১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

শিশু সুরক্ষা: মেটাকে ‘উপদ্রব’ ঘোষণা, ৫৭ কোটি ডলার জরিমানা

এর আগে একই মামলায় মেটাকে সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়েছিল।

শিশু সুরক্ষা: মেটাকে ‘উপদ্রব’ ঘোষণা, ৫৭ কোটি ডলার জরিমানা
মেটার কারণে পুরো সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আদালত। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Aug 2026, 06:04 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

শিশু সুরক্ষার এক মামলায় সোশাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটাকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের এক আদালত। 

শিশুদের জন্য তাদের প্ল্যাটফর্মগুলোর ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করতে ব্যর্থতার দায়ে এ জরিমানা করা হয়েছে, যা শিশুসুরক্ষা প্রশ্নে এখন পর্যন্ত মেটার সর্বোচ্চ অংকের অর্থদণ্ড।

বৃহস্পতিবার দেওয়া রায়ে বিচারক ব্রায়ান বিডশাইড বলেন, এই সোশাল মিডিয়া এমন ‘উপদ্রব’, যা বায়ুদূষণের মতো ক্ষতি করে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে একটি তহবিল গঠনের জন্য মেটাকে এই অর্থ দিতে হবে।

এর আগে একই মামলায় মেটাকে সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। নতুন জরিমানাসহ মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।

মেটাকে একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করে রায়ে বিচারক বলেন, এ কোম্পানির পণ্য হল বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট; আর ‘শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ’ হলো সেই দূষণ, যা দূর করা দরকার।

ইনস্টাগ্রাম, ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডসের মালিক কোম্পানি মেটার একজন মুখপাত্র বৃহস্পতিবার বলেন, “আমরা এই রায়ের সঙ্গে একমত নই এবং এর বিরুদ্ধে আপিল করব।”

তিনি বলেন, “আমাদের প্ল্যাটফর্মে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কঠোর পরিশ্রম করি। ক্ষতিকর ব্যক্তি ও ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আমরা স্বচ্ছ থেকেছি। 

“অনলাইনে কিশোর বয়সিদের সুরক্ষায় আমাদের কাজের বিষয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী এবং প্রকৃত তথ্য বিকৃত করে আনা অভিযোগের বিরুদ্ধে আমরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে থাকব।”

এর আগে একই মামলায় ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানার রায়ের পরও মেটা বলেছিল, তারা আপিল করবে এবং প্রায় একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছিল। শিশু নিরাপত্তা প্রশ্নে মেটার বিরুদ্ধে সেটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যের প্রথম জয়।

শিশু সুরক্ষা প্রশ্নে মার্ক জাকারবার্গের কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্রমাগত মামলা বাড়ছে। ছবি: রয়টার্স

শিশু সুরক্ষা প্রশ্নে মার্ক জাকারবার্গের কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্রমাগত মামলা বাড়ছে

বিবিসি লিখেছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে হাজারো মামলা বিচারাধীন। নিউ মেক্সিকোর পাশাপাশি চলতি বছরের শুরুতে লস অ্যাঞ্জেলেসেও একই ধরনের অভিযোগে একটি মামলায় হেরে যায় মেটা।

২০২৩ সালে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের করা এক মামলার ভিত্তিতে এ বিচার শুরু হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, মেটার প্ল্যাটফর্ম শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং তাদের যৌন উত্তেজক কনটেন্ট ও যৌন অপরাধীদের সংস্পর্শে নিচ্ছে। এজন্য মেটাকে দায়ী করা উচিত।

বিচারের প্রথম ধাপের রায়ে বলা হয়, মেটা বারবার নিউ মেক্সিকোর ‘আনফেয়ার প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’ লঙ্ঘন করেছে। তাদের ‘রেকমেনডেশন অ্যালগরিদম’ কমবয়সি ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর কনটেন্ট ও ক্ষতিকর যোগাযোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

‘রেকমেনডেশন অ্যালগরিদম’ হচ্ছে এমন এক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের সামনে কোন কনটেন্ট দেখানো হবে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাছাই করে মেটা।

মামলার দ্বিতীয় ধাপের রায়ে বিচারক বিডশাইড বলেন, মেটার ক্ষতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা ‘পাবলিক নুইসেন্স’ বা ‘জনস্বার্থবিরোধী উপদ্রব’ হয়ে দাঁড়িয়েছে; যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পুরো সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিবিসি লিখেছে, এই রায়ে শিশু সুরক্ষা প্রশ্নে মেটা যে শুধু সবচেয়ে বড় জরিমানার মুখে পড়ল–তা নয়, বরং কোনো সোশাল মিডিয়া কোম্পানিকে এই প্রথমবারের মত ‘উপদ্রব’ ঘোষণা করা হল।

রায়ে বিচারক বলেন, “একটি কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত দূষণ যেমন মানুষের নির্মল বাতাস পাওয়ার অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; তেমনি শিশুদের ওপর মেটা প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর প্রভাব কেবল ওই প্ল্যাটফর্মেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পুরো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে এবং সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগজনকভাবে বাস্তব জীবনেও প্রভাব ফেলে।

“এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু, তাদের পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ওপর সামাজিকভাবে একটি সাধারণ বোঝা তৈরি হয়, ক্ষতির সৃষ্টি করে।”

বিচারক বিডশাইড বলেন, মেটাকে যে তহবিল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা এই ক্ষতির ‘বিস্তৃত প্রভাব’ মোকাবিলায় ব্যবহৃত হবে।

আদালতের আদেশ অনুযায়ী, জরিমানার অর্থের বড় অংশ ৪২ কোটি ডলার—মেটার প্ল্যাটফর্মের কারণে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ব্যয় করা হবে। এ অর্থ দিয়ে উপযুক্ত ক্লিনিক্যাল ও আচরণগত স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি এবং বিশেষজ্ঞদের অর্থায়ন করা হবে।

অর্থের আরেকটি অংশ সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণে ব্যয় হবে। এর মধ্যে শিক্ষক ও স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ থাকবে, যাতে শিশুদের ওপর সোশাল মিডিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার কৌশল শেখানো হবে।

বিচারক মেটাকে আরও কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট যেন কোনো প্রাপ্তবয়স্কের সামনে না দেখানো (রেকমেন্ড) হয়, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক যেন অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীকে বার্তা পাঠাতে না পারেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের নগ্ন ছবি বা ভিডিও পাঠানো ও গ্রহণ নিষিদ্ধ করা এবং শিশু যৌন শোষণে জড়িত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের জন্য ‘ওয়ান-স্ট্রাইক’ নীতি চালু করা।

এ ছাড়া মেটাকে আরও যেসব পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে-

•    ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ‘লাইক’ সংখ্যা না দেখানো।

•    প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এবং শিক্ষাবর্ষ চলাকালে সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত এসব ব্যবহারকারীর কাছে পুশ নোটিফিকেশন পাঠানো বন্ধ রাখা।

•    ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুক মিলিয়ে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ৯০ ঘণ্টা, অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা ব্যবহারসীমা বাধ্যতামূলক করা।

আগামী সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ায় মেটার বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার শুরু হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন ডজন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল শিশুদের গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এ কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।