Published : 23 Oct 2022, 01:06 AM
চীনে তিন দশক আগের ‘ট্যাংক ম্যান’র স্মৃতি যেন ফিরে এল ‘ব্রিজ ম্যান’র মধ্য দিয়ে; প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কঠোর কোভিডবিধি এবং শাসননীতির বিরুদ্ধে দেশটির রাজধানী বেইজিংয়ে সেতুতে এই ব্যক্তির বিরল বিক্ষোভ প্রেরণাদায়ী হয়ে উঠেছে নিয়মের বেড়াজালে বন্দি দেশটির প্রতিবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে গত সপ্তাহে ওই সেতু মানবের বিরল বিক্ষোভ এবং তারপর চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসের মধ্যে তা কীভাবে জনরোষকে উসকে দিচ্ছে, তা তুলে ধরা হয়েছে।
ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী মিং শো হোর ভাষ্য, ব্রিজ ম্যান (বিক্ষোভকারী ব্যক্তি) মানুষের আবেগকে নাড়া দিয়ে গেছেন। তিনি আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
“কারণ তিনি সবার কথা বলেছেন। আমি মনে করি, জনগণের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারের বিক্ষোভের কখা। এই ব্যক্তির মধ্য দিয়ে চীনের মানুষ একচ্ছত্র আধিপত্যের-নিপীড়নের প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেয়েছে।”
গত এক সপ্তাহে সরকারবিরোধী নানা প্রতিবাদী গ্রুপ তাদের রাজনৈতিক স্লোগানগুলোকে ফিরিয়ে আনছে। চীন ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে, শহরের রাস্তার পাশে দোকানের গায়ে জিনপিংবিরোধী স্লোগান দেখা গেছে গত কয়েকদিনে।

‘ব্রিজ ম্যান’ নামে পরিচিতি পাওয়া ওই ব্যক্তিকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ, তার পরিচয়ও প্রকাশ করেনি।
তবে টুইটারে তার বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিওর নিচে অনেকের মন্তব্য, ‘ব্রিজ ম্যান’র ছোট্ট বিক্ষোভটি পৌঁছুতে পারে গণঅভ্যুত্থানে, যা রূপ নিতে পারে ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন বিক্ষোভের স্তরে।
দিনটি ছিল গত বৃহস্পতিবার, বিকালটি ছিল মেঘলা। কমলা রঙের জামা ও হলুদ টুপি পরা এক ব্যক্তিকে হাতে কার্ডবোর্ডের একটি বাক্স ও টায়ার নিয়ে বেইজিংয়ের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় হাইদিয়ান ইউনিভার্সিটি এলাকায় একটি ব্যস্ত উড়াল সেতুতে উঠতে দেখা যায়। পোশাক দেখে যে কেউ তাকে একজন সাধারণ নির্মাণ শ্রমিক হিসেবেই ধরে নেবে।
সেই বিকালের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি লাল রঙের প্রতিবাদী ভাষায় লেখা দুই বিশাল ব্যানার উড়িয়ে দেন ব্রিজের রেলিংয়ে এবং টায়ারে আগুনও ধরিয়ে দেন। কালো ধোঁয়ায় চারপাশ ছেয়েও যায়। আর তিনি লাউড স্পিকারে স্বাধীনতা, খাবার ও ভোটের দাবি তুলে স্লোগান দিতে থাকেন।
তিনি বলছিলেন- ‘স্কুলগুলো ধর্মঘটে চলে যাক, স্বৈরশাসক ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতক শি জিনপিংকে সরিয়ে দিন। আমরা খেতে চাই, স্বাধীনতা চাই, আমরা ভোট চাই।”

সেতুর রেলিংয়ে টানানো ব্যানার দুটোর একটিতে লেখা ছিল- “কোনো কোভিড পরীক্ষা নয়, আমরা খেতে চাই। কোনো কড়াকড়ি নয়, আমরা স্বাধীনতা চাই। কোনো মিথ্যা নয়, আমরা মর্যাদা চাই। কোনও সাংস্কৃতিক বিপ্লব নয়, আমরা সংস্কার চাই। কোনো নেতা নয়, আমরা ভোট চাই। আমরা দাস না, নাগরিক হতে চাই।”
অন্য ব্যানারটিতে অধিবাসীদেরকে কর্মক্ষেত্রে, স্কুলে ধর্মঘটে নামার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, “স্বৈরশাসক ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতক শি জিনপিংকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিন।”
গত পাঁচ বছরের মধ্যে চলমান কংগ্রেস দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কংগ্রেস উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তায় আচ্ছাদিত বেইজিংয়ে অন্যান্য এলাকার চেয়ে স্বাস্থ্যবিধি জোরদার করা হয়েছে। প্রতি তিন দিন পর লাখো মানুষের কোভিড পরীক্ষা করছে দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ।
আশা করা হচ্ছে, কংগ্রেসের চলতি সভায় ৬৯ বছর বয়সী জিনপিং তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় দল তথা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকবেন। এমন একটি সময়ে জিনপিংয়ের কঠোর শাসননীতির প্রতিবাদে অজ্ঞাত ওই ব্যক্তির ‘বিরল’ বিক্ষোভকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওই ব্যক্তির প্রতিবাদের ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্ম এবং মেসেজিং আ্যাপগুলোয়, যা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আলোড়ন তুলেছে। কেউ কেউ বলছেন কংগ্রেসের আগে এ ধরনের বিক্ষোভকে প্রেসিডেন্ট জিনপিংকে অপমান করা হয়েছে, যা ইতিহাসে অকল্পনীয়। আবার প্রতিবাদের জন্য প্রশংসা কুড়াচ্ছেন ওই ব্যক্তি।

এই ঘটনা কংগ্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেওয়া কথিত কড়া নিরাপত্তার ফাঁকও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ ওই ব্যক্তি শুধু নিরাপত্তার ঘেরাটোপই এড়ায়নি, জনদৃষ্টি আকর্ষণেও পর্যাপ্ত সময়ও তিনি পেয়েছেন।
কোভিড মহামারীর সূচনা হয় ২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনে। মহামারী শুরু থেকেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন কোভিডের লাগাম টানতে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ কোনোভাবেই তারা কোভিড ছড়াতে দেবে না।
গণহারে নমুনা পরীক্ষা, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন দেওয়ার মধ্যে দিয়ে কোভিডের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিতে আনতে সক্ষম হয় দেশটি। এক বছরেরও বেশি সময় চীনে কোভিডজনিত মৃত্যুহার শূন্য থাকলেও চলতি বছরে করোনাভাইরাসের অতিসংক্রামক ধরন ওমিক্রনের কারণে আবারও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল সংক্রমিত হতে থাকে। তাই পরীক্ষা, কোয়ারেন্টিনসহ যাবতীয় বিধিনিষেধের পুনরাবৃত্তিতে পড়ে দেশবাসী। দিনের পর দিন লকডাউনের ছাপ পড়েছে দেশটির অর্থনীতিতেও।
সেন্সরশিপ বিশ্লেষক এরিক লিউ চায়না ডিজিটাল টাইমসকে বলেন, “সত্যিই কয়েক বছর ধরে আমি এই কঠোর লকডাউন নীতির প্রভাব দেখে আসছি। প্রতিটি বিষয়ে অতিমাত্রায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।”
তার মতে, সরকারের নীতি জনসাধারণের মধ্যে হতাশার ঢেউ তুলেছ। মাত্রাতিরিক্ত স্বাস্থ্যবিধির কড়াকড়ি বহু মানুষের জন্য শ্বাসরুদ্ধ কর পরিস্থিতিতে তৈরি করেছে।
বিশেষ করে গত সপ্তাহে কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় ১৪ বছর বয়সী কিশোরের মৃত্যু আবারও বিতর্ক তৈরি করেছে। সবমিলিয়ে হতাশা ও ক্লান্তি ছড়িয়েছে সমাজের নানা স্তরে।
নটরডেম ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভিক্টোরিয়া হুইয়ের ভাষ্য, মহামারীর শুরু দু বছর বাদেও সাম্প্রতদিক মাসগুলোতে এই শহরের মানুষদের যে কাজ করতে গেলে অন্তহীন কোভিড পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। নিম্ন বা মধ্যবিত্তই শুধু নয়, উচ্চবিত্তরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছ। মানুষের মনে ধারণা হয়েছে সরকার কোভিড সংক্রমণে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে গিয়ে জনগণের ক্ষতি করছে।
তাই গত সপ্তাহের প্রতিবাদকে হেলাফেলার করার সুযোগ নেই, বলছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভিক্টোরিয়া হুই। তিনি ওই ব্যক্তির স্লোগান ‘আমরা ভোট চাই, আমরা দাস নই, আমরা নাগরিক’ উদ্ধৃত করে বলেন, এ ধরনের মনোভাব ‘কর্তত্ববাদী’ চীনা শাসনের জন্য নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের।
ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী মিং শো হো বলেছেন সংস্কারপন্থি নেতা দেং জিয়াওপিং থেকে শুরু করে অনান্য নেতারা কোভিড বিধিনিষেধ কঠোর করার মধ্য দিয়ে নিজেদের শাসনতান্ত্রিক মানসিকতার ছাপ রেখেছেন। তারা স্বাস্থ্যবিধি আরোপ করতে গিয়ে নানা সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি স্বৈরাচারী রূপেরও প্রকাশ ঘটিয়েছে।

চীনে মাও জে দংয়ের পর শি জিনপিংকেই সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা হিসাবে দেখা হয়। তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হলে তার ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত হবে। শি আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন বলেও অনেকে মনে করেন।
তাই কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের আগে দিয়ে চীনে গণঅসন্তোষ বাড়ছে। কোভিড মোকাবেলায় বহু এলাকায় জারি থাকা কড়া বিধিনিষেধ নিয়েও অনলাইনে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে।
এর আগে জিনপিংয়ের ক্ষমতা একত্রীকরণের বিরুদ্ধে আলোচনা-সমালোচনার পথ কঠোরভাবে রুদ্ধ করা হয়। কিন্তু বেইজিং সেতুতে ওই ব্যক্তির বিক্ষোভ নতুন করে উসকে দিয়েছে জিনপিং বিরোধী আলোচনাকে, মনে করছেন অধ্যাপক মিং শো হো
তার ভাষায়, এই প্রতিবাদটি জিনপিংয়ের তৃতীয় মেয়াদের আগে নতুন তার প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আছে বিপরীতক ব্যাখ্যাও। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যারয়ের রাজৈতিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ হো ফু১ হাং দেশটির বুদ্ধিজীবীদের উপর দমন-পীড়নের ইঙ্গিত করে বলেন, “এই ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিবাদ সামষ্টিক পদক্ষেপ থেকে অনেক দূরে। কমিউনিস্ট পার্টি এসব নিয়ে ভীত নয়। তারা ব্রিজ ম্যানের চেয়েও বড় হুমকি দমনে সক্ষম। তবে এটা ঠিক এই ধরনের ঘটনা অসন্তোষের বীজ সম্পর্কে সচেতন করে।”
১৯৮৯ সালে ছাত্র বিক্ষোভ দমনে যাওয়া ট্যাংক রুখতে যিনি খালি হাতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন, তার পরিণতি কী হয়েছে, তার আর জানা যায়নি। ‘ব্রিজ ম্যান’র যে কী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।