Published : 19 Mar 2026, 01:18 AM
ইরানে হামলা করার আগে যুক্তরাষ্ট্র যদি ধরে নিয়ে থাকে যে নিজের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে সাহস করবে না, তাহলে তাদের অনুমান ছিল ভুল।
এক প্রতিবেদনে সিএনএন লিখেছে, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করেছিল, এখনও কাছাকাছি পরিমাণ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠাচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হলে ইরান হরমুজে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। তাতে ওই পথ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়।
হরমুজ পার হতে গিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ১৬টি জাহাজ ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর কিছু হামলার দায় ইরান স্বীকার করেছে।
সিএনএন এর প্রতিবেদন বলছে, ইরান সফলভাবে অন্যদের তেলের জাহাজ আটকে দিতে পেরেছে এবং নিজেদের রপ্তানিও অব্যাহত রাখতে পেরেছে।
দেশের অর্থনীতি এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ যোগাতে ইরানের জন্য তেল রপ্তানি গুরুত্বপূর্ণ। আর যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই কোটি কোটি ব্যারেল তেল নিয়ে সমুদ্রে বিক্রেতার জন্য অপেক্ষা করছিল ইরানি জাহাজ।
ট্যাংকার ট্র্যাকিং ডেটা এবং স্যাটেলাইট ছবি দেখাচ্ছে, যুদ্ধের মধ্যেও ইরানি তেলবাহী জাহাজ ওই প্রণালি দিয়ে গেছে, যদিও উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ভারতের গুজরাটের মুন্দ্রা বন্দরে পৌঁছেছে এলপিজিবাহী ভারতের জাহাজ ‘শিবালিক’
বাণিজ্যিক ডেটা বিশ্লেষণ সংস্থা কপ্লারের বিশেষজ্ঞদের অনুমান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে ইরান।
আর মেরিন ইনটেলিজেন্স কোম্পানি ট্যাংকারট্র্যাকার্সের ধারণা, গত সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১ কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল তেল ইরান এই সময়ে হরমুজ দিয়ে পার করেছে।
এই পরিসংখ্যান ঠিক হলে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে ইরান। কপ্লারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইরানের দৈনিক গড় রপ্তানি ছিল ১৬.৯ লাখ ব্যারেল।
সিএনএন লিখেছে, ইরানি ট্যাংকার আটকাতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো কার্যকর চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে না, যদিও তারা ইরানের নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস করার দাবি করেছে।
ইরানের তেল অবকাঠামো যেমন শোধনাগার, পাইপলাইন ও রিজার্ভ ট্যাংকে হামলাও এড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইসরায়েলি হামলায় তেহরানসহ রাজধানীর আশেপাশের তেল মজুদের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের তেলের বড় অংশ খার্ক দ্বীপের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে রপ্তানি করা হয়, যা ইরানি উপকূল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে।
শুক্রবার ওই দ্বীপে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্র তীব্র আক্রমণ চালালেও তেল অবকাঠামোতে কোনো আঘাত করা হয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প পরে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে থাকে, তাহলে তিনি খার্কের তেল অবকাঠামো এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দূত মাইক ওয়াল্টজ সিএনএনকে বলেছেন, ট্রাম্প তার পরিকল্পনা থেকে কোনো বিকল্প বাদ দিচ্ছেন না।
“আমি নিশ্চিত, তিনি যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করতে চান, তাহলে সেটা তিনি করবেন।”
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার সিএনবিসিকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু ইরানি, ভারতীয় ও চীনা জাহাজ চলাচল করছে, ওয়াশিংটন আপাতত তাতে বাধা দিচ্ছে না।
ট্যাংকারট্র্যাকার্স জানিয়েছে, খার্কের তেল অবকাঠামো শনিবারও কার্যকর ছিল। স্যাটেলাইট ছবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দ্বীপের ৫৫টি অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকের সবই অক্ষত এবং দুটি ইরানি ট্যাংকার শনিবার ২৭ লাখ ব্যারেল তেল লোড করছিল।
আরও অনেক ইরানি ট্যাংকার দ্বীপ থেকে রওনা হয়ে থাকতে পারে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার জন্য এসব জাহাজ প্রায়ই ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে রাখে, ফলে সেগুলোর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা কঠিন।
মেরিন ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, শুক্রবারও ছয়টি ইরানি জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে ভুয়া অবস্থান দেখাচ্ছিল।
এনার্জি ডেটা সংস্থা ভর্টেক্সা জানায়, যুদ্ধ শুরুর আগেই কোটি কোটি ব্যারেল তেল নিয়ে ইরানি জাহাজ বিক্রেতার জন্য সমুদ্রে অপেক্ষ করছিল। কেবল জানুয়ারি মাসেই সাগরে ছিল প্রায় ১.৭ কোটি ব্যারেল তেলবাহী জাহাজ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলা শুরু করার আগে ফেব্রুয়ারি মাসেই রপ্তানি বাড়িয়ে দেয় ইরান। ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক গড়ে ২০.৪ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে খার্ক ছেড়ে গেছে ইরানি জাহাজ, যা গত বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেশি।
ইরানের আধা সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরান প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিও বৃদ্ধি করতে পেরেছে। ইরাকের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে ফার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরান থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি তিনগুণ বেড়ে দৈনিক ১৮ মিলিয়ন ঘনমিটার হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের সুবিধা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের জন্য, বিশেষ করে এশীয় গ্রাহকদের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ দিচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্বাস অরাকচি বলেছেন, “হরমুজ প্রণালী খোলা আছে, শুধুমাত্র আমাদের শত্রুদের জাহাজ ও যারা আমাদের এবং তাদের মিত্রদের ওপর হামলা করছে, তাদের জন্য বন্ধ। অন্যরা স্বাধীনভাবে চলতে পারবে।”
ইরানি সংবাদপত্র শরক লিখেছে, ভারত গত মাসে আটকানো তিনটি ইরানি ট্যাংকার ছেড়ে দিয়েছে, যাতে ইরান দুটি ভারতীয় জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সুযোগ দেয়। সমুদ্র নিরাপত্তা ও তেল বাণিজ্য নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনাও চলছে।
ভারতের শিপিং মন্ত্রণালয় সিএনএনকে বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলপিজিবাহী দুটি জাহাজ শুক্রবার রাত থেকে শনিবারের মধ্যে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে বলেছেন, কৌশলগত কূটনীতি কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে, ভারতীয় ট্যাংকার পার করার আলোচনা তার উদাহরণ।
তিনি বলেন, “আমি এই মুহূর্তে তাদের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত এবং আমার আলোচনা কিছু ফল দিয়েছে।”
একজন ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, চীনা মুদ্রা ইউয়ানে তেল বিক্রির শর্তে কিছু ট্যাংকারকে প্রণালি পার হতে দেওয়ার প্রস্তাব তারা বিবেচনা করছে।
তেল বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই ডলারে হয়। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেল কেনাবেচা হয় রুবল বা ইউয়ানে।
চীন কয়েক বছর ধরেই ইউয়ানে তেল কিনতে চেষ্টা করছে, বিশেষ করে সৌদি আরবে।
সিএনএন লিখেছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা অন্য দেশগুলোর মত ইরানের জন্যও জরুরি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র যদি চায়, ইরানি জাহাজও ওই প্রণালি পার হতে গিয়ে বিপদে পড়বে।