কেরালা রাজ্যের এ দুই ভারতীয় দালালের খপ্পরে পড়ে রুশ বাহিনীর হয়ে ইউক্রেইন যুদ্ধে লড়াই করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন।
Published : 11 Apr 2024, 11:56 PM
গত কয়েকমাসে দালালের খপ্পরে পড়ে রুশ বাহিনীর হয়ে লড়তে ইউক্রেইনে গেছে বেশ কয়েকজন ভারতীয়। গত সপ্তাহে বাড়িতে ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছে তাদের দুইজন।
তাদের কথাতেই উঠে এসেছে ইউক্রেইনের যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। যে লড়াইয়ে তারা হয়েছেন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
বিবিসি জানায়, ভারতের কেরালা রাজ্যের এই দুই বাসিন্দার নাম ডেভিড মুথাপ্পান এবং প্রিন্স সেবাস্তিয়ান। দুইজনই পড়েন দালালের খপ্পরে।
মুথাপ্পানের কাহিনী শুরু হয় গতবছর অক্টোবর মাসে। ফেইসবুকে মুথাপ্পানের চোখে পড়েছিল একটি বিজ্ঞাপন। রাশিয়ায় নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগের বিজ্ঞাপন ছিল সেটি। বেতন ছিল মাসে ২ লাখ ৪ হাজার রুবল।
ছোটতেই স্কুল ছেড়ে দিয়ে মাছ ধরার কাজে নামা জেলে মুথাপ্পানের কাছে এত বড় অঙ্কের বেতনের চাকরি মনে ধরেছিল। আর এতে রাজি হয়েই ফাঁদে পা দেন তিনি।
কয়েক সপ্তাহ পরই ২৩ বছর বয়সী মুথাপ্পান নিজেকে আবিষ্কার করেন ইউক্রেইনের রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত দোনেৎস্ক অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে। সে সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় ছিল মৃত্যু আর ধ্বংস।’
কেরালার পোঝিউর গ্রামের বাসিন্দা মুথাপ্পান এখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফিরতে পেরে স্বস্তি পেয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে তিনি যা দেখে এসেছেন তা ভুলতে পারছেন না।
সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মুথাপ্পান বলেন, মাটিতে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। তা দেখে তিনি বমি করতে করতে প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। পরে তাদের নেতৃত্বে থাকা রুশ কমান্ডার তাকে সেনা চৌকিতে ফিরে যেতে বলেন। স্বাভাবিক হতে তার কয়েকঘণ্টা লেগে গিয়েছিল।
গত ডিসেম্বরে বড়দিনের সময় প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে লড়াই করতে গিয়ে পা ভেঙেছিল মুথাপ্পানের। তবে এ ঘটনার কথা সে সময় জানত না তার পরিবার। চিকিৎসার জন্য তখন আড়াই মাস তাকে লুহানস্ক, ভলগোগ্রাদ ও রোস্তভের বিভিন্ন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল।
গত মার্চ মাসে একদল ভারতীয় মুথাপ্পানকে মস্কোয় অবস্থিত ভারতের দূতাবাসে যেতে সহায়তা করেছিল। পরে দূতাবাসের সহায়তায় ভারতে ফেরেন তিনি।
একইভাবে ইউক্রেইনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভারতে ফিরতে পেরেছেন প্রিন্স সেবাস্তিয়ান। তার বাড়ি মুথাপ্পানের গ্রাম থেকে ৬১ কিলোমিটার দূরে আরেক গ্রাম অঞ্চুথেঙ্গুতে।
স্থানীয় এক দালালের খপ্পরে পড়ে সেবাস্তিয়ান গিয়ে পৌঁছেছিলেন পূর্ব ইউক্রেইনে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত লিসিচানস্ক শহরে। সেখানে মোতায়েন ৩০ যোদ্ধার একটি দলে ছিলেন তিনি।
মাত্র তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে সম্মুখসারির যুদ্ধে লড়তে পাঠানো হয়েছিল। সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল রকেট-চালিত গ্রেনেড লঞ্চার ও বোমার মতো ভারী অস্ত্র। এসব অস্ত্র নিয়ে দ্রুত চলাচল করতে পারছিলেন না তিনি।
সেই সময়কার কথা স্মরণ করে সেবাস্তিয়ান জানান, যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারিতে পৌঁছানোর ১৫ মিনিট পরই কাছ থেকে ছোড়া একটি গুলি এসে তার বাঁ কানের নিচে লাগে। তিনি পড়ে যান। পরে বুঝতে পারেন, এক রুশ সেনার মরদেহর ওপরে গিয়ে পড়েছেন।
সেবাস্তিয়ান বলেন, “আমি বড় ধাক্কা খেয়েছিলাম। নড়াচড়া করতে পারছিলাম না। এক ঘণ্টা পর রাত নামলে আরেকটি বোমা বিস্ফোরণ হয়। এতে আমার বাঁ পায়ে বেশ আঘাত পাই।”
সেই রাত একটি পরিখায় কাটিয়েছিলেন সেবাস্তিয়ান। রক্ত ঝরছিল। পরদিন সকালে তিনি সেখান থেকে পালাতে পেরেছিলেন। এরপর কয়েক সপ্তাহ ভর্তি থাকতে হয়েছিল বিভিন্ন হাসপাতালে।
বিশ্রামের জন্য এক মাস ছুটি পেয়েছিলেন। সে সময়েই ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তাকে সহায়তা করেন এক ধর্মযাজক। পরে দূতাবাসের সহায়তায় ভারতে ফেরেন সেবাস্তিয়ান।
তিনি জানান, তার সঙ্গে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন আরও দুই বন্ধু। তারাও মাছ ধরা জেলে। তাদের কোনও হদিস পাচ্ছেন না তিনি। কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের খোঁজখবর পাচ্ছে না তাদের পরিবারও।
কেরালার কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এখন পর্যন্ত মুথাপ্পান, সেবাস্তিয়ান ও তার দুই বন্ধুর দালালের খপ্পরে পড়ার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছেন।
তারা কীভাবে দালালের খপ্পরে পড়েছিলেন, সে কাহিনী বর্ণনা করেছেন সেবাস্তিয়ান। বলেছেন, ইউরোপে চাকরির খোঁজে তিনি ও তার বন্ধুরা স্থানীয় এক দালালের কাছে গিয়েছিলেন।
ওই দালাল বলেছিলেন, রাশিয়ায় নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করার ‘সুবর্ণ সুযোগ’ আছে তাদের জন্য। মাসে বেতন ২ লাখ রুপি। একথা শুনতেই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান তারা।
রাশিয়ার ভিসার জন্য ওই দালালকে সেবাস্তিয়ান ও তার বন্ধুরা প্রত্যেকে দিয়েছিলেন ৭ লাখ রুপি করে। এ বছর ৪ জানুয়ারিতে তারা মস্কো পৌঁছান। সেখানে অ্যালেক্স নামে পরিচয় দেওয়া এক ভারতীয় তাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন।
সে রাতটা একটি বাসায় কাটানোর পরদিন এক ব্যক্তি সেবাস্তিয়ান ও তার বন্ধুদেরকে রাশিয়ার কস্ত্রোমা শহরে এক সেনা কর্মকর্তার কাছে নিয়ে যান। সেখানে তাদের একটি চুক্তিপত্র সই করদে দেওয়া হয়েছিল। তবে রুশ ভাষায় লেখা সেই চুক্তির বিষয়বস্তু কিছুই বুঝতে পারেননি তারা।
সেখানে তাদের সঙ্গে যোগ দেন শ্রীলঙ্কার তিন নাগরিক। তারপর ছয়জনকে নিয়ে যাওয়া হয় ইউক্রেইন সীমান্তের রোস্তভ অঞ্চলের একটি সামরিক ক্যাম্পে। নিয়ে নেওয়া হয় পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন।
১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় তাদের প্রশিক্ষণ। কয়েক দিনের মধ্যে তারা শিখে যান, কীভাবে ট্যাংক-বিধ্বংসী গ্রেনেড ব্যবহার করতে হয়। আহত হলে কী করতে হবে, তা–ও শেখানো হয়।
এরপর ছয়জনকে অ্যালাবিনো পলিগন নামের আরেকটি ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদেরকে টানা ১০ দিন ধরে রাত-দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সেবাস্তিয়ান বলেন, “সেখানে আমাদের জন্য সব ধরনের অস্ত্র ছিল। খেলনার মতো সেসব অস্ত্র নিয়ে মজা করা শুরু করলাম।” কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে মুষড়ে দিয়েছে নিষ্ঠুর এক বাস্তবতা।
সেবাস্তিয়ান এখন ভারতে তার পুরোনো পেশা মাছ ধরা শুরু করার আশায় আছেন। রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য যে অর্থ ধার করেছিলেন তা এখন শোধ করতে হবে তাকে। নতুনভাবে জীবনও শুরু করতে হবে।
একই ইচ্ছা মুথাপ্পানেরও। তিনি বলেন, “রাশিয়ায় যাওয়ার আগে একটি মেয়ের সঙ্গে আমার বাগদান হয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, রাশিয়ায় গিয়ে অর্থ নিয়ে আসব। আর বিয়ের আগে একটা বাড়ি বানাব।”
মুথাপ্পান ও তার বাগ্দত্তা এখন নতুন করে নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিতে বিয়ের জন্য আরও দুই বছর অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে মুথাপ্পান অন্তত এটুকু মনে করে স্বস্তি পান যে, যুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তিনি কাউকে হত্যা করেননি।
মুথাপ্পান বলেন, “একসময় ইউক্রেনীয়রা আমাদের চেয়ে মাত্র ২০০ মিটার দূরে ছিল। তখন আমাদেরতে তাদের ওপর আক্রমণ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আমি তাদের দিকে একটি গুলিও ছুড়িনি। আমি কাউকে হত্যা করতে পারি না।”