বেড়েছে বাঘ, আনন্দ-আতঙ্কের দোলাচলে নেপাল

বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে চলে যাওয়া বাঘের সংখ্যা বাড়ায় নেপালে ফিরেছে আনন্দ। আবার বাঘ বাড়ার কারণে মানুষ অহরহ এ প্রাণীর হামলার শিকার হওয়ায় বেড়েছে আতঙ্ক।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 July 2022, 06:28 PM
Updated : 29 July 2022, 06:28 PM

বাঘ ফিরে আসায় নেপালে আনন্দের সঙ্গে বাড়ছে আতঙ্কও। গত ১০ বছরে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে দেশটিতে। সেটি আনন্দের। কারণ, নেপালে বাঘ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল।

তবে বাঘ বেড়ে যাওয়াটা আতঙ্কও বয়ে এনেছে। কারণ, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বাঘের হামলার শিকার হচ্ছেন।

একটি বাঘ সুরক্ষা ইউনিটের নেতা আয়ুশ জং বাহাদুর রানা বলেন, “বাঘের মুখে পড়লে দু’রকম অনুভূতি হয়। এক, ‘কী অসাধারণ সৃষ্টি’; দুই, ‘এই বুঝি প্রাণটা গেল’।”

নেপালের তেরাই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং সুরক্ষিত জাতীয় উদ্যান বারদিয়ার খোলা সমভূমি এবং ঘন ঝোপে সশস্ত্র টহল দেওয়ার সময় আজকাল প্রায়ই রয়েল বেঙ্গল টাইগার সামনে এসে পড়ে বলে জানিয়েছেন আয়ুশ।

নেপালের বাঘ রক্ষায় কাজে এসেছে জিরো-পোচিং পদ্ধতি। নেপালের সামরিক বাহিনীও জাতীয় উদ্যানে বাঘ রক্ষায় কাজ করা দলগুলোকে সহায়তা করে।

উদ্যানের পাশের অভয়ারণ্যে কমিউনিটি অ্যান্টি-পোচিং ইউনিটগুলো প্রাকৃতিক করিডোরগুলো নজরে রাখার কারণে বাঘ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে।

উদ্যানের এমন একটি অংশ ‘খাতা’ করিডোর নামে পরিচিত। এই করিডোর বারদিয়া জাতীয় উদ্যানের সঙ্গে ভারতীয় সীমান্তের কাতারনিয়াঘাট বন্য প্রাণী সংরক্ষণ এলাকার সংযোগস্থল।

কিন্তু ওই এলাকায় বাঘ ফিরে আসায় উদ্যানের সীমান্তবর্তী এলাকায় বাস করা মানুষেরা ঝুঁকিতে পড়েছে। মনোজ গুতাম নামের এক সংরক্ষণ কর্মকর্তা বলেছেন, “এই এলাকার মানুষজন ত্রাসের পরিবেশে বাস করছে।”

“সংকীর্ণ এ এলাকায় বলতে গেলে বাঘ, শিকারি প্রাণী এবং মানুষ গা লাগালাগি করে বাস করছে। নেপালে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার আনন্দ ফিরিয়ে আনতে ওই এলাকার মানুষ মূল্য দিয়েছে।”

গত ১২ মাসে নেপালে বাঘের হামলায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। অথচ এর আগের পাঁচ বছরে সব মিলিয়ে বাঘের হামলায় মৃতের সংখ্যা ছিল ১০।

গ্রামবাসী গবাদিপশু চরানো কিংবা ফল, মাশরুম এবং কাঠ সংগ্রহ করতে জাতীয় উদ্যান বা অভয়ারণ্যে গিয়েই বেশির ভাগ সময় হামলার শিকার হয়েছেন।

অনেক সময় বাঘ উদ্যান থেকে বেরিয়ে লোকালয়ে ঢুকে হামলা করেছে। এসব লোকালয়ে বন্য প্রাণী ঢুকে পড়া ঠেকাতে বেড়া দেওয়া থাকলেও শিকারি পশুরা সহজেই তা ডিঙিয়ে যেতে পারে।

ভাদাই থারু নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা ২০০৪ সালে বাঘের হামলার শিকার হন। হামলার মুহূর্তের ঘটনা অভিনয় করে দেখিয়ে তিনি বলেন, “বাঘটি বিশাল গর্জন করে আমার মুখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমি ছিটকে পড়ে যাই। এরপর বাঘটি লাফানো বলের মতো পেছন দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে ঘুষি মারি, সাহায্যের জন্য চিৎকার করি।”

বাঘের সেই হামলায় একটি চোখ খোয়াতে হয়েছে বলে জানান ভাদাই থারু। অথচ এই বাঘের সুরক্ষার জন্যই এতদিন ধরে কাজ করে এসেছেন তিনি। বাঘের এই হামলায় রাগ-দুঃখ দুইই হয় বলে জানিয়েছেন থারু।

বিবিসি জানায়, বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে ২০১০ সালে ১৩ টি দেশ ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার অঙ্গীকার করেছিল। দেশগুলোর মধ্যে কেবল নেপালই এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পেরেছে।

নেপালে বাঘের সংখ্যা ২০০৯ সালে ছিল ১২১ টি। ২০২২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫৫ টিতে। নেপালজুড়ে ৫ টি জাতীয় উদ্যানে এই বাঘগুলোর দেখা মেলে। তবে অন্য প্রজাতির প্রাণী গন্ডার, হাতি এবং চিতাবাঘের সংখ্যাও বেড়েছে।

বারদিয়া জাতীয় উদ্যানের কাছে বাস করা মানুষজন বাঘ সংরক্ষণ কাজকে সমর্থন করে। কিন্তু বাঘের সংখ্যা বাড়ায় সেখানকার লোকজনের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে। স্থানীয় এক নারী বলেন, “পর্যটকরা বাঘ দেখতে আসে। কিন্তু আমাদেরকে তো বাঘের সঙ্গেই বসবাস করতে হয়।”

গতবছর বাঘের হামলায় শ্বাশুড়িকে হারিয়েছেন এই নারী। তিনি বলেন, “আগামী কয়েকবছরে আরও অনেক পরিবার আমার মতো ভুক্তভোগী হবে। বাঘের হামলার শিকার মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে।”

বাঘের হামলা বেড়ে যাওয়ার কারণে সম্প্রতি স্থানীয় মানুষেরা বিক্ষোভও করতে শুরু করেছে। গত ৬ জুন বাঘের হামলার শিকার হওয়া ভাদাই থারুর গ্রামে বিক্ষোভ হয়েছে। জঙ্গলের কাছের এক পরিবারের ওপর চিতাবাঘের হামলার পর এক সপ্তাহ পর ওই বিক্ষোভ হয়।

প্রায় ৩শ’ মানুষ বাঘের হামলা থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সুরক্ষায় কর্তৃপক্ষের আরও বেশিকিছু করার দাবি নিয়ে রাস্তায় নামে। বিক্ষুদ্ধ জনতা কমিউনিটি বনবিভাগের কার্যালায়ও জ্বালিয়ে দেয়। পরে বিক্ষোভ দমনে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে দুপক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি চালালে এক কিশোরী নিহতও হয় ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক