২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ডিএনএ বিশ্লেষণে মিলল ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীর উৎসের সন্ধান

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় প্লেগের ভয়ংকর এক ধরণ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময়ে ওই মহামারী ইউরোপের প্রায় অর্ধেক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশেও হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহতম ওই মহামারী ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 16 Jun 2022, 11:41 PM

Updated : 25 Oct 2022, 10:44 AM

Image
ছবি রয়টার্স
Image
ছবি: সিএনএন
Image
ছবি: সিএনএন

ইউরোপে ১৩৪৬ সাল থেকে ১৩৫৩ সাল পর্যন্ত চলে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীর তাণ্ডব। ধারণা করা হয়, ওই সাত বছরে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে ইউরোপে সাড়ে ৭ থেকে ২০ কোটি মানুষ মারা যায়।

মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর অনেক দিন পর্যন্ত অবশ্য কী রোগে এত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তা বিজ্ঞানীদের অজানাই ছিল। এখন আমরা জানি, রোগটির নাম ‘বিউবনিক প্লেগ’। ‘ইউসিনিয়া পেসটিস’ নামের এক ব্যাকটেরিয়া এর হোতা।

 এই ব্যাকটেরিয়ার বাহক ছিল ‘ওরিয়েন্টাল র‌্যাট ফ্লি’ নামের এক প্রজাতির মাছি। ভয়ংকর মাছিগুলো ইঁদুরকে কামড়ানোর ফলেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল প্লেগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাত-পায়ের আঙুল কালো হয়ে যেত। সেই থেকে এই মহামারী ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা ‘কালো মড়ক’ নামে পরিচিতি পায়।

Image
ছবি: সিএনএন

ছবি: সিএনএন

রোগের উৎস:

কোথা থেকে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীর সূত্রপাত হয়েছিল তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে মতপার্থক্য চলছে।

কিন্তু সম্প্রতি একদল গবেষক দাবি করছেন, তারা এই মহামারীর উৎসের সন্ধান পেয়েছেন। তারা বলছেন, ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীর সূত্রপাত হয় ১৩৩০ এর দশকে মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানে। সেখানে দুটি কবরস্থান কারা ডিজিগাচ ও বুরানা থেকে তারা নমুনা সংগ্রহ করেছেন।

ধারণা করা হয়, মহামারীর কারণে মারা যাওয়া লোকদের ওই কবরস্থান দুটিতে সমাধিস্থ করা হয়েছে। কবরস্থানের সমাধিফলকগুলোতে মৃত্যুর তারিখ লেখা আছে। এমনকী কয়েকটি সমাধিফলকে রহস্যময় মহামারী নিয়েও কিছু কথা বলা আছে। কবরস্থানগুলো আইসিককুল হ্রদের কাছে অবস্থিত।

মহামারীর কারণে ১৩৩৮ ও ১৩৩৯ সালে সেখানে কবরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গবেষকরা ওই দুটি কবরস্থান থেকে বের করা কয়েকটি মৃতদেহের ডিএনএ সংগ্রহ করে সেগুলোর জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের কিছু প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছেন।

জার্নাল নেচার এ বুধবার ওই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ পেয়েছে। সিএনএন জানিয়েছে, আইসিক-কুল হ্রদের কাছে কবরস্থান দুটির কবরগুলো অবশ্য ১৮৮০ এর দশকে প্রথমে খনন করা হয়।

পরে স্কটল্যান্ডের স্টার্লিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইতিহাসবিদ ফিল স্লাভিন ২০১৭ সালে সিরিয়াক ভাষায় লেখা কবরগুলোর সমাধিফলক পুনরায় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করেন।

তিনি লক্ষ্য করেন, সেখানে ৪৬৭টি সমাধিফলকে ঠিকঠাক তারিখ দেওয়া ছিল। যেখানে ১১৮টি সমাধিফলকের তারিখ তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। সেগুলোতে মাত্র দুই বছর অর্থাৎ ১৩৩৮ ও ১৩৩৯ সাল লেখা। যেটিকে তিনি খুবই ‘আশ্চর্যজনক’ বলে বর্ণনা করেন।

এক সংবাদ সম্মেলনে স্লাভিন বলেন, ‘‘যখন আপনি এক বা দুই বছরে অনেক বেশি মৃত্যু দেখবেন, তার অর্থ সেখানে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছিল। তবে সেখানে অন্য একটি বিষয় যেটি সত্যিকার অর্থে আমার মনযোগ কেড়েছিল সেটি কোনও বছর নয় বরং সময়। সেই সময়টা ছিল ইউরোপে প্লেগ আসার ঠিক সাত থেকে আট বছর আগের।

‘‘আমি সবসময়ই ব্ল্যাক ডেথ মহামারী নিয়ে কাজ করতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলাম। এবং আমার স্বপ্নগুলোর একটি ছিল ঠিক কোথা থেকে এটির সূত্রপাত হয়েছিল সেই ধাঁধার উত্তর খুঁজে বের করা।”

স্লাভিন এবং তার সহযোগীরা আবিষ্কার করেন, কিরগিজস্তানের সমাধিস্থলে কবর দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০ জনের দেহাবশেষ রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গে পিটার দ্য গ্রেট মিউজিয়াম রাখা আছে।

কীভাবে ওই ব্যক্তিদের মৃত্যু হয়েছিল তা পরীক্ষা করতে ওইসব দেহাবশেষ থেকে নমুনা নিয়ে তার ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি পান স্লাভিনের নেতৃত্বাধীন গবেষক দল।

গবেষকরা সেখানকার সাতটি কঙ্কালের দাঁত থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন। ওই ডিএনএ বিশ্লেষণ করে তারা যে জেনেটিক উপাদান পান তার মধ্যে তিনটি কঙ্কালের জেনেটিক উপাদানে তারা ‘প্লেগ ব্যাকটেরিয়াম’ এর ডিএনএ খুঁজে পান।

যাকে বিজ্ঞানীরা ‘ইউসিনিয়া পেসটিস’ বলে। ওই তিনজনের প্রত্যেকের সমাধিফলকে মৃত্যুর বছর ১৩৩৮ সাল খোদাই করা ছিল।

এর মাধ্যমে এটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সমাধিফলকে যে মহামারীর কথা উল্লেখ করা আছে, সেটি প্রকৃতপক্ষে প্লেগ। যা ইঁদুর থেকে মাছির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।

প্রতিবেদনে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারী ছড়িয়ে পড়ার চিত্র বর্ণনায় বলা হয়, ১৩৪৭ সালে প্লেগ প্রথম কৃষ্ণ সাগরের আশেপাশের অঞ্চলগুলি থেকে পণ্য পরিবহনকারী বাণিজ্য জাহাজের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করে। তারপর এই রোগ ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ওই সময়ে ওইসব অঞ্চলের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ মারা যায়।

কিছু ইতিহাসবিদ অবশ্য বিশ্বাস করেন, প্লেগের যে ধরণ ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীর জন্য দায়ী সেটির উদ্ভব হয়েছিল চীনে। আবার কেউ কেউ মনে করেন সেটি কাস্পিয়ান সাগরের কাছের কোনও অঞ্চল থেকে ছড়িয়েছিল।

সম্ভাব্য উৎস হিসেবে কেউ কেউ ভারতের কথাও বলেন। প্রায় ৫০০ বছর ধরে প্লেগের নানা ধরণ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।

Image
ছবি: সিএনএন

ছবি: সিএনএন

প্লেগের ধরণের বিবর্তন:

জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে জানা গেছে, প্রাচীন কিছু রোগজীবাণু যেমন প্লেগ যা মানুষের ডিএনএ তে একটি জেনেটিক ছাপ ফেলে গেছে। এই গবেষণা ওই তথ্যভাণ্ডের নতুন সংযোজন।

২০১১ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথম প্লেগ ব্যাক্টেরিয়া ‘ইউসিনিয়া পেসটিস’ এর জেনেটিক রহস্য উন্মোচন করে।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে কবর দেওয়া প্লেগ আক্রান্ত দুই ব্যক্তির দেহাবশেষ থেকে তারা নমুনা সংগ্রহ করেন। তারপর থেকে, ইউরোপ এবং দক্ষিণ রাশিয়া জুড়ে কবর দেওয়া প্লেগ আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহাবশেষ থেকে জেনেটিক উপাদান সংগ্রহ করে সেগুলো পরীক্ষা করা শুরু হয়।

ওই সব পরীক্ষা থেকে প্লেগের জীবাণুর বৈচিত্রময় অসংখ্য ধরণ পাওয়া যায়। এটা যেন ‘বিগ ব্যাং’ বিস্ফোরণের মত পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় জড়িত গবেষকরা বিশ্বাস করেন, কিরগিজস্তানের আইসিক-কুল হ্রদের কাছে দুটি কবরস্থানের আশেপাশের এলাকাটিই প্লেগের ওই ধরণের উৎস, যেটি ব্ল্যাক ডেথ মহামারীর কারণ ছিল।

কারণ, তারা দুটি কঙ্কালের দাঁত থেকে পাওয়া ডিএনএ জিনগত বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে দেখেছেন, সেগুলো প্লেগের একই ধরণ। যা বিশ্বজুড়ে বিগ ব্যাং এর মত ছড়িয়ে পড়া মহামারীর সবচেয়ে প্রত্যক্ষ পূর্বপুরুষ।

তারা বলেন, ঠিক এই স্থানেই ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীর একেবারের প্রাথমিক প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল এবং সেটি এই মহামারী ইউরোপে পৌঁছানোরও আগে।

গবেষকদের একজন জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারিয়া স্পিরু বলেন, ‘‘আমরা দেখতে পেয়েছি কিরগিজস্তানে পাওয়া প্লেগের প্রাচীন ওই ধরণই ভয়াবহ ওই মহামারীর একেবারে মূলে অবস্থিত।”

আরেক গবেষক ইয়ুহানেস ক্রাউজে বলেন, ‘‘ঠিক কোভিডের মত ব্ল্যাক ডেথ মহামারীও অন্য কোথাও থেকে আসা রোগ যেটি ভয়াবহ এক মহামারীর সূত্রপাত করে এবং যেটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলেছে। ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল সেটা বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।