্র পাওয়া গেছে।

টুইটার অ্যাকাউন্ট ১৫০০তাসবিরে তেহরানে পুলিশের গাড়ির কাচ ভাংচুর এবং কাছেই নিরাপত্তা বাহিনীর যান থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর জলকামান নিক্ষেপের দৃশ্য দেখা গেছে।

অন্য এক ভিডিও ফুটেজে আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের বিরুদ্ধে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভের কথা জানানো হয়।

এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

মাশা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় নিন্দা এবং দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স।

এদিকে সোমবার তেহরানের পুলিশ কমান্ডার হোসেইন রাহিমি বলেছেন, পুলিশের বিরুদ্ধে ‘কাপুরুষোচিত অভিযোগ’ আনা হচ্ছে। মাশার শরীরে কোনো আঘাত করা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেছেন।

তাকে বাঁচাতে পুলিশ সব করেছে. বলেছেন তিনি। 

“ঘটনাটি আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। আমরা চাই, এ ধরনের কোনো ঘটনা যেন আর কখনোই দেখতে না হয়,” বলেছেন রাহিমি।   

কর্তৃপক্ষ মাশাকে পুলিশ হেফাজতে রাখার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজও প্রকাশ করেছে, যা ঘটনা নিয়ে পুলিশের ভাষ্যকেই সমর্থন করছে বলে মনে হচ্ছে।

রয়টার্স এই ভিডিওরও সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক