মওদূদী কেন জিন্নাহবিরোধী-১: মুসলমানদের নাকি ইসলামের রাষ্ট্র?
মোটাদাগে জিন্নাহর প্রতি মওদূদীর আপত্তি ছিল দুটি স্তরে—ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামি চরিত্রের অনুপস্থিতি এবং ইসলামকে একটি আদর্শিক রাষ্ট্রের বদলে স্রেফ রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার বানানো।
ইতিহাসে দেখা যায়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা আর তার আদর্শের রূপকার অনেক সময় একই ব্যক্তি নন। পাকিস্তান এর সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্তগুলোর একটি। দেশটিকে ইসলামি রাষ্ট্রে রূপান্তরের সবচেয়ে সুসংবদ্ধ তাত্ত্বিক কাঠামো যিনি গড়েছিলেন, ওই সৈয়দ আবুল আলা মওদূদী নিজেই পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্ব, মুসলিম লীগের রাজনীতি এবং লীগের পাকিস্তান কল্পনা, তিনটিরই তিনি ছিলেন কঠোর সমালোচক। অথচ পাকিস্তানের জন্মের তিন দশক পর, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি দেখে গেছেন, রাষ্ট্রের সংবিধান আর আইনে তার চিন্তার ছাপ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
মওদূদীর জিন্নাহ বিরোধিতার শিকড় ব্যক্তিগত অপছন্দে নয়, দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রকল্পনার সংঘাতের গভীরে। আর ওই সংঘাতে মওদূদী শেষ পর্যন্ত যে জায়গা করে নিলেন, তার পেছনে তার দলের শক্তির চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে প্রতিপক্ষ শাসকদের আপস।
মওদূদীর রাজনৈতিক চিন্তার ভিত গড়ে উঠেছিল জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার অনেক আগে। ১৯০৩ সালে হায়দরাবাদ রাজ্যের আওরঙ্গাবাদে তার জন্ম। কর্মজীবনের শুরু সাংবাদিকতায়। বিশের দশকে তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মুখপত্র ‘আল জমিয়ত’ সম্পাদনা করেন। ওই দশকের শেষে জিহাদ নিয়ে এক বিতর্কের জবাবে লেখা তার গ্রন্থ ‘আল-জিহাদ ফিল ইসলাম’ (ইসলামে জিহাদ) তাকে পরিচিতি এনে দেয়, আর ১৯৩৩ সাল থেকে ‘তরজুমানুল কুরআন’ পত্রিকা হয়ে ওঠে তার চিন্তা প্রচারের প্রধান বাহন।
১৯৩৮ সালে কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালের উৎসাহে তিনি হায়দরাবাদ ছেড়ে পাঞ্জাবের পাঠানকোটে (বর্তমানে ভারতের অংশ) চলে আসেন। সেখানে গড়ে তোলেন দারুল ইসলাম নামে একটি গবেষণা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র। মুসলমানদের আলাদা রাজনৈতিক সত্তার ধারণার অন্যতম রূপকার ইকবালের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও মওদূদী লীগের পথে হাঁটেননি, আর ওই না হাঁটার কারণেই লুকিয়ে আছে তার জিন্নাহ বিরোধিতার মূল সূত্র।
তিরিশের দশকের শেষভাগে মওদূদী লড়ছিলেন দুই দিকে। দেওবন্দের প্রভাবশালী আলেম হুসাইন আহমদ মাদানি তখন কংগ্রেসের যুক্ত জাতীয়তাবাদের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছিলেন— ধর্মে ভিন্ন হলেও ভারতের মুসলমানরা ভূখণ্ডের সূত্রে একই ভারতীয় জাতির অংশ। মওদূদী এর তীব্র জবাব দেন। কিন্তু তার চিন্তার মৌলিকতা ধরা পড়ে পরের ধাপে। যে যুক্তিতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নাকচ করলেন, ওই একই যুক্তিতে প্রত্যাখ্যান করলেন মুসলিম লীগের মুসলিম জাতীয়তাবাদকেও। তার কাছে জাতীয়তাবাদ মানেই আদর্শের জায়গায় জন্মসূত্রের আনুগত্যকে বসানো। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ; মুসলমান পরিবারে জন্মালেই কেউ ওই আদর্শের বাহক হয়ে ওঠে না। এই পর্বের লেখাগুলো পরে ‘মুসলমান আওর মওজুদা সিয়াসি কাশমকাশ’ (মুসলমান ও সমকালীন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব) নামে সংকলিত হয়। সেখানে তার যুক্তির সারকথা ছিল, মুসলমানদের আলাদা ভূখণ্ড যদি পশ্চিমা ধাঁচের জাতিরাষ্ট্রই হয়, তবে বদলাবে কেবল শাসকের নাম, শাসনের চরিত্র নয়।
১৯৪১ সালের অগাস্টে লাহোরে মাত্র পঁচাত্তর জন সদস্য নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর যাত্রা শুরু হয়। সময়টি লক্ষ্য করার মতো। লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে এক বছর আগে, মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবিতে গণআন্দোলন গড়ে তুলছে। ঠিক তখন মওদূদী গড়লেন একটি ছোট ও বাছাই করা দল, যার লক্ষ্য জনসমর্থন নয় বরং আদর্শিক বিশুদ্ধতা।
জিন্নাহর প্রতি মওদূদীর আপত্তি ছিল দুই স্তরে। প্রথম স্তরে নেতৃত্বের চরিত্র। লীগের শীর্ষ নেতাদের বড় অংশ ছিলেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত আইনজীবী, জমিদার ও পেশাজীবী, ব্যক্তিজীবনে ধর্মাচার থেকে যাদের অনেকের দূরত্ব ছিল স্পষ্ট। জিন্নাহ নিজে ছিলেন এই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিনিধি। মওদূদীর প্রশ্ন ছিল, যে নেতৃত্বের চিন্তা ও চরিত্রে ইসলামের ছাপ নেই, তারা কীভাবে ইসলামি রাষ্ট্র গড়বেন? তার দৃষ্টিতে ইসলামি রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ কেবল ইসলামি চরিত্রে গড়ে ওঠা মানুষই করতে পারে; আদমশুমারির খাতায় মুসলমান হিসেবে নাম থাকলেই ওই যোগ্যতা তৈরি হয় না।
দ্বিতীয় স্তরটি আরও গভীর। জিন্নাহর রাজনীতিতে ইসলাম কাজ করত মূলত পরিচয়ের প্রতীক ও রাজনৈতিক সংহতির উপকরণ হিসেবে। ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল ‘দ্য সোল স্পোকসম্যান: জিন্নাহ, দ্য মুসলিম লীগ অ্যান্ড দ্য ডিমান্ড ফর পাকিস্তান’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জিন্নাহ পাকিস্তান দাবিকে অনেকাংশে ব্যবহার করেছিলেন কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় মুসলমানদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে। পাকিস্তান কেমন রাষ্ট্র হবে, ওই প্রশ্নে জিন্নাহ সচেতনভাবেই অস্পষ্ট থেকেছেন, কারণ তাতে নানা মত ও স্বার্থের মুসলমানকে এক পতাকার নিচে ধরে রাখা সহজ হয়েছিল।
মওদূদীর চোখে ঠিক এটাই ছিল মূল বিপদ। ১৯৪৭ সালের ১১ অগাস্ট গণপরিষদে জিন্নাহ যখন ঘোষণা করলেন, নাগরিক কোন ধর্মের অনুসারী তাতে রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না, তখন মওদূদীর আশঙ্কা যেন প্রমাণিত হলো।
তবে এই বিরোধিতাকে কেবল তাত্ত্বিক লড়াই ভাবলে ব্যাখ্যাটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মওদূদী ও জামায়াতের ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে প্রামাণ্য গবেষকদের অন্যতম, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সৈয়দ ওয়ালি রেজা নাসর আরেকটি মাত্রা সামনে এনেছেন। মওদূদী নিজেকে উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতির প্রকৃত আদর্শিক দিশারি মনে করতেন, আর লীগ ও জামায়াত আসলে একই জনগোষ্ঠীর আনুগত্যের জন্য প্রতিযোগিতা করছিল। তত্ত্ব ও ক্ষমতার হিসাব এখানে আলাদা করা কঠিন।
দুই দলের সাংগঠনিক চরিত্রেও এই পার্থক্য স্পষ্ট। মুসলিম লীগ ছিল ছাতার মতো একটি গণসংগঠন, যেখানে সদস্য হওয়ার জন্য মুসলমান পরিচয়টুকুই যথেষ্ট ছিল; লক্ষ্য ছিল একটি রাষ্ট্র অর্জন। জামায়াত গড়ে উঠেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছাঁচে। নাসর একে তুলনা করেছেন লেনিনবাদী ‘ভ্যানগার্ড’ দলের সঙ্গে—কঠোর সদস্যপদ, স্তরভিত্তিক শৃঙ্খলা, আর সমাজ ও রাষ্ট্রের আদর্শিক রূপান্তরের লক্ষ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফারজানা শেখ ‘মেকিং সেন্স অব পাকিস্তান’ গ্রন্থে যে বিশ্লেষণ হাজির করেছেন, তার সূত্র ধরে বলা যায়, লীগ চেয়েছিল মুসলমানদের জন্য একটি রাষ্ট্র, আর জামায়াত চেয়েছিল ইসলামের রাষ্ট্র। ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ ও ‘ইসলামি রাষ্ট্রের’ এই ফারাকই পাকিস্তানের পরবর্তী ইতিহাসের কেন্দ্রীয় টানাপোড়েনে পরিণত হয়।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর মওদূদীর এই বিরোধিতা কোন পথে গেল, আর যে রাষ্ট্রকে তিনি সমর্থন করেননি, তার সংবিধান ও আইনে কীভাবে তার চিন্তা জায়গা করে নিল, ওই আলোচনা পরের পর্বে।
সাঈদ ইফতেখার আহমেদ: শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম। ই-মেইল: sia112002@yahoo.com
