Published : 25 Mar 2026, 05:22 PM
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী নৌযানের চলাচল সুরক্ষিত রাখার পথ বের করতে আলোচনার চেষ্টা চালানো পশ্চিমা মিত্রদের কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা একইসঙ্গে তাদের সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বছর দুয়েক আগে একই রকমের এক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল লোহিত সাগরকে নিরাপদ করতে। কিন্তু শত শত কোটি ডলার খরচ করে ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে হওয়া ওই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
লোহিত সাগরে চড়া মূল্য দেওয়া ওই অভিজ্ঞতা—যেখানে চারটি জাহাজ ডুবেছে, শতকোটি ডলারের বেশি অস্ত্রশস্ত্র খরচ হয়েছে, তারপরও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ওই জলপথ এড়িয়ে চলে—এখন ছায়া ফেলছে তার চেয়েও জটিল হরমুজ প্রণালির ওপর, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনী হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর থেকে ইরান কার্যত ওই প্রণালি বন্ধ করে করে রেখেছে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশটির সামরিক শক্তি ও সক্ষমতা হুতিদের তুলনায় অনেক অনেকগুণ বেশি।
প্রণালিটি বন্ধ নিয়ে ইরানের হুমকি এবং কাছাকাছি উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ফলে ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সরবরাহে সবচেয়ে বড় বিঘ্ন ঘটায় তেলের দামেও ব্যাপক উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি না খুললে সঙ্কটের তীব্রতা আরও বাড়বে, যার ফলে জ্বালানির পাশাপাশি বিশ্বজুড়েই খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে।
“হরমুজ প্রণালির কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক আইন ও বাস্তবতা অনুযায়ী এটি বিশ্বের (সকলের) প্রণালি,” মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে সেরাউইক জ্বালানি সম্মেলনে দেওয়া ভিডিও বার্তায় এমনটাই বলেছেন কুয়েত পেট্রলিয়ামের প্রধান নির্বাহী শেখ নাওয়াফ সৌদ আল-সাবাহ।
প্রণালিটির সুরক্ষা নিশ্চিতে নানান প্রস্তাব নিয়ে মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে আলোচনাও হয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইনসহ কিছু দেশ ‘যে কোনো উপায়ে’ প্রণালিটি সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা চেয়েছে। এই ব্যবস্থা পাস হলে, হরমুজ চালু রাখতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বলপ্রয়োগ করতে পারবে।
এ বিষয়ে রয়টার্স নিরাপত্তা ও সমুদ্র বিষয়ক ১৯ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে, যারা বলেছেন—হরমুজ সুরক্ষিত রাখতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের ভয়াবহ প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হবে।
কেননা, ইরানের সামরিক শক্তিমত্তা হুতিদের চেয়ে বেশি, তাদের অস্ত্রভাণ্ডারে আছে সস্তা ড্রোন, ভাসমান মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র, যেগুলো খুব সহজেই ইরানের রুক্ষ পাহাড়ি উপকূল থেকে সঙ্কীর্ণ জলপথটিতে আঘাত হানতে পারবে।
“হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের বহরের সুরক্ষা দেওয়া লোহিত সাগরের থেকে অনেক অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং,” বলছেন অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমেরি। তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় ১৯৮৮ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে ট্যাংকারগুলোকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা মার্কিন অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলাকালেই যুদ্ধ শুরু করে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এখন এই হরমুজ গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ প্রণালিটি বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রেই এখন গ্যালনপ্রতি গ্যাসের দাম ৪ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এদিকে নভেম্বরেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে জ্বালানির মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভালো কোনো খবর শোনাতে না পারলে, এবং পকেট থেকে যাওয়া অতিরিক্ত অর্থের পেছনে যুক্তিযুক্ত কারণ হাজির না করতে পারলে ট্রাম্পের রিপাবলিকান প্রার্থীদের ধরাশায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।
হরমুজ পুরোপুরি সচল করতে না পারলে ট্রাম্প বেশ বিপদেই পড়তে যাচ্ছেন, বলছেন বিশ্লেষকরা।
প্রণালিটি সচলে মার্কিন বাহিনীর দৃঢ় ভূমিকা থাকবে—ট্রাম্প এ ধরনের প্রতিশ্রুতিও দিতে পারছেন না। মার্কিন এ প্রেসিডেন্ট প্রথমে বলেছিলেন, প্রয়োজন পড়লে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলে মার্কিন নৌবাহিনী পাহারা দেবে। কিন্তু এখন তিনি সে অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। বলছেন, অন্য দেশগুলোর উচিত এ ধরনের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেওয়া।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর করার পর থেকে সাড়ে তিন সপ্তাহে ইরান হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজকে ওই প্রণালি পার হতে দিয়েছে। এর বাইরে শত শত জাহাজ প্রণালিটির দুই পাশে ও কাছাকাছি এলাকাগুলোতে স্থবির হয়ে বসে আছে।
তেহরান এখন ওই প্রণালি পার হতে চাওয়া নৌযানগুলোর ওপর ফি আরোপের কথা ভাবছে বলে গত সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন ইরানের এক আইনপ্রণেতা।
হরমুজের গোলকধাঁধা
হুতিদের কাছ থেকে লোহিত সাগরকে সুরক্ষিত করতে মার্কিন অভিযান শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, কয়েক মাস পরে ইউরোপের দেশগুলোও নিজেদের অভিযানে নামে। পশ্চিমা এই মিত্র দেশগুলো শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে, তারপরও হুতিরা ২০২৪ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের মধ্যে চারটি জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।
নৌযান পরিচালনাকারীরা এখন লোহিত সাগরের ওই পথ মোটাদাগে এড়িয়েই চলেন, অথচ এক সময় বিশ্ব বাণিজ্যের ১২ শতাংশই এ পথ দিয়ে হত। হুতিদের নজরের বাইরে থাকতে বেশিরভাগ নৌযানই এখন হর্ন অব আফ্রিকা দিয়ে যাতায়াতের দীর্ঘ পথ বেছে নেয়।
“কারিগরি ও অভিযানগত বিবেচনায় একে জয় বলা গেলেও কৌশলগত বিবেচনায় এটি যদি পরাজয় না’ও হয়, তাহলেও এটি ড্র,” বলেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএনএ’র নৌ বিশ্লেষক জশুয়া তালিস।
লোহিত সাগরের দিকে যাওয়া বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে যে জায়গা থেকে হুতিরা হামলা করতে পারতো, হরমুজ প্রণালির আশপাশে তার চেয়ে পাঁচগুণ বড় বিপজ্জনক জায়গা বিদ্যমান। হুতিরা পেশাদার সেনাবাহিনী নয়। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কেবল পেশাদারই নয়, তাদের নিজস্ব অস্ত্র কারখানা ও অর্থের জোগান রয়েছে।
এসব কারণে হরমুজে চলাচলরত জাহাজকে পাহারায় যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের ডেস্ট্রয়ারের মতো ডজনখানেক বড় যুদ্ধজাহাজ লাগবে। তাদের সহায়তায় থাকতে হবে যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার। এগুলোকে একসঙ্গে সমন্বয় করা এবং একে অপরের খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে, বলছেন একাধিক সমর বিশ্লেষক।
উড়ন্ত ড্রোন এবং সমুদ্রে থাকা নৌযানের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে সক্ষম মনুষ্যবাহী বা মনুষ্যহীন বিস্ফোরকবোঝাই নৌযান থেকে সুরক্ষায় আকাশপথেও টহল দেওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম, বলছেন তারা।
“একটি ডেস্ট্রয়ার হয়তো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারবে, কিন্তু একসঙ্গে মাইন সরাতে, বিভিন্ন দিক থেকে আসা এক ঝাঁক ড্রোন-নৌকাকে প্রতিরোধ ও জিপিএস সঙ্কেতের বিপর্যয় সামলাতে পারবে না,” বলছেন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএসওয়াইয়ের বিশ্লেষকরা।
হরমুজ সংশ্লিষ্ট শত শত মাইল খাড়া ও পাহাড়ি উপকূলীয় এলাকায় অসংখ্য ভবন ও গুহায় আইআরজিসির যোদ্ধারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুদ করে রেখেছে বলে অনুমান অধিকাংশ বিশ্লেষকের।
কোথাও কোথাও উপকূল জাহাজের এত কাছে থাকবে যে ড্রোন মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে নৌযানটিকে ঘিরে ফেলতে পারবে, বলছেন তারা।
“সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ভাসমান মাইন রয়েছে। আপনি যদি এই তিনটি সক্ষমতা ধ্বংসও করে দেন, এরপর রয়েছে আত্মঘাতী অভিযান,” বলেছেন ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট ফর স্টাডিজ অন দ্য মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকার পরিচালক আদেল বাকাওয়ান।
সমুদ্রে পাতা মাইন ও ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছোট ছোট সাবমেরিনগুলো এমন এক হুমকি, লোহিত সাগরেও যার মুখোমুখি হতে হয়নি যুক্তরাষ্ট্রকে, বলেছেন রয়্যাল নেভির অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডার টম শারপি। কিন্তু হরমুজে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এমন হুমকির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।
“যদি আমেরিকানরা এখানে একটি ডেস্ট্রয়ার হারায়, তাহলেই সব হিসাব-নিকাশ বদলে যাবে। সেখানে ৩০০ জনের মতো নাবিক ও ক্রু থাকে,” মার্কিনিদের সম্ভাব্য প্রাণহানির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন শারপি।
তবে ইরান প্রণালিটিতে মাইন বসিয়েছে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই বলে চলতি মাসের শুরুর দিকেই একবার বলেছিলেন মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ। ওই জলপথে ইরান ডজনখানেক মাইন পেতে রেখেছে বলে সেসময় খবর বেরিয়েছিল।
মাইন সরানোর নৌযান, সামরিক পাহারা ও আকাশে টহল— এই তিনের সমন্বয়ে হরমুজে ফের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা যাবে বলে মত হাডসন ইনস্টিটিউটের স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধবিদ্যার বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ক্লার্কের।
“আইআরজিসির হুমকি নিশ্চিহ্নে আপনাকে এ কাজ মাসের পর মাস চালিয়ে যেতে হবে,” বলেছেন তিনি।