গাম্বিয়া: মানচিত্র যার নদীর মতো

রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য আলোচিত গাম্বিয়া।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 July 2022, 01:34 PM
Updated : 23 July 2022, 01:34 PM

নদী ধরে শহর-নগর গড়ে ওঠা স্বাভাবিক এক ঘটনা, কিন্তু একটি নদী ধরে একটি দেশের মানচিত্র বিরল এক ঘটনা, আর সেই ঘটনাটিই ঘটেছে গাম্বিয়ার ক্ষেত্রে।

রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য গাম্বিয়া দেশটির নাম এখন বাংলাদেশে অনেকটাই জানা, তবে দেশটি সম্পর্কে জানতে গেলে সবার আগে চোখে পড়বে এর অদ্ভুত মানচিত্র।

উত্তর আটলান্টিকের পাড়ে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালের ঠিক পেটের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে একটি নদী, যার দুই তীরে মাত্র ১১ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি আলাদা মানচিত্র, রিপাবলিক অব গাম্বিয়া।

Also Read: জাতিসংঘের আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের পথ খুললো

দেশটির রাজধানী বানজুলের অবস্থান একেবারে পশ্চিমে, যেখান থেকে মূল গাম্বিয়া নদীর শুরু হয়েছে।

পশ্চিম আফ্রিকার প্রধান এই নদীটি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ১ হাজার ১২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সেনেগালের প্রাচীর ভেদ করে পাশের দেশ গিনিতে পৌঁছে হারিয়ে গেছে। তবে নদীর সঙ্গে এঁকেবেঁকে কিছুদূর গিয়ে সীমানা প্রাচীর উঠেছে এক সময় সেনেগালের সঙ্গে থাকা গাম্বিয়ার।

১৯ শতকে গাম্বিয়া নদীর নিম্নাংশে গ্রেট ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণ ছিল। সেসময় সেনেগালের নিয়ন্ত্রণ ছিল ফ্রান্সের হাতে। ঔপনিবেশিক সমঝোতার কারণেই ২৭ লাখ জনসংখ্যার দেশ গাম্বিয়ার এই অদ্ভুত গড়ন।

১৯৬৫ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে গাম্বিয়া। পরে ১৯৮২ সালে সেনেগালের সঙ্গে একত্র হয়ে ‘সেনেগাম্বিয়া’ নামের একটি কনফেডারেশন হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৯ সালে সে কনফেডারেশন ভেঙে যায়।

১৯৯৪ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গাম্বিয়ায় ক্ষমতা দখল করেন লেফটেন্যান্ট ইয়াহিয়া জামেহ্। তিনি ২২ বছর দেশ শাসন করেন। ২০১৫ সালে গাম্বিয়াকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়।

জনসংখ্যা

আফ্রিকার অন্য দেশগুলোর তুলনায় আয়তনে অনেক ছোট গাম্বিয়ার মোট জনসংখ্যা ২৭ লাখ, যা বাংলাদেশের ১২ ভাগের এক ভাগ মাত্র।

দেশটির ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ শহরে এবং ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ গ্রামে বাস করে। শহুরে জীবন মূলত রাজধানী বানজুলকে কেন্দ্র করেই।

৯৬ শতাংশ সুন্নি মুসলিম জনসংখ্যার দেশটিতে খ্রিস্টান ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ও অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসীদের সংখ্যা শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ও শিশু মৃত্যুর হার পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে গাম্বিয়াতেই সর্বোচ্চ।

গাম্বিয়ায় স্বাক্ষরতার হারে পুরুষ ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং নারী ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

সরকার ব্যবস্থা

বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ গাম্বিয়া। ১৯৯৬ সালে সংবিধানের সংশোধনী অনুযায়ী প্রেসিডেন্টই রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধান। তিনি সর্বজনীন ভোটাধিকারে ভিত্তিতে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। প্রেসিডেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগ করেন। ৫৩ জন সদস্য নিয়ে গঠিত আইনসভার ক্ষমতা জাতীয় পরিষদের হাতে।

রাজনীতি

স্বাধীনতার পর থেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ছিল পিপলস প্রগ্রেসিভ পার্টি (পিপিপি)। ১৯৯৪ সালের অভ্যুত্থানের পর দলটির পতন ঘটে। ১৯৯৬ সাল থেকে অ্যালায়েন্স ফর প্যাট্রিয়টিক রিওরিয়েন্টেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন দলটি এখন প্রভাবশালী। সক্রিয় থাকা পিপিপি ছাড়াও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর মধ্যে রয়েছে গাম্বিয়া পিপলস পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন মুভমেন্ট, পিপলস ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশন ফর ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যান্ড সোশ্যালিজম এবং ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক পার্টি।

সংবিধানে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীরা সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নারীরা আইনসভা ও মন্ত্রিসভায় থাকলেও সংখ্যায় কম।

১৯৯৪ সালে একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করা হয় এবং সামরিক নেতা ইয়াহিয়া জাম্মে্‌ তার স্থান নেন। জাম্মেহ্ পরবর্তীকালে গাম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জাম্মেহ্কে পরাজিত করার পরে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে অ্যাডামা ব্যারো গাম্বিয়ার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হন।

অর্থনীতি

গাম্বিয়ান কৃষিকে একটি ক্লাসিক মনোকালচার ধরনের, অর্থাৎ একটা সময়ে এক ধরনের শস্যই চাষাবাদ করা হয়। চিনাবাদাম দেশটির সবচেয়ে মূল্যবান কৃষিপণ্য। বেশিরভাগ কৃষি জমিই গ্রামবাসীদের হাতে।

শ্রমের ক্ষেত্রে বিভাজন রয়েছে, যেমন- পুরুষরা অর্থকরী ফসল রোপণ, চাষাবাদ ও সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত। আর নারীরা কাসাভা (ম্যানিক), ইয়াম, বেগুন, টমেটো, চাল এবং মসুরের মতো ফসল চাষ করে। নারীদের চাষাবাদের লক্ষ্য থাকে নিজেদের উৎপাদিত ফসল খেয়ে-পড়ে বাঁচা, বিক্রি ও লাভ সেখানে মুখ্য বিষয় নয়।

দেশটির বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র। পর্যটন শিল্পও তাদের আয়ের উৎস।

দেশটির রপ্তানি পণ্য বাদাম, মাছ, পাম কার্নেল ও তুলা। আর খাদ্য, যন্ত্রপাতি, পরিবহন সরঞ্জাম, উৎপাদিত পণ্য, জ্বালানী তাদের আমদানি পণ্য। ২০১৮ সালে গাম্বিয়া আইভরি কোস্ট থেকে ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্য আমদানি করেছে। এরপর যুক্তরাজ্য থেকে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ পণ্য আমদানি করেছে। এ ছাড়া ব্রাজিল, চীন, ভারত ও অন্যান্য দেশ থেকেও গাম্বিয়া পণ্য আমদানি করে থাকে।

২০১৭ সালে দেশটি ভারতে ১৭ শতাংশ পণ্য রপ্তানি করে। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও নেদারল্যান্ডসেও তারা পণ্য রপ্তানি করে থাকে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক