ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ যেভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরাকের তেল বিক্রির পুরো অর্থ জমা হয় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পর ইরাকের শেষ ঘাঁটিগুলো থেকেও মার্কিন বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে পেন্টাগন। তবে সেনা প্রত্যাহার হলেও ২০০৩ সালের আক্রমণের পর থেকে ইরাকের তেল বিক্রির শত শত কোটি কোটি ডলারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে ওয়াশিংটন।
সাড়ে চার হাজার মার্কিন সৈন্যের প্রাণহানির পর আমেরিকানদের এই প্রস্থানকে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে উদযাপন করছে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা। কিন্তু ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ নিয়ন্ত্রণের সুযোগে ওয়াশিংটন কেবল বাগদাদের রাজনীতি ও অর্থনীতিতেই প্রভাব খাটাচ্ছে না, পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখছে; লিখেছে রয়টার্স ।
ইরাকের তেল বিক্রির পুরো অর্থ জমা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে।
২০০৩ সালে ইরাক দখলের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘কোয়ালিশন প্রোভিশনাল অথরিটি’ (সিপিএ) দেশ পুনর্গঠনের জন্য ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ (ডিএফআই) নামের একটি বিশেষ তহবিল গঠন করে।
সাদ্দাম হোসেনের আমলের দেনা ও মামলা-মোকদ্দমা থেকে ইরাকের তেল আয়কে সুরক্ষা দিতে এর অ্যাকাউন্টটি নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে খোলা হয়।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে চালু হওয়া এই ব্যবস্থা পরবর্তী সময়ে প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নবায়ন করে আসছেন।
পরবর্তী সময়ে এই ডিএফআই ফান্ডটি নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে পরিচালিত ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি মূল অ্যাকাউন্টে রূপান্তরিত হয়, যা আজও একই নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে।
ইরাকের জাতীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ আয়ই আসে তেল রপ্তানি থেকে। তেল রপ্তানির আয়ের পুরোটাই জমা হয় ফেডারেল ব্যাংকের ওই ইরাকি অ্যাকাউন্টে। ফলে দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ওয়াশিংটনের হাতে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২০ সালে ইরাক সরকার যখন আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন সেনাদের দেশ ছাড়তে বলে, তখন নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ফান্ডে ইরাকের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় ওয়াশিংটন। শেষ পর্যন্ত মার্কিন চাপের মুখে পিছু হঠতে বাধ্য হয় বাগদাদ।
যদিও দখলদারিত্বের শুরুর দিকের তুলনায় ইরাক এখন নিজের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বাধীনতা পেয়েছে, তবুও এই নির্ভরতা দেশটির পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরাকি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থা ইরাকের আর্থিক স্থিতিশীলতা সুদৃঢ় করতে ও রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করেছে।
তারা জানান, এটি তেল বহির্ভূত আয়ের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আস্থা বৃদ্ধি করে, বাণিজ্য ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার প্রাপ্তি সহজ করে। পাশাপাশি পাওনাদারদের দাবি ও আইনি অভিযোগসহ বাইরের বিভিন্ন দাবি ও আর্থিক ধাক্কা থেকে আয়কে সুরক্ষা দেয়।
তারা আরও জানান, এই ব্যবস্থা বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ও ইরাকের অর্থনীতির ওপর আস্থা সুদৃঢ় করতে সহায়তা করে।
পাশাপাশি ইরাকের ভেতরে সক্রিয় ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যাতে অবাধে ডলার ব্যবহার করতে না পারে, অর্থাৎ তাদের ওপর লাগাম টানতে মার্কিন এই কড়াকড়িকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে বাগদাদ। যারা ডলারের সহজলভ্যতার ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করতে চায়, ইরানের মিত্র গোষ্ঠীসহ এমন কিছু পক্ষের বিরোধিতা করারও সুযোগ পায় সরকার।
গত বছরও ইরানের কাছে অবৈধভাবে ডলার পাচারের অভিযোগে একাধিক ইরাকি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্র ডলার সরবরাহে কড়াকড়ি আরোপ করায় ইরাকের ভেতরে খোলা বা সমান্তরাল এক কালোবাজার তৈরি হয়েছে।
এর ফলে ব্যাংকের সরকারি বিনিময় হার এবং খোলা বাজারের ডলারের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই মূল্যের পার্থক্যটি মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের একটি ‘ঝুঁকি মাসুল’ বা রিস্ক প্রিমিয়াম।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি জোরদার করায় দুই শক্তির লড়াইয়ের মাঝে পড়ে বিপাকে পড়েছে ইরাক।
বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যে সামরিক অভিযান শুরু করেছেন, তা বাগদাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরাকের তেল বিক্রির যাবতীয় অর্থ এখনো নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হেফাজতেই জমা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ডলার নিলাম’ বা ‘ফরেন কারেন্সি উইন্ডো’র মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করে আসছিল।
তবে অবৈধ লেনদেন ও বিশেষ করে ইরানে ডলার পাচার বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপের মুখে ২০২৫ সালের শুরুতেই দুই দশকের পুরনো এই ‘ডলার নিলাম’ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে ইরাক।
