Published : 25 Nov 2025, 02:29 AM
রাশিয়ার আগ্রাসন থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া শান্তি প্রস্তাব নিয়ে ইউক্রেইনের যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনাদের মধ্যে প্রতিবাদ, ক্ষোভ ও অসহায়ত্বের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
বিবিসি এমন ছয়জন সেনার সঙ্গে কথা বলেছে, যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ই-মেইলের মাধ্যমে শান্তি প্রস্তাব নিয়ে তাদের মত প্রকাশ করেছেন। এর আগে, মূল মার্কিন শান্তি পরিকল্পনার বিস্তারিত গত সপ্তাহে ফাঁস হয়।
তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেইনের আলোচকরা প্রস্তাবটিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন এবং “শান্তি কাঠামো” নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পূর্ব ইউক্রেইনে থাকা সেনা যরোস্লাভ বলেন, “পরিকল্পনাটি খুবই বাজে, এটা কেউই সমর্থন করবে না”।
সুটসার কোডনামের আরেকজন সেনা চিকিৎসক এই পরিকল্পনাকে “একেবারেই অসম্মানজনক খসড়া শান্তি পরিকল্পনা এবং মনোযোগ কাড়ার মতো নয়” বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে স্নেক কোডনামের আরেক সেনা বলেন, “অন্ততপক্ষে কোনও না কোনও বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো এখন সময়ের দাবি।”
শান্তি পরিকল্পনার মূল কিছু বিষয় নিয়ে বিবিসি’র সঙ্গে আলাপে যা বলেছেন সেনারা:
ভূমি ছাড়ার প্রস্তাব:
যুক্তরাষ্ট্র এমন সময় খসড়া শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে যখন রাশিয়া সামরিক দিক দিয়ে অগ্রগতি করছে। এক মাসে ইউক্রেইনের আরও ৪৫০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল রাশিয়ার হাতে গেছে।
ডনবাসের প্রায় ১৫ শতাংশ এখনও কিইভের নিয়ন্ত্রণে আছে। ওদিকে, লুহানস্ক ও দনেৎস্ক অঞ্চল রাশিয়ার মূল লক্ষ্য।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল শান্তি পরিকল্পনায় ইউক্রেইনকে পুরো অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে, এমন অংশও ছাড়তে বলা হয়েছে যা তারা প্রায় চার বছর ধরে রক্ষা করে আসছে।
ইউক্রেইনের সেনা স্নেক বিবিসি-কে বলেন, “তাদেরকে নিয়ে যেতে দিন। শহর ও গ্রামগুলোতে প্রায় কেউ নেই। আমরা মানুষের জন্য লড়ছি না, মাটির জন্য লড়ছি, আর এতে মানুষ মারা যাচ্ছে।”
ইউক্রেইনের সাধারণ সেনা সদস্য কর্মকর্তা আন্দ্রি বলেন, লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক নিয়ে যা প্রস্তাব করা হচ্ছে তা “বেদনাদায়ক ও কঠিন”, তবে এছাড়া ইউক্রেইনের এখন অন্য উপায় হয়ত নাই।
ইউক্রেইন অঞ্চলটি ২০১৪ সাল থেকে রক্ষা করে আসছে। আন্দ্রি বলেন, “আমরা হয়ত এ অঞ্চল ছেড়ে দিতে চাই না। তবে এটি সামরিকভাবে ধরে রাখতেও হয়ত আমরা সক্ষম হব না।”
পূর্ব ইউক্রেইন এই যুদ্ধে ভারি লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে আছে এবং অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরেরাখতে গিয়ে বহু সেনাও মারা গেছে।
২০১৮ সাল থেকে অঞ্চলটিতে লড়াই করে আসা সেনা মেট্রোস বিবিসি-কে বলেন, “ডনবাস রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিলে সবকিছু ব্যর্থ হয়ে যাবে, সশস্ত্র বাহিনীর সব প্রচেষ্টা বিফল হবে। সেটা হবে প্রাণ হারানো সব সেনা আর বেসামরিক নাগরিকদের জন্য অসম্মানজনক।”
সেনা সংখ্যা কমানো:
যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া শান্তি পরিকল্পনায় ইউক্রেইনের সামরিক বাহিনীর আকার ৬,০০,০০০ সদস্যে সীমাবদ্ধ করে রাখার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে ইউক্রেইনের সেনা সংখ্যা আনুমানিক ৮,০০,০০০-এর বেশি। স্নেক মনে করেন, যুদ্ধ শেষ হলে দেশ পুনর্গঠনে এই সেনাদের অনেককেই প্রয়োজন হবে। আর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা থাকলে অত বড় বাহিনীরও দরকার নেই।
সেনা আন্দ্রিরও একই মত, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকলে এত বড় সেনাবাহিনী রাখার দরকার পড়ে না। তার কথায়, ‘মানুষ ক্লান্ত, তারা পরিবারের কাছে ফিরতে চায়।’
তবে সামরিক চিকিৎসক সুটসার অবশ্য এর সঙ্গে একমত নন। তার কথায়, “ইউক্রেইনের সেনা হল একমাত্র প্রতিরক্ষা বাহিনী যা আমাদের পরাজয় ও দাসত্ব থেকে রক্ষা করে।”
ওদিকে, সেনা মেট্রোসও ইউক্রেইনের সশস্ত্র বাহিনীর আকার কমানোর প্রস্তাবকে ‘অদ্ভুত এবং ধান্দাবাজি’ আখ্যা দিয়েছেন।
নিরাপত্তার নিশ্চয়তা:
যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে ইউক্রেইনের ইচ্ছার বিষয়টি নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যত নিরাপত্তার গ্যারান্টি পাওয়ার ওপর।
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী, পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোর সদস্যপদ পাওয়ার চিন্তা বাদ দিতে হবে ইউক্রেইনকে।
যদিও বলা হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ইউক্রেইন যোগ দিতে পারবে। ভবিষ্যতে আবার রাশিয়ার হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে পরিকল্পনায়।
কিন্তু সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে সে বিষয়ে বিস্তারিত খুঁটিনাটি স্পষ্ট করে বলা হয়নি পরিকল্পনায়। আবার শান্তি চুক্তি হলে ইউক্রেইনে কোনও নেটো সেনা উপস্থিতি থাকবে না সেকথাও বলা হয়েছে।
ইউক্রেইনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়ে দেশটির সেনা বাহিনীর ড্রোন অপারেটর ইয়েভহেন মনে করেন, বিদেশি সেনা মোতায়েনই তার দেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক নিশ্চয়তা।
ইউক্রেইনে যুদ্ধবিরতি হলে পরে দেশটিতে ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ এর মাধ্যমে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য একটি বাহিনী পাঠানোর চেষ্টায় কাজ করছে। ইউক্রেইনের বিদেশি সেনা পাঠানোর এই পরিকল্পনাটি পছন্দ হয়েছে বলে জানান ইয়েভহেন।
তবে সেনা আন্দ্রি মনে করেন, ইউরোপের দেশগুলো শক্তিশালী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। কারণ, ইউরোপের দেশগুলো মেরুদণ্ডহীন আর বিভক্ত। সব আশা করা যায় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।
ওদিকে, সেনা শুটসার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও খুব বেশি আস্থা রাখা যায় না। তার কথায়, “যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকারের আমলে যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে, তা আদৌ কোনও নিশ্চয়তা নয়।”
নতুন নির্বাচন:
শান্তি পরিকল্পনায় ইউক্রেইনে যুদ্ধ শেষের ১০০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার নিয়ে ইউক্রেইনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগের কারণে।
ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দুর্নীতির অভিযোগে দুই মন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে বাধ্যও হয়েছেন। এই কেলেঙ্কারির কারণে রাজনৈতিক কোন্দল সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি সেখানে সংবাদ শিরোনামেও উঠে আসছে।
যুদ্ধক্ষেত্রেও সম্প্রতি বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। বিবিসি সাংবাদিকরা সেখানে সেনাদের সঙ্গে কথা বলে নির্বাচনের জন্য সমর্থন দেখতে পেয়েছে। সেনা স্নেক বলেন, “(নির্বাচন) অবশ্যই প্রয়োজন, বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছে তারা বিশ্বাসযোগ্য নয়।”
আরেক সেনা মারিন বলেছেন, বর্তমান সরকারের দুর্নীতিমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনিও নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানকে সমর্থন করেন। ওদিকে, সেনা আন্দ্রিও বলেন, “গোটা সরকারকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন নতুন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।”
ফলে দেখা যাচ্ছে নির্বাচনই শান্তি পরিকল্পনার একটি বিষয় যা নিয়ে সবচেয়ে কম বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পরিকল্পনাটি নিয়ে গুরুতর শঙ্কা ও উদ্বেগ রয়েছে।
সেনা ইয়ারোস্লাভ বলেন, “এ পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে।” আরেক সেনা ওলেক্সান্দর পরিকল্পনাটিকে ‘বিস্ফোরক’ বলে তিরস্কার করেছেন।
তবে অনেকের সঙ্গেই কথা বলে যে পরিষ্কার বার্তা পাওয়া গেছে তা হচ্ছে- অনেক সেনাই যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত।
সেনা আন্দ্রি শান্তি পরিকল্পনার কিছু দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও শেষমেষ বলেছেন, “যদি এ পরিকল্পনা যুদ্ধ থামায়, তাহলে তা আমার কাছে কার্যকর মনে হবে।”