Published : 17 Mar 2026, 04:04 PM
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলি লারিজানি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ।
সেই সঙ্গে ইরানের বাসিজ ইউনিটের কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানিও নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)
বিবিসি জানিয়েছে, মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে কাটজ বলেন, রাতভর ইসরায়েলি হামলার পর ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানির নিহত হওয়ার তথ্য তিনি ‘মাত্রই’ পেয়েছেন।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও কোনো বক্তব্য আসেনি। ইরানের বার্তা সংস্থা মেহের ও তাসনিমের বরাত দিয়ে বিবিসি লিখেছে, আলি লারিজানির বিষয়ে শিগগিরই একটি বিবৃতি প্রকাশ করবে তেহরান।
ইসরায়েলি বাহিনী সোমবার রাতে ইরানের রাজধানী তেহরান এবং শিরাজ ও তাব্রিজ শহরে একযোগে হামলা চালায়। এসব হামলায় তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও কমান্ড সেন্টারগুলোকে নিশানা করার কথা জানিয়েছে।
এর মধ্যেই তেহরানে লারিজানিকে নিশানা করে হামলা চালানোর কথা আইডিএফের পক্ষ থেকে বলা হয়।
আইডিএফের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জমির ওই হামলায় ‘উল্লেখযোগ্য’ ফল অর্জিত হওয়ার কথা এর আগে বলেছিলেন।
আইডিএফ বলেছে, চলতি বছরের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে জড়িত বাসিজ ইউনিটের কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানিও তাদের আরেক হামলায় নিহত হয়েছেন।
টেলিগ্রামে এক পোস্টে আইডিএফের পক্ষ থেকে বলা হয়, ছয় বছর ধরে রেভল্যুশনারি গার্ডস–সম্পৃক্ত ওই মিলিশিয়া বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন সোলাইমানি। তাকে নিশানা করে সোমবার হামলা চলায় ইসরায়েলের বিমান বাহিনী।
এ বিষয়েও ইরানের সংবাদমাধ্যমে এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

কে এই আলি লারিজানি?
আল জাজিরা লিখেছে, ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে সংযত ও বাস্তববাদী একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত আলি লারিজানি দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইরানের সমর কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন তিনি।
১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানি ইরানের আমোলের একটি বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। প্রভাবশালী ওই পরিবারকে একসময় ‘ইরানের কেনেডি পরিবার’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল টাইম ম্যাগাজিন।
লারিজানির বাবা ছিলেন একজন খ্যাতিমান ধর্মীয় পণ্ডিত। ২০ বছর বয়সে তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী মুর্তজা মোতাহারির মেয়ে ফরিদেহ মোতাহারিকে বিয়ে করেন।
সমসাময়িক অনেক নেতার তুলনায় লারিজানির শিক্ষাজীবন ছিল তুলনামূলকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। তিনি গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি নেন এবং পরে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের দর্শন নিয়ে গবেষণা করে পাশ্চাত্য দর্শনে ডক্টরেট করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরে যোগ দেন। পরে সরকারে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন; সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেন। এক সময় রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির প্রধানও ছিলেন।
২০০৫ সালে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারির দায়িত্ব পান লারিজানি। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের নেতৃত্বও দেন তিনি। তবে পরে সেই দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
২০০৮ সালে লারিজানি এমপি হন এবং টানা তিন মেয়াদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি অনুমোদনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০২৫ সালের অগাস্টে লারিজানি আবার নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেক্রেটারি পদে ফিরে আসেন এবং তার পর থেকে তেহরান প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন।

বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানি কে?
আল জাজিরা লিখেছে, ১৯৬৪ সালে জন্ম নেওয়া সোলাইমানি তরুণ বয়সে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরে যোগ দেন।
ধীরে ধীরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার হন। পরে আইআরজিসির কয়েকটি ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন।
২০১৯ সাল থেকে বাসিজ বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন গোলামরেজা সোলাইমানি।
আইআরজিসির অধীন এই স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনীতে আনুমানিক সাড়ে চার লাখ সদস্য রয়েছে। এ বাহিনীর নেতা হিসেবে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত ছিরেন সোলাইমানি।
ইরান সরকারের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত সোলাইমানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ একাধিক পশ্চিমা দেশ ও সংস্থার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।