কাবুল বিমানবন্দরে আইএসের হামলার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের
কাবুল বিমানবন্দরে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আফগানিস্তান শাখার হামলার আশঙ্কার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দিয়েছে আফগানিস্তানের মার্কিন দূতাবাস।
বিবিসি জানায়, শনিবার দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দর থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ফটকের বাইরে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব নাগরিক এখনও কাবুলে অবস্থান করছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোনো প্রতিনিধির কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত যেন বিমানবন্দরের দিকে না যান।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, সবচেয়ে বড় হুমকি এখন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আফগানিস্তানের শাখা, যারা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হামলা চালাতে পারে। সেরকম কিছু ঘটলে কেবল যুক্তরাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, তালেবানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ধারণাও চোট পাবে।
পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানান, বিমানবন্দরের ফটক সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে যেসব মার্কিন নাগরিকের যথাযথ সনদ আছে তাদের ঢোকার সুযোগ করে দিতে সেগুলো সাময়িকভাবে খুলে দেওয়া হবে।
এই সতর্কতার কারণ হিসেবে কাবুল বিমানবন্দরে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন কর্মকর্তারা। আফগানিস্তানজুড়ে খাবারের অভাব বেড়ে যাওয়ার কথাও তারা বলেছেন।
অন্যান্য দেশও কাবুল বিমানবন্দর ও কাবুলের পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে।
জার্মানি সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, কাবুল বিমানবন্দর “অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং বিমানবন্দরে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব”।
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ‘উল্লেখযোগ্য মাত্রায় খারাপ হয়েছে’ এবং কাবুল থেকে একটি ভাড়া করা বিমানে নাগরিকদের বের করে আনার প্রক্রিয়া বাতিল করেছে তারা।
ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস
পেন্টাগনের জয়েন্ট স্টাফ মেজর জেনারেল উইলিয়াম টেইলর শনিবার বলেন, কাবুল বিমানবন্দরে সামরিক বাহিনীর কমান্ডাররা যথাযথ কাগজপত্রসহ আসা মার্কিন নাগরিক, আফগান মিত্র ও অন্য বিদেশিদের ‘হিসাব’ রাখছে এবং তাদের পরিচয়গুলো যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, শনিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩ হাজার ৮০০ যাত্রীকে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাদের অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তবে দুই দিন আগে এই সংখ্যা ছিল ৬ হাজার।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা হিসাব দিয়েছিলেন, আফগানিস্তানে ১০ থেকে ১৫ হাজার মার্কিন নাগরিক অবস্থান করছিলেন, তবে এখনও কতজন রয়ে গেছেন, তারা হালনাগাদ কোনো হিসাব তারা জানাতে পারেননি।
গত ১৫ অগাস্ট তালেবান বাহিনী কাবুল দখল করে নেওয়ার পর দেশ ছাড়ার চেষ্টায় বিমানবন্দরে মানুষের ঢল নামে। বিদেশিদের সরিয়ে নেওয়ার ফ্লাইটে আফগানদের ওঠার মরিয়া চেষ্টায় সেখানে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
কাবুলে বিমানবন্দরের ফটক বন্ধ রাখায় উঁচু দেয়াল টপকে অনেকে ভেতরে যেতে দেখা যায়। উড়াল দেওয়ার সময় বিমানের ল্যান্ডিং গিয়ারে উঠে পড়া অন্তত দুজন পড়ে গিয়ে নিহতও হয়েছেন।
তালেবান বন্দুকধারীদের মারধর এবং কাঁদুনে গ্যাস সহ্য করেও বহু আফগান স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বিমানবন্দর এলাকায় ভিড় করে আছে এই আশায় যে কোনো না কোনোভাবে তারা হয়ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানে চড়ার সুযোগ পাবে। এসব উড়োজাহাজে মার্কিন নাগরিক ও তাদের আফগান মিত্রদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দুই বছরের একটি শিশু শনিবার সকালে বিমানবন্দরের একটি ফটকে পদদলিত হয়ে মারা যায়। মেয়েটির মা কাবুলে একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মী।
তিনি জানান, ভিড় করে থাকা মানুষ যখন ফটক দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছলো, তাদের ধাক্কায় তিনি পড়ে যান এবং তার মেয়ে পদপিষ্ট হয়। ওই ঘটনার পরই বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার সতর্কবার্তা আসে।
দেশ ছাড়ার চেষ্টায় এই আফগান জনস্রোত সামলাতে হিমশিম অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন আফগানিস্তানের বাইরে থেকে বাণিজ্যিক বিমানসংস্থাকেও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে, যাতে তারা আরও বেশি আফগান শরণার্থীকে বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যেতে পারে।
ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস
পেন্টাগনের মুখপাত্র জন এফ কিরবি শনিবার বলেন, বৃহস্পতিবারের পর আর কোনো মার্কিন নাগরিককে হেলিকপ্টারে করে কাবুল থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে হয়নি। তবে ভবিষ্যতে আর এমন অভিযান পরিচালনার সম্ভাবনাও নাকচ তিনি করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, আইএস সামরিক বা বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে হামলা চালাতে পারে, এমন একটি হুমকি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
এদিকে তালেবানের সহপ্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আব্দুল গনি বারাদার শনিবার কাবুলে পৌঁছেছেন। তিনি আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এবং অন্য রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করছেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
তালেবানের সংস্কৃতি বিষয়ক কমিটির উপপ্রধান আহমাদুল্লাহ ওয়াসেক বলেছেন, “এখন দর কষাকষি চলছে”।
কাবুলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালেবান বন্দুকধারীরা সেই সব আফগানদের খুঁজছে, যারা যুক্তরাষ্ট্র সরকার বা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন অথবা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকারের পক্ষে ছিলেন।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির হিসাবে, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩ লাখের বেশি আফগান নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাদের একটি ছোট অংশই কেবল মার্কিন সহায়তায় আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ঠিক কতজন মার্কিন নাগরিক কাবুলে আটকা পড়েছেন এবং আফগানিস্তান ছেড়ে আসার চেষ্টা করছেন, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা এখন পর্যন্ত তাদের জানা নেই।
পেন্টাগন জানিয়েছে, জুলাইয়ের শেষ থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২২ হাজার লোককে আফগানিস্তান থেকে বের করে আনা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৭ হাজার মানুষকে সরানো হয়েছে ১৪ আগস্টের পর।
