১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন বন্যার ঝুঁকির মধ্যেই নেপালের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি

এই বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে; ট্রেকার এবং তীর্থযাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই রুটে এখনো হাজার খানেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

নতুন বন্যার ঝুঁকির মধ্যেই নেপালের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি
ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Aug 2026, 11:37 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:54 PM

দুই দিন আগে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় বিধ্বস্ত নেপালের শহরগুলোতে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকারী দল। 

রয়টার্স জানিয়েছে, জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার আশা ফিকে হয়ে আসছে, নতুন করে বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি কমাতে কাজ করে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বুধবার সকালে নেপাল ও প্রতিবেশী তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহ ধসে হিমালয়ের পাহাড়ি নদী দিয়ে পাথর, বরফ, কাদা এবং ধ্বংসস্তূপের বিশাল স্রোত আছড়ে পড়ে। 

কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, এই বন্যায় এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে।

বন্যাটি কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসার সংযোগকারী রুটের গ্রাম ও উপত্যকাগুলোকে তছনছ করে দিয়েছে। ধ্বংস হয়ে গেছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তাঘাট এবং সেতু। 

ট্রেকার এবং তীর্থযাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই রুটে এখনো হাজার খানেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

কোথায় কত মৃত্যু, কত নিখোঁজ

কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী এবং এর ভাটি অঞ্চলে জীবিত ও মৃতদের সন্ধানে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। 

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ১২৭ জন নেপালি নাগরিকসহ মোট ৬৬৭ জন পর্যটক ও দর্শনার্থী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

বিদেশি নিখোঁজ নাগরিকদের বিষয়ে বোর্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৩১ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ১ জন ভারতীয়, ৪ জন দক্ষিণ কোরীয়, ২ জন মার্কিন, ২ জন রুশ, ২ জন ইতালীয়, ১ জন বুলগেরীয় এবং ১ জন সুইস নাগরিক। উদ্ধার হওয়া বাকি ১৮ জনের জাতীয়তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।

নেপাল পুলিশের বরাতে নেপাল নিউজ উদ্ধার হওয়া ৪৬৯টি মরদেহের জেলাভিত্তিক একটি পরিসংখ্যান দিয়েছে। 

সবচেয়ে বেশি ১৭৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে চিতওয়ান জেলা থেকে। এছাড়া নবলপরাসী বরদাঘাট সুস্তার পূর্বে ১১০ জন, গোর্খায় ৪৪ জন, নুয়াকোটে ৩৭ জন, ধাদিংয়ে ৩৩ জন, তানাহুনে ২৮ জন, নবলপরাসী বরদাঘাট সুস্তার পশ্চিমে ২৭ জন এবং রসুয়া জেলা থেকে ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। 

নেপাল সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী একযোগে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে এবং আটকা পড়াদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।

হ্রদ ভেঙে নতুন বন্যার শঙ্কা

এদিকে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসস্তূপ নদীর গতিপথ আটকে দেওয়ায় নতুন করে বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, ধ্বংসস্তূপের কারণে ভোটে কোশি নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে এবং এর পানি ক্রমাগত বাড়ছে, যা যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

সীমান্তের অপর প্রান্ত থেকে চীন জানিয়েছে, আগামী তিন দিনের মধ্যে ওই হ্রদে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার (১২০০ অলিম্পিক সাইজ সুইমিং পুলের সমান) পানি প্রবেশ করতে পারে। 

চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, ফলে হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।

হ্রদটির থ্রিডি মডেলিং এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চীন আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল পাঠিয়েছে।

বিপর্যস্ত তিব্বত সীমান্ত

তিব্বতের জিরং সীমান্ত ক্রসিং বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

বুধবারের ভিডিওতে দেখা যায়, মুহূর্তের মধ্যে কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত সীমান্ত এলাকার স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পালানোর চেষ্টা করা মানুষও ওই স্রোতের মধ্যে পড়ে যান।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনা উদ্ধারকারীরা সীমান্তের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে পারেননি। প্রধান সড়কে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছিল।

চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, জিরং কাউন্টিতে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেখানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। 

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার জিরং পরিদর্শন করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় বেইজিং এই দুর্যোগকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।

জীবিতদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, উদ্বেগে স্বজনরা

বন্যায় বেঁচে ফেরা রসুয়া শহরের বাসিন্দা দিবগা তামাংকে বৃহস্পতিবার নুয়াকোটের একটি সেনা ক্যাম্পে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে আসা হয়। 

সর্বস্বান্ত তামাং বলেন, "আমাদের সব মানুষ হারিয়ে গেছে। তারা মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মত আর কেউ নেই। সবকিছু শেষ।"

এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিখোঁজদের স্বজনরা উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন। নেপালে তীর্থযাত্রায় যাওয়া শত শত ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ থাকায় ভারতজুড়ে শোক ও উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে। 

নিখোঁজদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন। ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা স্নেহা সুধীরের স্বামী তিব্বতের মাউন্ট কৈলাসে ট্রেকিংয়ে গিয়েছিলেন। 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, "সবাই কাঁদছে, চোখের জল মুছে আবার কাজে ফিরছে।"

নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক, বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের অবস্থান জানার চেষ্টা করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নেপালকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "শক্তপোক্ত ভবনগুলো টুথপিকের মত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এটি এক ভয়ানক ঘটনা।"

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বৃহস্পতিবার বন্যাদুর্গত নুয়াকোট পরিদর্শন করে বলেছেন, "রাষ্ট্রের সব সংস্থা পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করছে। নিখোঁজদের উদ্ধার এবং নাগরিকদের জীবন রক্ষাই এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।" 

২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এই বন্যাকে নেপালের ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।