Published : 21 Dec 2025, 05:34 PM
জিভে পানি আনা কাবাব, সুবাসিত বিরিয়ানি কিংবা মুখে দিলেই মিলিয়ে যাওয়া মিষ্টান্ন, খাবারের কথা উঠলেই ভারতের উত্তরাঞ্চলের শহর লখনউকে আলাদা করে চিনিয়ে দেওয়ার কিছু থাকে না।
দীর্ঘদিন ধরেই খাবারপ্রেমীদের কাছে লখনৌ যেন এক স্বর্গরাজ্য। এবার সেই পরিচিত স্বাদ ও ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল।
গত মাসে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো লখনউকে ‘উত্তম ভোজনবিলাসের সৃজনশীল শহর’ দিয়েছে।
এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে লখনৌ যুক্ত হল বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশের ৪০৮ টি শহরের একটি নেটওয়ার্কে, যেখানে নগর উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইউনেস্কোর দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক টিম কার্টিস বলেন, এই স্বীকৃতি লখনউয়ের গভীরভাবে প্রোথিত রান্নার ঐতিহ্য ও প্রাণবন্ত খাদ্যসংস্কৃতির স্বীকৃতি।
এটি শহরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সম্মান জানায় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করে।
খাবারের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ৭০টি শহরের তালিকায় ভারতের দ্বিতীয় শহর হিসেবে স্থান করে নিল লখনৌ। এর আগে ২০১৯ সালে ভারতের হায়দ্রাবাদ শহর এই স্বীকৃতি পায়।
লাখনৌ শহরের বাসিন্দা ও খাবারপ্রেমীদের কাছে এই ঘোষণা খুব একটা বিস্ময়কর নয়। অনেকেই জনপ্রিয় রন্ধনশিল্পী রানভীর ব্রারের মন্তব্যের সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, “দেরিতে হলেও ভাল। আরও আগেই আসা উচিত ছিল।”
উত্তর প্রদেশের রাজধানী এই শহরের আত্মার সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক বহু পুরোনো। দিনের শুরু থেকে শেষ, কি রান্না হবে, কীভাবে হবে, এ আলোচনা ঘুরে ফিরে আসে ঘরে ঘরে।
সানাতকাড়া ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা মাধবী কুক্রেজা, যারা ‘কিচেনস অফ লখনউ’ প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বিবিসি-কে তিনি বলেন, লখনৌয়ের খাবারের বিশেষত্ব হল যত্ন আর সময় নিয়ে রান্না করা।
তার ভাষায়, এখানে মানুষকে রান্নার মান দিয়েই বিচার করা হয়। এই খাবারের ইতিহাস কয়েক শতকের পুরোনো। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে নবাবদের শাসনামলে লখনৌ পরিচিতি পায় ‘নবাবদের শহর’ হিসেবে।
সেই সময় রাজকীয় রান্নাঘরগুলোতে পারস্য ও স্থানীয় ভারতীয় রান্নার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে আওয়ধি খাবারের ধারা।
সেখানেই জন্ম নেয় লখনৌয়ের বিখ্যাত কাবাব। কথিত আছে, দাঁত হারানো এক নবাবের জন্য তৈরি করা হয়েছিল মাটন গালোটি কাবাব, পেঁপে, জাফরান ও মসলায় মাখানো এতটাই নরম মাংস, যা চিবোনোর দরকার হত না।
এই সময়েই জনপ্রিয় হয় ‘দম পুখত’ রান্নার পদ্ধতি, কম আঁচে, মুখ বন্ধ পাত্রে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না। দুর্ভিক্ষের সময় একপাত্রে ভাত, মাংস ও মসলার এই রান্না থেকেই এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু।
আধুনিক সময়ে এই রান্নার ধারা জনপ্রিয় করেন প্রয়াত রন্ধনশিল্পী ইমতিয়াজ কুরেশি, যিনি দিল্লির বিখ্যাত ‘দম পুখত’ ও ‘বুখারা’ রেস্তোরাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তবে লখনৌ মানেই শুধু কাবাব বা বিরিয়ানি নয়। নিরামিষ খাবারেরও বড় ভাণ্ডার আছে এখানে। স্থানীয় বানিয়া সম্প্রদায়ের নিরামিষ রান্না, ঋতুভিত্তিক সবজি ও মিষ্টান্ন শহরের খাদ্যসংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট দোকান, যেগুলো স্থানীয়দের কাছে অমূল্য। ভোরে হাজরতগঞ্জে শর্মাজি টি স্টলে ভিড় জমে দুধ-চা আর মাখন লাগানো নরম পাউরুটির জন্য। ১৯৪৯ সাল থেকে চলছে এই দোকান।
পুরনো শহরের আমিনাবাদ এলাকায় ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত নেটরাম আজও পরিচিত কচুরি-জিলাপির জন্য। ষষ্ঠ প্রজন্মের মালিকেরা এখনও আগের নিয়মেই রেসিপি রক্ষা করে চলেছেন।
শীতকালে পাওয়া যায় মাখন মালাই, হালকা, ফেনার মতো এক ধরনের মিষ্টি, যা রাতের শিশিরে রেখে তৈরি করা হয়। তবে অনেক বিক্রেতাই বলছেন, এই শিল্প ধরে রাখার মতো আগ্রহ নতুন প্রজন্মের মধ্যে কমছে।
জনপ্রিয় রন্ধনশিল্পী রানভীর ব্রারের মতে, ইউনেস্কোর স্বীকৃতির আসল সাফল্য তখনই আসবে, যখন লখনৌ তার কম পরিচিত খাবারের দোকানগুলোকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারবে।
সানাতকাড়া ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা মাধবী কুক্রেজার কথায়, লখনৌয়ের প্রতিটি খাবারের পেছনে আছে একটি গল্প, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা রেসিপি আর পরিশ্রমের ইতিহাস।
এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সেই গল্পগুলোকে বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে বলেই মনে করছেন তিনি।