Published : 31 Mar 2026, 08:54 AM
কিউবার উদ্দেশ্যে যাওয়া তেলের চালান আটকানোর পথ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, কোনো দেশ কমিউনিস্ট পার্টিশাসিত দ্বীপটিতে অপরিশোধিত তেল পাঠাতে চাইলে তার কোনো ‘সমস্যা নেই’।
রাশিয়ার একটি তেলবাহী ট্যাংকার কিউবার এক বন্দরের কাছে পৌঁছানোর পর রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ কথা বলেন, জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ওয়াশিংটনের অবরোধের কারণে মারাত্মক অর্থনৈতিক দুরাবস্থা ও ব্যাপক বিদ্যুৎ সঙ্কটে ভুগছে ক্যারিবীয় দ্বীপদেশটি কিউবা। রাশিয়ার এই তেল তাদের জন্য ‘আশীর্বাদ’ হয়ে হাজির হওয়ার কথা।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ নৌযান আনাতোলি কোলোদকিন রোববার কিউবার পূর্ব উপকূল থেকে সামান্য দূরে ছিল। মস্কোর ‘ছায়া বহরের’ অংশ এই ট্যাংকারটির সোমবারই কিউবার বন্দরে পৌঁছানোর কথা।
এ বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার পর যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। অন্য কোনো দেশ হাভানায় অপরিশোধিত তেল পাঠাতে চাইলে তাদের ওপরও শাস্তিমূলক শুল্ক বসানোর হুমকি দেন তিনি।
তার এ হুমকির পর মেক্সিকো কিউবায় তেল পাঠানো বন্ধ করে দেয়। কিউবার তেলের সিংহভাগই ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে আসতো।
ট্রাম্প প্রশাসনের অবরোধের কারণে তিন মাসে একটি ট্যাংকারও কিউবায় ঢুকতে পারেনি বলে জানিয়েছেন দ্বীপদেশটির প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল।
এর ফলে দেশটির জ্বালানি সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করে। কঠোর পেট্রল রেশনিংয়ের পাশাপাশি এক কোটি জনসংখ্যার দেশটি নিয়মিত দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে থাকে।
চরম এ বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে কিউবায় ক্যান্সার রোগী বিশেষ করে শিশু রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে ট্রাম্প কিউবার জনগণের জ্বালানি প্রয়োজনীয়তায় সহানুভূতি ব্যক্ত করেন এবং বলেন, হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে কে কী সহায়তা করল তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন; কারণ, তার ধারণা ওই সরকার শিগগিরই পড়ে যাবে।
“যদি কোনো দেশ এখন কিউবায় কিছু তেল পাঠাতে চায়, আমার তাতে কোনো সমস্যা নেই, এটা রাশিয়াই হোক বা অন্য যে কেউ।
“কিউবা শেষ। তাদের শাসনব্যবস্থা বাজে। তাদের নেতারা খুবই খারাপ ও দুর্নীতিগ্রস্ত। এখন তারা এক নৌকা তেল পেল কি পেল না, তাতে কিছু আসে যায় না। আমি ওই তেল ঢুকতে দিব, সেটা রাশিয়াই হোক বা অন্য কেউ, কারণ লোকজনের তাপ, ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অনেক কিছু দরকার,” বলেছেন তিনি।
এখন সহানুভূতি দেখালেও ট্রাম্প সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিউবার সরকারকে একের পর এক হুমকি দিয়ে গেছেন। কিছুদিন আগেও তিনি বলেছেন, ইরানের পর তিনি পুরোপুরি কিউবার দিকে নজর দেবেন। কমিউনিস্ট শাসনে পরিচালিত দেশটি মার্কিন সমুদ্রতীর থেকে মাত্র দেড়শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা মোকাবেলা ও বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে এ মাসেই যুক্তরাষ্ট্র রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছিল। তবে তাতেও কিউবা, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা ছিল।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের জাহাজ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, আনাতোলি কোলোদকিন সাড়ে ছয় লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে রাশিয়ার প্রিমর্স্ক বন্দর ছাড়ে। তবে বেশকিছু প্রতিবেদনে নৌযানটিতে ৭ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল তেল আছে বলে জানানো হয়েছে।
ক্যারিবিয়ানের পথে থাকা কোলোদকিন রুশ নৌবাহিনীর পাহারায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার পর কিউবার সরকারি সংবাদমাধ্যম কিউবাডিবেট রাশিয়ার এ চালানকে মার্কিন তেল অবরোধের প্রতি ‘সরাসরি চ্যালেঞ্জ’ আখ্যা দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এ রুশ ট্যাংকারকে কিউবায় তেল নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে বলে এ সম্বন্ধে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আগেই জানিয়েছিল নিউ ইয়র্ক টাইমস। কিন্তু কেন তারা এ সিদ্ধান্ত নেয় তা স্পষ্ট নয়, বলেছিল মার্কিন গণমাধ্যমটি।
ট্যাংকারটিকে জোর করে থামানো হলে তা মস্কোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারতো। এমনিতেই ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন বেশ জটিল, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ঝুঁকি বাড়াতে চায়নি বলেই অনুমান অনেক বিশ্লেষকের।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইসরসের ব্রেট এরিকসন বলেছেন, আনাতোলি কোলোদকিন ছাড়াও সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকার রাশিয়ার ‘ছায়া বহরের’ আরেকটি নৌযানকেও ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করার অনুমতি দেয়। অথচ দিনকয়েক আগেই লন্ডন যুক্তরাজ্যের জলসীমায় নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কোনো নৌযান এলে সেগুলোতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে ওঠার এখতিয়ার দিয়েছিল।
এরিকসনের মতে, রাশিয়া ‘ইরান যুদ্ধে আর্থিকভাবে ব্যাপক লাভবান হচ্ছে’, পাশাপাশি তারা কিউবার জন্য অত্যাবশ্যকীয় তেলও সরবরাহ করতে পারছে। সিরিয়া ও ভেনেজুয়েলায় মিত্রদের পতন এবং ইরানের ওপর হামলার কারণে মস্কোর কাছে এখন কিউবার কৌশলগত গুরুত্বও বেড়ে গেছে।
“হাভানার চলার জন্য খুব বেশি তেলের দরকার নেই। কোলোদকিনে যা আছে তা দিয়ে আড়াই সপ্তাহ চলতে পারবে তারা। চাইলে টেনেটুনে এক মাসও চালানো যাবে,” কিউবার রেশনিং ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে বলেন তিনি।