যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, তবে লাগবে ট্রাম্পের অনুমোদন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হলে তা হবে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি।
চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৬০ দিন বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে এতে এখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন প্রয়োজন।
বিষয়টি সংশ্লিষ্ট চার কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ খবর জানিয়েছেন। এই চুক্তিতে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে কিভাবে আলোচনা চলবে তাও বলে দেওয়া থাকবে।
আর এই বিষয়টি ওই ৬০ দিন সময়সীমার মধ্যে প্রথম আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যেই স্থান পাবে বলে জানানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
হোয়াইট হাউজ চুক্তির বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কয়েকবারই বলে এসেছে যে তারা যুদ্ধ বন্ধে চুক্তির কাছাকাছি আছে।
ট্রাম্প প্রথমদিকে এও বলেছিলেন যে, ইরানে যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহ চলবে। কিন্তু সেই যুদ্ধ এখন তিন মাসে গড়িয়েছে। সময় সময় তিনি কয়েকদিনেই যুদ্ধ বন্ধ হতে পারে বলেছিলেন। তবে পরে তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধ আরও কিছু সময় চলতে পারে।
এখন দুইপক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হলে তা হবে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি।
তবে ট্রাম্পের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত দাবির স্থায়ী সমাধান করে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে গেলে সামনে আরও দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন পড়বে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, “এটি (সমঝোতা চুক্তি) মূলত সবাইকে আলোচনার টেবিলে আনার একটি চুক্তি। বাকি খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আমরা সমাধান করব মূল আলোচনার টেবিলে ।”
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার নাগাদই চুক্তির শর্তাবলি অনেকাংশে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল, তবে এতে উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল।
কর্মকর্তারা আরও জানান, ইরানি প্রতিনিধিরা পরে ফিরে এসে জানিয়েছিলেন যে, এতে তাদের অনুমোদন আছে এবং তারা সইও করতে প্রস্তুত।
তবে ইরান এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। ওদিকে, মার্কিন আলোচকরা চূড়ান্ত চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জানালেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এতে সই করেননি।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট মধ্যস্থতাকারীদের বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার জন্য তার আরও দু-এক দিন সময় প্রয়োজন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, ৬০ দিনের এই সমঝোতা স্মারকে যেসব বিষয় রয়েছে সেগুলো হল:
* হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল হবে সম্পূর্ণ অবাধ । এর মানে হল- কোনও ধরনের টোল আদায় করা হবে না এবং কোনও জাহাজকে হয়রানি করা হবে না। একইসঙ্গে ইরানকে ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি থেকে সব সামুদ্রিক মাইন অপসারণ করতে হবে।
*যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। তবে তা হবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হয় সেই অনুপাতে। তাছাড়া, ইরানকে অবাধে তেল বিক্রি করতে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।
*সমঝোতা স্মারকে ইরানের পানমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। যুদ্ধবিরতির ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে প্রথম আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যেই থাকবে ইরানের উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে স্থানান্তর করা যায় সেটি এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি।
ওদিকে, *সংলাপের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা তহবিল মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করবে।
*ইরান যাতে পণ্য ও মানবিক সহায়তা পেতে পারে, সেজন্য একটি বিশেষ কার্যপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হবে। তাছাড়া, সমঝোতা স্মারকে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়টিও উল্লেখ থাকবে।
তবে চুক্তিটি চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি থাকার এই সময়েও গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুটি সংঘর্ষের ঘটনার খবর এসেছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ইরানের সামনে এখন তাদের অর্থনীতি সচল করার সুযোগ এসে গেছে। তিনি বলেন, “ইরানের শাসনব্যবস্থায় এমন কিছু মানুষ আছে, যারা বোঝেন এখন তাদের ভিন্ন পথে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
“এই ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালেই আমরা বুঝতে পারব বিষয়টি এমন কিনা। ইরান আলোচনায় যত বেশি ছাড় দিতে রাজি হবে, তারা তত বেশি সুবিধা পাবে,” বলেন ওই কর্মকর্তা।
মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আলোচনার সময় যদি এটি স্পষ্ট হয় যে, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচিতে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে না, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে অর্থনৈতিক ও সামরিক সব পথই খোলা থাকবে।
পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন করা মার্কিন সেনা প্রত্যাহার কেবল একটি চূড়ান্ত চুক্তি হলেই ঘটতে পারে।
